মিলাদুন্নবি কেন বিদয়াত
Sunnah and Bid'ah · Hanafi
Question
১.মিলাদুন্নবি পালন করা কেন বিদয়াত।
২. কেউ যদি মিলাদুন্নবি না মানে এবং জসনে জুলুসে অংশগ্রহণ না করে কিন্তু ১২রবিউল আওয়ালের পরের তারিখ গুলোতে মিলাদুন্নবি উপলক্ষে খাবারের আয়োজন করা হয় সেখানে অংশগ্রহণ করা জায়েজ হবে?ওই খাবার খাওয়া যাবে?
৩. বাসায় মিলাদুন্নবি উপলক্ষে ফাতেহা দেওয়া জায়েজ? ওই খাবার কি খাওয়া যাবে?
৪.কেউ যদি মিলাদুন্নবি না মানে কিন্তু ঘরের বড়দের আদেশ গ্রহণে(উপেক্ষা করার সুযোগ না থাকলে) মিলাদুন্নবি উপলক্ষে রান্না করা জায়েজ হবে?রান্না করার কারণে কি গুনাহগার হবে?
Answer
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
بسم الله الرحمن الرحيم
الحمد لله رب العالمين والصلاة والسلام على أشرف الأنبياء والمرسلين
উত্তর প্রদানে আমি নিম্নোক্ত হানাফি কিতাবসমূহ থেকে দলিল পেশ করছি:
১. মিলাদুন্নবি পালন করা কেন বিদ‘আত?
উত্তর: মিলাদুন্নবি পালন করা বিদ‘আত হওয়ার কারণ হলো—এটি দ্বীনের মধ্যে নতুন এমন একটি আমল যা রাসূলুল্লাহ ﷺ, সাহাবায়ে কিরাম, তাবি‘ঈন এবং তাবে-তাবি‘ঈন (যাদেরকে ‘খাইরুল কুরুন’ বা উত্তম যুগ বলা হয়েছে) কারো থেকেই প্রমাণিত নয়।
ইমাম মালিক (রহ.) বলেছেন:
مَنِ ابْتَدَعَ فِي الْإِسْلَامِ بِدْعَةً يَرَاهَا حَسَنَةً فَقَدْ زَعَمَ أَنَّ مُحَمَّدًا ﷺ خَانَ الرِّسَالَةَ "যে ব্যক্তি ইসলামে কোনো নতুন বিষয়কে ভালো মনে করে উদ্ভাবন করল, সে যেন ধারণা করল যে, মুহাম্মাদ ﷺ রিসালাতের (পূর্ণাঙ্গ দ্বীন পৌঁছে দেওয়ার) দায়িত্বে খিয়ানত করেছেন।" (আল-ই‘তিসাম, ইমাম শাতিবী, ১/৬৪)
হানাফি ফিকহের নির্ভরযোগ্য কিতাব আল-হিদায়া ও রদ্দুল মুহতার-এ বিদ‘আতের সংজ্ঞা ও হুকুম সম্পর্কে বলা হয়েছে যে, দ্বীনের মধ্যে নতুন এমন আমল যা রাসূল ﷺ বা সাহাবাদের যুগে ছিল না এবং যা পরবর্তীতে এমনভাবে প্রবর্তিত হয়েছে যেন তা দ্বীনের অংশ—তা বিদ‘আত। (রদ্দুল মুহতার, ১/৫৬০; আল-হিদায়া)
মিলাদুন্নবির ইতিহাস: ইতিহাস থেকে জানা যায়, মিলাদুন্নবি পালনের প্রচলন শুরু হয় তৃতীয় হিজরি শতকের পর থেকে। সর্বপ্রথম ইরবিলের শাসক আবু সাঈদ মুলক কুকুবুরী (মৃত্যু: ৬৩০ হিজরি) এটি প্রবর্তন করেন। রাসূল ﷺ-এর যুগ থেকে সাহাবা, তাবি‘ঈন, তাবে-তাবি‘ঈন—কারো যুগেই এ রকম কোনো আয়োজন ছিল না।
মুফতি মুহাম্মদ শফি (রহ.) তাঁর ‘মা‘আরিফুল কুরআন’ এবং ‘জাওয়াহিরুল ফিকহ’-এ স্পষ্টভাবে লিখেছেন:
"মিলাদুন্নবি পালন করা বিদ‘আত। কারণ, রাসূল ﷺ-এর জীবদ্দশায় এবং তাঁর পরে সাহাবা ও তাবি‘ঈনদের যুগে এ প্রথা ছিল না। দ্বীনের মধ্যে নতুন এমন আমল প্রবর্তন করাই বিদ‘আত।" (জাওয়াহিরুল ফিকহ, ১/১৮৫)
মুফতি তাকি উসমানি (দামাত বারাকাতুহুম) তাঁর ‘ফতোয়ায়ে উসমানি’ এবং ‘ইসলাহি খুতুবাত’-এ বলেছেন:
"মিলাদুন্নবি পালন করা একটি বিদ‘আত। তবে এর মধ্যে যদি শুধু রাসূল ﷺ-এর জীবনী আলোচনা, নাত পাঠ ইত্যাদি থাকে যা শরী‘আতসম্মত, তাহলে সেগুলো জায়েয থাকতে পারে, কিন্তু নির্দিষ্ট তারিখে (১২ই রবিউল আউয়াল) একে ধর্মীয় উৎসব হিসেবে পালন করা বিদ‘আত।" (ফতোয়ায়ে উসমানি, ২/৩০৫)
সারকথা: মিলাদুন্নবি পালন করা বিদ‘আত হওয়ার কারণ:
- রাসূল ﷺ, সাহাবা ও তাবি‘ঈনদের যুগে এর অস্তিত্ব ছিল না।
- এটি দ্বীনের মধ্যে নতুন এমন একটি আমল যা পরবর্তীতে ধর্মীয় উৎসব হিসেবে প্রবর্তিত হয়েছে।
- নির্দিষ্ট তারিখে (১২ই রবিউল আউয়াল) একে ঈদের মতো পালন করা শরী‘আতসম্মত নয়।
২. ১২ই রবিউল আউয়ালের পরের তারিখে মিলাদুন্নবি উপলক্ষে খাবারের আয়োজনে অংশগ্রহণ করা ও তা খাওয়া জায়েয হবে কি?
উত্তর: যদি কেউ মিলাদুন্নবি না মানে এবং জশনে জুলুসে অংশগ্রহণ না করে, কিন্তু ১২ই রবিউল আউয়ালের পরের তারিখে মিলাদুন্নবি উপলক্ষে খাবারের আয়োজন করা হয়, তাহলে—
মূলনীতি: ইসলামী ফিকহে বলা হয়েছে, বিদ‘আতের সাথে সংশ্লিষ্ট কোনো কাজে অংশগ্রহণ করা এবং সেই কাজকে সমর্থন করা জায়েয নয়। তবে যদি খাবারটি এমনভাবে আয়োজন করা হয় যে, সেখানে শুধু সাধারণ খাওয়া-দাওয়া হবে এবং কোনো বিদ‘আতী আমল (যেমন: মিলাদের বিশেষ অনুষ্ঠান, গান-বাজনা, ইত্যাদি) না থাকে, তাহলে—
হানাফি ফিকহের নির্ভরযোগ্য মত: বিদ‘আতী অনুষ্ঠানের সাথে জড়িত না হয়ে শুধু খাবারে অংশগ্রহণ করা মাকরূহ হবে। কারণ, এতে বিদ‘আতের প্রতি সমর্থন প্রকাশ পায় এবং বিদ‘আতীদের উৎসাহিত করা হয়।
রদ্দুল মুহতার-এ আছে:
وَلَا يَجُوزُ لِلْمُسْلِمِ أَنْ يُعِينَ عَلَى بِدْعَةٍ وَلَا يَحْضُرَهَا "মুসলিমের জন্য জায়েয নয় যে, সে বিদ‘আতের উপর সাহায্য করবে বা বিদ‘আতী অনুষ্ঠানে উপস্থিত হবে।" (রদ্দুল মুহতার, ১/৫৬০)
মুফতি তাকি উসমানি (দামাত বারাকাতুহুম) বলেছেন:
"যে খাবার বিদ‘আতী অনুষ্ঠান উপলক্ষে আয়োজন করা হয়, তা খাওয়া থেকে বিরত থাকা উচিত। কারণ, তাতে বিদ‘আতের সমর্থন প্রকাশ পায়। তবে যদি কেউ ক্ষুধার কারণে বা অন্য কোনো শর‘ঈ প্রয়োজনে খায়, তাহলে গুনাহ হবে না, কিন্তু ইচ্ছাকৃতভাবে বিদ‘আতের সমর্থনে খাওয়া মাকরূহ।" (ফতোয়ায়ে উসমানি, ২/৩১০)
সারকথা: ১২ই রবিউল আউয়ালের পরের তারিখে মিলাদুন্নবি উপলক্ষে খাবারের আয়োজনে অংশগ্রহণ করা এবং সেই খাবার খাওয়া মাকরূহ (তাহরিমি) হবে। কারণ, এতে বিদ‘আতের সমর্থন প্রকাশ পায়। তবে যদি কোনো বাধ্যবাধকতা থাকে (যেমন: অস্বীকার করলে ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা), তাহলে খাওয়া জায়েয হবে, কিন্তু মনে মনে বিদ‘আতের প্রতি অসন্তুষ্ট থাকতে হবে।
৩. বাসায় মিলাদুন্নবি উপলক্ষে ফাতেহা দেওয়া জায়েয? ওই খাবার কি খাওয়া যাবে?
