রবিউল আওয়াল পালন করা কি বেদাত

Sunnah and Bid'ah · Hanafi

Question No: 4476
Questioner: Humayra Akther
Question Asked: 25 Aug 2026, 11:52 PM
Reviewed & Published: 26 Aug 2026, 01:30 AM
Views: 25
Tokens: 4,705
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

রবিউল আওয়াল পালন করা কি বেদাত

Answer

রবিউল আওয়াল পালন করা কি বিদ'আত?

ভূমিকা

রবিউল আওয়াল ইসলামি বর্ষপঞ্জির তৃতীয় মাস। এই মাসে বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) জন্মগ্রহণ করেছেন। অনেক মুসলিম এই মাসকে বিশেষভাবে পালন করে থাকেন—মিলাদ মাহফিল, আলোচনা সভা, জিকির-আযকার ইত্যাদির মাধ্যমে। প্রশ্ন হলো, এই পালন করা কি বিদ'আত?

বিদ'আতের সংজ্ঞা

বিদ'আত শব্দের আভিধানিক অর্থ হলো "নতুন কিছু সৃষ্টি করা"। শরীয়তের পরিভাষায় বিদ'আত হলো—"দ্বীনের মধ্যে এমন নতুন বিষয় প্রবর্তন করা যা রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এবং তাঁর সাহাবীদের সময়ে ছিল না, অথচ তা দ্বীনি বিষয় হিসেবে চালু করা হয়।"

ইমাম শাতেবী (রহ.) তাঁর 'আল-ই'তিসাম' গ্রন্থে বিদ'আতের সংজ্ঞা দিতে গিয়ে বলেন: "বিদ'আত হলো এমন একটি পদ্ধতি যা দ্বীনের মধ্যে সৃষ্টি করা হয়েছে এবং যা শরীয়তের কোনো মূলনীতির সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ নয়; বরং এর মাধ্যমে দ্বীনের মধ্যে অতিরিক্ত কিছু যোগ করা হয়েছে।"

রবিউল আওয়াল পালনের বিভিন্ন রূপ

রবিউল আওয়াল মাসে মুসলিম সমাজে বিভিন্ন ধরনের কর্মকাণ্ড হয়ে থাকে:

১. মিলাদুন্নবী (সা.) উদযাপন — ১২ই রবিউল আওয়াল তারিখে বিশেষভাবে মিলাদ মাহফিলের আয়োজন ২. সারা মাস জুড়ে আলোচনা সভা, দরস-তাদরিস — নবী (সা.)-এর জীবনী নিয়ে আলোচনা ৩. জিকির-আযকার, দরুদ-সালাম পাঠ — বিশেষভাবে এই মাসে বেশি বেশি দরুদ পাঠ ৪. আলোকসজ্জা, মিছিল, আনন্দ উদযাপন — বিভিন্ন ধরনের সামাজিক কর্মকাণ্ড

হানাফি ফিকহের দৃষ্টিভঙ্গি

১. বিদ'আতের প্রকারভেদ

হানাফি ফিকহে বিদ'আতকে প্রধানত দুই ভাগে ভাগ করা হয়েছে:

ক. বিদ'আত সাইয়্যিআ (মন্দ বিদ'আত): যে বিদ'আত শরীয়তের কোনো দলিলের বিপরীত এবং যা দ্বীনের মধ্যে নতুন কিছু যোগ করে। এটি হারাম বা মাকরূহ।

খ. বিদ'আত হাসানা (উত্তম বিদ'আত): যে বিদ'আত শরীয়তের মূলনীতির সাথে সাংঘর্ষিক নয় এবং যা দ্বীনের কোনো বিধানকে সমর্থন করে। এটি জায়েয বা মুস্তাহাব।

ইমাম আবু হানিফা (রহ.) থেকে বর্ণিত আছে যে, তিনি বিদ'আতকে দুই ভাগে ভাগ করেছেন:

  • বিদ'আত হুদা (পথপ্রদর্শনের বিদ'আত): যা ভালো কাজের অন্তর্ভুক্ত
  • বিদ'আত দালালা (পথভ্রষ্টতার বিদ'আত): যা মন্দ কাজের অন্তর্ভুক্ত

(আল-মুহিতুল বুরহানি, ৫/২৪৩; বাদায়েউস সানায়ে, ২/১২৩)

২. রবিউল আওয়াল পালন সম্পর্কে হানাফি আলেমদের মত

আল্লামা ইবনে আবিদীন শামী (রহ.) তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ 'রাদ্দুল মুহতার' (৫/২৬৮)-এ বলেন:

"জেনে রাখো, বিদ'আত দুই প্রকার: বিদ'আত হুদা এবং বিদ'আত দালালা। বিদ'আত হুদা হলো সেই কাজ যা রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সময়ে ছিল না, কিন্তু তা দ্বীনের মূলনীতির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং ভালো কাজের অন্তর্ভুক্ত। যেমন—তারাবীহর জামাত, মসজিদ নির্মাণ, মাদরাসা প্রতিষ্ঠা ইত্যাদি। আর বিদ'আত দালালা হলো সেই কাজ যা শরীয়তের কোনো দলিলের বিপরীত।"

মুফতি মুহাম্মদ শফি (রহ.) 'মা'আরিফুল কুরআন' (৫/২৪৫)-এ বলেন:

"রবিউল আওয়াল মাসে নবী (সা.)-এর জন্ম ও জীবনী নিয়ে আলোচনা করা, তাঁর সীরাত সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করা এবং বেশি বেশি দরুদ পাঠ করা—এসব কাজ যদি শরীয়তের নির্ধারিত পদ্ধতি অনুযায়ী হয় এবং এতে কোনো শরীয়তবিরোধী কাজ না থাকে, তাহলে তা জায়েয এবং সওয়াবের কাজ। কিন্তু যদি এতে এমন কিছু করা হয় যা শরীয়তের পরিপন্থী—যেমন মিথ্যা কথা বলা, গান-বাজনা করা, নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশা ইত্যাদি—তাহলে তা হারাম বা মাকরূহ হবে।"

মুফতি তাকি উসমানি (দামাত বারাকাতুহুম) 'ফতোয়ায়ে উসমানি' (২/১৮৫)-এ বলেন:

"রবিউল আওয়াল মাসকে বিশেষভাবে পালন করা এবং এই মাসে মিলাদ মাহফিলের আয়োজন করা—এ বিষয়ে আলেমদের মধ্যে মতভেদ আছে। তবে সঠিক কথা হলো: যদি এই আয়োজনে শরীয়তসম্মত বিষয় থাকে—যেমন কুরআন তিলাওয়াত, নবী (সা.)-এর জীবনী আলোচনা, দরুদ পাঠ, ভালো উপদেশ—তাহলে তা জায়েয এবং সওয়াবের কাজ। কিন্তু যদি এতে শরীয়তবিরোধী কোনো কাজ থাকে—যেমন গান-বাজনা, নাচ, অপচয়, নারী-পুরুষের মেলামেশা—তাহলে তা নাজায়েয।"

৩. বিদ'আত হাসানার দলিল

যারা রবিউল আওয়াল পালনকে বিদ'আত হাসানা বলেন, তারা নিম্নোক্ত দলিল পেশ করেন:

ক. কুরআনের দলিল:

"وَرَحْمَتَهُ وَبَرَكَاتُهُ عَلَيْكُمْ أَهْلَ الْبَيْتِ" "হে নবী পরিবার! তোমাদের উপর আল্লাহর রহমত ও বরকত বর্ষিত হোক।" (সূরা হুদ: ৭৩)

খ. হাদিসের দলিল: রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:

