হাত চালা", না দেখে রোগ নির্ণয়, সাপের নজর ও খারাপ নজরের ধারণা কতটুকু সত্য?
Sunnah and Bid'ah · Hanafi
Question
Answer
ওয়া আলাইকুমুস সালাম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ।
প্রিয় প্রশ্নকারিণী, আপনার প্রশ্নের জন্য ধন্যবাদ। আপনার আম্মুর অসুস্থতা ও মানসিক অবস্থার জন্য আমরা উদ্বিগ্ন। আসুন, ইসলাম ও হানাফি ফিকহের আলোকে আপনার প্রশ্নগুলোর উত্তর জানার চেষ্টা করি।
১. দুয়া ও গাছ-গাছালির ওষুধ দেওয়া ব্যক্তির বিধান
আপনি বলেছেন, ঐ ব্যক্তি দুয়া ও গাছ-গাছালির (ভেষজ) ওষুধ দিয়ে থাকেন এবং তাবিজ দেন না। ইসলামে দুটি বিষয়কে আলাদা করা হয়েছে:
- ভেষজ ওষুধ (তিব্ব): ইসলামে রোগ নিরাময়ের জন্য বৈধ ও পবিত্র জিনিস দ্বারা চিকিৎসা করানো জায়েয। গাছ-গাছালি বা ভেষজ উপাদান দিয়ে তৈরি ওষুধ সেবন করা সম্পূর্ণ বৈধ, যদি তা ক্ষতিকর না হয় এবং ইসলামী বিধান অনুযায়ী পবিত্র হয়। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) নিজেও রোগীদের চিকিৎসার পরামর্শ দিয়েছেন এবং বলেছেন, "আল্লাহ তাআলা এমন কোনো রোগ অবতীর্ণ করেননি যার নিরাময় তিনি দেননি।" (সহীহ বুখারী)।
- দুয়া (রুকইয়াহ): কুরআনুল কারিমের আয়াত ও সহীহ হাদিসে বর্ণিত দুয়া দ্বারা রোগীর জন্য প্রার্থনা করাও সুন্নাহসম্মত। এটি একটি বৈধ আমল। তবে শর্ত হলো, দুয়া ও রুকইয়াহ হতে হবে কুরআন ও হাদিসের আলোকে, এবং বিশ্বাস রাখতে হবে যে, আরোগ্য দান করেন একমাত্র আল্লাহ তাআলাই। দুয়া বা রুকইয়াহকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে রোগ নিরাময়কারী মনে করা যাবে না।
হানাফি ফিকহের দৃষ্টিভঙ্গি: ইমাম আবু হানিফা (রহ.) এবং অন্যান্য ইমামগণ কুরআন ও সহীহ হাদিসের দুয়া দ্বারা ঝাড়-ফুঁক (রুকইয়াহ) করাকে জায়েয বলেছেন। তবে শিরকি কালাম, অজানা শব্দ বা কোনো প্রকার শিরকের সাথে জড়িত কিছু ব্যবহার করা সম্পূর্ণ হারাম ও নাজায়েয।
আপনার বাসার সদস্যদের কথা অনুযায়ী, উনি শিরক করেন না এবং তাবিজও দেন না। যদি তিনি শুধুমাত্র কুরআনের আয়াত বা সহীহ হাদিসের দুয়া পড়ে ফুঁ দেন এবং বৈধ ভেষজ ওষুধ দেন, তাহলে তা সুন্নাহসম্মত হতে পারে। কিন্তু যদি তিনি কোনো অজানা শব্দ, জপ-তপ বা শিরকি পদ্ধতি ব্যবহার করেন, তাহলে তা সম্পূর্ণ নাজায়েয।
