পাত্র ও বিয়ে সম্পর্কিত
Miscellaneous Fiqh · Hanafi
Question
১.পাত্রপক্ষের সামনে যাওয়ার শরয়ী সীমা কতটুকু? পা কি ঢেকে রাখতে হবে?
২.কারো যদি ফুল হাতা ড্রেস না থাকে এবং ম্যানেজ করা সম্ভব না হয়, তাহলে সে কি করবে?
৩.পাত্রপক্ষের সামনে যাওয়ার আগে হাতে এবং নখে মেহেদী দেয়া, হালকা মেকআপ করা কি জায়েয?
৪.পাত্রকে কি কি প্রশ্ন করলে তার দ্বীনদারিতা সম্পর্কে ভালো ধারণা পাওয়া যাবে?
৫.পাত্রপক্ষের সামনে যাওয়ার কি কোনো সুন্নতি তরিকা আছে?
Answer
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
بسم الله الرحمن الرحيم
الحمد لله رب العالمين والصلاة والسلام على أشرف الأنبياء والمرسلين
প্রিয় বোন, আপনার প্রশ্নগুলোর উত্তর শরীয়তের আলোকে নিম্নরূপ দেওয়া হলো:
১. পাত্রপক্ষের সামনে যাওয়ার শরয়ী সীমা কতটুকু? পা কি ঢেকে রাখতে হবে?
ইসলামী শরীয়তে বেগানা (অ-মাহরাম) পুরুষের সামনে মহিলার সতর (ঢাকার আবশ্যকীয় অংশ) সম্পর্কে স্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে। কুরআনুল কারীমে আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَقُل لِّلْمُؤْمِنَاتِ يَغْضُضْنَ مِنْ أَبْصَارِهِنَّ وَيَحْفَظْنَ فُرُوجَهُنَّ وَلَا يُبْدِينَ زِينَتَهُنَّ إِلَّا مَا ظَهَرَ مِنْهَا... "আর মুমিন নারীদেরকে বলুন, তারা যেন তাদের দৃষ্টিকে সংযত রাখে এবং তাদের লজ্জাস্থানের হিফাযত করে। আর তারা যেন তাদের সৌন্দর্য প্রকাশ না করে, তবে যা সাধারণত প্রকাশ হয়ে পড়ে তা ছাড়া..." (সূরা আন-নূর: ৩১)
এই আয়াতের ব্যাখ্যায় ফকীহগণ বলেন, বেগানা পুরুষের সামনে মহিলার জন্য সম্পূর্ণ শরীর ঢেকে রাখা ফরয — চেহারা, হাতের কব্জি (পায়ের পাতা সহ) পর্যন্ত। অর্থাৎ, পা ঢেকে রাখা ফরয।
ইমাম আবু হানীফা (রহঃ) এর মতে, বেগানা পুরুষের সামনে মহিলার জন্য পায়ের পাতা (পা) ঢেকে রাখা ফরয। (বাদায়েউস সানায়ে, ২/৩২১; রদ্দুল মুহতার, ৬/৩৭০)
সুতরাং, পাত্রপক্ষের সামনে যাওয়ার সময় পা (পায়ের পাতা) অবশ্যই ঢেকে রাখতে হবে। মোজা, জুতা বা লম্বা পায়জামা/আবায়া দ্বারা পা ঢেকে রাখা জরুরি। পাত্রপক্ষ বেগানা হওয়ায় তাদের সামনে শরয়ী পর্দার সম্পূর্ণ বিধান প্রযোজ্য হবে।
২. কারো যদি ফুল হাতা ড্রেস না থাকে এবং ম্যানেজ করা সম্ভব না হয়, তাহলে সে কি করবে?