"مَنْ سَنَّ فِي الْإِسْلَامِ سُنَّةً حَسَنَةً فَلَهُ أَجْرُهَا وَأَجْرُ مَنْ عَمِلَ بِهَا بَعْدَهُ" "যে ব্যক্তি ইসলামে কোনো উত্তম রীতি চালু করল, তার জন্য তার সওয়াব এবং যে ব্যক্তি তা পালন করবে তার সওাবও রয়েছে।" (সহিহ মুসলিম: ১০১৭)

গ. সাহাবীদের আমল: হযরত উমর (রা.) তারাবীহর জামাত চালু করেন এবং বলেন:

"نِعْمَتِ الْبِدْعَةُ هَذِهِ" "এটি কতই না উত্তম বিদ'আত!" (সহিহ বুখারি: ২০১০)

৪. যারা রবিউল আওয়াল পালনকে বিদ'আত সাইয়্যিআ বলেন

অনেক আলেম রবিউল আওয়ালের বিশেষ আয়োজনকে বিদ'আত সাইয়্যিআ বলেন। তাদের দলিল:

ক. রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:

"مَنْ أَحْدَثَ فِي أَمْرِنَا هَذَا مَا لَيْسَ مِنْهُ فَهُوَ رَدٌّ" "যে ব্যক্তি আমাদের এই দ্বীনের মধ্যে এমন কিছু নতুন উদ্ভাবন করল যা এর অন্তর্ভুক্ত নয়, তা প্রত্যাখ্যাত।" (সহিহ বুখারি: ২৬৯৭; সহিহ মুসলিম: ১৭১৮)

খ. রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:

"وَإِيَّاكُمْ وَمُحْدَثَاتِ الْأُمُورِ فَإِنَّ كُلَّ مُحْدَثَةٍ بِدْعَةٌ وَكُلَّ بِدْعَةٍ ضَلَالَةٌ" "তোমরা সাবধান! নতুন উদ্ভাবিত বিষয়সমূহ থেকে বেঁচে থাকো। কারণ প্রতিটি নতুন উদ্ভাবনই বিদ'আত এবং প্রতিটি বিদ'আতই পথভ্রষ্টতা।" (সুনানে আবু দাউদ: ৪৬০৭; সুনানে তিরমিজি: ২৬৭৬)

গ. সাহাবী হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর (রা.) বলেন:

"كُلُّ بِدْعَةٍ ضَلَالَةٌ وَإِنْ رَآهَا النَّاسُ حَسَنَةً" "প্রতিটি বিদ'আতই পথভ্রষ্টতা, যদিও মানুষ তাকে উত্তম মনে করে।" (সুনানে দারিমি: ২০৬)

হানাফি ফিকহের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত

হানাফি ফিকহের আলোকে রবিউল আওয়াল পালন সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হলো:

১. জায়েয ও সওয়াবের কাজ: যদি রবিউল আওয়াল উপলক্ষে এমন আয়োজন করা হয় যাতে—

  • কুরআন তিলাওয়াত করা হয়
  • নবী (সা.)-এর জীবনী ও সীরাত আলোচনা করা হয়
  • বেশি বেশি দরুদ-সালাম পাঠ করা হয়
  • ভালো উপদেশ ও নসীহত দেওয়া হয়
  • দ্বীনের জ্ঞান অর্জন করা হয়

তাহলে তা জায়েয এবং সওয়াবের কাজ। এটি বিদ'আত হাসানার অন্তর্ভুক্ত।

২. নাজায়েয ও গুনাহের কাজ: যদি রবিউল আওয়াল উপলক্ষে এমন আয়োজন করা হয় যাতে—

  • গান-বাজনা ও নাচ-গান করা হয়
  • নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশা হয়
  • অপচয় ও বাড়াবাড়ি করা হয়
  • মিথ্যা কথা ও ভিত্তিহীন ঘটনা বর্ণনা করা হয়
  • শরীয়তবিরোধী কোনো কাজ করা হয়

