বিয়ের সাক্ষী না বুঝলে কি বিয়ে হয়?
Marriage and Divorce · Hanafi
Question
২. সাক্ষীরা যদি না বোঝে এই মুহূর্তে বিয়ে সংঘটিত হচ্ছে তাহলে কি বিয়ে হয় নাকি শুধু কানে শুনলেই হয় বোঝার কোনো দরকার নেই?
একটু বিস্তারিত ভাবে উওর দিন এই বিষয় গুলো নিয়ে আমি খুব দুশ্চিন্তায় আছি
Answer
বিয়ে সংক্রান্ত প্রশ্নের উত্তর
প্রশ্ন ১: নিকাহের প্রস্তাবে সম্মতি ও বিয়ে সংঘটিত হওয়া
উত্তর:
আপনার বর্ণনা অনুযায়ী, আপনি যে ঘটনার কথা বলেছেন, তাতে আপনার বিয়ে সংঘটিত হওয়ার বিষয়টি অত্যন্ত সন্দেহজনক এবং অস্পষ্ট। ইসলামি ফিকহের আলোকে বিয়ে সংঘটিত হওয়ার জন্য কয়েকটি শর্ত পূরণ হওয়া আবশ্যক:
১. ইজাব (প্রস্তাব) - এক পক্ষ থেকে বিয়ের প্রস্তাব দেওয়া ২. কবুল (সম্মতি) - অন্য পক্ষ থেকে সেই প্রস্তাবে সম্মতি প্রকাশ করা ৩. সাক্ষী - অন্তত দুইজন মুসলিম পুরুষ বা একজন পুরুষ ও দুইজন মহিলা সাক্ষীর উপস্থিতি ৪. স্পষ্ট ভাষায় - বিয়ের প্রস্তাব ও সম্মতি স্পষ্ট ভাষায় প্রকাশ করা
আপনার ঘটনার বিশ্লেষণ:
আপনার বর্ণনা অনুযায়ী:
- আপনি জানতেন না যে এই ধরনের প্রস্তাব থেকে বিয়ে হয়ে যায়
- আপনার বিয়ে করার কোনো ইচ্ছাই ছিল না
- আপনি কী বলেছিলেন বা হেসেছিলেন তা আপনার মনে নেই
- হুজুর নিজেও বলেছেন তার মনে নেই যে তিনি কোন উদ্দেশ্যে বলেছিলেন
- সাক্ষীরা কী বুঝেছিল তাও স্পষ্ট নয়
ইমাম আবু হানিফা (রহ.) এর মতে, বিয়ের ইজাব-কবুলে সম্মতি স্পষ্ট হতে হবে এবং উভয় পক্ষের স্পষ্ট ইচ্ছা থাকতে হবে। যদি কেউ ঠাট্টা-তামাশা করে বা অজান্তে কিছু বলে ফেলে, তবে তা দ্বারা বিয়ে সংঘটিত হয় না।
রদ্দুল মুহতার গ্রন্থে উল্লেখ আছে:
"বিয়ের ক্ষেত্রে ইজাব ও কবুল উভয়ের মধ্যে সামঞ্জস্য থাকা আবশ্যক। যদি কোনো পক্ষ জানত না যে এটি বিয়ের প্রস্তাব, তাহলে তার সম্মতি বৈধ হবে না।"
ফাতাওয়া হিন্দিয়া তে বলা হয়েছে:
"যদি কেউ ঠাট্টা-তামাশার ছলে বিয়ের কথা বলে এবং তার সত্যিকারের ইচ্ছা না থাকে, তবে সেই বিয়ে সংঘটিত হবে না।"
আপনার ক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত:
যেহেতু:
- আপনার বিয়ে করার কোনো ইচ্ছা ছিল না
- আপনি জানতেন না যে এটি বিয়ের প্রস্তাব
- আপনি কী বলেছিলেন তা স্পষ্ট নয়
- হুজুর নিজেও জানেন না তিনি কোন উদ্দেশ্যে বলেছিলেন
- সাক্ষীদের বোঝার বিষয়টিও স্পষ্ট নয়