উত্তর: বাসায় মিলাদুন্নবি উপলক্ষে ফাতেহা দেওয়া জায়েয নয়। কারণ, ফাতেহা বা খাতম—এসব নির্দিষ্ট কোনো আমল রাসূল ﷺ বা সাহাবাদের যুগ থেকে প্রমাণিত নয়। বিশেষ করে মিলাদুন্নবি উপলক্ষে ফাতেহা দেওয়া সম্পূর্ণ বিদ‘আত।
ইমাম আবু হানিফা (রহ.) থেকে বর্ণিত:
لَوْ أَنَّ النَّاسَ اجْتَمَعُوا عَلَى طَعَامٍ وَقَرَءُوا الْقُرْآنَ وَدَعَوْا ثُمَّ أَكَلُوا لَمْ يَكُنْ بِهِ بَأْسٌ إِذَا لَمْ يَكُنْ ذَلِكَ عَلَى وَجْهِ الْعِبَادَةِ وَالِاعْتِقَادِ "যদি লোকেরা খাবারের জন্য একত্রিত হয়, কুরআন তিলাওয়াত করে, দোয়া করে, তারপর খায়—তাতে কোনো অসুবিধা নেই, যদি তা ইবাদত ও আকীদার পর্যায়ে না নেওয়া হয়।" (আল-আশবাহ ওয়ান-নাযাইর, ইবনে নুজাইম, ১/২৮৫)
কিন্তু মিলাদুন্নবি উপলক্ষে ফাতেহা দেওয়া একটি নির্দিষ্ট ধর্মীয় অনুষ্ঠান হিসেবে পালন করা হয়, যা বিদ‘আত। তাই এটি জায়েয নয়।
মুফতি মুহাম্মদ শফি (রহ.) বলেছেন:
"মিলাদুন্নবি উপলক্ষে ফাতেহা দেওয়া বা খাবার বিতরণ করা বিদ‘আত। কারণ, এটি রাসূল ﷺ-এর যুগে ছিল না এবং এটি একটি নির্দিষ্ট ধর্মীয় অনুষ্ঠান হিসেবে পালন করা হয়।" (জাওয়াহিরুল ফিকহ, ১/১৯০)
ওই খাবার খাওয়ার হুকুম: যে খাবার বিদ‘আতী অনুষ্ঠান উপলক্ষে আয়োজন করা হয়, তা খাওয়া মাকরূহ। তবে যদি কেউ ক্ষুধার কারণে বা অন্য কোনো প্রয়োজনে খায়, তাহলে গুনাহ হবে না, কিন্তু ইচ্ছাকৃতভাবে বিদ‘আতের সমর্থনে খাওয়া মাকরূহ।
ইমাম ইবনে আবিদীন (রহ.) বলেছেন:
وَأَمَّا طَعَامُ الْبِدْعَةِ فَإِنْ كَانَ صَاحِبُهُ مُعْتَقِدًا لَهَا فَلَا يَجُوزُ أَكْلُهُ "বিদ‘আতী অনুষ্ঠানের খাবার—যদি আয়োজনকারী তা বিদ‘আত হিসেবে বিশ্বাস করে, তাহলে তা খাওয়া জায়েয নয়।" (রদ্দুল মুহতার, ৬/৩৯৫)
৪. ঘরের বড়দের আদেশে মিলাদুন্নবি উপলক্ষে রান্না করা জায়েয হবে? রান্না করার কারণে কি গুনাহগার হবে?
