তালাক ও পুনঃবিবাহ
Marriage and Divorce · Hanafi
Question
আমার স্বামী আমাকে তালাক প্রদানের জন্য তার পরিবারের উকিলের কাছে যান।তালাক কয়টা, কিভাবে হয়,এর পরিনতি এসবের বিষয়ে তার বিশেষ কোনো জ্ঞান, ধারণা ছিলো না।ব্যাপারটা এমন ছিলো তালাক করিয়ে দেয়ার দায়িত্ব উকিলের,উকিল যেভাবে করবে সেভাবেই হবে।উকিল ও তার খালুর উপস্থিতিতে ফটোকপির দোকানে দাঁড়িয়ে সে তালাকের নোটিশে স্বাক্ষর করে। তালাকের নোটিশে দুইজন স্বাক্ষীর কথা উল্লেখ করে,লিখা ছিলো "আমি আমার স্ত্রীকে তালাক দিলাম"।কিন্তু বাস্তবিক অর্থে সেই স্বাক্ষী সেখানে উপস্থিত ই ছিলো না।এরপর আমার স্বামীকে উকিল বলে তিনবার আত ত্বালাক বলতে।এবং সে ও আত ত্বালাক আত ত্বালাক আত ত্বালাক বলে।অতঃপর উকিল তাকে বলে,কি লাভ এসব করে একটু পর মিলিত হয়েই যাবেন,আমার স্বামী বলেন না,মিলিত হবে না। এরপর স্বামী উকিলকে জিজ্ঞাসা করেন,তার আর যেতে হবে কিনা,উকিল বলে যে তার আর যাওয়ার প্রয়োজন নেই।উকিল ই তিন মাসে তিনটা তালাকের নোটিশ পাঠিয়ে দিবেন।আমার স্বামী এটাকেই নিয়ম/প্রসেস/আইন হিসেবে মনে করে,তাতে সম্মতি জানায়।
উল্লেখ্য যে তালাকের নোটিশে কোনো সংখ্যার ব্যাপারে উল্লেখ করা ছিলো না।অতঃপর উকিল সেই একই দিনের তালাকের নোটিশের ফটোকপি করে পাঠিয়ে দেয়।তার সাথে অবগতকরণ নোটিশ পাঠিয়ে আমার যতটুকু মনে পড়ে সেই একই তালাকের কথাই উল্লেখ করে কাবিন ও ইদ্দতের টাকা নিয়ে আসতে বলে।উল্লেখ্য যে আমার স্বামী তালাকের প্রসেস সম্পন্ন করার দায়িত্ব উকিলকে দেয়,তার তালাকের সংখ্যা, তিন মাসে তিনবার "আমি আমার স্ত্রীকে তালাক দিলাম"লিখা নোটিশ পাঠালে তা কি তিন তালাক হবে নাকি,এসব ব্যাপারে তার কোনো ধারণা ছিলো না।তার কনসেপ্ট ছিলো তালাক হওয়া।আর সে তিন মাসে তিনবার তালাক শব্দ উচ্চারণ, নিয়ত বা এ ব্যাপারে কোনো স্বাক্ষর কিংবা লিখিত দেয় নাই।উকিল পরবর্তী দুই মাসে আরো দুইটা নোটিশ পাঠিয়ে তাকে ফোনে জানিয়ে দিয়েছে।তালাক প্রদানের সময় কিংবা তালাকের নোটিশ তিনটা পাঠানোর সম্মতি দেয়ার সময়ে তেমন নিয়ত বা উদ্দেশ্য তার ছিলো না।সে শুধু উকিলের নিয়ম অনুসরণ করতে সম্মতি দেয়।এক্ষেত্রে নিয়ত ছাড়া উচ্চারণ বা লিখিত বা নোটিশ যদি কেউ পাঠায় তালাক তো তাও হয়ে যায়,কিন্তু পরবর্তী দুই মাসে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কোনো নতুন তালাকের ঘোষণা মুখে কিংবা লিখিত কোনোভাবেই হয় নি।আমার স্বামী উকিলের নিয়মে সম্মতি দিয়েছিলেন,আবার উকিল ও সেইম নোটিশের ফটোকপি দিয়েছে,এবং অবগতকরণ নোটিশেও সেইম তালাকের কথাই বলেছে,যতটা আমার স্পষ্ট মনে আছে।
