তওবার পর পুনরায় সেই গুনাহ করলে করনীয় কি?
Family Life · Ahle Hadith / Salafi
Question
Answer
উত্তর
বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম
আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ।
প্রিয় বোন, আপনার প্রশ্নের জন্য ধন্যবাদ। আপনার অনুভূতি ও অনুতাপ সত্যিই হৃদয়স্পর্শী। আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ না হওয়ার জন্য আমরা আপনাকে উৎসাহিত করছি। নিচে আপনার প্রশ্নগুলোর উত্তর প্রদান করা হলো:
১. তওবা ভেঙে গুনাহে লিপ্ত হওয়া ও আগের আমল বাতিল হওয়া প্রসঙ্গে
উত্তর: আল্লাহ তা'আলা অত্যন্ত ক্ষমাশীল ও দয়ালু। কুরআনে আল্লাহ বলেছেন:
قُلْ يَا عِبَادِيَ الَّذِينَ أَسْرَفُوا عَلَىٰ أَنفُسِهِمْ لَا تَقْنَطُوا مِن رَّحْمَةِ اللَّهِ ۚ إِنَّ اللَّهَ يَغْفِرُ الذُّنُوبَ جَمِيعًا ۚ إِنَّهُ هُوَ الْغَفُورُ الرَّحِيمُ
"বলুন, হে আমার বান্দাগণ! যারা নিজেদের উপর জুলুম করেছে, তোমরা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না। নিশ্চয় আল্লাহ সমস্ত গুনাহ মাফ করে দেন। নিশ্চয় তিনি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।" (সূরা আয-যুমার: ৫৩)
রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন:
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: وَالَّذِي نَفْسِي بِيَدِهِ لَوْ لَمْ تُذْنِبُوا لَذَهَبَ اللَّهُ بِكُمْ وَلَجَاءَ بِقَوْمٍ يُذْنِبُونَ فَيَسْتَغْفِرُونَ اللَّهَ فَيَغْفِرُ لَهُمْ
"সেই সত্তার কসম যার হাতে আমার প্রাণ! যদি তোমরা গুনাহ না করতে, তবে আল্লাহ তোমাদেরকে সরিয়ে দিতেন এবং এমন এক সম্প্রদায় আনতেন যারা গুনাহ করত, অতঃপর আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইত এবং আল্লাহ তাদেরকে ক্ষমা করে দিতেন।" (সহীহ মুসলিম: ২৭৪৯)
আপনার পূর্বের আমলগুলো বাতিল হবে না। শায়খুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়্যাহ (রহিমাহুল্লাহ) বলেছেন: "যদি কোনো ব্যক্তি তওবা করে এবং পরে আবার গুনাহে ফিরে যায়, তবে তার পূর্বের তওবা ও নেক আমল বাতিল হয় না। বরং তাকে আবার নতুন করে তওবা করতে হবে।" (মাজমু' ফাতাওয়া: ১৬/৫৩)
শায়খ ইবনে উসাইমীন (রহিমাহুল্লাহ) বলেছেন: "তওবা ভঙ্গ করলে পূর্বের তওবা বাতিল হয় না, বরং নতুন গুনাহের জন্য নতুন তওবা করতে হবে। পূর্বের নেক আমলগুলো তার জন্য সঞ্চিত থাকবে।" (মাজমু' ফাতাওয়া: ২/৯৩)
আপনার করণীয়: আবার নতুন করে তওবা করুন। আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হবেন না। আপনার পূর্বের আমলগুলো বাতিল হয়নি।
২. অসুস্থতা কি আল্লাহর গজব নাকি পরীক্ষা?
