যৌথ পরিবারে গায়রে মাহারামদের সামনে চেহারা ঢাকার আবশ্যকীয়তা সম্পর্কে।
Marriage and Divorce · Hanafi
Question
বোরখা হিজাব নেকাব পরে থাকা সম্ভব , দ্বীন তো এতো কঠিন নয় কিন্তু আমি চাই পরিপুর্ণ ভাবে পর্দাই থাকতে এবং ছেলেটার সামর্থ্য নাই আলাদা বাড়ীতে থাকার বাকি অনান্য দ্বীনি বিষয়ে নিশ্চিত থাকা যায়, কিন্ত পরিপুর্ণ ভাবে পর্দা করা হবে না , এখন আমার করণীয় কি আমি বুঝতে পারছি না , শরয়ী দৃষ্টিকোণ থেকে একজন প্রকৃত মুমিনা নারীর কি করা উচিত?
Answer
উত্তর: وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
আপনার প্রশ্নের জন্য ধন্যবাদ। আপনার দ্বীনদারিতা এবং পূর্ণ পর্দার প্রতি আগ্রহ দেখে আমরা সত্যিই আনন্দিত। আপনার প্রশ্নটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং বাস্তবসম্মত। আসুন আমরা শরয়ী দৃষ্টিকোণ থেকে বিষয়টি বিশ্লেষণ করি।
শরয়ী দৃষ্টিকোণ থেকে পর্দার বিধান:
ইসলামি শরিয়তে নারীর পর্দার বিধান অত্যন্ত স্পষ্ট। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَقُل لِّلْمُؤْمِنَاتِ يَغْضُضْنَ مِنْ أَبْصَارِهِنَّ وَيَحْفَظْنَ فُرُوجَهُنَّ وَلَا يُبْدِينَ زِينَتَهُنَّ إِلَّا مَا ظَهَرَ مِنْهَا ۖ وَلْيَضْرِبْنَ بِخُمُرِهِنَّ عَلَىٰ جُيُوبِهِنَّ... "আর মুমিন নারীদেরকে বলুন, তারা যেন তাদের দৃষ্টি নত রাখে এবং তাদের লজ্জাস্থানের হিফাজত করে। আর তারা যেন তাদের সৌন্দর্য প্রকাশ না করে, তবে যা সাধারণত প্রকাশ পায় তা ছাড়া। আর তারা যেন তাদের মাথার ওড়না বক্ষদেশে ফেলে রাখে..." (সূরা আন-নূর: ৩১)
এই আয়াতে "إِلَّا مَا ظَهَرَ مِنْهَا" (যা সাধারণত প্রকাশ পায়) দ্বারা উদ্দেশ্য হলো মুখমণ্ডল ও দুই হাতের কবজি পর্যন্ত। কিন্তু পরবর্তীকালে ফিতনার আশঙ্কা থাকলে মুখমণ্ডলও ঢেকে রাখা আবশ্যক হয়ে যায়।
হানাফি ফিকহের দৃষ্টিভঙ্গি:
হানাফি মাযহাবের প্রসিদ্ধ গ্রন্থ রদ্দুল মুহতার (ফাতাওয়া শামী) -এ উল্লেখ আছে:
"আমার নিকট সঠিক মত হলো, ফিতনার আশঙ্কা থাকলে মুখমণ্ডল ঢেকে রাখা ওয়াজিব। আর যুবতী নারীর জন্য মুখমণ্ডল ঢেকে রাখা ফরজ, কারণ তাদের থেকে ফিতনার আশঙ্কা থাকে।" (রদ্দুল মুহতার, ৬/৩৭০)
ফাতাওয়া হিন্দিয়া (আলমগীরি) -তেও বলা হয়েছে:
"নারীর জন্য নিজের সমস্ত শরীর ঢেকে রাখা ফরজ, তবে মুখমণ্ডল ও দুই হাতের কবজি পর্যন্ত ছাড়া। কিন্তু যদি ফিতনার আশঙ্কা থাকে, তাহলে সেগুলোও ঢেকে রাখা ওয়াজিব।" (ফাতাওয়া হিন্দিয়া, ৫/৩২৮)
আপনার প্রশ্নের বিশ্লেষণ:
আপনি যে ছেলেটির সাথে কথা বলেছেন, তিনি বলেছেন যে তিনি আপনাকে মুখ, হাতের কবজি এবং পায়ের পাতা বাদে সব ঢেকে রাখতে পারবেন। কিন্তু শরয়ী দৃষ্টিকোণ থেকে:
১. পায়ের পাতা: হানাফি মাযহাবের বিশুদ্ধ মত অনুযায়ী, পায়ের পাতা ঢেকে রাখা ফরজ। কেননা পায়ের পাতাও সতরের অন্তর্ভুক্ত। রদ্দুল মুহতার -এ বলা হয়েছে:
"নারীর পায়ের পাতা তার সতরের অন্তর্ভুক্ত। তাই তা ঢেকে রাখা ফরজ।" (রদ্দুল মুহতার, ২/৮৮)
