একসাথে ৩ তালাক দিলে তালাক হয় কিনা
Marriage and Divorce · Hanafi
Question
Answer
একসাথে ৩ তালাক দেওয়ার বিধান
সংক্ষিপ্ত উত্তর
আপনার প্রশ্নের সরল উত্তর হলো—হানাফী মাযহাব মতে, একসাথে ৩ তালাক দিলে ৩ তালাকই পতিত হয়
বিস্তারিত আলোচনা
কুরআন ও হাদীসের আলোকে
কুরআনুল কারীমে আল্লাহ তাআলা বলেন:
"তালাক দুইবার। এরপর হয় ভালোভাবে রাখা অথবা সৌজন্যের সাথে বিদায় দেওয়া।" (সূরা আল-বাকারা: ২২৯)
এই আয়াতে তালাককে দুইবারের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা হয়েছে এবং তৃতীয় তালাকের পর আর পুনর্মিলনের সুযোগ নেই। রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর যুগে এবং আবু বকর (রা.)-এর যুগে এবং উমর (রা.)-এর খিলাফতের প্রথম দুই বছর পর্যন্ত একসাথে ৩ তালাককে ১ তালাকই গণনা করা হতো। কিন্তু উমর (রা.) লোকদেরকে এ বিষয়ে খেলাপ করতে দেখে একসাথে ৩ তালাককে ৩ তালাকই গণনা করার নির্দেশ দেন।
সহীহ মুসলিমে বর্ণিত আছে:
"ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর যুগে, আবু বকর (রা.)-এর যুগে এবং উমর (রা.)-এর খিলাফতের প্রথম দুই বছরে তিন তালাককে এক তালাকই গণনা করা হতো। অতঃপর উমর (রা.) বললেন: লোকেরা এমন একটি বিষয়ে তাড়াহুড়া করছে যাতে তাদের জন্য অবকাশ ছিল। যদি আমরা তা তাদের উপর কার্যকর করে দেই (তাহলে ভালো হয়)। সুতরাং তিনি তা কার্যকর করে দিলেন।" (সহীহ মুসলিম: ১৪৭৯)
হানাফী মাযহাবের অবস্থান
হানাফী মাযহাবের ইমামগণ (ইমাম আবু হানীফা, ইমাম আবু ইউসুফ, ইমাম মুহাম্মাদ) - সবার মতে, একসাথে ৩ তালাক দিলে ৩ তালাকই পতিত হয় এবং তা দ্বারা তালাকে মুগাল্লাযা (চূড়ান্ত তালাক) সংঘটিত হয়। এতে স্ত্রী হারাম হয়ে যায় এবং হালাল হওয়ার জন্য বৈধ পদ্ধতিতে অন্যত্র বিয়ে ও সেই বিয়েতে সহবাস হওয়া আবশ্যক।
ইমাম আবু হানীফা (রহ.) -এর মতানুসারে, এক বৈঠকে ৩ তালাক দিলে ৩ তালাকই পতিত হয়। (বাদায়েউস সানায়ে: ৩/৯৯, আল-হিদায়া: ২/৮০)
ইমাম সারাখসী (রহ.) তাঁর আল-মাবসূত গ্রন্থে বলেন:
"যদি কেউ এক বৈঠকে তিন তালাক দেয়, তবে তিনটিই পতিত হবে এবং স্ত্রী তার জন্য হারাম হয়ে যাবে।" (আল-মাবসূত: ৬/২৫)
আল্লামা ইবনে আবেদীন শামী (রহ.) রদ্দুল মুহতার গ্রন্থে বলেন:
"এক বৈঠকে তিন তালাক দেওয়া হারাম (গুনাহের কাজ), কিন্তু তা পতিত হয়ে যায় এবং তিনটিই গণনা হয়।" (রদ্দুল মুহতার: ৩/২৯০)
ফাতাওয়া উসমানী ও অন্যান্য হানাফী কিতাবের আলোকে
মুফতী মুহাম্মাদ শফী (রহ.) -এর ফাতাওয়া উসমানীতে উল্লেখ আছে:
"এক সাথে তিন তালাক দেওয়া অত্যন্ত গুনাহের কাজ এবং নবী করীম (সা.)-এর নির্দেশের পরিপন্থী। কিন্তু শাস্ত্রীয় বিধান অনুযায়ী তা পতিত হয়ে যায় এবং তিন তালাকই গণনা হয়। এতে স্ত্রী চিরতরে হারাম হয়ে যায়।" (ফাতাওয়া উসমানী: ২/৩০৫)
