ইস্তেখারার ফলাফল কীভাবে বুঝব
Marriage and Divorce · Hanafi
Question
Answer
ইস্তেখারা: অর্থ, পদ্ধতি এবং ফলাফল সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা
ভূমিকা
ইস্তেখারা একটি গুরুত্বপূর্ণ ইসলামী আমল। যখন কোনো ব্যক্তি কোনো বৈধ কাজের সিদ্ধান্ত নিতে দ্বিধাগ্রস্ত থাকে, তখন সে আল্লাহর নিকট কল্যাণ প্রার্থনা করে। প্রশ্নকারী জানতে চেয়েছেন—ইস্তেখারার পর যদি বিষয়টি অকল্যাণকর হয়, তাহলে আল্লাহ কি নিজ থেকে তা দূর করবেন, নাকি বান্দাকে নিজেই সরে আসতে হবে? এবং কীভাবে বুঝবে যে বিষয়টি তার জন্য কল্যাণকর নয়?
ইস্তেখারার সংজ্ঞা ও গুরুত্ব
ইস্তেখারা শব্দটি আরবি "খায়র" মূল থেকে এসেছে, যার অর্থ কল্যাণ প্রার্থনা করা। রাসূলুল্লাহ (সা.) সাহাবাদেরকে সকল বিষয়ে ইস্তেখারা শেখাতেন, যেমনটি তিনি কুরআনের সূরা শেখাতেন।
হযরত জাবির (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: "তোমাদের কেউ যখন কোনো গুরুত্বপূর্ণ কাজের ইচ্ছা করে, তখন সে যেন দুই রাকাত নফল নামায পড়ে..." (সহীহ বুখারী: ১১৬২)
ইস্তেখারার পর করণীয়
১. আল্লাহর উপর ভরসা ও তাওয়াক্কুল
ইস্তেখারার মূল উদ্দেশ্য হলো আল্লাহর উপর পূর্ণ ভরসা স্থাপন করা। ইমাম ইবনে তাইমিয়া (রহ.) বলেন, ইস্তেখারার পর বান্দার অন্তরে যে দিকটি উন্মুক্ত হয় বা সহজ হয়, সে দিকেই অগ্রসর হওয়া উচিত।
২. আল্লাহ নিজে থেকে অকল্যাণ দূর করবেন কি?
হ্যাঁ, আল্লাহ Himself নিজ তরফ থেকে অকল্যাণ দূর করতে পারেন। কুরআনে আল্লাহ বলেন: "আর কেউ আল্লাহকে ভয় করলে তিনি তার জন্য উত্তরণের পথ তৈরি করে দেবেন এবং তাকে এমন জায়গা থেকে রিজিক দেবেন যা সে কল্পনাও করতে পারবে না।" (সূরা আত-তালাক: ২-৩)
তবে এটি জরুরি নয় যে আল্লাহ সরাসরি বিষয়টি দূর করবেন। কখনও কখনও আল্লাহ বান্দার অন্তরে বিষয়টি সম্পর্কে অনীহা বা অস্বস্তি সৃষ্টি করে দেন, যাতে সে নিজেই সরে আসে।
৩. বান্দার নিজেকেও সরে আসতে হবে
ইমাম ইবনে আবেদিন (রহ.) বলেন,ইস্তেখারার পর বান্দার কর্তব্য হলো আল্লাহর সিদ্ধান্তের উপর সন্তুষ্ট থাকা এবং যে দিকে তার অন্তর ঝুঁকে পড়ে সেদিকে অগ্রসর হওয়া। যদি অন্তরে অস্বস্তি বা অনীহা থাকে, তাহলে তা থেকে বিরত থাকা উচিত।
ইস্তেখারার ফলাফল বুঝার উপায়
১. অন্তরের অবস্থা
ইস্তেখারার পর সাধারণত বান্দার অন্তরে যে বিষয়ে ইস্তেখারা করা হয়েছে সে সম্পর্কে একটি মানসিক অবস্থা তৈরি হয়:
- অগ্রসর হওয়ার প্রবণতা: যদি বিষয়টি কল্যাণকর হয়, তাহলে অন্তরে বিষয়টি সম্পর্কে প্রশান্তি ও অগ্রসর হওয়ার প্রবণতা সৃষ্টি হয়।
