ইসলামে পিতা-মাতার সেবা করার নিয়ম
Sunnah and Bid'ah · Hanafi
Question
Answer
পিতা-মাতার সেবা ও নবী (সাঃ)-এর জীবন থেকে শিক্ষা
ভূমিকা
প্রশ্নকারী ভাই/বোনের প্রশ্নটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিনি জানতে চেয়েছেন—নবী মুহাম্মদ (সাঃ) এতিম ছিলেন বলে তিনি কি পিতা-মাতার সেবা করার সুযোগ পাননি? আর উম্মত হিসেবে আমরা কীভাবে পিতা-মাতার সেবা শিখব?
নবী (সাঃ)-এর পিতা-মাতার প্রতি অবস্থান
প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার আগে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় পরিষ্কার করা প্রয়োজন। মহানবী (সাঃ) এতিম ছিলেন সত্য, কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে তিনি পিতা-মাতার সেবা সম্পর্কে শিক্ষা দেননি। বরং:
১. নবী (সাঃ)-এর পিতা-মাতার প্রতি ভালোবাসা:
- তাঁর পিতা আবদুল্লাহ ইবনে আবদুল মুত্তালিব তাঁর জন্মের আগেই ইন্তেকাল করেন
- তাঁর মা আমিনা বিনতে ওহাব তাঁর শৈশবেই (৬ বছর বয়সে) ইন্তেকাল করেন
- কিন্তু নবী (সাঃ) তাঁর পিতা-মাতার প্রতি অগাধ ভালোবাসা ও সম্মান পোষণ করতেন
২. আল্লাহ তায়ালা পিতা-মাতার সেবার শিক্ষা দিয়েছেন: আল্লাহ তাআলা কুরআনে ঘোষণা করেছেন:
وَقَضَىٰ رَبُّكَ أَلَّا تَعْبُدُوا إِلَّا إِيَّاهُ وَبِالْوَالِدَيْنِ إِحْسَانًا "তোমার রব আদেশ করেছেন যে, তোমরা তাঁকে ছাড়া কারো ইবাদত করো না এবং পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহার করো।" (সূরা বনী ইসরাঈল: ২৩)
৩. নবী (সাঃ)-এর হাদীসে পিতা-মাতার সেবা:
- এক ব্যক্তি নবী (সাঃ)-কে জিজ্ঞেস করল, "হে আল্লাহর রাসূল! মানুষের মধ্যে আমার সর্বোত্তম সেবা পাওয়ার অধিকারী কে?" তিনি বললেন, "তোমার মা।" লোকটি আবার জিজ্ঞেস করল, "এরপর কে?" তিনি বললেন, "তোমার মা।" লোকটি আবার জিজ্ঞেস করল, "এরপর কে?" তিনি বললেন, "তোমার মা।" চতুর্থবার জিজ্ঞেস করলে তিনি বললেন, "তোমার পিতা।" (সহীহ বুখারী: ৫৯৭১, সহীহ মুসলিম: ২৫৪৮)
নবী (সাঃ)-এর এতিম হওয়ার প্রজ্ঞা
আল্লাহ তাআলা নবী (সাঃ)-কে এতিম করার মধ্যে অনেক প্রজ্ঞা রয়েছে:
১. আল্লাহর বিশেষ তত্ত্বাবধান প্রদর্শন:
أَلَمْ يَجِدْكَ يَتِيمًا فَآوَىٰ "তিনি কি তোমাকে এতিম অবস্থায় পাননি? অতঃপর তিনি আশ্রয় দিয়েছেন।" (সূরা আদ-দুহা: ৬)
২. এতিমদের প্রতি সহানুভূতি শেখানো: নবী (সাঃ) নিজে এতিম ছিলেন বলে এতিমদের প্রতি তাঁর অগাধ ভালোবাসা ছিল। তিনি বলেছেন:
"আমি এবং এতিমের প্রতিপালক জান্নাতে এভাবে থাকব" — ইশারা করে দুটি আঙ্গুল একত্র করলেন। (সহীহ বুখারী: ৫৩০৪)
৩. পিতা-মাতার সেবার গুরুত্ব বোঝানো: নবী (সাঃ) পিতা-মাতার সেবার গুরুত্ব এতটাই বোঝাতেন যে, তিনি বলেছেন:
"পিতার সন্তুষ্টিতে আল্লাহর সন্তুষ্টি এবং পিতার অসন্তুষ্টিতে আল্লাহর অসন্তুষ্টি।" (তিরমিজি: ১৮৯৯)
উম্মত হিসেবে আমরা কীভাবে পিতা-মাতার সেবা শিখব?
