ইসলামে পাত্রের দ্বীনদার বোঝার জন্য নিয়ম কি
Marriage and Divorce · Hanafi
Question
Answer
ইসলামে পাত্রের দ্বীনদার বোঝার জন্য নিয়ম
ভূমিকা
বিবাহ ইসলামের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিধান। ইসলাম বিবাহের ক্ষেত্রে পাত্র-পাত্রী নির্বাচনে কয়েকটি বিষয়কে প্রাধান্য দিয়েছে, যার মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো দ্বীনদারি (ধর্মপরায়ণতা)। রাসূলুল্লাহ ﷺ স্পষ্টভাবে দ্বীনদার পাত্র নির্বাচনের নির্দেশ দিয়েছেন।
কুরআন ও হাদীসের নির্দেশনা
কুরআনের নির্দেশনা
আল্লাহ তাআলা বলেন: "আর তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি স্বাধীন ঈমানদার নারীকে বিবাহ করার সামর্থ্য রাখে না, সে তোমাদের অধিকারভুক্ত ঈমানদার দাসীদেরকে বিবাহ করবে।" (সূরা আন-নিসা: ২৫)
অন্য আয়াতে আল্লাহ তাআলা বলেন: "আর তোমরা মুশরিক নারীকে বিবাহ করো না, যতক্ষণ না সে ঈমান আনে। আর একজন ঈমানদার দাসীও মুশরিক নারীর চেয়ে উত্তম, যদিও তোমাদের কাছে মুশরিক নারীটি ভালো লাগে।" (সূরা আল-বাকারা: ২২১)
হাদীসের নির্দেশনা
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: "নারীকে চারটি বিষয় দেখে বিবাহ করা হয়: তার সম্পদ, তার বংশমর্যাদা, তার সৌন্দর্য এবং তার দ্বীনদারি। তুমি দ্বীনদার নারীকে অগ্রাধিকার দাও, তোমার হাত ধুলাময় হোক।" (সহীহ বুখারী: ৫০৯০, সহীহ মুসলিম: ১৪৬৬)
অন্য হাদীসে রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: "যখন তোমাদের কাছে এমন ব্যক্তি আসে, যার দ্বীনদারি এবং চরিত্র তোমরা পছন্দ কর, তখন তাকে বিবাহ দাও। যদি তোমরা তা না কর, তবে পৃথিবীতে ফিতনা এবং বড় ধরনের বিপর্যয় ছড়িয়ে পড়বে।" (সুনানে তিরমিযী: ১০৮৪, সুনানে ইবনে মাজাহ: ১৯৬৭)
পাত্রের দ্বীনদার বোঝার নিয়ম
১. নামাযের প্রতি যত্নবান হওয়া
পাত্রের দ্বীনদারি বোঝার প্রথম ও প্রধান লক্ষণ হলো তার নামাযের প্রতি যত্নবান হওয়া। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: "আমাদের এবং তাদের (মুনাফিকদের) মধ্যে যে অঙ্গীকার রয়েছে তা হলো নামায। যে ব্যক্তি নামায ত্যাগ করল, সে কুফরী করল।" (সুনানে তিরমিযী: ২৬২১, সুনানে নাসাঈ: ৪৬৩)
পাত্র নিয়মিত পাঁচ ওয়াক্ত নামায জামাতের সাথে আদায় করে কিনা তা খোঁজ নেওয়া উচিত।
২. হালাল-হারাম সম্পর্কে সচেতনতা
পাত্রের দ্বীনদারি বোঝার জন্য তার হালাল-হারাম সম্পর্কে সচেতনতা দেখতে হবে। সে সুদ, ঘুষ, প্রতারণা, মিথ্যা ইত্যাদি থেকে বিরত থাকে কিনা তা যাচাই করা উচিত। আল্লাহ তাআলা বলেন: "হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং সত্যবাদীদের সাথে থাক।" (সূরা আত-তাওবা: ১১৯)
৩. আখলাক ও চরিত্র
পাত্রের আখলাক ও চরিত্র দ্বীনদারির গুরুত্বপূর্ণ লক্ষণ। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: "তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তি উত্তম যে চরিত্রের দিক থেকে উত্তম।" (সহীহ বুখারী: ৩৫৫৯)
পাত্রের সততা, আমানতদারিতা, দয়া, ক্ষমাশীলতা, বড়দের সম্মান এবং ছোটদের স্নেহ ইত্যাদি বিষয় লক্ষ্য করা উচিত।
৪. দ্বীনি জ্ঞান ও আমল
পাত্রের দ্বীনি জ্ঞান কতটুকু এবং সে অনুযায়ী আমল করে কিনা তা দেখা উচিত। ইমাম আবু হানীফা (রহঃ) বলেছেন: "দ্বীনদার সেই ব্যক্তি, যে দ্বীনকে জানে এবং তার উপর আমল করে।"
৫. সঙ্গ ও পরিবেশ
পাত্রের সঙ্গ ও পরিবেশ তার দ্বীনদারি সম্পর্কে ধারণা দেয়। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: "মানুষ তার বন্ধুর দ্বীনের উপর থাকে। সুতরাং তোমাদের প্রত্যেকে যেন দেখে, সে কাকে বন্ধু বানায়।" (সুনানে আবু দাউদ: ৪৮৩৩, সুনানে তিরমিযী: ২৩৭৮)