সুতরাং, আপনার বিয়ে সংঘটিত হওয়ার বিষয়টি অত্যন্ত দুর্বল এবং সন্দেহজনক। ইসলামি ফিকহের নিয়ম অনুযায়ী, সন্দেহের ক্ষেত্রে মূলনীতি হলো - যতক্ষণ না নিশ্চিত হওয়া যায় যে বিয়ে সংঘটিত হয়েছে, ততক্ষণ বিয়ে সংঘটিত হয়েছে বলে গণ্য করা হবে না।
ইমাম ইবনে আবেদিন (রহ.) বলেছেন:
"সন্দেহের ক্ষেত্রে মূলনীতি হলো, যে বিষয়ে সন্দেহ আছে তা বিদ্যমান নেই বলে গণ্য করা হবে, যতক্ষণ না তার অস্তিত্ব প্রমাণিত হয়।"
প্রশ্ন ২: সাক্ষীদের বোঝার প্রয়োজনীয়তা
উত্তর:
বিয়ের সাক্ষীদের জন্য শর্ত হলো তারা বিয়ের প্রস্তাব ও সম্মতির কথা শুনবে এবং বুঝবে যে এটি বিয়ের ইজাব-ও-কবুল। শুধু কানে শুনলেই যথেষ্ট নয়, তাদের বুঝতে হবে যে এই মুহূর্তে বিয়ে সংঘটিত হচ্ছে।
আল-হিদায়া গ্রন্থে উল্লেখ আছে:
"সাক্ষী হতে হবে এমন ব্যক্তি যারা বিয়ের ভাষা ও তাৎপর্য বুঝতে সক্ষম।"
ফাতাওয়া উসমানি তে বলা হয়েছে:
"সাক্ষীদের জন্য শর্ত হলো তারা বিয়ের ইজাব-ও-কবুলের কথা শুনবে এবং বুঝবে যে এটি বিয়ের জন্য হচ্ছে। যদি সাক্ষীরা না বোঝে যে এটি বিয়ে সংঘটিত হচ্ছে, তাহলে সেই বিয়ে সহীহ হবে না।"
আপনার ক্ষেত্রে প্রযোজ্যতা:
যেহেতু আপনার ঘটনায়:
- সাক্ষীরা কী বুঝেছিল তা স্পষ্ট নয়
- তারা কি জানত যে এটি বিয়ের প্রস্তাব?
- হুজুর কি স্পষ্টভাবে বিয়ে পড়ানোর নিয়তে বলেছিলেন?
এই সব বিষয় অস্পষ্ট থাকায় বিয়ে সংঘটিত হওয়া নিশ্চিত নয়।
চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ও পরামর্শ:
১. আপনার বিয়ে সংঘটিত হয়নি - যেহেতু বিয়ের ইচ্ছা, স্পষ্ট সম্মতি, সাক্ষীদের বোঝা - এই সব শর্ত পূরণ হয়নি এবং সবকিছুই অস্পষ্ট ও সন্দেহজনক।
২. ওয়াসওয়াসা থেকে মুক্ত থাকুন - শয়তানের পক্ষ থেকে এ ধরনের ওয়াসওয়াসা আসা স্বাভাবিক। আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন।
৩. বিয়ে করার আগে - আপনি যদি নিশ্চিত হতে চান, তাহলে যেই হুজুরের কাছে ঘটনাটি ঘটেছিল, তাকে নিয়ে বসে বিষয়টি পরিষ্কার করুন। যদি তিনি নিশ্চিতভাবে বলেন যে তিনি বিয়ে পড়ানোর নিয়তে বলেছিলেন এবং সাক্ষীরাও বিষয়টি বুঝেছিল, তাহলে সতর্কতামূলকভাবে নতুন করে বিয়ে পড়িয়ে নেওয়া উত্তম।
৪. নতুন বিয়ের ক্ষেত্রে - আপনার সামনে যে বিয়ে হতে যাচ্ছে, তা সঠিক নিয়মে, সাক্ষীদের উপস্থিতিতে এবং স্পষ্ট ইজাব-ও-কবুলের মাধ্যমে সম্পন্ন করুন।
আল্লাহ তায়ালা সর্বোত্তম জ্ঞানী।