স্বামীর মানসিক নির্যাতনের কারণে সংসার করতে না চাইলে করণীয় কি?
Marriage and Divorce · Hanafi
Question
স্বামীর মানসিক নির্যাতনের কারণে একজন স্ত্রী তার স্বামীর সাথে আর সংসার করতে চাচ্ছেন না এবং তিনি বিচ্ছেদ চাচ্ছেন। এমতাবস্থায়, ইসলামিক শরীয়াহ অনুযায়ী স্ত্রীর পক্ষ থেকে বিচ্ছেদ চাওয়ার এবং তা কার্যকর হওয়ার সঠিক পদ্ধতি বা শরয়ী বিধান কী? এ বিষয়ে বিস্তারিত জানতে চাই।
দ্বিতীয় প্রশ্ন:
স্বামী-স্ত্রীর সমস্যা সমাধানের জন্য স্বামীর পক্ষ থেকে একজন এবং স্ত্রীর পক্ষ থেকে একজন নিয়ে একটি শালিশি বৈঠক বসেছিল। এর আগে, স্বামীর অত্যাচার থেকে বাঁচতে স্ত্রী তার মেয়ে ও জামাইয়ের বাসায় গিয়ে থাকতে চেয়েছিলেন। তখন স্বামী স্ত্রীকে উদ্দেশ্য করে স্পষ্টভাবে বলেছিলেন, "যদি যায় তাহলে একবারে বের হয়ে যাবে/চলে যাবে।"
এখন জানার বিষয় হলো, স্বামীর এই কথার পর স্ত্রী যদি সত্যি সত্যিই বাড়ি থেকে বের হয়ে তার মেয়ে-জামাইয়ের বাসায় গিয়ে থাকতে শুরু করেন, তবে কি ইসলামিক শরীয়াহ অনুযায়ী তাদের মাঝে স্বয়ংক্রিয়ভাবে তালাক বা বিবাহ বিচ্ছেদ হয়ে যাবে?
Answer
তালাক সংক্রান্ত প্রশ্নের উত্তর
প্রথম প্রশ্নের উত্তর
স্ত্রীর পক্ষ থেকে বিচ্ছেদ চাওয়ার শরয়ী পদ্ধতি সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা নিম্নরূপ:
১. খুলা (خلع) পদ্ধতি:
যদি স্ত্রী স্বামীর মানসিক নির্যাতনের কারণে তার সাথে সংসার করতে না চান এবং বিচ্ছেদ চান, তবে ইসলামী শরীয়াহ অনুযায়ী তিনি খুলা (خلع) এর মাধ্যমে বিচ্ছেদ নিতে পারেন। খুলা হলো স্ত্রীর পক্ষ থেকে কিছু অর্থের বিনিময়ে তালাক গ্রহণ করা।
কুরআন ও হাদীসের দলিল:
আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَلَا يَحِلُّ لَكُمْ أَن تَأْخُذُوا مِمَّا آتَيْتُمُوهُنَّ شَيْئًا إِلَّا أَن يَخَافَا أَلَّا يُقِيمَا حُدُودَ اللَّهِ ۖ فَإِنْ خِفْتُمْ أَلَّا يُقِيمَا حُدُودَ اللَّهِ فَلَا جُنَاحَ عَلَيْهِمَا فِيمَا افْتَدَتْ بِهِ "তোমাদের জন্য বৈধ নয় যে, তোমরা স্ত্রীদেরকে যা দিয়েছ তা ফিরিয়ে নাও, তবে যদি উভয়ে আশঙ্কা করে যে, তারা আল্লাহর সীমারেখা বজায় রাখতে পারবে না। অতএব, যদি তোমরা আশঙ্কা কর যে, তারা আল্লাহর সীমারেখা বজায় রাখতে পারবে না, তবে স্ত্রী যা বিনিময়ে দেবে তাতে উভয়ের কোনো পাপ নেই।" (সূরা আল-বাকারা: ২২৯)