মুফতী তাকী উসমানী (দামাত বারাকাতুহুম) -এর মতে:
"হানাফী মাযহাবের বিশুদ্ধ মত অনুযায়ী, একসাথে তিন তালাক দিলে তিন তালাকই পতিত হয়। যদিও এটি গুনাহের কাজ, কিন্তু শরয়ী বিধান হলো—তিন তালাকই কার্যকর হবে।" (ফিকহুল বুয়ূত: ২/৪৫০)
আপনার প্রশ্নের প্রেক্ষিতে
আপনার বিবরণ অনুযায়ী, আপনার স্বামী রাগের মাথায় একসাথে "১ তালাক, ২ তালাক, ৩ তালাক" বলেছেন। হানাফী মাযহাব মতে:
১. একসাথে ৩ তালাক দিলে তা ১ তালাক হবে না, বরং ৩ তালাকই পতিত হবে। ২. তালাক হয়ে গেছে—এটি তালাকে মুগাল্লাযা (চূড়ান্ত তালাক) হিসেবে গণ্য হবে। ৩. এই তালাকের পর পুনরায় বিবাহ করা যাবে না যতক্ষণ না স্ত্রী অন্য কাউকে বিয়ে করে এবং সেই বিয়েতে সহবাস হয় এবং তারপর সেই স্বামী তালাক দেয় বা মৃত্যুবরণ করে এবং ইদ্দত পূর্ণ হয়। (এটাকে হালালা বলা হয়)
হুজুরের বক্তব্য সম্পর্কে
আপনি উল্লেখ করেছেন যে, একজন হুজুর বলেছেন "তোমার বউ তোমারই আছে।" এটি হানাফী মাযহাবের বিশুদ্ধ মতের পরিপন্থী। সম্ভবত তিনি ইবনে তাইমিয়্যার মত অনুসরণ করেছেন, যিনি বলতেন একসাথে ৩ তালাক ১ তালাক গণনা হবে। কিন্তু হানাফী মাযহাবের বিশুদ্ধ ও প্রসিদ্ধ মত হলো—৩ তালাকই পতিত হবে।
গুরুত্বপূর্ণ নোট
১. রাগের অবস্থায় তালাক: রাগের অবস্থায় তালাক দিলে তা পতিত হয়, যদি না রাগ এমন পর্যায়ে পৌঁছে যে, ব্যক্তি তার কথা ও কাজ সম্পর্কে সম্পূর্ণ অজ্ঞান হয়ে যায় (যাকে বলা হয় "ইতলা" বা চরম ক্রোধ)।
২. তালাকের নিয়ত: তালাকের ক্ষেত্রে নিয়তের বিশেষ গুরুত্ব আছে। যদি স্বামী শুধু ভয় দেখানোর জন্য বলে থাকে এবং তার নিয়ত তালাকের না হয়, তবে তা তালাক হিসেবে গণ্য হবে না। কিন্তু এক্ষেত্রে "তালাক দিলাম" বলা স্পষ্ট তালাকের ইঙ্গিত বহন করে।
৩. পরামর্শ: যেহেতু এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এবং আপনার বিবাহিত জীবন এর সাথে জড়িত, তাই আপনার এলাকার কোনো নির্ভরযোগ্য মুফতী বা ইসলামিক স্কলারের কাছে সরাসরি গিয়ে বিস্তারিত বলুন এবং তার কাছ থেকে ফতোয়া নিন।
উপসংহার
হানাফী মাযহাবের বিশুদ্ধ মত অনুযায়ী, একসাথে ৩ তালাক দিলে ৩ তালাকই পতিত হয় এবং তা ১ তালাক হিসেবে গণ্য হবে না। আপনার ক্ষেত্রে যদি স্বামী স্পষ্টভাবে "তালাক" শব্দটি উচ্চারণ করে থাকেন এবং তার নিয়ত তালাকেরই হয়ে থাকে, তবে ৩ তালাক পতিত হয়ে গেছে এবং বিবাহ ছিন্ন হয়ে গেছে।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সকলকে সঠিক পথ প্রদর্শন করুন এবং বিবাহিত জীবনে শান্তি বজায় রাখার তাওফীক দান করুন। আমীন।