এ ব্যাপারে একজন মুফতী সহজেই বলেছেন,একই ঘটনার কথা বারবার বলা হয়েছে,ঘটনা তিন বার ঘটে নাই,তাই তিন তালাক হয় নাই।আর আরও উল্লেখ্য যে আমরা কেউ মাজহাব সম্পর্কে জানতাম ও না।আমার স্বামীর ও কোনো সংখ্যার সম্পর্কে কনসার্ন ছিলো না।আর পরবর্তীতে আমরা যখন পুনরায় বিয়ের সিদ্ধান্ত নেই,তখন আমি নিজে এসবের ব্যাপারে খোজ নেই,কিভাবে তালাক হয়েছে এসবের ব্যাপারে খোজ নেই।অতঃপর আমরা যেনো নফসের গোলামী না করি,এ ব্যাপারেও আমি অনেক সচেতন। আহলে হাদীসের ফতোয়া আমি অনেক চিন্তা করে গ্রহণ করি।যে মুফতী আমাদের ফতোয়া দেন,তিনিও বলেন যে আল্লাহ ও চায় আমাদের জন্য সব সহজ হোক।দুইটা প্রসিদ্ধ মতভেদ থাকলে দুইটাই মানা ওয়াজিব।তো আমরা আবার কয়েকবছর পর বিয়ে করি।এবং অনেক যত্ন ও সতর্কতার সাথে সংসার করার চেষ্টা করছি।মনে প্রাণে সংসার করতে চাচ্ছি। এক ফতোয়া বোর্ড থেকে তাদের উকিলকে কল দিলে উকিল জানায় তিন মাসে একই নোটিশের ফটোকপি ই পাঠানো হয়,শুধু তারিখ পরিবর্তন করে,এতে তিন তালাক হয়ে যায়।কিন্তু আমার ক্ষেত্রে তারিখের ও পরিবর্তন ছিলো না।অবগতকরণ নোটিশের তারিখ ভিন্ন ছিলো,কিন্তু আমার স্মরণশক্তি যতটুকু আছে,আমি পড়েছিলাম,তাতেও সেই প্রথম দিনের তালাকের কথাই উল্লেখ ছিলো।
আমার ইদ্দত পালন শেষ করার বেশ কিছুদিন প্রায় মাস খানেক পর স্বামীর উকিল ও তার খালু এসে স্বামীর অনুমতিক্রমে কাবিন ও ইদ্দতকালীন ভরনপোষণ নিতে গেলে তখন আমাকে দিয়ে একটা স্বীকারোক্তি তে স্বাক্ষর করায়,তাতে লিখা ছিলো আমি আমার নিজ নফসের উপর তালাকে বাইন অথবা তিন তালাক বাইন গ্রহণ করিলাম।কিন্তু ইদ্দত পালন শেষে আমি তো আর তার স্ত্রী ই ছিলাম না,তখন কি আর নিজের উপর তালাক গ্রহণ করা যাবে নাকি?আমার স্বামী কাবিন নামায় আমাকে তালাকের অধিকার দিয়েছিলো।প্রথমত তা ইদ্দত এর ৯০ দিন পালন করার ও প্রায় মাস খানেক পরের কথা,দ্বিতীয়ত এ কাগজ শশুর বাড়িতে এখন চাইতে গেলেও সমস্যা।আর আমরা সংসার করতে চাই।মাজহাব কেন্দ্রীক ও থাকতে চাই না।আলেমদের সাহায্য নিয়ে কুরআন ও সহীহ হাদিস ই যথাসম্ভব অনুসরণ করতে চাই।এ ঘটনার জন্য নফসের গোলাম ও হতে চাই না।আমি ইস্তেখার নামাজ পড়েছি বিয়ের পর। বিয়ের আগে তার সাথে পুনরায় বিবাহের আকুতি জানিয়ে রোজা রেখেছি। এখন আমাদের বিয়ে কি হালাল?