৬. পিতা-মাতার প্রতি আচরণ
পাত্র তার পিতা-মাতার সাথে কেমন আচরণ করে তা তার দ্বীনদারির গুরুত্বপূর্ণ লক্ষণ। আল্লাহ তাআলা বলেন: "আর তোমার রব আদেশ দিয়েছেন যে, তোমরা তাঁকে ছাড়া কারো ইবাদত করবে না এবং পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহার করবে।" (সূরা বনী ইসরাঈল: ২৩)
৭. রিযিকের পবিত্রতা
পাত্রের উপার্জন হালাল কিনা তা যাচাই করা উচিত। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: "যে ব্যক্তি হালাল উপার্জন করে এবং হালাল খায়, তার আমল কবুল হয় এবং তার দোয়া কবুল হয়।" (মুসনাদ আহমাদ: ২২৩৮৫)
হানাফী ফিকহের দৃষ্টিভঙ্গি
ইমাম আবু হানীফা (রহঃ)-এর মত
ইমাম আবু হানীফা (রহঃ) বলেছেন: "বিবাহের ক্ষেত্রে দ্বীনদারি এবং ভালো চরিত্রকে প্রাধান্য দেওয়া উচিত। কারণ, দ্বীনদার ও সচ্চরিত্রবান স্বামী স্ত্রীর হক আদায় করবে এবং তাকে ভালো রাখবে।"
ফাতাওয়া হিন্দিয়ায় উল্লেখ আছে
ফাতাওয়া হিন্দিয়ায় (১/২৭৯) উল্লেখ আছে যে, কন্যার অভিভাবকের জন্য কর্তব্য হলো এমন পাত্র নির্বাচন করা যে দ্বীনদার এবং সচ্চরিত্রবান। কারণ, রাসূলুল্লাহ ﷺ দ্বীনদার পাত্র নির্বাচনের নির্দেশ দিয়েছেন।
রদ্দুল মুহতার
ইমাম ইবনে আবিদীন (রহঃ) রদ্দুল মুহতারে (৩/৫৫) উল্লেখ করেছেন: "বিবাহের মূল উদ্দেশ্য হলো দ্বীন রক্ষা করা এবং সন্তান-সন্তুতি লাভ করা। তাই পাত্র নির্বাচনে দ্বীনদারিকে প্রাধান্য দেওয়া ওয়াজিব।"
পাত্রের দ্বীনদারি যাচাইয়ের ব্যবহারিক পদ্ধতি
১. পাত্রের পরিচিত ও বিশ্বস্ত লোকদের কাছ থেকে খোঁজ নেওয়া - যারা তাকে দীর্ঘদিন ধরে জানে এবং তার সাথে নিয়মিত উঠাবসা করে।
২. পাত্রের স্থানীয় মসজিদের ইমাম বা মুসল্লিদের কাছ থেকে জানা - তিনি নিয়মিত মসজিদে আসেন কিনা, নামায আদায় করেন কিনা।
৩. পাত্রের সাথে সরাসরি কথা বলা - ইসলামী শরীয়তের সীমার মধ্যে থেকে পাত্রের সাথে কথা বলে তার দ্বীনি জ্ঞান ও চিন্তাধারা বোঝার চেষ্টা করা।
৪. পাত্রের আচরণ পর্যবেক্ষণ করা - বিভিন্ন পরিস্থিতিতে তার আচরণ কেমন তা পর্যবেক্ষণ করা।
৫. ইস্তিখারা করা - পাত্র নির্বাচনের ক্ষেত্রে আল্লাহর কাছে ইস্তিখারা করা এবং আল্লাহর উপর ভরসা করা।
সতর্কতা
১. শুধু বাহ্যিক দ্বীনদারিতে সন্তুষ্ট না হওয়া - কারো বাহ্যিক চেহারা, পোশাক বা কথাবার্তা দেখে প্রতারিত হওয়া উচিত নয়। বরং তার আমল ও চরিত্র যাচাই করা উচিত।
২. অতিরিক্ত কঠোরতা না করা - দ্বীনদারি যাচাইয়ে অতিরিক্ত কঠোরতা না করে বাস্তবসম্মত দৃষ্টিভঙ্গি রাখা উচিত। কারণ, নিখুঁত মানুষ খুঁজে পাওয়া কঠিন।
৩. গোপনীয়তা রক্ষা করা - পাত্র সম্পর্কে খোঁজ নেওয়ার সময় তার গোপনীয়তা ও সম্মান রক্ষা করা উচিত।
৪. পরামর্শ করা - পরিবারের বড়দের এবং বিজ্ঞ আলেমদের সাথে পরামর্শ করা উচিত।
উপসংহার
ইসলামে পাত্রের দ্বীনদারি বোঝার জন্য উপরোক্ত নিয়মগুলো অনুসরণ করা উচিত। দ্বীনদার পাত্র নির্বাচন করা শুধু পার্থিব জীবনের জন্যই নয়, বরং আখিরাতের সাফল্যের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর নির্দেশ অনুযায়ী দ্বীনদার পাত্রকে অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত। তবে মনে রাখতে হবে, দ্বীনদারি যাচাইয়ের অর্থ এই নয় যে, পাত্রের প্রতিটি কাজের উপর নজরদারি করা হবে; বরং তার দ্বীনি অবস্থা সম্পর্কে সাধারণ ধারণা নেওয়াই যথেষ্ট।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সকলকে দ্বীনদার ও সচ্চরিত্রবান পাত্র-পাত্রী নির্বাচনের তাওফীক দান করুন। আমীন।