ব্যাংকে চাকরি করা কি হারাম?
Business and Job · Hanafi
Question
শায়খ আমি একজন মেয়ে।
আমি এখন চাকরি প্রার্থী। সরকারি চাকরির প্রস্তুতি নিচ্ছি। আমি ব্যাংকে চাকরি করতে আগ্রহী নই। কিন্তু আমার পরিবারের সবাই ব্যাংকে চাকরি করে এবং আমি একাউন্টটিং এর ছাত্রী হওয়ায় সবাই আমাকে ব্যাংকে চাকরি করার জন্য প্রেসার দিচ্ছে।আমার বিয়ের বয়স চলে যাচ্ছে, আমার বাবা নাই মা অসুস্থ আমি চাকরি না পেলে পরিবার থেকে বিয়েও দিতে চাইছে না। বর্তমান বাংলাদেশে সরকারি চাকরির জন্য যে সময় ও প্রস্তুতি দরকার তাতে চাকরি পেতে আমার আরও সময় প্রয়োজন, কিন্তু ব্যাংকে চেষ্টা করে দ্রুত চাকরি পাওয়া সম্ভব।ঢাকায় রিলেটিভের বাসায় থেকে প্রস্তুতি নিচ্ছি, এখানে খুবই মানসিক হতাশায় ভুগছি।
এমতাবস্থায় আমি কি করতে পারি? সারাজীবন ব্যাংকে চাকরি করার ইচ্ছা নেই। যদি এখন পাই পাশাপাশি অন্য চাকরির জন্য চেষ্টা করে পেশা পরিবর্তন করতে চাই। এমন অবস্থায় কি আমার ব্যাংক জবের জন্য চেষ্টা করা উচিত হবে?
Answer
উত্তর: وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
আপনার প্রশ্নের জন্য ধন্যবাদ। আপনার পরিস্থিতি অত্যন্ত সংবেদনশীল এবং কঠিন। আপনি একজন মেয়ে, আপনার বাবা নেই, মা অসুস্থ, এবং পরিবারের চাপে আছেন। এই অবস্থায় আপনার জন্য একটি স্পষ্ট এবং শরিয়তসম্মত সমাধান দেওয়া জরুরি।
ব্যাংকে চাকরির বিধান (শরিয়তের দৃষ্টিতে):
সাধারণত, যে ব্যাংকগুলো সুদ (রিবা) ভিত্তিক লেনদেন করে, সেখানে চাকরি করা ইসলামী শরিয়তে হারাম (নাজায়েয)। কারণ, এতে সুদের লেনদেনে সরাসরি বা পরোক্ষভাবে সহায়তা করা হয়। কুরআন ও হাদিসে সুদের সাথে জড়িত থাকা, লেখা, সাক্ষী থাকা এবং সহায়তা করা থেকে কঠোরভাবে নিষেধ করা হয়েছে।
- কুরআনের নির্দেশ: আল্লাহ তাআলা বলেন: "আর তোমরা পাপ ও সীমালঙ্ঘনের কাজে একে অপরকে সহযোগিতা করো না।" (সূরা আল-মায়িদা: ২)
- হাদিসের নির্দেশ: হযরত জাবির (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) সুদখোর, সুদদাতা, সুদের লেখক এবং সুদের সাক্ষী সকলের উপর লানত (অভিশাপ) করেছেন। (সহিহ মুসলিম)
হানাফি ফিকহের আলোকে:
- রদ্দুল মুহতার (ফাতাওয়া শামী): এতে স্পষ্টভাবে উল্লেখ আছে যে, সুদভিত্তিক ব্যাংকে চাকরি করা এবং সেখানে কোনো পদে নিয়োজিত থাকা (যদিও তা হিসাবরক্ষক বা ক্যাশিয়ার হয়) হারাম, কারণ এটি সুদী লেনদেনের সহায়তা করার শামিল।
- ফাতাওয়া উসমানি: মুফতি মুহাম্মদ তাকি উসমানি (দামাত বারাকাতুহুম) তাঁর ফাতাওয়ায় উল্লেখ করেছেন, ইসলামী শরিয়তের দৃষ্টিতে সুদভিত্তিক ব্যাংকের যেকোনো বিভাগে (একাউন্টিং, ক্যাশ, অফিসার, ম্যানেজার) চাকরি করা জায়েয নয়। কারণ, পুরো ব্যাংকের মূল ভিত্তিই সুদ। এমনকি যে বিভাগে সরাসরি সুদ লেনদেন হয় না, সেখানেও চাকরি করা মাকরূহে তাহরিমি (নিষিদ্ধের কাছাকাছি)।
আপনার বর্তমান পরিস্থিতির সমাধান:
আপনি উল্লেখ করেছেন, ব্যাংকে চাকরি করলে দ্রুত চাকরি পাওয়া সম্ভব, কিন্তু সারাজীবন সেখানে থাকার ইচ্ছা নেই। এই অবস্থায় আপনার জন্য ব্যাংকে চাকরি করা উচিত নয়। কারণ:
১. হারাম রিজিকের বরকত থাকে না: হারাম উপার্জনে বরকত থাকে না এবং তা দীর্ঘমেয়াদে আপনার জন্য ক্ষতির কারণ হবে। আপনি যদি হারাম উপার্জন দিয়ে সংসার চালান, তবে তা আপনার ঈমান ও দুনিয়া উভয়ের জন্যই ক্ষতিকর।
২. পেশা পরিবর্তনের অঙ্গীকার: আপনি যদি মনে মনে ভাবেন "অস্থায়ীভাবে করব, পরে ছেড়ে দেব", তবুও শরিয়তের দৃষ্টিতে হারাম কাজ শুরু করাই জায়েয নয়। কারণ, হারাম কাজ শুরু করার পর তা ছেড়ে দেওয়া অনেক কঠিন হয়ে পড়ে এবং অভ্যাসে পরিণত হয়।
৩. বিকল্প ব্যবস্থা: আপনার জন্য উচিত হবে সরকারি চাকরি বা অন্য কোনো বৈধ (হালাল) চাকরির জন্য চেষ্টা করা। আপনি একাউন্টিংয়ের ছাত্রী, তাই আপনি শিক্ষকতা, এনজিও (যেগুলো সুদভিত্তিক নয়), অথবা কোনো ইসলামী ব্যাংক (যেগুলো সম্পূর্ণ শরিয়তসম্মত পদ্ধতিতে চলে) -এ চাকরির চেষ্টা করতে পারেন। ইসলামী ব্যাংকে চাকরি করা জায়েয, যদি সেটি সত্যিকার অর্থে শরিয়তসম্মত হয়।
আপনার পারিবারিক চাপ ও মানসিক অবস্থা:
আপনার পরিবারের চাপ এবং বি�়ের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। তবে মনে রাখবেন, আল্লাহর রিজিকের ভান্ডার অফুরন্ত। আপনি যদি হারাম থেকে বিরত থাকেন এবং হালাল উপার্জনের জন্য চেষ্টা করেন, তবে আল্লাহ আপনাকে এমন জায়গা থেকে রিজিক দেবেন, যা আপনি কল্পনাও করতে পারবেন না। আল্লাহ তাআলা বলেন: "যে ব্যক্তি আল্লাহকে ভয় করে, আল্লাহ তার জন্য উত্তরণের পথ তৈরি করে দেন। এবং তাকে এমন জায়গা থেকে রিজিক দেন, যা তার ধারণাতীত।" (সূরা আত-তালাক: ২-৩)
আপনার করণীয়: ১. তাওয়াক্কুল করুন: আল্লাহর উপর ভরসা রাখুন এবং বেশি বেশি দোয়া করুন। বিশেষ করে তাহাজ্জুদের সময় দোয়া করুন। ২. বিকল্প চেষ্টা করুন: সরকারি চাকরির পাশাপাশি অন্যান্য হালাল চাকরির জন্য চেষ্টা চালিয়ে যান। যেমন: কোনো প্রাইভেট কোম্পানির অ্যাকাউন্টিং বিভাগ, শিক্ষকতা, অথবা ইসলামী ব্যাংক। ৩. পরিবারকে বোঝান: আপনার পরিবারকে নম্রভাবে বোঝানোর চেষ্টা করুন যে, সুদভিত্তিক ব্যাংকে চাকরি করা ইসলামী শরিয়তে নিষিদ্ধ এবং এটি আপনার জন্য দুনিয়া ও আখিরাত উভয় জায়গায় ক্ষতির কারণ হবে। আপনি তাদের বলতে পারেন, "আমি হালাল উপার্জন করতে চাই, যাতে আমাদের পরিবারে বরকত আসে।" ৪. ধৈর্য ধরুন: চাকরি পেতে সময় লাগতে পারে, তবে ধৈর্য ধরুন। আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সাথে আছেন।
সংক্ষিপ্ত ফতোয়া: সুদভিত্তিক ব্যাংকে চাকরি করা হারাম। আপনার জন্য উচিত হবে ব্যাংকে চাকরির চেষ্টা না করা এবং হালাল উপার্জনের জন্য নারীদের জন্য যেসব চাকরি বৈধ,সেসব চাকরির চেষ্টা করা। আল্লাহ আপনার জন্য উত্তম পথ খুলে দেবেন, ইনশাআল্লাহ।
আল্লাহ তাআলা আপনাকে ধৈর্য ও সঠিক পথে চলার তাওফিক দান করুন। আমিন।