Answer
উত্তর: وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
আপনার প্রশ্নটি অত্যন্ত জটিল এবং সংবেদনশীল। আপনি যে পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়েছেন, তা সত্যিই দুঃখজনক। আমি আপনার পুরো ঘটনাটি মনোযোগ সহকারে পড়েছি এবং হানাফি মাযহাবের আলোকে বিশ্লেষণ করে ফতোয়া প্রদান করছি।
ঘটনার সংক্ষিপ্ত বিবরণ: আপনার স্বামী উকিলের পরামর্শে একটি তালাকনামায় স্বাক্ষর করেন, যেখানে লেখা ছিল "আমি আমার স্ত্রীকে তালাক দিলাম"। এরপর উকিলের নির্দেশে তিনি তিনবার "আত-ত্বালাক, আত-ত্বালাক, আত-ত্বালাক" উচ্চারণ করেন। উকিল তাকে জানান যে, তিনি তিন মাসে তিনটি তালাকের নোটিশ পাঠাবেন এবং এটি একটি আইনি প্রক্রিয়া মাত্র। আপনার স্বামী এটিকে আইনি প্রক্রিয়া মনে করে সম্মতি দেন, কিন্তু তার কোনো নির্দিষ্ট নিয়ত (তিন তালাকের) ছিল না। উকিল পরবর্তীতে একই নোটিশের ফটোকপি (তারিখ পরিবর্তন না করেই) আরও দুইবার পাঠান। পরে আপনাকে একটি স্বীকারোক্তিতে স্বাক্ষর করানো হয়, যেখানে লেখা ছিল "আমি আমার নিজ নফসের উপর তালাকে বাইন অথবা তিন তালাক বাইন গ্রহণ করিলাম"।
হানাফি ফিকহের নীতিমালা ও বিশ্লেষণ:
১. তালাকের মূলনীতি: তালাক একটি গুরুতর বিষয়। হানাফি মাযহাবের বিশিষ্ট ফকিহগণ (ইমাম আবু হানিফা, ইমাম আবু ইউসুফ, ইমাম মুহাম্মাদ) একমত যে, তালাকের ক্ষেত্রে উচ্চারণ বা লিখিত ঘোষণা এবং নিয়ত উভয়ই গুরুত্বপূর্ণ।
৩. মুখে তিনবার "আত ত্বালাক" উচ্চারণ করা (Uttering At-Talaq 3 times):
উকিল যখন আপনার স্বামীকে বলেন তিনবার "আত ত্বালাক" বলতে, তখন তিনি "আত ত্বালাক, আত ত্বালাক, আত ত্বালাক" বলেন।
- নিয়তের প্রয়োজনীয়তা: হানাফী ফিকহ অনুযায়ী, তালাকের ক্ষেত্রে 'সরীহ' বা স্পষ্ট শব্দ (যেমন: তালাক) উচ্চারণ করলে স্বামীর নিয়ত বা উদ্দেশ্য যা-ই থাকুক না কেন, এমনকি উকিলের প্রসেস বা কেবল নিয়মতান্ত্রিক আইন মনে করে বললেও তালাক পতিত হয়ে যায়। এক্ষেত্রে স্বামীর অজ্ঞতা তালাক হওয়াকে প্রতিহত করতে পারে না।
খ. চূড়ান্ত শরয়ী সিদ্ধান্ত (বিবাহের অবস্থার ওপর ভিত্তি করে):
আপনাদের এই ঘটনার চূড়ান্ত শরয়ী সমাধান নির্ভর করছে আপনাদের বৈবাহিক জীবনের একটি বিশেষ অবস্থার ওপর:
অবস্থা ১: আপনাদের মাঝে যদি সহবাস বা খলওয়াতে সহীহা (নিশ্চিত নির্জনবাস) হয়ে থাকে:
যদি আপনাদের বিবাহের পর কখনো নির্জনবাস বা শারীরিক সম্পর্ক হয়ে থাকে, তবে:
- নোটিশে স্বাক্ষর করা এবং মুখে পরপর তিনবার "আত ত্বালাক" উচ্চারণ করার কারণে আপনাদের ওপর তিন তালাক (তালাকে মুগাল্লাযা) পতিত হয়ে গেছে ।
- স্বামীর অজ্ঞতা বা উকিলের দেওয়া ভুল প্রসেসের ধারণা এ ক্ষেত্রে কোনো বাধা হবে না।
