সরকারি চাকরিজীবীর জন্য কাজের সাথে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে কোনো উপহার গ্রহণ করার বিধান
Business and Job · Hanafi
Question
আলহামদুলিল্লাহ মা-শা আল্লাহ। আমি সরকারি চাকরি করি। আমার অফিসে অনেক প্রতিষ্ঠানের লোক আসে বিভিন্ন কাজের জন্য। অনেক প্রতিষ্ঠান ঈদ উপলক্ষে বিভিন্ন ধরনের গিফট দেয়। অর্থাৎ আমার ডেস্কে যখন য়ারা কর্মরত থাকে তখন তাদেরকে বড় বড় প্রতিষ্ঠান গিফট দিয়ে থাকে। আমি টাকার কথা বলছি না। বিভিন্ন খাদ্য সামগ্রী।। যেমন, ঈদুল আযহা উপলক্ষে একটি সিগারেট উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান কিছু খাদ্য সামগ্রী দিয়েছে আমাদের সবাইকে। বড় বক্সের মধ্যে তেল, ঘি, সেমাই মসলা ইত্যাদি।
এখন এটা আমাদের জন্য নেয়া জাযেজ হবে কি না মেহেরবানি করে রেফারেন্সসহ জানালে উপকৃত হব ইন শা আল্লাহ।
জাযাকাল্লাহু খইরন
Answer
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
الحمد لله والصلاة والسلام على رسول الله
প্রশ্নের জন্য আপনাকে ধন্যবাদ। আপনার প্রশ্নটি সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং বাস্তবিক একটি মাসআলা। নিচে কুরআন, হাদিস ও হানাফি ফিকহের কিতাবের রেফারেন্স সহ উত্তর প্রদান করা হলো।
উত্তর সংক্ষেপে:
সরকারি চাকরিজীবী হিসেবে আপনার জন্য অফিসে আগত প্রতিষ্ঠান থেকে ঈদ উপলক্ষে প্রদত্ত খাদ্য সামগ্রী (যেমন: তেল, ঘি, সেমাই, মসলা ইত্যাদি) গ্রহণ করা জায়েয নয়, বিশেষ করে যখন তা আপনার দায়িত্ব বা কাজের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান দেয় এবং এটি একটি সাধারণ নিয়ম বা রীতি হিসেবে প্রদান করে। তবে কিছু শর্তে তা জায়েয হতে পারে।
বিস্তারিত দলিল ও বিশ্লেষণ:
১. কুরআনের নির্দেশনা:
আল্লাহ তাআলা বলেন:
إِنَّ اللَّهَ يَأْمُرُكُمْ أَنْ تُؤَدُّوا الْأَمَانَاتِ إِلَىٰ أَهْلِهَا
"নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদেরকে আদেশ করেন যে, তোমরা আমানতসমূহ তার অধিকারীদের কাছে পৌঁছে দাও।" (সূরা আন-নিসা: ৫৮)
সরকারি চাকরি একটি আমানত। সরকারি কর্মচারী হিসাবে আপনি জনগণের সেবক এবং রাষ্ট্রের তহবিল থেকে বেতন গ্রহণ করেন। তাই কোনো প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তি যদি আপনাকে উপহার দেয়, তবে তা সাধারণত ঘুষের পর্যায়ে পড়ে, যা আমানতের খিয়ানত।
আরও বলা হয়েছে:
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَأْكُلُوا أَمْوَالَكُمْ بَيْنَكُمْ بِالْبَاطِلِ
"হে ঈমানদারগণ! তোমরা একে অপরের সম্পদ অন্যায়ভাবে গ্রাস করো না।" (সূরা আন-নিসা: ২৯)
২. হাদিসের দলিল:
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
هَدَايَا الْعُمَّالِ غُلُولٌ
"কর্মচারীদেরকে দেওয়া উপহার (ঘুষ) খিয়ানতের শামিল।" (মুসনাদে আহমাদ, হাদিস: ২২৯৮২; শুআবুল ঈমান, বায়হাকী)
অন্য হাদিসে এসেছে:
مَنِ اسْتَعْمَلْنَاهُ عَلَى عَمَلٍ فَرَزَقْنَاهُ رِزْقًا، فَمَا أَخَذَ بَعْدَ ذَلِكَ فَهُوَ غُلُولٌ
"আমরা যাকে কোনো কাজে নিযুক্ত করি এবং তার জন্য বেতন নির্ধারণ করি, তারপর সে যা কিছু অতিরিক্ত গ্রহণ করে, তা খিয়ানত।" (আবু দাউদ, হাদিস: ২৯৪৩; ইবনে মাজাহ, হাদিস: ২৩১৩)
৩. হানাফি ফিকহের কিতাব থেকে দলিল:
ফাতাওয়া হিন্দিয়া (আলমগিরি) তে বলা হয়েছে:
أما الهدية للقاضي والحاكم والمحتسب ونحوهم فلا تحل، سواء كانت قبل الحكم أو بعده، لأنها رشوة
"বিচারক, শাসক, হিসবা কর্মকর্তা (যারা সরকারি দায়িত্বে আছেন) এবং তাদের মতো ব্যক্তিদের জন্য উপহার গ্রহণ করা হালাল নয়, তা বিচারের আগে হোক বা পরে হোক, কারণ তা ঘুষ।" (ফাতাওয়া হিন্দিয়া, ৫/৩৬৪)
একইভাবে রদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদীন) এ বলা হয়েছে:
أما هدايا العمال فحرام؛ لأنها رشوة
"কর্মচারীদের উপহার হারাম; কারণ তা ঘুষ।" (রদ্দুল মুহতার, ৫/২৬৮)
ইমদাদুল ফাতাওয়া তে মাওলানা আশরাফ আলী থানভী (রহ.) বলেন:
"সরকারি কর্মচারীর জন্য কোনো প্রজা বা ক্লায়েন্টের কাছ থেকে উপহার নেওয়া জায়েয নয়, যদিও তা অতি সামান্য হয়। কারণ এটি ঘুষের শামিল এবং সরকারি আমানতে খিয়ানত।" (ইমদাদুল ফাতাওয়া, ৪/২৫০)
ফাতাওয়া উসমানি তে মুফতি মুহাম্মদ তাকি উসমানি (দা. বা.) বলেন:
"সরকারি কর্মকর্তাদের জন্য অফিসে আগত সেবাগ্রহীতা বা প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে কোনো উপহার বা গিফট গ্রহণ করা জায়েয নয়। বিশেষ করে যখন তা তাদের কাজের সাথে সম্পর্কিত হয়। তবে যদি কোনো নিকটাত্মীয় বা বন্ধু ব্যক্তিগত সম্পর্কের ভিত্তিতে কোনো উপহার দেয় এবং সেই উপহারের কারণে কোনো কাজে প্রভাব না পড়ে, তাহলে ভিন্ন কথা। কিন্তু প্রশ্নে বর্ণিত পরিস্থিতি সাধারণত এমন নয়।" (ফাতাওয়া উসমানি, ২/৫২১)
৪. সিগারেট উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের দৃষ্টিভঙ্গি:
প্রশ্নে উল্লেখিত প্রতিষ্ঠানটি যদি সিগারেট (তামাকজাত দ্রব্য) উৎপাদনকারী হয়, তবে তাদের দেওয়া উপহার গ্রহণের ব্যাপারে আরও কঠোরতা রয়েছে। কারণ:
১. তামাক ও সিগারেট ব্যবহার করা ইসলামে নাজায়েয (হারাম) বা মাকরুহে তাহরিমি (নিষিদ্ধের কাছাকাছি)। অনেক ফকিহ এর ধোঁয়া ও সেবনকে হারাম বলেছেন, কারণ এটি স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর এবং অপব্যয়ের অন্তর্ভুক্ত।
