রাগে মুক্ত করে দিলাম বললে কি তালাক হয়? গেলে চিরজীবনের জন্য যাবে বললে কি তালাক হয়?
Marriage and Divorce · Hanafi
Question
আমাদের আগে দুইটা তালাক হয়ে গেছে। এখন তাই বেশ কিছু বিষয় নিয়ে সংশয়ে আছি।
ঘটনা -১:বাবার বাড়িতে বেশ কিছু ছাত্র ছাত্রী পড়াতে চাইলে না করে। জোরাজোরি করলে কথার এক পর্যায়ে রেগে বলে, তোমাকে মুক্ত করে দিলাম। যেখানে খুশি জাও। এখানে থাকতে পারবে না। তালাকের উদ্দেশ্য না থাকলে রেগে এ ধরনের কথা দ্বারা তালাক পতিত হবে কি?
ঘটনা -২: বাসায় মেহমান আসবে।কোন কারণে মেহমান আসার আগে বাপের বাড়ি চলে যেতে চাইলে বলে, গেলে চিরজীবন এর জন্য যাবে। হাত পা ধুয়ে যাবে। এখন স্বাভাবিক অবস্থায় অনুমতি নিয়ে যাওয়া যাবে কি?
ঘটনা -৩: ঐ দিন ঐ মেহমান এর সামনে যেতে রাজি না হলে বলে,বাপের বাড়ি গেলে চির জীবনের জন্য যাবে। আমার অনুমতি ছাড়া গেলে চির জীবনের জন্য যাবে। এখন অ
নুমতি নিয়ে যাওয়া যাবে কি?
Answer
উত্তর: وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
আপনার প্রশ্নটি তিনটি ঘটনা সম্পর্কে। আমি প্রতিটি ঘটনা পৃথকভাবে বিশ্লেষন করে উত্তর দিচ্ছি।
ঘটনা-১ এর শরয়ী সমাধান:
আপনার স্বামী যদি তালাক দেওয়ার উদ্দেশ্য বা নিয়ত ছাড়া রাগের মাথায় আপনাকে বলেন— "তোমাকে মুক্ত করে দিলাম, যেখানে খুশি যাও, এখানে থাকতে পারবে না"—তবে এর দ্বারা কোনো তালাক পতিত হয়নি।
- শরয়ী কারণ: "মুক্ত করে দেওয়া" বা "যেখানে খুশি যাওয়া" শব্দগুলো তালাকের স্পষ্ট শব্দ নয়, বরং 'কিনায়া' বা অস্পষ্ট শব্দ। হানাফী ফিকহের অকাট্য নিয়ম অনুযায়ী, কিনায়া শব্দে তালাক কার্যকর হওয়ার জন্য স্বামীর তালাক দেওয়ার সুনির্দিষ্ট নিয়ত থাকা বাধ্যতামূলক শর্ত। যেহেতু স্বামীর কোনো নিয়ত ছিল না, তাই আপনাদের বৈবাহিক সম্পর্কের কোনো ক্ষতি হয়নি ।
- সূত্র:
- ফাতাওয়ায়ে হিন্দিয়া (আলমগীরী): ১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৩৭৪ (কিতাবুত তালাক, আল-বাবুত ছামিন ফিল কিনায়াত)।
- ফাতাওয়া মাহমুদিয়া: ১৩শ খণ্ড, পৃষ্ঠা ৮৫ (তালাক অধ্যায়, অস্পষ্ট শব্দের বিবরণ)।
ঘটনা-২ ও ৩ এর শরয়ী সমাধান:
উক্ত ঘটনার দিন মেহমান আসার সময় স্বামী রাগের মাথায় যে বলেছিলেন— "গেলে চিরজীবনের জন্য যাবে" এবং "অনুমতি ছাড়া গেলে চিরজীবনের জন্য যাবে"—এমতাবস্থায় এখন স্বাভাবিক অবস্থায় স্বামীর অনুমতি নিয়ে বাপের বাড়ি গেলে কোনো তালাক পতিত হবে না। দাম্পত্য সম্পর্ক সম্পূর্ণ নিরাপদ থাকবে।
- শরয়ী কারণ:
- স্বামী রাগের মাথায় তাৎক্ষণিক মেহমান আসার পরিস্থিতিকে কেন্দ্র করে এই নিষেধাজ্ঞা দিয়েছিলেন। ফিকহের পরিভাষায় একে "ইয়ামিনে ফাওর" (তাত্ক্ষণিক পরিস্থিতিভিত্তিক কসম) বলা হয়। মেহমান চলে যাওয়ার পর সেই বিশেষ পরিস্থিতি শেষ হয়ে যাওয়ায় এই নিষেধাজ্ঞার কার্যকারিতাও সমাপ্ত হয়ে গেছে। তাই পরবর্তীতে অনুমতি নিয়ে গেলে কোনো তালাক হবে না।
- তাছাড়া ঘটনা-৩ এ স্বামী নিজেই শর্ত জুড়ে দিয়েছেন— "অনুমতি ছাড়া গেলে চিরজীবনের জন্য যাবে"। সুতরাং আপনি যখন স্বামীর অনুমতি নিয়ে যাবেন, তখন শর্ত ভঙ্গ হবে না, ফলে কোনো তালাক পতিত হওয়ার প্রশ্নই আসে না।
- সূত্র:
- ফাতাওয়া মাহমুদিয়া: ১৩ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ১০৮ (অধ্যায়: বাবে তা'লীকে তালাক, "বিবি বাপের বাড়ি চলে গেলে তালাক" সংক্রান্ত মাসআলা) [ মাহমুদিয়া, ১৩ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ১০৮ ।
- ফাতাওয়ায়ে হিন্দিয়া (আলমগীরী): ২য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ৪১৫-৪১৬ (কিতাবুল ঈমান, ইয়ামিনে ফাওর তথা তৎকালীন রাগ ও পরিস্থিতির কসম পরিচ্ছেদ)
চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত: পূর্বের দুটি তালাকের পর আপনাদের বৈবাহিক সম্পর্ক নিয়ে যে সংশয় তৈরি হয়েছিল, তা থেকে আপনারা সম্পূর্ণ নিরাপদ আছেন। আপনাদের বর্তমান বিবাহে কোনো সমস্যা হয়নি।
দাম্পত্য জীবনে শয়তানি ওয়াসওয়াসা ও অহেতুক তালাকের ভয় থেকে মনকে শান্ত রাখতে নিয়মিত সকালে ও সন্ধ্যায় তিনবার করে "আউযুবিল্লাহি মিনাশ শাইতানির রাজীম" পাঠ করে বুকে ফু দিয়ে নেবেন।
বিশেষ দ্রষ্টব্য: যেহেতু বিষয়টি অত্যন্ত স্পর্শকাতর এবং আপনার পূর্বের দুই তালাকের বিবরণ আমাদের জানা নেই, তাই অনুগ্রহ করে আপনার এলাকার কোনো বিশ্বস্ত মুফতির কাছে সরাসরি গিয়ে বিস্তারিত বলুন এবং তার নির্দেশনা নিন। কারণ তালাকের বিষয়ে প্রতিটি ঘটনার প্রেক্ষাপট ও নিয়ত গুরুত্বপূর্ণ।
আল্লাহই সর্বজ্ঞ।