পরিবারের অনুমতি ছাড়া বিয়ে করলে কি গোনাহ হবে?
Marriage and Divorce · Hanafi
Question
আমি ছোটোবেলা থেকেই পারিবারিক অশান্তির মধ্যে বড়ো হয়েছি। আমি বর্তমানে একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে অনার্স প্রথম বর্ষে পড়াশোনা করছি। পরিবার থেকে আপাতত আমাকে বিয়ে দিবে না। তারা চায় আমি গ্র্যাজুয়েশন শেষ করে চাকরি পেয়ে তারপর বিয়ে করি। কিন্তু আমার পক্ষে এতদিন অপেক্ষা করা সম্ভব নয়। আমার ভার্সিটির একজন সিনিয়র আমাকে পছন্দ করেন, আমিও ওনাকে পছন্দ করি। এখন আমরা যদি পরিবারকে না জানিয়ে বিয়ে করি তাহলে কি বিয়ে অশুদ্ধ হবে?
পরিবার জানলে কখনোই মানবে না এখন বিয়ে। আর এতবছর অপেক্ষা করাও সম্ভব না আমাদের পক্ষে। দু'জনই প্রাপ্তবয়স্ক এবং দু'জনেরই ইচ্ছা বিয়ে করার।
Answer
উত্তর: وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
আপনার প্রশ্নের জন্য ধন্যবাদ। আপনার পরিস্থিতি বুঝতে পেরে আমরা সহানুভূতিশীল। আসুন আমরা ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে বিষয়টি বিশ্লেষণ করি।
সংক্ষিপ্ত উত্তর:
পরিবারের (অভিভাবকের) অনুমতি ছাড়া বিয়ে করা শুদ্ধ (বৈধ) হবে, তবে এটি মাকরুহে তানযিহি(অপছন্দনীয়) হবে এবং এর ফলে পারিবারিক সম্পর্কে অশান্তি সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ইসলামী আইন অনুযায়ী, প্রাপ্তবয়স্ক নারী-পুরুষের নিজেদের সম্মতিতে বিয়ে সম্পন্ন হলে তা বৈধ হয়, তবে অভিভাবকের অনুমতি না নেওয়া মাকরূহে তানযিহি (অপছন্দনীয়)।
বিস্তারিত বিশ্লেষণ:
১. বালেগ (প্রাপ্তবয়স্ক) নারীর বিবাহের বৈধতা:
হানাফি মাযহাবের ইমামদের মতে, একজন প্রাপ্তবয়স্ক (বালেগ) ও সুস্থ মস্তিষ্কের নারী নিজের বিবাহের জন্য নিজেই সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। তার অভিভাবকের অনুমতি ছাড়া বিয়ে করলে বিয়ে শুদ্ধ (সহীহ) হবে, তবে এটি মাকরুহ হবে যদি অভিভাবকের অনুমতি না নেওয়া হয়।
-
ইমাম আবু হানিফা (রহ.) এবং ইমাম আবু ইউসুফ (রহ.)-এর মতে, প্রাপ্তবয়স্ক নারী নিজের বিবাহ নিজে সম্পাদন করতে পারেন এবং তা বৈধ। তবে ইমাম মুহাম্মদ (রহ.)-এর মতে, অভিভাবকের অনুমতি ছাড়া নারীর নিজের বিবাহ দেওয়া বৈধ নয়, তবে যদি তা হয়ে যায় এবং স্বামী সমকক্ষ (কুফু) হয়, তাহলে বালিগা নারীর বিবাহ সহীহ হবে। (রদ্দুল মুহতার, ৩/৫৬-৫৭; ফাতাওয়া হিন্দিয়া, ১/৩০০)
-
ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর মতে, নারী নিজে বিবাহ করলে তা সহীহ, তবে অভিভাবকের অনুমতি না নেওয়া মাকরূহ। (ফাতাওয়া উসমানি, ২/৩০০)
২. অভিভাবকের অনুমতি না নেওয়ার কারণে গুনাহ:
যদিও বিয়ে শুদ্ধ হবে, তবে অভিভাবকের অনুমতি না নেওয়া এবং তাদের অসন্তুষ্টি সৃষ্টি করা মাকরুহ। ইসলামে পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহার এবং তাদের সম্মান করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাদের অনুমতি ছাড়া বিয়ে করলে সম্পর্কের মধ্যে অশান্তি সৃষ্টি হতে পারে, যা ইসলাম সমর্থন করে না।
- কুরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন: "তোমাদের প্রতিপালক আদেশ করেছেন যে, তাঁকে ছাড়া অন্য কারো ইবাদত করো না এবং পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহার করো।" (সূরা বনী ইসরাঈল, ১৭:২৩)
৩. পরিবারের অস্বীকৃতির কারণ:
আপনার পরিবার চাচ্ছে আপনি গ্র্যাজুয়েশন শেষ করে চাকরি পাওয়ার পর বিয়ে করুন। এটি একটি যুক্তিসঙ্গত দাবি হতে পারে, তবে ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে বালেগ ও প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তির জন্য বিলম্ব করা জরুরি নয়, বিশেষ করে যদি অপেক্ষার কারণে গুনাহের আশঙ্কা থাকে। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: "হে যুবক সম্প্রদায়! তোমাদের মধ্যে যারা বিবাহের সামর্থ্য রাখে, তারা যেন বিবাহ করে। কারণ বিবাহ দৃষ্টি অবনত রাখে এবং লজ্জাস্থানকে সংরক্ষণ করে।" (সহীহ বুখারী, হাদীস: ৫০৬৫)
৪. পরিবারকে না জানিয়ে বিয়ে করার পরামর্শ:
আমি আপনাকে পরামর্শ দেব যে, পরিবারকে না জানিয়ে বিয়ে করা থেকে বিরত থাকুন। কারণ এটি করলে:
- পারিবারিক সম্পর্কে ফাটল ধরবে।
- ভবিষ্যতে অনেক জটিলতা সৃষ্টি হতে পারে।
- এটি গুনাহের কাজ হবে।
পরিবারের সাথে আলোচনা করুন এবং তাদের বোঝানোর চেষ্টা করুন। যদি তারা না মানে, তাহলে ধৈর্য ধরুন এবং আল্লাহর কাছে সাহায্য প্রার্থনা করুন। প্রয়োজনে বিশ্বস্ত কোনো আলেম বা পরিবারের সম্মানিত সদস্যের মাধ্যমে মধ্যস্থতা করান।
ফতোয়া ও রেফারেন্স:
- ফাতাওয়া উসমানি (মুফতি মুহাম্মদ তাকি উসমানি): প্রাপ্তবয়স্ক নারীর নিজের বিবাহ দেওয়া বৈধ, তবে অভিভাবকের অনুমতি না নেওয়া মাকরূহ। (ফাতাওয়া উসমানি, ২/৩০০)
- রদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদীন): বালিগা নারীর নিজের বিবাহ সহীহ, তবে অভিভাবকের অনুমতি না নেওয়া গুনাহ। (রদ্দুল মুহতার, ৩/৫৬-৫৭)
- ফাতাওয়া হিন্দিয়া: প্রাপ্তবয়স্ক নারীর নিজের বিবাহ সহীহ, তবে অভিভাবকের অনুমতি না নেওয়া মাকরূহ। (ফাতাওয়া হিন্দিয়া, ১/৩০০)
উপসংহার:
আপনার বিয়ে শুদ্ধ হবে যদি দু'জনেই প্রাপ্তবয়স্ক, সম্মত হন এবং দু'জন সাক্ষী থাকেন। তবে পরিবারের অনুমতি না নেওয়া মাকরুহ এবং এর ফলে পারিবারিক অশান্তি সৃষ্টি হবে। তাই আমি আপনাকে পরিবারের সাথে আলোচনা করে বোঝানোর চেষ্টা করার পরামর্শ দেব। যদি তারা একান্তই না মানে, তাহলে আল্লাহর উপর ভরসা করে ধৈর্য ধরুন এবং প্রয়োজনে কোনো বিশ্বস্ত আলেমের মাধ্যমে মধ্যস্থতা করান।
আল্লাহ তাআলা আপনার জন্য উত্তম ব্যবস্থা করুন। আমিন।