ইসলামে এমন কোনো অবস্থা নেই যেখানে শরয়ী পর্দা লঙ্ঘন করা জায়েয হয়ে যায়, বিশেষ করে পাত্রপক্ষের সামনে যাওয়ার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে। শরয়ী পর্দা (সতর) রক্ষা করা ফরয।
যদি কারো ফুল হাতা ড্রেস না থাকে, তাহলে সে অন্য কোনো কাপড় দিয়ে হাত ঢেকে নিতে পারে। যেমন: ওড়না, চাদর, বা স্কার্ফ দিয়ে হাতের বাকি অংশ ঢেকে নেওয়া। অথবা হাতের কব্জি পর্যন্ত ঢেকে যায় এমন কোনো কাপড় ব্যবহার করা। যদি কোনোভাবেই সম্ভব না হয়, তাহলে পাত্রপক্ষের সাথে দেখা করা স্থগিত রাখা উচিত, যতক্ষণ না শরয়ী পর্দা রক্ষা করে দেখা করার ব্যবস্থা করা যায়।
মনে রাখতে হবে, পাত্রপক্ষের সামনে যাওয়া একটি সুন্নত/মুস্তাহাব কাজ, কিন্তু শরয়ী পর্দা রক্ষা করা ফরয। ফরয কাজের জন্য মুস্তাহাব কাজকে বাদ দেওয়া জায়েয আছে, কিন্তু মুস্তাহাব কাজের জন্য ফরয কাজকে বাদ দেওয়া কখনো জায়েয নয়। (আল-হিদায়া, ৪/৪৫৮; ফাতাওয়া হিন্দিয়া, ৫/৩২৮)
৩. পাত্রপক্ষের সামনে যাওয়ার আগে হাতে এবং নখে মেহেদী দেওয়া, হালকা মেকআপ করা কি জায়েয?
ইসলামী শরীয়তে স্বামীর সামসে সাজসজ্জা করা মুস্তাহাব। কিন্তু বেগানা পুরুষের সামনে সাজসজ্জা (যাইনাত) প্রদর্শন করা হারাম। কুরআনে আল্লাহ তাআলা স্পষ্টভাবে বলেছেন:
وَلَا يُبْدِينَ زِينَتَهُنَّ إِلَّا لِبُعُولَتِهِنَّ... "এবং তারা যেন তাদের সৌন্দর্য প্রকাশ না করে, তবে নিজেদের স্বামীদের জন্য ছাড়া..." (সূরা আন-নূর: ৩১)
তবে পাত্রপক্ষের সামনে যাওয়ার ক্ষেত্রে শরীয়তের একটি বিশেষ নিয়ম আছে। ইসলাম পাত্র-পাত্রীকে একে অপরকে দেখার অনুমতি দিয়েছে, যাতে তারা বিবাহের সিদ্ধান্ত নিতে পারে। কিন্তু এই দেখার ক্ষেত্রেও শরয়ী পর্দার সীমা অতিক্রম করা জায়েয নয়।
হাদীসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন:
إِذَا خَطَبَ أَحَدُكُمُ الْمَرْأَةَ فَإِنِ اسْتَطَاعَ أَنْ يَنْظُرَ إِلَى مَا يَدْعُوهُ إِلَى نِكَاحِهَا فَلْيَفْعَلْ "তোমাদের কেউ যখন কোনো নারীর কাছে বিবাহের প্রস্তাব দেয়, তখন যদি সে এমন কিছু দেখতে পারে যা তাকে বিবাহে উৎসাহিত করে, তবে সে যেন তা করে।" (সুনানে আবু দাউদ: ২০৮২; মুসনাদে আহমাদ: ৯৫৯৫)
এই হাদীসের আলোকে ফকীহগণ বলেছেন, পাত্র শুধুমাত্র চেহারা এবং হাতের কব্জি পর্যন্ত দেখতে পারে। (রদ্দুল মুহতার, ৩/৩৫; ফাতাওয়া হিন্দিয়া, ১/২৭৩)
**সুতরাং, পাত্র বা পাত্রপক্ষের সামনে যাওয়ার সময় মেহেদী দেওয়া বা হালকা মেকআপ না করা উচিত। কারণ এটি সাজসজ্জা (যাইনাত) প্রদর্শনের অন্তর্ভুক্ত হতে পারে। পাত্রপক্ষের সামনে যাওয়ার সময় স্বাভাবিক ও পরিপাটি থাকা যথেষ্ট। মেহেদী বা মেকআপ স্বামীর জন্য করা উচিত, পাত্রপক্ষের সামনে নয়।
৪. পাত্রকে কি কি প্রশ্ন করলে তার দ্বীনদারিতা সম্পর্কে ভালো ধারণা পাওয়া যাবে?