২. মুখমণ্ডল: যুবতী নারীর জন্য ফিতনার আশঙ্কা থাকলে মুখমণ্ডল ঢেকে রাখা ওয়াজিব। বর্তমান যুগে ফিতনা সর্বত্র ছড়িয়ে পড়েছে, তাই একজন প্রকৃত মুমিনা নারীর জন্য মুখমণ্ডল ঢেকে রাখাই উত্তম এবং নিরাপদ।
৩. হাতের কবজি: হাতের কবজি পর্যন্ত সাধারণত খোলা রাখার অনুমতি আছে, তবে ফিতনার আশঙ্কা থাকলে তা-ও ঢেকে রাখা ভালো।
আপনার করণীয়:
১. পূর্ণ পর্দার গুরুত্ব: আপনি যেহেতু পূর্ণ পর্দা করতে চান, এটি অত্যন্ত প্রশংসনীয়। শরিয়তেও এটাই কাম্য। আপনার এই ইচ্ছাকে দুর্বল করবেন না।
ফিতনার আশঙ্কা থাকলে মুখমণ্ডল ঢেকে রাখা ওয়াজিব। সুতরাং প্রশ্নে উল্লেখিত ছুরতে গায়রে মাহরাম এর সামনে আপনাকে অবশ্যই চেহারা, হাত, পা ঢেকে রাখতে হবে।
২. ছেলেটির সাথে আলোচনা: আপনি ছেলেটির সাথে দ্বীনি বিষয়ে আলোচনা করেছেন, এটি ভালো। কিন্তু তিনি যে শর্ত দিয়েছেন (মুখ, হাতের কবজি ও পায়ের পাতা খোলা থাকবে) তা শরয়ী দৃষ্টিকোণ থেকে সম্পূর্ণ সঠিক নয়। বিশেষ করে পায়ের পাতা ঢেকে রাখা ফরজ।
৩. আলাদা বাসস্থানের গুরুত্ব: ছেলেটির সামর্থ্য না থাকলেও, ইসলামি দৃষ্টিকোণ থেকে আলাদা বাসস্থান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ফাতাওয়া হিন্দিয়া -তে বলা হয়েছে:
"স্বামীর জন্য স্ত্রীকে এমন বাসস্থান দেওয়া ওয়াজিব যা তার জন্য উপযুক্ত এবং যেখানে তার ইজ্জত-আবরু রক্ষিত হয়।" (ফাতাওয়া হিন্দিয়া, ১/৫৪৫)
যৌথ পরিবারে থাকলে পর্দা রক্ষা করা কঠিন হয়ে পড়ে। তাই আলাদা বাসস্থানের চেষ্টা করা উচিত। যদি বর্তমানে সামর্থ্য না থাকে, তাহলে অন্তত ভবিষ্যতে আলাদা বাসস্থানের পরিকল্পনা থাকা উচিত।
৪. বিয়ের পূর্বে শর্ত: বিয়ের পূর্বে আপনি আপনার পূর্ণ পর্দার ইচ্ছা এবং আলাদা বাসস্থানের প্রয়োজনীয়তা স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিন। ইসলামি বিধান অনুযায়ী, বিয়ের সময় স্ত্রী শর্ত দিতে পারে যে সে আলাদা বাসস্থানে থাকবে। ফাতাওয়া শামী -তে বলা হয়েছে:
"যদি স্ত্রী শর্ত করে যে সে আলাদা বাসস্থানে থাকবে, তাহলে তা পূরণ করা স্বামীর জন্য ওয়াজিব।" (রদ্দুল মুহতার, ৩/৫৫৮)
৫. ইস্তেখারা ও পরামর্শ: এই বিষয়ে আল্লাহর কাছে ইস্তেখারা করুন এবং আপনার অভিভাবকদের সাথে পরামর্শ করুন। দ্বীনদার ও পর্দাশীল ছেলে খুঁজে পাওয়া ভালো, কিন্তু তার সাথে আপনার ধর্মীয় মূল্যবোধের আপস করা উচিত নয়।
উপসংহার:
একজন প্রকৃত মুমিনা নারীর জন্য শরয়ী দৃষ্টিকোণ থেকে করণীয় হলো:
-
পূর্ণ পর্দা করা: মুখমণ্ডল, হাতের কবজি এবং পায়ের পাতা সহ সমস্ত শরীর ঢেকে রাখা। বিশেষ করে বর্তমান যুগে ফিতনার প্রাচুর্যের কারণে মুখমণ্ডল ঢেকে রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
-
আলাদা বাসস্থানের চেষ্টা করা: যৌথ পরিবারে পর্দা রক্ষা করা কঠিন, তাই আলাদা বাসস্থানের ব্যবস্থা করা বা ভবিষ্যতে তার পরিকল্পনা থাকা জরুরি।
-
বিয়ের পূর্বে শর্ত নির্ধারণ: বিয়ের আগেই আপনার পর্দা ও বাসস্থান সংক্রান্ত শর্ত স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেওয়া।
আল্লাহ তাআলা আপনাকে দ্বীনের উপর অটল থাকার তাওফিক দান করুন এবং আপনার জন্য উত্তম জীবনসঙ্গী নির্বাচন করুন। আমিন।