হাদীস: সাবিত ইবনে কায়েস (রা.)-এর স্ত্রী হাবীবা বিনতে সাহল (রা.)-এর ঘটনা প্রসিদ্ধ। তিনি রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে এসে বললেন, "আমি সাবিতের সাথে সংসার করতে পারছি না।" রাসূলুল্লাহ (সা.) তাকে বললেন, "তুমি কি তার বাগানটি ফিরিয়ে দেবে?" তিনি বললেন, "হ্যাঁ।" তখন রাসূলুল্লাহ (সা.) সাবিতকে বললেন, "তুমি বাগানটি গ্রহণ কর এবং তাকে তালাক দাও।" (সহীহ বুখারী: ৫২৭৩)
২. তালাক-ই-তাফবীয (تفویض طلاق):
যদি বিবাহের সময় বা পরে স্বামী স্ত্রীকে তালাকের ক্ষমতা প্রদান করে থাকেন, তবে স্ত্রী সেই ক্ষমতা ব্যবহার করে নিজেকে তালাক দিতে পারেন।
৩. ফাসাখ (فسخ) বা বিচ্ছেদ:
যদি স্বামী স্ত্রীর উপর অত্যাচার করে এবং স্ত্রী প্রমাণ করতে পারেন যে, স্বামী শরীয়তসম্মতভাবে স্ত্রীর অধিকার (ভরণপোষণ, উত্তম ব্যবহার ইত্যাদি) পালন করছেন না, তবে স্ত্রী কাযী বা ইসলামী আদালতের নিকট আবেদন করে বিবাহ বিচ্ছেদ (ফাসাখ) করাতে পারেন।
হানাফী মাযহাবের বিধান: হানাফী মাযহাব অনুযায়ী, স্ত্রী নিম্নলিখিত কারণে ফাসাখের আবেদন করতে পারেন:
- স্বামী ভরণপোষণ প্রদান না করলে
- স্বামী দীর্ঘদিন অনুপস্থিত থাকলে
- স্বামী গুরুতর অসুস্থ হলে (যেমন: কুষ্ঠ রোগ, কুষ্ঠরোগ ইত্যাদি)
- স্বামী স্ত্রীর সাথে দুর্ব্যবহার করলে
ইমাম আবু হানীফা (রহ.) এর মতে, স্বামী কর্তৃক স্ত্রীর উপর শারীরিক বা মানসিক নির্যাতন ফাসাখের বৈধ কারণ। তবে এটি প্রমাণের জন্য আদালতের প্রয়োজন।
৪. মুবারাআত (مباراة):
উভয় পক্ষের সম্মতিতে পারস্পরিকভাবে বিচ্ছেদ হলে তাকে মুবারাআত বলা হয়। এতে স্ত্রী কিছু অর্থ প্রদান করলে বা না করলেও চলতে পারে।
৫. শালিশি কমিটির মাধ্যমে সমাধান:
কুরআনের নির্দেশ:
وَإِنْ خِفْتُمْ شِقَاقَ بَيْنِهِمَا فَابْعَثُوا حَكَمًا مِّنْ أَهْلِهِ وَحَكَمًا مِّنْ أَهْلِهَا "যদি তোমরা তাদের উভয়ের মধ্যে বিরোধের আশঙ্কা কর, তবে স্বামীর পরিবার থেকে একজন এবং স্ত্রীর পরিবার থেকে একজন বিচারক নিযুক্ত কর।" (সূরা আন-নিসা: ৩৫)
এই শালিশি কমিটি যদি দেখে যে, স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে মিলন সম্ভব নয়, তবে তারা তাদের বিবাহ বিচ্ছেদের সুপারিশ করতে পারে।
দ্বিতীয় প্রশ্নের উত্তর
স্বামীর উক্তির বিশ্লেষণ:
স্বামী স্ত্রীকে বলেছেন, "যদি যায় তাহলে একবারে বের হয়ে যাবে/চলে যাবে।"
এই উক্তিটি বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন:
১. এটি কি তালাকের নিয়তে বলা হয়েছে?
- যদি স্বামী এই কথা তালাকের নিয়তে বলে থাকেন, তবে এটি তালাকে রজয়ী (প্রথম বা দ্বিতীয় তালাক) হিসেবে গণ্য হবে।
- যদি তালাকে বায়েন (তৃতীয় তালাক) এর নিয়তে বলেন, তবে তা তালাকে বায়েন হবে।
২. এটি কি শর্তযুক্ত তালাক?