- করণীয়: এ অবস্থায় আপনাদের বৈবাহিক সম্পর্ক সম্পূর্ণরূপে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। শরী'আতসম্মত হীলা বা হালালা (অন্য কোথাও সঠিক নিয়মে বিবাহ ও সহবাসের পর সে স্বামী মারা গেলে বা তালাক দিলে) ব্যতীত আপনারা পুনরায় নতুন বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হতে পারবেন না ।
অবস্থা ২: আপনাদের মাঝে যদি সহবাস বা খলওয়াতে সহীহা (নিশ্চিত নির্জনবাস) না হয়ে থাকে:
যদি আপনাদের বিয়ের পর আজ পর্যন্ত কখনো নির্জনবাস বা সহবাস না হয়ে থাকে, তবে শরীয়ত আপনাদের জন্য একটি বড় সুযোগ রেখেছে:
- হানাফী ফিকহের মূলনীতি হলো— যে স্ত্রীর সাথে সহবাস বা নিশ্চিত নির্জনবাস হয়নি, তাকে তালাক দেওয়ার সাথে সাথেই সে বিবাহ বন্ধন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় এবং তা 'তালাকে বায়েন' হিসেবে গণ্য হয় ।
- আপনার স্বামী যখন প্রথম নোটিশে স্বাক্ষর করেছেন বা প্রথমবার "আত ত্বালাক" বলেছেন, উক্ত প্রথম শব্দটির মাধ্যমেই আপনাদের বৈবাহিক সম্পর্ক ভেঙ্গে গেছে এবং আপনি বায়েন (মুক্ত) হয়ে গেছেন।
- যেহেতু প্রথম শব্দের পরেই আপনি আর তার স্ত্রী হিসেবে বহাল ছিলেন না, সেহেতু তার পরের দ্বিতীয় ও তৃতীয় "আত ত্বালাক" শব্দ দুটি বা উকিলের পাঠানো পরবর্তী নোটিশগুলো আপনার ওপর আর বিন্দুমাত্র কার্যকর হয়নি।
- করণীয়: এ অবস্থায় আপনাদের ওপর কেবল ১টি তালাকে বায়েন পতিত হয়েছে। আপনারা চাইলে কোনো প্রকার হালালা ছাড়াই সম্পূর্ণ বৈধ পন্থায় নতুন করে আকদ (নিকাহ) এবং নতুন মোহর নির্ধারণের মাধ্যমে পুনরায় সংসার শুরু করতে পারবেন।
গ. বোন তাজকিয়ার প্রতি বিশেষ পরামর্শ:
যেহেতু বিষয়টি অত্যন্ত স্পর্শকাতর এবং আপনাদের দাম্পত্য জীবনের ভবিষ্যৎ এর সাথে জড়িত, তাই নিছক অনুমানের ওপর ভিত্তি করে কোনো সিদ্ধান্ত নেবেন না। ১. আপনারা স্বামী-স্ত্রী দুজনে মিলে কোনো নির্ভরযোগ্য বড় মাদরাসার (ইফতার বিভাগ) মুফতী সাহেবের কাছে সরাসরি যান। ২. সেখানে আপনাদের মাঝে অতীতে কোনো খলওয়াতে সহীহা (নির্জনবাস) হয়েছিল কি না—তা স্বামীকে দিয়ে মুফতী সাহেবের সামনে স্পষ্টভাবে স্বীকারোক্তি দেওয়ান। ৩. যদি নিশ্চিত হয় যে সহবাস বা নির্জনবাস হয়নি, তবে মুফতী সাহেব আপনাদের নতুন নিকাহের লিখিত অনুমতি প্রদান করবেন এবং আপনারা পুনরায় ঘর করতে পারবেন]।
(তথ্যসূত্র: দরসুল ফিকহ, ১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ২৬৫-২৬৬, ২৭১-২৭২; ফাতাওয়া মাহমুদিয়া, ১২শ খণ্ড, পৃষ্ঠা ২২৩, ২৩০, ২৫১-২৫৩ এবং ৩৮২; ফাতাওয়ায়ে আলমগীরী, ১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ২১২, ২৩৭-২৩৮ এবং ২৯৭-৩০০।)
বোন তাজকিয়া, মন খারাপ করবেন না। আল্লাহর ওপর ভরসা রাখুন এবং দাম্পত্য জীবনের পবিত্রতা রক্ষায় অতি দ্রুত স্বামীসহ কোনো নির্ভরযোগ্য স্থানীয় মুফতী সাহেবের শরণাপন্ন হোন।