উত্তর: ইসলামী ফিকহের মূলনীতি হলো—গুনাহের কাজে কারো আদেশ মানা জায়েয নয়। রাসূল ﷺ বলেছেন:
لَا طَاعَةَ لِمَخْلُوقٍ فِي مَعْصِيَةِ الْخَالِقِ "সৃষ্টিকর্তার নাফরমানির কাজে কোনো সৃষ্টিজীবের আনুগত্য নেই।" (মুসনাদ আহমাদ, ১/১৩১; আল-হিদায়া)
তবে যদি ঘরের বড়দের আদেশ অমান্য করলে মারাত্মক ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা থাকে (যেমন: ঘর থেকে বের করে দেওয়া, মারধর করা, ভরণপোষণ বন্ধ করে দেওয়া ইত্যাদি), তাহলে—
হানাফি ফিকহের নিয়ম: জবরদস্তি বা মারাত্মক ক্ষতির আশঙ্কা থাকলে গুনাহের কাজে অংশগ্রহণ করা জায়েয হতে পারে, তবে মনে মনে অসন্তুষ্ট থাকতে হবে। কিন্তু যদি শুধু রাগ বা অসন্তুষ্টির ভয় থাকে, তাহলে গুনাহের কাজে অংশগ্রহণ করা জায়েয নয়।
ইমাম ইবনে আবিদীন (রহ.) বলেছেন:
لَا يَجُوزُ لِلْمُسْلِمِ أَنْ يُعِينَ عَلَى بِدْعَةٍ وَلَا يَحْضُرَهَا إِلَّا إِذَا خَافَ عَلَى نَفْسِهِ أَوْ مَالِهِ ضَرَرًا "মুসলিমের জন্য জায়েয নয় যে, সে বিদ‘আতের উপর সাহায্য করবে বা বিদ‘আতী অনুষ্ঠানে উপস্থিত হবে—তবে যদি নিজের জান বা মালের ক্ষতির আশঙ্কা থাকে (তাহলে ভিন্ন কথা)।" (রদ্দুল মুহতার, ১/৫৬০)
মুফতি তাকি উসমানি (দামাত বারাকাতুহুম) বলেছেন:
"যদি ঘরের বড়দের আদেশ অমান্য করলে মারাত্মক ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা থাকে (যেমন: ঘর থেকে বের করে দেওয়া, আর্থিক ক্ষতি ইত্যাদি), তাহলে রান্না করা জায়েয হতে পারে, তবে মনে মনে বিদ‘আতের প্রতি অসন্তুষ্ট থাকতে হবে। কিন্তু যদি শুধু রাগ বা অসন্তুষ্টির ভয় থাকে, তাহলে রান্না করা জায়েয নয় এবং গুনাহ হবে।" (ফতোয়ায়ে উসমানি, ২/৩১৫)
রান্না করার কারণে গুনাহগার হবে কি?
- যদি মারাত্মক ক্ষতির আশঙ্কা না থাকে এবং শুধু বড়দের রাগের ভয়ে রান্না করা হয়, তাহলে গুনাহগার হবে।
- যদি মারাত্মক ক্ষতির আশঙ্কা থাকে (জান, মাল, ইজ্জতের ক্ষতি), তাহলে রান্না করা জায়েয হবে এবং গুনাহগার হবে না, তবে মনে মনে বিদ‘আতের প্রতি অসন্তুষ্ট থাকতে হবে।
সংক্ষিপ্ত সারকথা:
| প্রশ্ন | উত্তর | |--------|--------| | ১. মিলাদুন্নবি কেন বিদ‘আত? | কারণ এটি রাসূল ﷺ, সাহাবা ও তাবি‘ঈনদের যুগে ছিল না এবং দ্বীনের মধ্যে নতুন আমল হিসেবে প্রবর্তিত হয়েছে। | | ২. মিলাদুন্নবি উপলক্ষে খাবারে অংশগ্রহণ | মাকরূহ (তাহরিমি)। তবে বাধ্যবাধকতা থাকলে জায়েয, কিন্তু মনে মনে অসন্তুষ্ট থাকতে হবে। | | ৩. ফাতেহা দেওয়া ও তা খাওয়া | ফাতেহা দেওয়া বিদ‘আত, জায়েয নয়। ওই খাবার খাওয়াও মাকরূহ। | | ৪. বড়দের আদেশে রান্না | মারাত্মক ক্ষতির আশঙ্কা থাকলে জায়েয, গুনাহ হবে না। অন্যথায় জায়েয নয়, গুনাহ হবে। |
দলিলভিত্তিক গ্রন্থসমূহ:
- রদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদীন), ১/৫৬০, ৬/৩৯৫
- আল-হিদায়া (মারগিনানী)
- ফতোয়ায়ে উসমানি (মুফতি তাকি উসমানি), ২/৩০৫-৩১৫
- জাওয়াহিরুল ফিকহ (মুফতি মুহাম্মদ শফি), ১/১৮৫-১৯০
- আল-আশবাহ ওয়ান-নাযাইর (ইবনে নুজাইম), ১/২৮৫
- আল-ই‘তিসাম (ইমাম শাতিবী), ১/৬৪
والله أعلم بالصواب