- যদি স্বামী শর্তযুক্ত তালাক দিয়ে থাকেন (অর্থাৎ, "যদি তুমি যাও, তবে তালাক"), তবে স্ত্রী বের হয়ে গেলে তালাক পতিত হবে।
- কিন্তু এখানে স্বামী বলেছেন, "যদি যায় তাহলে একবারে বের হয়ে যাবে/চলে যাবে" - এটি একটি হুমকি বা সতর্কবাণী, যা স্পষ্ট তালাকের ইঙ্গিত নয়।
হানাফী ফিকহের নীতি: হানাফী মাযহাবে, তালাকের ক্ষেত্রে স্পষ্ট শব্দ (صريح) এবং ইঙ্গিতমূলক শব্দ (كناية) এর পার্থক্য রয়েছে।
- স্পষ্ট শব্দ: "তালাক দিলাম", "আমি তোমাকে তালাক দিলাম" - এগুলোতে নিয়তের প্রয়োজন নেই।
- ইঙ্গিতমূলক শব্দ: "তুমি মুক্ত", "তুমি স্বাধীন", "তোমার পথ খোলা" - এগুলোতে নিয়তের প্রয়োজন।
"বের হয়ে যাবে" বা "চলে যাবে" - এটি ইঙ্গিতমূলক শব্দ। এতে তালাক পতিত হওয়ার জন্য স্বামীর নিয়ত প্রয়োজন।
রদ্দুল মুহতার (رد المحتار) এ উল্লেখ আছে:
الكناية لا يقع بها الطلاق إلا بالنية "ইঙ্গিতমূলক শব্দে নিয়ত ছাড়া তালাক পতিত হয় না।"
ফাতাওয়া আলমগীরী তেও উল্লেখ আছে:
إذا قال الرجل لامرأته اخرجي أو اذهبي إلى أهلك ولم ينو الطلاق لا يقع الطلاق "যদি কোনো ব্যক্তি তার স্ত্রীকে বলে 'বের হয়ে যাও' বা 'তোমার পরিবারের কাছে চলে যাও' এবং তালাকের নিয়ত না করে, তবে তালাক পতিত হবে না।"
সুতরাং, এই ক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত:
১. যদি স্বামী তালাকের নিয়তে এই কথা বলে থাকেন, তবে স্ত্রী বের হয়ে গেলে তালাক পতিত হবে। ২. যদি স্বামী তালাকের নিয়ত না করে থাকেন, তবে স্ত্রী বের হয়ে গেলেও তালাক পতিত হবে না। ৩. এই উক্তিটি শর্তযুক্ত তালাক হিসেবে গণ্য হবে না, কারণ এটি স্পষ্ট শর্তযুক্ত তালাকের ভাষা নয়।
ইমাম আবু হানীফা (রহ.) এর মতে, "যদি যায় তাহলে বের হয়ে যাবে" - এটি একটি হুমকি বা সতর্কবাণী, তালাকের ইঙ্গিত নয়, যদি না স্বামী তালাকের নিয়ত করে থাকেন।
তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়:
যদি স্ত্রী প্রমাণ করতে পারেন যে, স্বামী তার উপর মানসিক নির্যাতন করছেন এবং তিনি স্বামীর সাথে বসবাস করতে পারছেন না, তবে তিনি: ১. খুলার মাধ্যমে বিচ্ছেদ নিতে পারেন ২. ইসলামী আদালতে ফাসাখের আবেদন করতে পারেন ৩. শালিশি কমিটির মাধ্যমে সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করতে পারেন
মুফতী মুহাম্মদ শফী (রহ.) তাঁর তাফসীর মা'আরিফুল কুরআন এ উল্লেখ করেছেন যে, স্ত্রীর উপর অত্যাচার করা ইসলামী দৃষ্টিতে সম্পূর্ণ হারাম এবং স্ত্রী এ ক্ষেত্রে বিচ্ছেদ চাইতে পারেন।
সংক্ষিপ্ত সিদ্ধান্ত:
১. স্বামীর উক্তি "যদি যায় তাহলে একবারে বের হয়ে যাবে" - এটি তালাকের স্পষ্ট শব্দ নয়। তালাক পতিত হওয়ার জন্য স্বামীর নিয়ত প্রয়োজন।
২. স্ত্রী বের হয়ে গেলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে তালাক পতিত হবে না, যদি না স্বামী তালাকের নিয়ত করে থাকেন।
৩. স্ত্রী মানসিক নির্যাতনের কারণে বিচ্ছেদ চাইতে পারেন:
- খুলার মাধ্যমে (অর্থের বিনিময়ে)
- ফাসাখের মাধ্যমে (আদালতে আবেদন করে)
- শালিশি কমিটির মাধ্যমে
৪. শালিশি কমিটি যদি দেখে যে, মিলন সম্ভব নয়, তবে তারা বিবাহ বিচ্ছেদের সুপারিশ করতে পারে।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সকলকে সঠিক পথ প্রদর্শন করুন।