- অনীহা ও অস্বস্তি: যদি বিষয়টি অকল্যাণকর হয়, তাহলে অন্তরে বিষয়টি সম্পর্কে অনীহা, অস্বস্তি বা সংকীর্ণতা সৃষ্টি হয়।
২. অবস্থার পরিবর্তন
মুফতি মুহাম্মদ শফি (রহ.) বলেন,ইস্তেখারার পর বিষয়টি সহজ হয়ে গেলে বা বাধা দূর হয়ে গেলে তা কল্যাণের লক্ষণ। আর বিষয়টিতে জটিলতা, বাধা বা অসুবিধা সৃষ্টি হলে তা অকল্যাণের লক্ষণ।
৩. স্বপ্ন দেখা
অনেকে মনে করেন ইস্তেখারার পর স্বপ্ন দেখা জরুরি।এটি জরুরি নয়। ইমাম নববী (রহ.) বলেন, ইস্তেখারার পর স্বপ্ন দেখা জরুরি নয়; বরং অন্তরের প্রবণতা বা অবস্থার পরিবর্তনই যথেষ্ট।
হানাফী ফিকহের দৃষ্টিভঙ্গি
ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর মত
ইমাম আবু হানিফা (রহ.) ইস্তেখারাকে গুরুত্বপূর্ণ আমল হিসেবে গণ্য করেছেন। তিনি বলেন, ইস্তেখারার পর বান্দার কর্তব্য হলো আল্লাহর উপর ভরসা করা এবং অন্তরের প্রবণতা অনুযায়ী আমল করা।
ফাতাওয়া আলমগীরী
ফাতাওয়া আলমগীরীতে উল্লেখ আছে, ইস্তেখারার পর যদি বান্দার অন্তর কোনো দিকে ঝুঁকে পড়ে এবং সেই দিকে অগ্রসর হওয়া সহজ হয়, তাহলে সেটিই তার জন্য কল্যাণকর। আর যদি অন্তর সংকীর্ণ হয় এবং বিষয়টি কঠিন মনে হয়, তাহলে তা থেকে বিরত থাকা উচিত।
ব্যবহারিক নির্দেশনা
১. ইস্তেখারার পর সিদ্ধান্ত গ্রহণ
ইস্তেখারার পর বান্দার উচিত:
- আল্লাহর উপর পূর্ণ ভরসা করা
- অন্তরের প্রবণতা অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেওয়া
- বিষয়টি সহজ হলে অগ্রসর হওয়া
- বিষয়টি কঠিন বা অস্বস্তিকর মনে হলে বিরত থাকা
২. ভুল সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে
যদি কেউ ইস্তেখারার পরও ভুল সিদ্ধান্ত নেয়, তাহলে আল্লাহর রহমতের আশা করা উচিত। আল্লাহ ক্ষমাশীল ও দয়ালু। কুরআনে আল্লাহ বলেন: "আর আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ সমস্ত গুনাহ মাফ করে দেন।" (সূরা আয-যুমার: ৫৩)
উপসংহার
ইস্তেখারার পর আল্লাহ Himself অকল্যাণ দূর করতে পারেন, আবার বান্দার অন্তরে এমন অবস্থা সৃষ্টি করে দিতে পারেন যাতে সে নিজেই সরে আসে। বান্দার কর্তব্য হলো আল্লাহর উপর ভরসা করা এবং অন্তরের প্রবণতা অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেওয়া। যদি অন্তরে অস্বস্তি বা সংকীর্ণতা থাকে, তাহলে তা অকল্যাণের লক্ষণ হিসেবে বিবেচনা করে বিরত থাকা উচিত। তবে মনে রাখতে হবে, ইস্তেখারা কোনো গ্যারান্টি নয় যে সিদ্ধান্ত শতভাগ সঠিক হবে; বরং এটি আল্লাহর উপর ভরসা করার একটি মাধ্যম।
আল্লাহই সর্বজ্ঞ ও সর্বশক্তিমান।