পাত্রের দ্বীনদারিতা যাচাই করার জন্য নিম্নলিখিত প্রশ্নগুলো করা যেতে পারে:
ক. নামায সম্পর্কে:
- সে কি পাঁচ ওয়াক্ত নামায নিয়মিত জামাআতের সাথে পড়ে?
- নামাযের প্রতি তার মনোযোগ কেমন?
- সে কি ফজরের নামাযের জন্য সময়মতো জাগে?
খ. রিযিক ও হালাল-হারাম সম্পর্কে:
- তার আয়ের উৎস কী? তা কি হালাল?
- সে কি সুদ, ঘুষ, প্রতারণা ইত্যাদি থেকে বিরত থাকে?
- তার চাকরি বা ব্যবসা কি শরীয়তসম্মত?
গ. আখলাক ও চরিত্র সম্পর্কে:
- সে কি মিথ্যা বলা থেকে বিরত থাকে?
- তার আচরণ পিতা-মাতা, আত্মীয়-স্বজন ও বন্ধু বান্ধবদের সাথে কেমন?
- সে কি রাগ নিয়ন্ত্রণ করতে পারে?
ঘ. দ্বীনি ইলম ও আমল সম্পর্কে:
- তার দ্বীনি জ্ঞান কতটুকু? সে কি নিয়মিত দ্বীনি মজলিসে অংশগ্রহণ করে?
- সে কি কুরআন তিলাওয়াত করে? তার তিলাওয়াত কেমন?
- সে কি সুন্নতের উপর আমল করে?
ঙ. বিবাহ ও পারিবারিক জীবন সম্পর্কে ধারণা:
- সে বিবাহের উদ্দেশ্য কী মনে করে?
- সে স্ত্রীর হক সম্পর্কে কতটুকু জানে?
- সে কি স্ত্রীকে দ্বীনি পরিবেশে রাখতে আগ্রহী?
চ. অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয়:
- সে কি ধূমপান, গাঁজা বা অন্যান্য নেশা জাতীয় দ্রব্য থেকে বিরত?
- সে কি গীবত, পরনিন্দা থেকে বিরত থাকে?
- তার বন্ধুবান্ধব কেমন? তারা কি দ্বীনদার?
এই প্রশ্নগুলো করার সময় নরম ও ভদ্র ভাষায় করা উচিত এবং অভিভাবকদের উপস্থিতিতে করা উচিত। (মা'আরিফুল কুরআন, ৫/৪৫০; বাহিশ্তি জেওর, ৫/২৫-৩০)
৫. পাত্রপক্ষের সামনে যাওয়ার কি কোনো সুন্নতি তরিকা আছে?
