কাবিননামায় যদি লেখা থাকে যে, "বনিবনা না হলে বা নিয়মিত খোরপোষ না দিলে বা খোঁজখবর না নিলে স্ত্রী তালাকের অধিকার পাবে" — এটি একটি শর্তযুক্ত তালাকের পর্যায়ে পড়ে?
Waswasa-OCD · Ahle Hadith / Salafi
Question
আর একটা প্রশ্ন বনিবনা না হওয়ায় সংঙ্গা কি কেমন পরিস্থিতি হলে বুঝতে হবে বনিবনা হয় না স্ত্রী তালাক অধিকার পাবে?
একদিন স্বামী মৌখিক ভাবে স্ত্রীকে তালাকের অধিকার দেন তখন স্ত্রী ফোন কেটে দিল পরে একা একা শুয়ে ভাবছিল মুখে বলল "যদি তালাক নেই পরে কি হবে" এটি বলে সে ভয় পায় এতে কিছু হবে? পরে সে স্বামীকে অধিকার ফিরিয়ে দেয় । পরেরদিন ঝগড়ায় বলে "কেন যে কালকে সুযোখ টা ব্যবহার করলাম না" এটা বলায় কিছু হবে?
স্বামী মাঝে মাঝে মৌখিক ভাবে তালাকের অধিকার দেন স্ত্রী সবসময় পরে বলে অধিকার ফিরিয়ে দিলাম এটা কি যথেষ্ট? আর কি অধিকার পাবে?
(উল্লেখ্য বিয়ের কাবিননামায় ১৮ নং কাজি স্ত্রী স্বামীর সাইন নেওয়ার পর নিজে সিল মেরে দেয় এটি কি স্ত্রী স্বামী জানতো না পরে স্ত্রী জেনে স্বামীকে অধিকার ফিরিয়ে দেয় এখন অনেকে বলে বিয়ের পর লেখা হলে অধিকার ফিরিয়ে দেওয়া যায় না অনেকে বলে যায় কি করব?
আর একটা প্রশ্ন আসসালামুয়ালাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ
আমার স্ত্রীর সাথে কিছুদিন আগে তার বাবার বাড়ি যাওয়া নিয়ে ঝগড়া হয়। তখন আমি মনে মনে এই নিয়ত করি যে, সে যদি তার বাবার বাড়ি যায় তাহলে সে তালাক। তবে মুখে কোনো কিছু উচ্চারণ করিনি। পরবর্তীতে স্ত্রী বাবার বাড়ি যায় আমাকে না জানিয়ে ও আসার পর বলি হায় আল্লাহ কেন গেলা আমি তো মনে মনে শর্ত দিয়ে দিছিলাম অনেক দিন আগে, তখন স্ত্রী বলে তুমি তো আমাকে মৌখিক ভাবে বলো নাই কি করবো এখন কি নতুন ভাবে শর্ত দিচ্ছ? তখন আমি বলি না আল্লাহ সাক্ষী আমি নতুন শর্ত দিচ্ছি না শুধু জানাচ্ছি মনে মনে দেওয়ার কথা।
এখন আমার স্ত্রী যদি বাপের বাড়ি যায় ও কি তালাক হবে হুজুর?
Answer
তালাকের অধিকার সংক্রান্ত প্রশ্নের উত্তর
বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম
প্রশ্নটি দীর্ঘ এবং একাধিক বিষয় জড়িত। আমি ধাপে ধাপে উত্তর দিচ্ছি:
১. কাবিননামায় শর্তযুক্ত তালাকের অধিকার
কাবিননামায় যদি লেখা থাকে যে, "বনিবনা না হলে বা নিয়মিত খোরপোষ না দিলে বা খোঁজখবর না নিলে স্ত্রী তালাকের অধিকার পাবে" — এটি একটি শর্তযুক্ত তালাকের (তালাক মু'আল্লাক) ব্যবস্থা।
বনিবনা না হওয়ার শর্তে স্ত্রী কখন তালাকের অধিকার পাবে?
শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়্যাহ (রহিমাহুল্লাহ) বলেন: শর্তযুক্ত তালাকে যখন শর্ত পূরণ হয়, তখন তালাক পতিত হয়ে যায়। তবে শর্ত পূরণের ব্যাপারে নিশ্চিত হতে হবে।
আপনার বর্ণিত পরিস্থিতিতে: স্ত্রী স্বামীকে ভালোবাসে, ঝগড়ার পর মিলে যায়, একে অপরকে ছেড়ে থাকতে পারে না, যোগাযোগ বন্ধ হয়নি — এগুলো প্রমাণ করে যে প্রকৃতপক্ষে "বনিবনা না হওয়া"র শর্ত পূরণ হয়নি। সাময়িক ঝগড়া-বিবাদকে "বনিবনা না হওয়া" বলা যায় না। কারণ:
- ঝগড়া কখনো ১/২ দিনের বেশি স্থায়ী হয়নি
- যোগাযোগ কখনো বন্ধ হয়নি
- উভয়ে মিলে যান
- স্ত্রীর নিয়ত ছিল স্বামীর সাথে সম্পর্ক ঠিক রাখা
সুতরাং, বনিবনা না হওয়ার শর্তে স্ত্রী তালাকের অধিকার পাবে না।
২. নিয়মিত খোরপোষ ও খোঁজখবর
স্বামী যদি নিয়মিত খোরপোষ দেন (যদিও ফিক্সড টাকার বদলে সরাসরি খরচ বহন করেন) এবং নিয়মিত খোঁজখবর নেন, তাহলে এ শর্তেও তালাক পতিত হবে না।
৩. মৌখিকভাবে তালাকের অধিকার দেওয়া
স্বামী মৌখিকভাবে স্ত্রীকে তালাকের অধিকার দিলে এবং স্ত্রী তা ফিরিয়ে দিলে:
- ইমাম আহমাদ (রহিমাহুল্লাহ)-এর মতে, স্বামী স্ত্রীকে তালাকের ইখতিয়ার দিলে স্ত্রী তা ব্যবহার না করা পর্যন্ত তালাক পতিত হয় না। স্ত্রী তা ফিরিয়ে দিলে অধিকার বাতিল হয়ে যায়।
- শাইখ আল-আলবানী (রহিমাহুল্লাহ) বলেন: স্ত্রীকে তালাকের ক্ষমতা দেওয়া একটি ওয়াকালাহ (প্রতিনিধিত্ব) মাত্র, যা স্ত্রী ফিরিয়ে দিতে পারে।
"যদি তালাক নেই পরে কি হবে" বলা: এটি তালাকের ইচ্ছা প্রকাশ নয়, বরং চিন্তা প্রকাশ। এতে তালাক পতিত হবে না।
"কেন যে কালকে সুযোগটা ব্যবহার করলাম না" বলা: এটিও তালাক পতিত করার নিয়তে বলা হয়নি, বরুং আক্ষেপ প্রকাশ। এতে তালাক পতিত হবে না।
৪. কাবিননামায় ১৮ নং ধারা — স্ত্রী নিজে সিল মেরে দেওয়া
কাবিননামায় স্ত্রী নিজে সিল মেরে দিলে এবং পরে স্বামী তা জানতে পেরে আপত্তি না করলে:
- শাইখ ইবনে বায (রহিমাহুল্লাহ) বলেন: যদি স্বামী কাবিননামার শর্তে সম্মতি দেন এবং সাক্ষর করেন, তাহলে শর্তগুলো প্রযোজ্য হবে। তবে যদি প্রমাণিত হয় যে স্বামী জানতেন না এবং তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেন, তাহলে বিষয়টি আদালতে নিষ্পত্তি হওয়া উচিত।
- তবে স্বামী যদি পরে জানতে পেরে আপত্তি না করেন এবং স্ত্রী অধিকার ফিরিয়ে দেন, তাহলে তা গ্রহণযোগ্য।
বিয়ের পর লেখা হলে অধিকার ফিরিয়ে দেওয়া যাবে কি? হ্যাঁ, যাবে। কারণ এটি একটি শর্ত, যা উভয় পক্ষের সম্মতিতে পরিবর্তন বা বাতিল করা যায়।
৫. মনে মনে তালাকের নিয়ত করা
রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন: "আমার উম্মতের থেকে (তালাকসহ) ভুল-ক্রটি এবং যা মনে মনে করে তা মাফ করা হয়েছে।" (সহীহ বুখারী: 2528, সহীহ মুসলিম: 1264)
শাইখ ইবনে উসাইমীন (রহিমাহুল্লাহ) বলেন: মনে মনে তালাকের নিয়ত করলে তালাক পতিত হয় না, যতক্ষণ না মুখে উচ্চারণ করা হয়।
সুতরাং, আপনার মনে মনে শর্ত দেওয়া এবং স্ত্রীর বাবার বাড়ি যাওয়ায় তালাক পতিত হবে না।
৬. "বনিবনা না হওয়া"র সংজ্ঞা
শাইখ সালিহ আল-ফাওযান (হাফিজাহুল্লাহ) বলেন: বনিবনা না হওয়া বলতে এমন পরিস্থিতি বোঝায় যখন স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে সম্পর্ক এতটাই নষ্ট হয়ে যায় যে একসাথে জীবনযাপন করা অসম্ভব হয়ে পড়ে, এবং তা স্থায়ীভাবে বিরোধে রূপ নেয়।
সাময়িক ঝগড়া-বিবাদ, যা পরে মিটে যায়, তা "বনিবনা না হওয়া"র অন্তর্ভুক্ত নয়।
সারসংক্ষেপ: আপনার বর্ণিত পরিস্থিতিতে স্ত্রী তালাকের অধিকার পাবেন না, কারণ বনিবনা না হওয়ার শর্ত পূরণ হয়নি। মৌখিকভাবে দেওয়া অধিকার ফিরিয়ে দেওয়া বৈধ। মনে মনে তালাকের নিয়ত করলে তালাক পতিত হয় না। কাবিননামার শর্ত উভয় পক্ষের সম্মতিতে বাতিল করা যায়।
আল্লাহু আলাম।