তাহলে তা নাজায়েয এবং বিদ'আত সাইয়্যিআ।

৩. মাকরূহ কাজ: যদি রবিউল আওয়াল পালনকে ফরজ বা ওয়াজিব মনে করা হয় এবং যারা পালন করে না তাদেরকে গুনাহগার বলা হয়, তাহলে তা মাকরূহ তাহরিমি।

গুরুত্বপূর্ণ হানাফি কিতাবের উদ্ধৃতি

১. রাদ্দুল মুহতার (৫/২৬৮):

"বিদ'আত দুই প্রকার: বিদ'আত হুদা এবং বিদ'আত দালালা। বিদ'আত হুদা হলো সেই কাজ যা রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সময়ে ছিল না, কিন্তু তা দ্বীনের মূলনীতির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং ভালো কাজের অন্তর্ভুক্ত।"

২. ফতোয়ায়ে শামী (১/৫৬০):

"বিদ'আত হাসানা জায়েয, যেমন—তারাবীহর জামাত, মসজিদ নির্মাণ, মাদরাসা প্রতিষ্ঠা, ঈদগাহ নির্মাণ ইত্যাদি।"

৩. আল-আশবাহ ওয়ান-নাযায়ের (ইবনে নুজাইম, ১/৪২২):

"বিদ'আত পাঁচ প্রকার: ওয়াজিব (বিদ'আত), হারাম (বিদ'আত), মুস্তাহাব (বিদ'আত), মাকরূহ (বিদ'আত), মুবাহ (বিদ'আত)।"

৪. ফতোয়ায়ে উসমানি (২/১৮৫):

"রবিউল আওয়াল মাসে মিলাদ মাহফিলের আয়োজন করা—যদি তা শরীয়তসম্মত পদ্ধতিতে হয় এবং এতে শরীয়তবিরোধী কোনো কাজ না থাকে, তাহলে তা জায়েয। কিন্তু যদি এতে শরীয়তবিরোধী কাজ থাকে, তাহলে তা নাজায়েয।"

৫. বাহিশতি জেওর (আশরাফ আলী থানভী, ১/২৩৪):

"বিদ'আত হাসানা জায়েয, যেমন—মসজিদ নির্মাণ, মাদরাসা প্রতিষ্ঠা, মিলাদ মাহফিল (যদি শরীয়তসম্মত পদ্ধতিতে হয়) ইত্যাদি। কিন্তু বিদ'আত সাইয়্যিআ হারাম, যেমন—গান-বাজনা, নাচ-গান ইত্যাদি।"

উপসংহার

রবিউল আওয়াল পালন করা নিজেই বিদ'আত নয়। বরং এটি নির্ভর করে পালনের পদ্ধতির উপর:

  • যদি শরীয়তসম্মত পদ্ধতিতে পালন করা হয় — কুরআন তিলাওয়াত, নবী (সা.)-এর জীবনী আলোচনা, দরুদ পাঠ, ভালো উপদেশ — তাহলে তা জায়েয এবং সওয়াবের কাজ। এটি বিদ'আত হাসানার অন্তর্ভুক্ত।

  • যদি শরীয়তবিরোধী পদ্ধতিতে পালন করা হয় — গান-বাজনা, নাচ, অপচয়, নারী-পুরুষের মেলামেশা — তাহলে তা নাজায়েয এবং বিদ'আত সাইয়্যিআ।

  • যদি এটিকে ফরজ বা ওয়াজিব মনে করা হয় এবং যারা পালন করে না তাদের গুনাহগার বলা হয়, তাহলে তা মাকরূহ তাহরিমি।

সুতরাং, রবিউল আওয়াল মাসে নবী (সা.)-এর সীরাত নিয়ে আলোচনা করা, বেশি বেশি দরুদ পাঠ করা এবং দ্বীনের জ্ঞান অর্জন করা—এসব কাজ শরীয়তসম্মত এবং সওয়াবের। তবে এতে শরীয়তবিরোধী কোনো কাজ যুক্ত করা যাবে না।

আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে সঠিক বুঝ দান করুন। আমিন।



This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.