পাত্রপক্ষের সামনে যাওয়ার জন্য ইসলামে একটি সুন্দর ও আদর্শ পদ্ধতি রয়েছে, যা নিম্নরূপ:
ক. অভিভাবকের উপস্থিতি: পাত্রপক্ষের সামনে যাওয়ার সময় অভিভাবক (মাহরাম) উপস্থিত থাকা জরুরি। কোনো অবস্থাতেই একান্তে (খালওয়াতে) দেখা করা যাবে না। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন:
لَا يَخْلُوَنَّ رَجُلٌ بِامْرَأَةٍ إِلَّا وَمَعَهَا ذُو مَحْرَمٍ "কোনো পুরুষ যেন এমন নারীর সাথে একান্তে না মিলে যার সাথে মাহরাম পুরুষ নেই।" (সহীহ বুখারী: ৫২৩৩; সহীহ মুসলিম: ১৩৪১)
খ. শরয়ী পর্দা রক্ষা করা: পাত্রপক্ষের সামনে যাওয়ার সময় সম্পূর্ণ শরয়ী পর্দা রক্ষা করা জরুরি। অর্থাৎ, শরীরের এমন অংশ ঢেকে রাখা যা ঢাকা ফরয। শুধুমাত্র চেহারা ও হাতের কব্জি পর্যন্ত দেখা যেতে পারে।
গ. দৃষ্টি সংযত রাখা: পাত্রী পাত্রের দিকে তাকাবে, কিন্তু দৃষ্টি সংযত রাখবে। একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকা বা বারবার তাকানো উচিত নয়। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন:
لِلْمُؤْمِنِ نَظْرَةٌ "মুমিনের জন্য (বেগানা নারীর দিকে) এক দৃষ্টি (যথেষ্ট)।" (সুনানে তিরমিযী: ২৭৭৭)
ঘ. দ্বীনদারিতাকে প্রাধান্য দেওয়া: পাত্রপক্ষের সামনে যাওয়ার মূল উদ্দেশ্য হওয়া উচিত দ্বীনদারিতা যাচাই করা, শুধুমাত্র চেহারা বা সম্পদ দেখা নয়। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন:
تُنْكَحُ الْمَرْأَةُ لِأَرْبَعٍ: لِمَالِهَا وَلِحَسَبِهَا وَلِجَمَالِهَا وَلِدِينِهَا، فَاظْفَرْ بِذَاتِ الدِّينِ تَرِبَتْ يَدَاكَ "নারীর সাথে বিবাহ করা হয় চারটি বিষয়ের জন্য: তার সম্পদের জন্য, তার বংশের জন্য, তার সৌন্দর্যের জন্য এবং তার দ্বীনের জন্য। সুতরাং তুমি দ্বীনদার নারীকে অগ্রাধিকার দাও, তোমার হাত ধুলোমাখা হোক।" (সহীহ বুখারী: ৫০৯০; সহীহ মুসলিম: ১৪৬৬)
ঙ. ইস্তিখারা করা: পাত্রপক্ষের সাথে দেখা করার আগে ও পরে ইস্তিখারা করা সুন্নত। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) আমাদেরকে সকল গুরুত্বপূর্ণ কাজে ইস্তিখারা করার শিক্ষা দিয়েছেন। (সহীহ বুখারী: ১১৬২)
চ. দুআ করা: পাত্রপক্ষের সাথে দেখা করার সময় ও পরে ভালো পাত্র পাওয়ার জন্য দুআ করা উচিত। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বিবাহের সময় যে দুআ শিখিয়েছেন:
بَارَكَ اللَّهُ لَكَ وَبَارَكَ عَلَيْكَ وَجَمَعَ بَيْنَكُمَا فِي خَيْرٍ "আল্লাহ তোমার জন্য বরকত দান করুন, তোমার উপর বরকত নাযিল করুন এবং তোমাদের উভয়কে কল্যাণের সাথে একত্রিত করুন।" (সুনানে আবু দাউদ: ২১৩০; সুনানে তিরমিযী: ১০৯১)
ছ. সালাতুল হাজত পড়া: পাত্রপক্ষের সাথে দেখা করার আগে সালাতুল হাজত (প্রয়োজন পূরণের নামায) পড়া উত্তম। (ফাতাওয়া উসমানী, ২/৩২০)
সারসংক্ষেপ: পাত্রপক্ষের সামনে যাওয়ার সময় শরয়ী পর্দা রক্ষা করা ফরয, পা ঢেকে রাখা জরুরি, মেকআপ বা সাজসজ্জা না করা উচিত। দ্বীনদারিতা যাচাইয়ের জন্য প্রশ্ন করা জায়েয এবং অভিভাবকের উপস্থিতিতে শরয়ী পর্দার সাথে দেখা করা সুন্নত।
والله أعلم بالصواب