সকাল সন্ধ্যার আমল এর ব্যপারে জানতে চাই
Sunnah and Bid'ah · Hanafi
Question
সকাল সন্ধ্যার হেফাজত এর আমল ফজর ও আসর এর সময় করতে হয়। এখন আমি যদি ফজর ও আসর এর সময় শুরু হয়েছে কিন্তু আযান দেয় নাই তখনও আমল করে নিতে পারবো? ফজর ও আসর এর নামায পড়ার আগে হেফাজত এর আমল করতে পারবো?
সময় হয়ে যাওয়ার অনেক পরে আযান দেয় আমি কি ওয়াক্ত শুরু হলেই নামাজ পড়তে পারবো? নাকি আযান এর অপেক্ষা করতে হবে?
Answer
ওয়া আলাইকুমুস সালাম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ।
আপনার প্রশ্নের উত্তরে প্রথমে একটি মূল বিষয় পরিষ্কার করে নেওয়া জরুরি যে, আযান নামাজের সময় হওয়ার ঘোষণা মাত্র। আযান নামাজের জন্য শর্ত নয়। ওয়াক্ত শুরু হওয়ার সাথে সাথেই নামাজ আদায় করা জায়েয, আযানের অপেক্ষা করা জরুরি নয়। তবে সাধারণত মসজিদে জামাতের সাথে নামাজ পড়ার জন্য আযানের পরই জামাত হয়, তাই জামাতের জন্য আযানের অপেক্ষা করা হয়।
এখন আপনার প্রশ্নগুলো নিয়ে আলোচনা করা যাক:
১. ফজর ও আসরের সময় শুরু হলে কি আযানের আগে হেফাজতের আমল করা যাবে?
উত্তর: হ্যাঁ, অবশ্যই যাবে। ফজরের সময় শুরু হওয়া মানে সুবহে সাদিক (প্রভাতের সত্যিকারের আলো) উদিত হওয়া। এই সময় থেকে ফজরের নামাজের সময় শুরু হয়ে যায়। আপনি যদি নিশ্চিত হন যে ওয়াক্ত শুরু হয়ে গেছে (যেমন: সময়সূচি দেখে বা বিশ্বস্ত কারো কাছ থেকে জেনে), তাহলে আযান না হলেও আপনি সকাল-সন্ধ্যার হেফাজতের আমল করতে পারবেন এবং ফজরের নামাজও পড়তে পারবেন।
দলিল: হাদিস শরীফে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, "সময় শুরু হলে নামাজ আদায় করো, আর সময় শেষ হলে নামাজ আদায় করো।" (সহিহ বুখারী, হাদিস: ৫২৭) — এখানে আযানের কথা উল্লেখ নেই, বরং সময়ের কথা বলা হয়েছে।
২. ফজর ও আসরের নামাজের আগে হেফাজতের আমল করা যাবে কি?
উত্তর: হ্যাঁ, যাবে। হেফাজতের আমল (যেমন: আয়াতুল কুরসি, সূরা ইখলাস, ফালাক, নাস ইত্যাদি পড়া) নামাজের সাথে শর্তযুক্ত নয়। এটি একটি স্বতন্ত্র আমল। আপনি চাইলে ফজরের নামাজের আগে বা পরে, এমনকি আসরের নামাজের আগে বা পরেও এই আমল করতে পারেন। তবে হাদিসে সকাল-সন্ধ্যার হেফাজতের আমলগুলো ফজরের পর এবং আসরের পর পড়ার কথা বর্ণিত আছে। তাই উত্তম হলো ফজরের নামাজের পর এবং আসরের নামাজের পর এই আমলগুলো করা। কিন্তু যদি কোনো কারণে নামাজের আগে করেন, তাতেও কোনো সমস্যা নেই, ইনশাআল্লাহ সওয়াব পাওয়া যাবে।
দলিল: হাদিসে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ফজরের পর এবং মাগরিবের পর কিছু যিকির ও দোয়া পড়তেন। (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ৫০৭৬) — তবে এটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য, কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে অন্য সময়ে পড়লে হবে না।
৩. সময় হয়ে যাওয়ার অনেক পরে আযান দিলে কি ওয়াক্ত শুরু হলেই নামাজ পড়া যাবে?
উত্তর: হ্যাঁ, ওয়াক্ত শুরু হওয়ার সাথে সাথেই নামাজ পড়া জায়েয। আযানের অপেক্ষা করা জরুরি নয়। তবে যদি আপনি মসজিদে জামাতের সাথে নামাজ পড়তে চান, তাহলে আযান ও ইকামতের পর জামাত হয়, তাই সেক্ষেত্রে আযানের অপেক্ষা করা উচিত। কিন্তু যদি আপনি একা নামাজ পড়েন, অথবা নিশ্চিত হন যে ওয়াক্ত হয়ে গেছে, তাহলে আযান না শুনেও নামাজ পড়তে পারেন।
দলিল: হাদিসে এসেছে, জিবরাঈল (আলাইহিস সালাম) রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে প্রথম দিন ফজরের সময় শুরু হলে নামাজ পড়ান এবং দ্বিতীয় দিন শেষ সময়ে নামাজ পড়ান। (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ১৪৯) — এখানে আযানের কোনো উল্লেখ নেই, বরং সময়ের উপরই গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
৪. আযানের অপেক্ষা করা কি জরুরি?
উত্তর: না, আযানের অপেক্ষা করা জরুরি নয়। আযান হলো মুসলিমদের নামাজের সময় জানানোর একটি মাধ্যম। আপনি যদি সময় জানেন, তাহলে আযান ছাড়াই নামাজ পড়তে পারেন। তবে মসজিদে জামাতের সাথে নামাজ পড়ার ক্ষেত্রে আযানের পরই জামাত অনুষ্ঠিত হয়, তাই সেক্ষেত্রে আযানের অপেক্ষা করা স্বাভাবিক।
হানাফি ফিকহের দলিল:
- আল-হিদায়া ও ফাতাওয়া আলমগীরি তে উল্লেখ আছে, নামাজের সময় হওয়া শর্ত, আযান শর্ত নয়। আযান শুধু একটি ঘোষণা। (ফাতাওয়া আলমগীরি, খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ৫৩)
- রদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদীন) এও উল্লেখ আছে, আযান নামাজের জন্য শর্ত নয়, বরং এটি সুন্নাতে মুয়াক্কাদা। (রদ্দুল মুহতার, খণ্ড ২, পৃষ্ঠা ৬০)
সংক্ষিপ্ত উত্তর:
১. ফজর ও আসরের সময় শুরু হলে আযানের আগে হেফাজতের আমল করা যাবে। — হ্যাঁ, যাবে। ২. ফজর ও আসরের নামাজের আগে হেফাজতের আমল করা যাবে। — হ্যাঁ, যাবে, তবে উত্তম হলো নামাজের পর করা। ৩. ওয়াক্ত শুরু হলেই নামাজ পড়া যাবে, আযানের অপেক্ষা করতে হবে না। — হ্যাঁ, যাবে, তবে জামাতের জন্য আযানের অপেক্ষা করা উচিত।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে সঠিকভাবে আমল করার তাওফিক দান করুন। (আমিন)