২. "না দেখে বুঝতে পারা" বা "হাত চালা" বিষয়টি
আপনি যে বিষয়টি উল্লেখ করেছেন—কোনো ব্যক্তি না দেখেই বলে দিতে পারে যে, "আপনাকে সাপে কামড়েছে" বা "আপনার শরীরে খারাপ নজর লেগেছে"—এটি ইসলামী দৃষ্টিতে একটি সূক্ষ্ম বিষয়।
- ইলমুল গায়ব (অদৃশ্যের জ্ঞান): একমাত্র আল্লাহ তাআলাই গায়ব (অদৃশ্য) সম্পর্কে পূর্ণ জ্ঞান রাখেন। কোনো মানুষের পক্ষে নিজের ইচ্ছা বা ক্ষমতা বলে কারো অদৃশ্য অবস্থা জানা সম্ভব নয়। কুরআনে আল্লাহ বলেন, "বলুন, আসমান ও জমিনে যা কিছু আছে তার গায়বের জ্ঞান একমাত্র আল্লাহই রাখেন।" (সূরা আন-নামল: ৬৫)।
- কাশফ ও ইলহাম: কিছু নেককার ও আল্লাহওয়ালা ব্যক্তিদের মাধ্যমে আল্লাহ তাআলা কখনো কখনো বিশেষ জ্ঞান (কাশফ/ইলহাম) দান করেন। তবে এটি তাদের নিজস্ব অর্জিত ক্ষমতা নয়, বরং আল্লাহর পক্ষ থেকে বিশেষ অনুগ্রহ। কিন্তু এই বিষয়টি নিশ্চিতভাবে বলা যায় না যে, যে ব্যক্তি "হাত চালা" বলে কিছু বুঝে নেয়, সে সত্যিই আল্লাহর পক্ষ থেকে জ্ঞান প্রাপ্ত। অনেক সময় এটি মানুষের মনগড়া কথা, অন্ধবিশ্বাস বা শয়তানের প্ররোচনাও হতে পারে।
- "হাত চালা" বা "নজর লাগা" ধারণা: গ্রামীণ সমাজে প্রচলিত "হাত চালা" বা "নজর লাগা" এসব অনেক সময় কুসংস্কার ও ভিত্তিহীন বিশ্বাসের উপর ভিত্তি করে হয়ে থাকে। ইসলামে "নজর লাগা" (বদ নজর) এর অস্তিত্ব স্বীকার করা হয়েছে। সহীহ হাদিসে আছে, "নজর (বদ নজর) সত্য।" (সহীহ বুখারী ও মুসলিম)। কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে, যে কেউ ইচ্ছা করলেই অন্যের নজর লাগা বা সাপে কামড়ানোর মতো অদৃশ্য বিষয় না দেখে বলে দিতে পারবে। এটি একটি বিশেষ ক্ষমতা, যা সবার থাকে না এবং এর কোনো বৈজ্ঞানিক বা ইসলামী ভিত্তি নেই।
আপনার আম্মুর বিষয়ে: কেউ না দেখে বলে দিয়েছে যে, "সাপে কামড়েছে" — এটি একটি ভিত্তিহীন ও ভীতিপ্রদর্শনমূলক কথা। এর কারণে আপনার আম্মু আরও বেশি ভয় পেয়ে যাচ্ছেন এবং মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ছেন, যা সম্পূর্ণ অনুচিত। ইসলামে এমন কোনো ধারণা নেই যে, সাপে কামড়ানোর বিষয়টি না দেখে কেউ বলে দিতে পারবে। এটি একটি কুসংস্কার ও বিদআতপূর্ণ বিশ্বাস।
৩. "সাপের নজরে ঘুরছে" বা "খারাপ নজর আছে" — এগুলো কি বিদআত?
