বিয়ের উপযুক্ত সময় ও সামর্থ্য বলতে কি? চাকরি না থাকলেও বর্তমান টিউশনির আয় দিয়ে বিয়ের ব্যবস্থা করা কি উচিত?
Marriage and Divorce · Hanafi
Question
আসসালামু আলাইকুম.
আমার ভাই অনার্স ৩য় বর্ষে পড়ে ( আমার ভাই খুবই ভদ্র স্বভাবের মানুষ ) টিউশনি করায়ে আমাদের সংসার চালায় . আমি মা আর ভাই পরিবারে . আমার বাবা ১৫ বছর আগে মারা গেছে . এখন আমার ভাইকে কি এই ইনকামে বিয়ে দেওয়া ঠিক হবে. নাকি চাকরি করে তারপর বিয়ে দেওয়া উচিত, আমার আম্মু ভাবতেছে চাকরি করলে ভালো ইনকাম হলে বিয়ে দেবে . সেটা হতে পারে ২/৩ বছর পরে . কিন্তু আমার আম্মুর চিন্তা ভাবনাকি সঠিক নাকি ভুল . এবং আমাদের দিকদিয়ে কোনটা সঠিক হবে ,দয়াকরে পরামর্শ দেবেন .
Answer
বিয়ে ও চাকরির প্রসঙ্গে ইসলামী পরামর্শ
উত্তর: ওয়ালাইকুমুস সালাম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ।
আপনার প্রশ্নের জন্য ধন্যবাদ। আপনার পারিবারিক পরিস্থিতি বুঝতে পেরে সহানুভূতি প্রকাশ করছি। আপনার ভাই অনার্স ৩য় বর্ষে পড়াশোনা করছেন এবং টিউশনি করে সংসার চালাচ্ছেন—এটি সত্যিই প্রশংসনীয়।
ইসলামী দৃষ্টিতে বিয়ের গুরুত্ব
রাসূলুল্লাহ (সা.) বিয়েকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়েছেন এবং যুবকদের দ্রুত বিয়ে করতে উৎসাহিত করেছেন। হাদিসে এসেছে:
"হে যুবক সম্প্রদায়! তোমাদের মধ্যে যারা সামর্থ্যবান, তারা যেন বিয়ে করে নেয়। কারণ বিয়ে দৃষ্টি অবনত রাখে এবং লজ্জাস্থানের হিফাজত করে।" (সহিহ বুখারী: ৫০৬৫, সহিহ মুসলিম: ১৪০০)
সামর্থ্যের সংজ্ঞা
ইসলামী ফিকহে বিয়ের সামর্থ্য বলতে মূলত নারীকে মোহর আদায় করার সামর্থ্য এবং স্ত্রীর ভরণপোষণের সামর্থ্য বোঝানো হয়েছে। তবে এর অর্থ এই নয় যে, বিয়ের আগে চাকরি বা স্থায়ী আয় থাকতেই হবে।
ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর মতে, যে ব্যক্তি নিজের এবং স্ত্রীর মৌলিক প্রয়োজন মেটাতে সক্ষম, তার জন্য বিয়ে করা বৈধ এবং উত্তম। (রদ্দুল মুহতার: ৩/১৩)
আপনার আম্মুর চিন্তা-ভাবনা সম্পর্কে
আপনার আম্মুর চিন্তা-ভাবনা সম্পূর্ণ ভুল নয়। একজন মা হিসেবে তিনি চান তার ছেলের ভবিষ্যৎ নিরাপদ হোক এবং সংসার চালাতে সক্ষম হোক। তবে কিছু বিষয় বিবেচনা করা উচিত:
১. বিলম্বের ঝুঁকি: বিয়ে ২/৩ বছর পিছিয়ে দিলে যুবকদের জন্য ফিতনার ঝুঁকি বেড়ে যায়। হাদিসে বিলম্বের ব্যাপারে সতর্ক করা হয়েছে।
২. রিজিকের মালিক আল্লাহ: আল্লাহ তাআলা বলেন, "তোমাদের মধ্যে যারা অবিবাহিত তাদের বিয়ে দাও... তারা অভাবী হলে আল্লাহ নিজ অনুগ্রহে তাদের অভাবমুক্ত করে দেবেন।" (সূরা আন-নূর: ৩২)
৩. টিউশনির আয়: আপনার ভাই বর্তমানে টিউশনি করে সংসার চালাচ্ছেন, যা প্রমাণ করে তিনি দায়িত্বশীল এবং আয়ের কিছু উৎস তার আছে। স্থায়ী চাকরি না থাকলেও বর্তমান আয় দিয়ে যদি তিনি স্ত্রীর মৌলিক প্রয়োজন মেটাতে পারেন, তাহলে বিয়ে করা যেতে পারে।