উত্তর: অসুস্থতা, বিপদ-আপদ মুমিনের জন্য পরীক্ষা বা গুনাহের কাফফারা হতে পারে। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন:
عَنْ أَبِي سَعِيدٍ الْخُدْرِيِّ وَعَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ عَنْ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: مَا يُصِيبُ الْمُسْلِمَ مِنْ نَصَبٍ وَلَا وَصَبٍ وَلَا هَمٍّ وَلَا حُزْنٍ وَلَا أَذًى وَلَا غَمٍّ حَتَّى الشَّوْكَةِ يُشَاكُهَا إِلَّا كَفَّرَ اللَّهُ بِهَا مِنْ خَطَايَاهُ
"যে মুসলিমের উপর কোনো ক্লান্তি, রোগ, দুশ্চিন্তা, দুঃখ, কষ্ট বা পেরেশানি আসে—এমনকি একটি কাঁটাও যদি তার গায়ে বিঁধে—তাহলে আল্লাহ তার বিনিময়ে তার গুনাহসমূহ মাফ করে দেন।" (সহীহ বুখারী: ৫৬৪১, সহীহ মুসলিম: ২৫৭৩)
শায়খ ইবনে বায (রহিমাহুল্লাহ) বলেছেন: "অসুস্থতা ও বিপদ-আপদ মুমিনের জন্য রহমত, যা দ্বারা তার গুনাহ মাফ হয় এবং মর্যাদা বৃদ্ধি পায়। এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে পরীক্ষাও হতে পারে, যাতে ধৈর্যশীল ও অধৈর্যশীল ব্যক্তি প্রকাশ পায়।" (মাজমু' ফাতাওয়া: ৬/৩৯)
আপনার অসুস্থতাকে গজব মনে করবেন না। বরং এটিকে আল্লাহর রহমত ও গুনাহের কাফফারা হিসেবে গণ্য করুন এবং ধৈর্য ধারণ করুন। আল্লাহ বলেন:
وَبَشِّرِ الصَّابِرِينَ
"আর ধৈর্যশীলদেরকে সুসংবাদ দিন।" (সূরা আল-বাকারাহ: ১৫৫)
৩. স্বামীকে জানানো প্রসঙ্গে
উত্তর: আপনার অতীত ও বর্তমানের গুনাহ স্বামীকে জানানো জরুরি নয়। বরং গোপন রাখা উত্তম। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন:
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: كُلُّ أُمَّتِي مُعَافًى إِلَّا الْمُجَاهِرِينَ وَإِنَّ مِنْ الْمُجَاهَرَةِ أَنْ يَعْمَلَ الرَّجُلُ بِاللَّيْلِ عَمَلًا ثُمَّ يُصْبِحَ وَقَدْ سَتَرَهُ اللَّهُ عَلَيْهِ فَيَقُولَ: يَا فُلَانُ عَمِلْتُ الْبَارِحَةَ كَذَا وَكَذَا وَقَدْ بَاتَ يَسْتُرُهُ رَبُّهُ وَيُصْبِحُ يَكْشِفُ سِتْرَ اللَّهِ عَنْ نَفْسِهِ
"আমার উম্মতের সকলকে ক্ষমা করা হবে, তবে সেই ব্যক্তি ছাড়া যে প্রকাশ্যে গুনাহ করে। আর প্রকাশ্যে গুনাহ করার অন্তর্ভুক্ত হলো—কেউ রাতে এমন কাজ করে, অতঃপর সকালে আল্লাহ তার গুনাহ গোপন রাখা সত্ত্বেও সে বলে: 'হে অমুক! আমি গতরাতে এমন এমন কাজ করেছি।' অথচ তার রব সারা রাত তার গুনাহ গোপন রেখেছিলেন, আর সে সকালে আল্লাহর গোপনীয়তা প্রকাশ করে দিল।" (সহীহ বুখারী: ৬০৬৯, সহীহ মুসলিম: ২৯৯০)
শায়খ সালিহ আল-ফাওযান (হাফিজাহুল্লাহ) বলেছেন: "যে ব্যক্তি গুনাহ করে এবং আল্লাহ তা গোপন রাখেন, তার উচিত তা গোপন রাখা এবং আল্লাহর কাছে তওবা করা। কারো কাছে তা প্রকাশ করা উচিত নয়, বিশেষত স্বামী/স্ত্রীর কাছে, কারণ এতে সম্পর্ক নষ্ট হতে পারে এবং পরিবারে অশান্তি সৃষ্টি হতে পারে।" (আল-মুনতাকা: ৩/৩০৮)
আপনার করণীয়: স্বামীকে জানাবেন না। সম্পূর্ণ গোপন রেখে আল্লাহর কাছে তওবা করুন।
৪. কাফফারা বা জরিমানা প্রসঙ্গে