২. যে প্রতিষ্ঠানের মূল ব্যবসা হারাম, তাদের কাছ থেকে কোনো কিছু গ্রহণ করা সাধারণত জায়েয হয় না, বিশেষ করে যখন তা উপহার হিসেবে দেওয়া হয় এবং তাদের ব্যবসার প্রচার বা প্রভাব সৃষ্টির উদ্দেশ্য থাকে।
৩. তবে খাদ্য সামগ্রী (যেমন তেল, ঘি, সেমাই) নিজেরা হালাল হলেও, যেহেতু তা হারাম উপার্জনের অর্থ দিয়ে কেনা, তাই সেই খাদ্য গ্রহণ করা থেকে বিরত থাকা উচিত। কারণ কুরআনে বলা হয়েছে:
وَتَعَاوَنُوا عَلَى الْبِرِّ وَالتَّقْوَىٰ وَلَا تَعَاوَنُوا عَلَى الْإِثْمِ وَالْعُدْوَانِ
"তোমরা সৎকর্ম ও তাকওয়ায় পরস্পর সহযোগিতা করো, এবং পাপ ও সীমালঙ্ঘনে সহযোগিতা করো না।" (সূরা মায়িদা: ২)
সুতরাং, এই ধরনের প্রতিষ্ঠানের উপহার গ্রহণ করা তাদের ব্যবসার পরোক্ষ সমর্থন হতে পারে।
জায়েয হওয়ার শর্ত:
তবে কিছু বিশেষ ক্ষেত্রে তা জায়েয হতে পারে, যদি নিম্নলিখিত শর্তগুলো পূরণ হয়:
১. উপহারটি যদি এমন কোনো প্রতিষ্ঠান দেয় যার সাথে আপনার কাজের কোনো সম্পর্ক নেই (যেমন: কোনো অজানা ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান যা কখনো আপনার অফিসে আসে না)।
২. এটি যদি সকল কর্মচারীকে একইভাবে দেওয়া হয় এবং কোনো কাজের প্রতিদান বা ভবিষ্যতে কোনো সুবিধা পাওয়ার আশা না থাকে।
৩. উপহার দেওয়ার প্রথা যদি প্রতিষ্ঠানের সাধারণ নীতি হয় এবং তা সরকারি নিয়মের পরিপন্থী না হয়।
৪. তবে প্রশ্নে বর্ণিত অবস্থায়, যেহেতু প্রতিষ্ঠানগুলো আপনার ডেস্কে আসে এবং তাদের সাথে কাজের সম্পর্ক রয়েছে, তাই তা গ্রহণ করা জায়েয হবে না।
ব্যবহারিক পরামর্শ:
১. আপনি নম্রভাবে উপহার ফিরিয়ে দিন বা অফিসের সাধারণ তহবিলে জমা দিন।
২. যদি ফিরিয়ে দেওয়া কঠিন হয় (সামাজিকভাবে), তবে তা গ্রহণ করে কোনো গরিবকে দান করে দিন (সাদাকা করে দিন)। তবে নিজে ব্যবহার করবেন না।
৩. অফিসের নিয়ম অনুযায়ী, এসব উপহার গ্রহণ করা সরকারি বিধি-নিষেধেরও পরিপন্থী। তাই শরিয়তের পাশাপাশি সরকারি নিয়ম মেনে চলাও জরুরি।
সারসংক্ষেপ:
- সরকারি চাকরিজীবীর জন্য কাজের সাথে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে কোনো উপহার (খাদ্য সামগ্রী হোক বা নগদ) গ্রহণ করা নাজায়েয এবং ঘুষের শামিল।
- বিশেষ করে সিগারেট উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের উপহার গ্রহণ করা আরও অনুচিত, কারণ তাদের মূল ব্যবসা হারাম।
- তাই আপনার জন্য উচিত হবে এসব খাদ্য সামগ্রী গ্রহণ না করা এবং প্রয়োজন হলে তা সাদাকা করে দেওয়া।
মহান আল্লাহ আমাদের সকলকে হালাল ও হারামের মধ্যে পার্থক্য করার তাওফিক দান করুন এবং ঘুষ ও খিয়ানত থেকে হেফাজত করুন।
والله أعلم بالصواب
জাযাকাল্লাহু খইরন