স্ত্রীকে প্রদত্ত তালাকের অধিকার প্রত্যাহার করা যাবে কি? তালাকে বায়েনের পর পুনর্বিবাহের সময় কাজী বা ইমাম সাহেব কি সাক্ষী হতে পারবে?
Marriage and Divorce · Hanafi
Question
আর ১তালাকে বায়েন হলে এক্ষেত্রে স্বামী স্ত্রী উভয়ের উপস্থিতিতে ১জন হুজুর যদি বিয়ে পড়ান আর আরেকজন পুরুষ উপস্থিত থাকেন বিয়ে কি হবে?নাকি তখন হুজুরকে সাক্ষী হিসেবে ধরা যাবেনা আলাদা আরেকজন সাক্ষী লাগবে?
Answer
খুলা তালাক ও বিবাহের সাক্ষী সংক্রান্ত উত্তর
প্রশ্নের সারসংক্ষেপ
১. স্ত্রী আদালতের মাধ্যমে খুলা তালাক নেননি, বরং স্বামী পূর্বে স্ত্রীকে তালাকের অনুমতি দিয়েছিলেন। পরে স্বামী তা অস্বীকার করেছেন এবং স্ত্রীকে তালাক নিতে নিষেধ করেছেন। এখন জানতে চাওয়া হয়েছে—স্বামীর এই নিষেধ সত্ত্বেও স্ত্রী তালাক নিলে তা কি কার্যকর হবে? এবং কয়টি তালাক হবে?
২. এক তালাকে বায়েন হওয়ার পর পুনরায় বিবাহের ক্ষেত্রে—স্বামী-স্ত্রী উভয়ের উপস্থিতিতে ১ জন হুজুর (ইমাম/কাজী) বিয়ে পড়ালে এবং আরেকজন পুরুষ উপস্থিত থাকলে বিবাহ কি শুদ্ধ হবে? নাকি হুজুরকে সাক্ষী হিসেবে ধরা যাবে না এবং আলাদা আরেকজন সাক্ষী লাগবে?
প্রথম অংশের উত্তর: স্ত্রীকে প্রদত্ত তালাকের অধিকার ও তা প্রত্যাহার
মূলনীতি
১ম প্রশ্নের উত্তর: স্বামীর নিষেধ সত্ত্বেও তাফবীযে তালাক কার্যকর হওয়া এবং তালাকের সংখ্যা
- স্বামীর নিষেধের শরয়ী কার্যকারিতা নেই: হানাফী ফিকহের অকাট্য মূলনীতি অনুযায়ী, স্বামী যদি পূর্বে স্ত্রীকে তালাক গ্রহণের ক্ষমতা (তাফবীযে তালাক) অর্পণ করে থাকেন, তবে পরবর্তীতে স্বামী তা প্রত্যাহার করার বা ফেরত নেওয়ার অধিকার শরীয়তসম্মতভাবে হারিয়ে ফেলেন। ফিকহের পরিভাষায় একে বলা হয়— "লা ইয়ামলিকুর রাজুউ আনিত তাফউইয" (স্বামী তাফবীয বা ক্ষমতা অর্পণ করার পর তা প্রত্যাহার করার মালিক থাকে না)। অতএব, পরবর্তীতে স্বামীর তা অস্বীকার করা এবং স্ত্রীকে তালাক নিতে নিষেধ করা শরীয়তের দৃষ্টিতে সম্পূর্ণ অকার্যকর ও বাতিল।
- তালাক কার্যকর হওয়া: স্বামীর এই নিষেধ সত্ত্বেও স্ত্রী যদি তার তাফবীযে তালাকের ক্ষমতা প্রয়োগ করে নিজের নফসের ওপর তালাক গ্রহণ করেন, তবে তালাক নিশ্চিতভাবে কার্যকর হয়ে যাবে। স্বামীর নিষেধাজ্ঞা বা অসম্মতি এতে বিন্দুমাত্র বাধা সৃষ্টি করতে পারবে না।
- তালাকের সংখ্যা: কাবিননামার শর্ত সাপেক্ষে স্ত্রী যদি নিজের ওপর তালাক গ্রহণ করেন, তবে সাধারণ অবস্থায় এর দ্বারা ১টি তালাকে বায়েন পতিত হবে। তবে কাবিননামায় বা ক্ষমতা দেওয়ার সময় স্বামী যদি নির্দিষ্ট কোনো শর্ত বা সংখ্যার (যেমন ৩টি) ক্ষমতা দিয়ে থাকেন এবং স্ত্রী সেই অনুযায়ী নিজের ওপর ৩টি তালাকই গ্রহণ করেন, তবে ৩টি তালাক পতিত হবে; অন্যথায় ১টি তালাকে বায়েনই কার্যকর হবে।
- সূত্র
- দরসুল ফিকহ, ২য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ১৫৩ (তাফবীযে তালাক অধ্যায়— 'আদ্দুররুল মুখতার' ও 'ফাতাওয়ায়ে শামী' এর বরাতে)।
- দরসুল ফিকহ, ১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ২৭০-২৭২ (কাবিননামায় তাফবীযে তালাক ও সই করার শরয়ী বিধান পরিচ্ছেদ)।
- ফাতাওয়ায়ে হিন্দিয়া (আলমগীরী), ১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৩৭৪ (কিতাবুত তালাক, আল-বাবুত ছামিন ফিল কিনায়াত)।