- "সাপের নজর" বা "খারাপ নজর" লাগা: হাদিসে বদ নজর (খারাপ দৃষ্টি) এর কথা বলা হয়েছে, কিন্তু "সাপের নজর" বলে কোনো জিনিস ইসলামে নেই। এটি সম্পূর্ণ কুসংস্কার। সাপের কামড় বা দৃষ্টির সাথে মানুষের অসুস্থতার কোনো সম্পর্ক নেই।
- বিদআত: ইসলামী পরিভাষায় বিদআত হলো, দ্বীনের মধ্যে এমন নতুন বিষয় প্রবর্তন করা যা কুরআন-সুন্নাহ ও সাহাবাদের আমলে ছিল না। "সাপের নজর", "হাত চালা" বা "না দেখে রোগ নির্ণয়" — এসব বিশ্বাস ও কর্ম ইসলামী শিক্ষার আলোকে বিদআত ও কুসংস্কার। কারণ, এগুলোর কোনো ভিত্তি কুরআন-হাদিসে নেই এবং এগুলো মানুষকে আল্লাহর উপর ভরসা থেকে দূরে সরিয়ে দেয়।
৪. আপনার করণীয়
১. সর্বপ্রথম চিকিৎসা: আপনার আম্মুর মাথা ঘোরার শারীরিক কারণ থাকতে পারে। তাই অবশ্যই তাকে একজন ভালো ডাক্তারের কাছে নিয়ে যান এবং প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা করান। ইসলামে রোগের চিকিৎসা করানো ফরজ বা ওয়াজিবের পর্যায়ে পৌঁছে যায়। রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন, "তোমরা চিকিৎসা করাও, কারণ আল্লাহ প্রতিটি রোগের নিরাময় দিয়েছেন।" (সুনানে আবু দাউদ)। 2. ভয় দূর করা: আপনার আম্মুকে বোঝান যে, "সাপে কামড়েছে" বলা ব্যক্তির কথা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। এটি একটি কুসংস্কার। আল্লাহর উপর ভরসা রাখতে বলুন। কুরআনে আল্লাহ বলেন, "যে আল্লাহর উপর ভরসা করে, তার জন্য আল্লাহই যথেষ্ট।" (সূরা আত-তালাক: ৩)। 3. সুন্নাহসম্মত দুয়া: আপনার আম্মুর জন্য কুরআন ও হাদিসের দুয়া পড়ে ফুঁ দিতে পারেন। যেমন: সূরা ফাতিহা, আয়াতুল কুরসি, সূরা ফালাক, সূরা নাস ইত্যাদি। এছাড়া রোগমুক্তির জন্য রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এর শেখানো দুয়া পড়তে পারেন: "আল্লাহুম্মা রাব্বান নাসি, আযিহিল বা'সা, ইশফি আন্তাশ শাফি, লা শিফাআ ইল্লা শিফাউকা, শিফাআন লা ইউগাদিরু সাকামা।" (অর্থ: হে আল্লাহ! মানুষের প্রতিপালক! কষ্ট দূর করুন, আরোগ্য দিন। আপনিই আরোগ্য দানকারী। আপনার আরোগ্য ছাড়া কোনো আরোগ্য নেই। এমন আরোগ্য দিন যা কোনো রোগ অবশিষ্ট রাখবে না।) — (সহীহ বুখারী)। 4. ঐ ব্যক্তির কাছে যাওয়া বন্ধ করুন: যেহেতু ঐ ব্যক্তির কর্মপদ্ধতি নিয়ে সন্দেহ আছে এবং তার কথায় আপনার আম্মু আরও ভয় পাচ্ছেন, তাই তার কাছে যাওয়া সম্পূর্ণ বন্ধ করুন। ইসলামে রোগ নিরাময়ের জন্য আল্লাহর উপর ভরসা রেখে বৈধ পদ্ধতি অবলম্বন করাই একমাত্র পথ।
সারসংক্ষেপ
- ভেষজ ওষুধ ও কুরআন-সুন্নাহসম্মত দুয়া দ্বারা চিকিৎসা জায়েয।
- "না দেখে রোগ নির্ণয়" বা "হাত চালা" বলা সম্পূর্ণ কুসংস্কার ও বিদআতপূর্ণ বিশ্বাস।
- "সাপের নজর" বা "খারাপ নজর" লাগার ভিত্তিহীন ধারণা থেকে দূরে থাকা জরুরি।
- আপনার আম্মুর শারীরিক চিকিৎসা করানো এবং তাকে মানসিকভাবে শক্তিশালী করা সবচেয়ে জরুরি।
আল্লাহ তাআলা আপনার আম্মুকে সুস্থতা দান করুন এবং আপনার পরিবারকে সব ধরনের কুসংস্কার থেকে হিফাজত করুন। আমিন।