ফিকহী দৃষ্টিভঙ্গি
হানাফী ফিকহের প্রসিদ্ধ গ্রন্থ আল-হিদায়াহ-তে উল্লেখ আছে:
"বিয়ের জন্য সামর্থ্য হলো মোহর আদায়ের সামর্থ্য এবং স্ত্রীর ভরণপোষণের সামর্থ্য। তবে এর জন্য নির্ধারিত কোনো পরিমাণ নেই; এটি ব্যক্তির অবস্থা অনুযায়ী বিবেচিত হবে।"
ফাতাওয়া হিন্দিয়া (আলমগীরি)-তেও বলা হয়েছে যে, যে ব্যক্তি হালাল উপায়ে জীবিকা অর্জন করতে পারে এবং স্ত্রীর মৌলিক চাহিদা পূরণে সক্ষম, তার জন্য বিয়ে করা জায়েয।
ব্যবহারিক পরামর্শ
১. বিয়েতে বিলম্ব না করাই উত্তম: যদি আপনার ভাই বর্তমানে টিউশনি থেকে এমন আয় করতে পারেন যা দিয়ে তিনি স্ত্রীর মৌলিক প্রয়োজন মেটাতে পারবেন, তাহলে বিয়ে দেওয়া যেতে পারে। তবে খরচ কমাতে সহজ শর্তে (সাধারণ মোহর, সাধারণ দাওয়াত) বিয়ের ব্যবস্থা করা উচিত।
২. চাকরির অপেক্ষা না করে বর্তমান অবস্থাতেই বিয়ে: অনেক সময় চাকরির অপেক্ষায় বিয়ে পিছিয়ে দিলে বয়স বেড়ে যায় এবং ভালো পাত্র/পাত্রী পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। বর্তমান আয় দিয়ে যদি সংসার চালানো সম্ভব হয়, তাহলে বিলম্ব না করাই ভালো।
৩. আম্মুর সাথে আলোচনা: আপনার আম্মুর সাথে ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে বিষয়টি বোঝানোর চেষ্টা করুন। তাকে বলুন যে, ইসলাম বিয়েকে উৎসাহিত করেছে এবং রিজিকের মালিক আল্লাহ। চাকরির পর বিয়ের অপেক্ষা করলে ফিতনার আশঙ্কা থাকে।
৪. সহজ বিয়ের ব্যবস্থা: বিয়ের খরচ কমিয়ে (সাধারণ মোহর, অল্প আয়োজনে দাওয়াত) বর্তমান আয়েই বিয়ের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, "সর্বোত্তম বিয়ে হলো যার খরচ কম।" (সুনানে আবু দাউদ: ২১১৭)
৫. দ্বীনদার পাত্রী নির্বাচন: এমন পাত্রী নির্বাচন করুন যিনি সচ্ছলতা না থাকলেও ধৈর্য ধরতে পারবেন এবং সহজভাবে জীবনযাপনে রাজি হবেন। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, "নারীকে চারটি বিষয়ে দেখে বিয়ে করা হয়... তুমি দ্বীনদারকে অগ্রাধিকার দাও।" (সহিহ বুখারী: ৫০৯০)
সংক্ষিপ্ত উত্তর
আপনার আম্মুর চিন্তা-ভাবনা সম্পূর্ণ ভুল নয়, তবে ইসলামী দৃষ্টিতে বর্তমান অবস্থাতেই বিয়ে দেওয়া উত্তম। যদি আপনার ভাই বর্তমান টিউশনির আয় দিয়ে স্ত্রীর মৌলিক প্রয়োজন মেটাতে পারেন, তাহলে চাকরির অপেক্ষা না করে বর্তমানেই বিয়ের ব্যবস্থা করা উচিত। তবে বিয়ের খরচ সহজ রাখতে হবে এবং দ্বীনদার পাত্রী নির্বাচন করতে হবে। আল্লাহ তাআলা রিজিকের মালিক, তিনি চাকরি না থাকলেও হালাল উপায়ে রিজিকের ব্যবস্থা করবেন।
আল্লাহ তাআলা আপনার পরিবারের উপর রহম করুন এবং আপনার ভাইয়ের জন্য উত্তম পাত্রী ও উত্তম রিজিকের ব্যবস্থা করুন। আমিন।