১. কুরআনের নির্দেশনা: আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَوَصَّيْنَا الْإِنسَانَ بِوَالِدَيْهِ حَمَلَتْهُ أُمُّهُ وَهْنًا عَلَىٰ وَهْنٍ وَفِصَالُهُ فِي عَامَيْنِ أَنِ اشْكُرْ لِي وَلِوَالِدَيْكَ إِلَيَّ الْمَصِيرُ "আর আমি মানুষকে তার পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহারের নির্দেশ দিয়েছি। তার মা তাকে কষ্টের পর কষ্ট করে গর্ভে ধারণ করেছে এবং তার দুধ ছাড়ানো দুই বছরে। সুতরাং আমার এবং তোমার পিতা-মাতার প্রতি কৃতজ্ঞ হও।" (সূরা লুকমান: ১৪)
২. নবী (সাঃ)-এর শিক্ষা অনুসরণ: নবী (সাঃ) বলেছেন:
رِضَا الرَّبِّ فِي رِضَا الْوَالِدِ وَسَخَطُ الرَّبِّ فِي سَخَطِ الْوَالِدِ "আল্লাহর সন্তুষ্টি পিতার সন্তুষ্টিতে এবং আল্লাহর অসন্তুষ্টি পিতার অসন্তুষ্টিতে।" (তিরমিজি: ১৮৯৯)
৩. সাহাবীদের উদাহরণ:
- আবদুল্লাহ ইবনে উমর (রাঃ) পিতা-মাতার সেবায় এতটাই যত্নবান ছিলেন যে, তাঁর পিতা উমর (রাঃ)-এর খলিফা হওয়ার পরও তিনি পিতার সেবা করতেন
- আসমা বিনতে আবু বকর (রাঃ) তাঁর মায়ের সেবা করতেন, যদিও তাঁর মা তখনও মুশরিকা ছিলেন
ইমাম আবু হানীফা (রহঃ)-এর শিক্ষা
ইমাম আবু হানীফা (রহঃ) বলেছেন: "পিতা-মাতার সেবা করা ফরজ এবং তাদের সাথে ভালো ব্যবহার করা ওয়াজিব। তাদের আদেশ মান্য করা আবশ্যক, তবে আল্লাহর নাফরমানির নির্দেশ ছাড়া।"
পিতা-মাতার সেবার কিছু ব্যবহারিক দিক
১. কথা ও ব্যবহারে সম্মান:
- তাদের সাথে নম্রভাবে কথা বলা
- তাদের সামনে বিনয়ী থাকা
- "উফ" শব্দটিও না বলা (সূরা বনী ইসরাঈল: ২৩)
২. আর্থিক সহায়তা:
- তাদের প্রয়োজন মেটানো
- তাদের জন্য দোয়া করা
৩. বৃদ্ধ বয়সে সেবা:
- তাদের অসুস্থতায় সেবা করা
- তাদের সাথে (ধৈর্য) ধরা
উপসংহার
নবী (সাঃ) এতিম ছিলেন বলে তিনি পিতা-মাতার সেবা করতে পারেননি—এটি সত্য, কিন্তু তিনি উম্মতকে পিতা-মাতার সেবার সর্বোত্তম শিক্ষা দিয়ে গেছেন। তাঁর এতিম হওয়াটা আমাদের জন্য শিক্ষা যে, আল্লাহর উপর ভরসা রাখতে হবে এবং এতিমদের প্রতি দয়া করতে হবে। পিতা-মাতার সেবা শেখার জন্য আমাদের নবী (সাঃ)-এর শিক্ষা, কুরআনের নির্দেশনা এবং সাহাবীদের উদাহরণ অনুসরণ করাই যথেষ্ট।
رَبِّ ارْحَمْهُمَا كَمَا رَبَّيَانِي صَغِيرًا "হে আমার রব! তাদের উভয়ের প্রতি দয়া করুন, যেমনটি তারা শৈশবে আমাকে লালন-পালন করেছেন।" (সূরা বনী ইসরাঈল: ২৪)