উত্তর: বিয়ের আগের গর্ভপাত ও বর্তমানের গুনাহের জন্য তওবা ও দান-সদকা ছাড়া শরীয়তে কোনো নির্দিষ্ট কাফফারা বা জরিমানা নেই। তবে গর্ভপাত একটি গুরুতর গুনাহ, যার জন্য তওবা করা অপরিহার্য।
শায়খুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়্যাহ (রহিমাহুল্লাহ) বলেছেন: "গর্ভপাতের জন্য নির্দিষ্ট কোনো কাফফারা নেই, তবে এটি একটি বড় গুনাহ। এর জন্য তওবা করতে হবে এবং আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইতে হবে।" (মাজমু' ফাতাওয়া: ৩৩/১৪৫)
শায়খ ইবনে উসাইমীন (রহিমাহুল্লাহ) বলেছেন: "গর্ভপাতের জন্য কোনো নির্দিষ্ট কাফফারা নেই। তবে গর্ভপাতের কারণে যদি সন্তান জীবিত অবস্থায় জন্ম নিত এবং মারা যেত, তাহলে দিয়াত (রক্তপণ) দিতে হতো। কিন্তু গর্ভপাতের ক্ষেত্রে তওবা ও ইস্তিগফারই যথেষ্ট।" (মাজমু' ফাতাওয়া: ১৭/৩৩)
আপনার করণীয়: তওবা করুন, দান-সদকা করুন এবং আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করুন। এর বাইরে কোনো নির্দিষ্ট কাফফারা নেই।
৫. অপরাধবোধ ও মানসিক অশান্তি থেকে মুক্তির উপায়
উত্তর: অপরাধবোধ ও মানসিক অশান্তি থেকে মুক্তির জন্য নিম্নোক্ত কাজগুলো করুন:
ক. তওবা করুন: রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন:
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: مَنْ تَابَ قَبْلَ أَنْ تَطْلُعَ الشَّمْسُ مِنْ مَغْرِبِهَا تَابَ اللَّهُ عَلَيْهِ
"যে ব্যক্তি সূর্য পশ্চিম দিক থেকে উদিত হওয়ার আগে তওবা করবে, আল্লাহ তার তওবা কবুল করবেন।" (সহীহ মুসলিম: ২৭০৩)
খ. ইস্তিগফার করুন: আল্লাহ বলেন:
وَمَن يَعْمَلْ سُوءًا أَوْ يَظْلِمْ نَفْسَهُ ثُمَّ يَسْتَغْفِرِ اللَّهَ يَجِدِ اللَّهَ غَفُورًا رَّحِيمًا
"যে ব্যক্তি কোনো মন্দ কাজ করে বা নিজের উপর জুলুম করে, অতঃপর আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করে, সে আল্লাহকে ক্ষমাশীল ও পরম দয়ালু পাবে।" (সূরা আন-নিসা: ১১০)
গ. নামাজ ও ইবাদতে মগ্ন থাকুন: রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন:
عَنْ حُذَيْفَةَ قَالَ: كَانَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ إِذَا حَزَبَهُ أَمْرٌ صَلَّى
"নবী (ﷺ) যখন কোনো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সম্মুখীন হতেন, তখন নামাজ পড়তেন।" (সুনানে আবু দাউদ: ১৩১৯, সহীহ)
ঘ. দান-সদকা চালিয়ে যান: দান-সদকা গুনাহ মাফের উপায়। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন:
وَالصَّدَقَةُ تُطْفِئُ الْخَطِيئَةَ كَمَا يُطْفِئُ الْمَاءُ النَّارَ
"দান-সদকা গুনাহ নিভিয়ে দেয় যেমন পানি আগুন নিভিয়ে দেয়।" (সুনানে তিরমিযী: ২৬১৬, সহীহ)
ঙ. শয়তান থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করুন: শয়তান আপনাকে হতাশ করতে চায়। আল্লাহ বলেন:
إِنَّ الشَّيْطَانَ لَكُمْ عَدُوٌّ فَاتَّخِذُوهُ عَدُوًّا
"নিশ্চয় শয়তান তোমাদের শত্রু, অতএব তোমরা তাকে শত্রু হিসেবেই গ্রহণ কর।" (সূরা ফাতির: ৬)
চ. ভালো সঙ্গী নির্বাচন করুন: ভালো মানুষের সাহচর্য আপনার ঈমানকে শক্তিশালী করবে।
৬. আল্লাহ কি আমাকে ছেড়ে দিয়েছেন?