২য় প্রশ্নের উত্তর: তালাকে বায়েনের পর পুনরায় বিবাহের ক্ষেত্রে ইমাম/কাজী সাক্ষী হতে পারবেন কি না
- পুনরায় বিবাহ সম্পন্ন করার নিয়ম: এক তালাকে বায়েন হওয়ার পর স্বামী-স্ত্রী যদি পুনরায় দাম্পত্য জীবন শুরু করতে চান, তবে শরীয়তের নিয়ম অনুযায়ী নতুন করে মোহরানা নির্ধারণ করে পুনরায় নতুন আকদ (বিবাহ) সম্পন্ন করা আবশ্যক।
- সাক্ষীর সাধারণ শর্ত: হানাফী ফিকহ অনুযায়ী বিবাহ সহীহ হওয়ার জন্য কমপক্ষে দুইজন স্বাধীন, বিবেকবান, প্রাপ্তবয়স্ক ও মুসলমান পুরুষ সাক্ষী (অথবা একজন পুরুষ ও দুইজন নারী সাক্ষী) স্বশরীরে উপস্থিত থাকা এবং একই মজলিসে সরাসরি ইজাব-কবুল শ্রবণ করা ও বোঝা বাধ্যতামূলক শর্ত।
- ইমাম/কাজী সাহেবের সাক্ষী হওয়ার শরয়ী ফয়সালা:
- যদি ইমাম/কাজী সাহেব কোনো এক পক্ষের 'উকিল' (প্রতিনিধি) না হন: বিবাহ পড়ানোর সময় ইমাম বা কাজী সাহেব যদি বর বা কনে কোনো পক্ষের প্রতিনিধি বা উকিল নিযুক্ত না হয়ে থাকেন, বরং তিনি কেবল বিবাহ পরিচালনাকারী বা পড়ানোর ভূমিকা পালন করেন; এমতাবস্থায় তিনি যদি সরাসরি ইজাব ও কবুল নিজের কানে শোনেন এবং বোঝেন, তবে শরীয়তের দৃষ্টিতে তিনি নিজেই একজন নির্ভরযোগ্য সাক্ষী হিসেবে গণ্য হবেন।
- সিদ্ধান্ত: কাজী সাহেব নিজেই যেহেতু একজন সাক্ষী, সেহেতু বিবাহ মজলিসে কাজী সাহেব ছাড়া আর মাত্র ১ জন প্রাপ্তবয়স্ক মুসলমান পুরুষ সাক্ষী উপস্থিত থাকলে এবং তারা উভয়ে ইজাব-কবুল শুনলে বিবাহটি সম্পূর্ণ সহীহ ও শুদ্ধ হয়ে যাবে। আলাদাভাবে আরও একজন সাক্ষী আনার প্রয়োজন নেই।
- যদি ইমাম/কাজী সাহেব নিজেই কোনো এক পক্ষের 'উকিল' (প্রতিনিধি) হন: কাজী সাহেব নিজেই যদি কনে বা বরের পক্ষ থেকে সই বা ইজাব-কবুল করার উকিল বা প্রতিনিধি হয়ে থাকেন, তবে তিনি একই সাথে উকিল ও সাক্ষী হতে পারবেন না। এই সুরতে কাজী সাহেব ব্যতীত আলাদাভাবে অবশ্যই আরও ২ জন পুরুষ সাক্ষী উপস্থিত থাকতে হবে।
- যদি ইমাম/কাজী সাহেব কোনো এক পক্ষের 'উকিল' (প্রতিনিধি) না হন: বিবাহ পড়ানোর সময় ইমাম বা কাজী সাহেব যদি বর বা কনে কোনো পক্ষের প্রতিনিধি বা উকিল নিযুক্ত না হয়ে থাকেন, বরং তিনি কেবল বিবাহ পরিচালনাকারী বা পড়ানোর ভূমিকা পালন করেন; এমতাবস্থায় তিনি যদি সরাসরি ইজাব ও কবুল নিজের কানে শোনেন এবং বোঝেন, তবে শরীয়তের দৃষ্টিতে তিনি নিজেই একজন নির্ভরযোগ্য সাক্ষী হিসেবে গণ্য হবেন।
- সূত্র
- দরসুল ফিকহ, ২য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ১২০-১২১ (বিবাহের সাক্ষীর যোগ্যতা ও শর্তাবলী পরিচ্ছেদ— 'হেদায়া' ও 'ফাতহুল কাদীর' এর বরাতে)।
- দরসুল ফিকহ, ২য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ১৩২-১৩৪ (বিবাহে উকিল হওয়া এবং এক ব্যক্তির দুই দিক প্রতিনিধিত্ব করার মাসআলা)।
- ফাতাওয়ায়ে হিন্দিয়া (আলমগীরী), ১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ২৬৭-২৬৮ (কিতাবুন নিকাহ, আল-বাবুত থানি ফিল আকদ আশ-শুরুত)।
চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ও নসীহত: ১. স্বামীর বর্তমান নিষেধ সত্ত্বেও তাফবীযে তালাক প্রয়োগ করে স্ত্রী নিজের ওপর তালাক গ্রহণ করলে তা ১০০% কার্যকর হবে। ২. পুনরায় বিবাহ করার সময় কাজী সাহেব উকিল না হলে, কাজী সাহেব + আরও ১ জন পুরুষ সাক্ষী উপস্থিত থাকলেই আপনাদের বিবাহ শরীয়তসম্মতভাবে শুদ্ধ হয়ে যাবে। আল্লাহই ভালো জানেন।