উত্তর: না, আল্লাহ আপনাকে ছেড়ে দেননি। আপনার এই অপরাধবোধ ও অনুতাপই প্রমাণ যে আপনার অন্তরে ঈমান রয়েছে। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন:
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: لَمَّا قَضَى اللَّهُ الْخَلْقَ كَتَبَ عِنْدَهُ فَوْقَ عَرْشِهِ: إِنَّ رَحْمَتِي سَبَقَتْ غَضَبِي
"আল্লাহ যখন সৃষ্টিজগৎ সৃষ্টি করলেন, তখন তিনি তাঁর আরশের উপরে লিখে রাখলেন: 'নিশ্চয় আমার রহমত আমার গজবের পূর্বে রয়েছে।'" (সহীহ বুখারী: ৭৪৫৪, সহীহ মুসলিম: ২৭৫১)
শায়খুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়্যাহ (রহিমাহুল্লাহ) বলেছেন: "গুনাহের পর অনুতাপ ও অপরাধবোধই ঈমানের প্রমাণ। মুমিনের অন্তর গুনাহের কারণে অস্থির হয়, আর মুনাফিকের অন্তর গুনাহের পরও শান্ত থাকে।" (মাজমু' ফাতাওয়া: ১০/২৫৫)
আপনার করণীয়: আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হবেন না। তিনি আপনার তওবা কবুল করবেন ইনশাআল্লাহ। আল্লাহ বলেন:
وَإِذَا سَأَلَكَ عِبَادِي عَنِّي فَإِنِّي قَرِيبٌ ۖ أُجِيبُ دَعْوَةَ الدَّاعِ إِذَا دَعَانِ
"আর যখন আমার বান্দারা আমার সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করে, তখন (বলে দাও) নিশ্চয় আমি অতি নিকটে। যারা আমাকে ডাকে, আমি তাদের ডাকে সাড়া দিই।" (সূরা আল-বাকারাহ: ১৮৬)
সংক্ষিপ্ত উপদেশ
১. নতুন করে তওবা করুন — আন্তরিকভাবে, দৃঢ় সংকল্পসহ যে এই গুনাহ আর করবেন না। ২. ফোনে সেই ছেলের সাথে সকল যোগাযোগ সম্পূর্ণ বন্ধ করুন — নম্বর ডিলিট করুন, ব্লক করুন। ৩. স্বামীকে কিছু জানাবেন না — গোপন রাখুন এবং আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইতে থাকুন। ৪. নামাজ, দান-সদকা ও ইবাদত চালিয়ে যান — আপনার পূর্বের আমলগুলো বাতিল হয়নি। ৫. আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হবেন না — তিনি ক্ষমাশীল। ৬. ভালো সঙ্গী ও পরিবেশ তৈরি করুন — দ্বীনি পরিবেশে নিজেকে রাখুন। ৭. ধৈর্য ধারণ করুন — অসুস্থতা আপনার গুনাহের কাফফারা।
আল্লাহ আপনার তওবা কবুল করুন, আপনার অসু