অংশীদারি ব্যবসায় নিজস্ব অর্থ দিয়ে কম দামে ডলার ক্রয় করে বেশি দামে বিক্রি করে মুনাফা অর্জনের শরয়ি বিধান কী?
Halal and Haram · Hanafi
Question
মুহতারাম হযরত মুফতি সাহেব, দা-মাত বারাকাতুহুম।
হযরত, কয়েকজন ব্যক্তি মিলে একটি পেমেন্ট গেটওয়ে-সংক্রান্ত ব্যবসা পরিচালনা করছেন। এর মাধ্যমে বাংলাদেশি ফ্রিল্যান্সারদের বিদেশি ক্লায়েন্টদের কাছ থেকে ডলারে পেমেন্ট গ্রহণের ব্যবস্থা করা হয় এবং বাংলাদেশে উক্ত ডলারের বিপরীতে টাকা পরিশোধ করা হয়।
ব্যবসার একজন অংশীদার (A) বিদেশে পেমেন্ট গ্রহণের কার্যক্রম পরিচালনা করেন এবং অন্য অংশীদার (B) বাংলাদেশে ফ্রিল্যান্সারদের পাওনা পরিশোধ করেন।
কিন্তু অনেক সময় বিদেশ থেকে ব্যাংকিং চ্যানেলে অর্থ বাংলাদেশে পৌঁছাতে কয়েক দিন বিলম্ব হয়। ফলে ফ্রিল্যান্সারদের পাওনা পরিশোধের জন্য সাময়িক অর্থসংকট দেখা দেয়।
এমতাবস্থায় অংশীদার B নিজের ব্যক্তিগত অর্থ দিয়ে ব্যবসার ডলার বাজারদরের চেয়ে কিছুটা কম মূল্যে ক্রয় করেন।
উদাহরণস্বরূপ, বাজারে প্রতি ডলারের মূল্য ১২২ টাকা হলে তিনি ১২০ টাকা দরে ১,০০০ ডলার ক্রয় করে নিজের ব্যক্তিগত অর্থ থেকে ১,২০,০০০ টাকা ব্যবসায় প্রদান করেন। এই টাকা ফ্রিল্যান্সারদের পাওনা পরিশোধে ব্যবহৃত হয়।
পরবর্তী সময়ে B উক্ত ডলার বাজারদরে ১২২ টাকা হিসাবে বিক্রি করলে তাঁর ব্যক্তিগতভাবে ২,০০০ টাকা মুনাফা অর্জিত হয়।
এখানে উল্লেখ্য, B নিজেই ব্যবসার একজন অংশীদার এবং ব্যবসার যৌথ মূলধন থেকে নয়, বরং নিজের ব্যক্তিগত অর্থ দিয়ে ডলার ক্রয় করছেন।
হযরতের নিকট জানার বিষয়
একজন অংশীদার তাঁর নিজস্ব অংশীদারি ব্যবসার সাময়িক অর্থসংকট মেটানোর উদ্দেশ্যে ব্যক্তিগত অর্থ দিয়ে ব্যবসার ডলার বাজারদরের চেয়ে কম মূল্যে ক্রয় করে পরবর্তী সময়ে বিক্রয়ের মাধ্যমে ব্যক্তিগতভাবে মুনাফা অর্জন করতে পারবেন কি?
বিশেষত, ব্যবসার অন্য অংশীদারদের সম্মতিতে এ ধরনের লেনদেন করা হলে তা শরিয়তসম্মত হবে কি না এবং এক্ষেত্রে বিশেষ কোনো শরয়ি শর্ত অনুসরণ করা আবশ্যক কি না, সে বিষয়ে হযরতের দিকনির্দেশনা কামনা করছি।
আমাদের উদ্দেশ্য হলো, সুদ ও অন্যান্য শরিয়তবিরোধী লেনদেন থেকে মুক্ত থেকে হালালভাবে ব্যবসা পরিচালনা করা।
আল্লাহ তাআলা আপনাকে উত্তম প্রতিদান দান করুন।
জাযাকুমুল্লাহু খাইরান।
والسلام مع الإكرام
Answer
প্রশ্নোক্ত লেনদেনের শরয়ি বিধান
** উত্তর:** প্রশ্নোক্ত পদ্ধতিতে অংশীদার B-এর নিজস্ব অর্থ দিয়ে ব্যবসার জন্য ডলার ক্রয় করে পরে বাজারদরে বিক্রি করে মুনাফা অর্জন করা — শরিয়তসম্মত নয়। এটি সুদের শামিল।
সমস্যাটির মূল বিশ্লেষণ
প্রশ্নে বর্ণিত অবস্থায় দেখা যাচ্ছে:
- B ব্যবসার প্রয়োজনে নিজের পকেট থেকে ১,২০,০০০ টাকা দিয়ে ১,০০০ ডলার ক্রয় করছেন (১২০ টাকা দরে)।
- এই ডলার ব্যবসার কাজে লাগছে (ফ্রিল্যান্সারদের পাওনা পরিশোধে)।
- পরে B সেই ডলার ব্যবসার কাছে/বাজারে ১২২ টাকা দরে বিক্রি করে ২,০০০ টাকা মুনাফা নিচ্ছেন।
এখানে প্রকৃতপক্ষে যা ঘটছে তা হলো — B ব্যবসাকে ১,২০,০০০ টাকা ধার দিচ্ছেন এবং ফেরত নিচ্ছেন ১,২২,০০০ টাকা। মাঝখানে ডলার ক্রয়-বিক্রয়ের প্রক্রিয়াটি কেবল নামমাত্র (সুরত) — যা সুদ থেকে বাঁচার জন্য করা হচ্ছে, কিন্তু হাকিকতে তা সুদই থেকে যাচ্ছে।
শরয়ি দলিল ও ফিকহি ভিত্তি
(ক) সুদের সংজ্ঞা ও নিষেধাজ্ঞা
আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন:
وَأَحَلَّ اللَّهُ الْبَيْعَ وَحَرَّمَ الرِّبَا
"আল্লাহ ব্যবসাকে হালাল করেছেন এবং সুদকে হারাম করেছেন।" — (সূরা বাকারা: ২৭৫)
রাসূলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেন:
لَعَنَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ آكِلَ الرِّبَا وَمُوكِلَهُ وَكَاتِبَهُ وَشَاهِدَيْهِ، وَقَالَ: هُمْ سَوَاءٌ
"রাসূলুল্লাহ ﷺ সুদ খাওয়ানো, খাওয়ানোর আদেশদাতা, লেখক ও সাক্ষী — সকলের উপর লানত করেছেন এবং বলেছেন: তারা সবাই সমান (গুনাহগার)।" — (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১৫৯৮)
রাদ্দুল মুহতার-এ ইবনে আবিদীন শামি (রহ.) উল্লেখ করেন:
"সুদ থেকে বাঁচার জন্য যে ক্রয়-বিক্রয় করা হয়, তাতে যদি প্রকৃতপক্ষে ঋণদান ও অধিক গ্রহণের উদ্দেশ্য থাকে, তবে তা সুদ। কারণ বিবেচনা করা হয় উদ্দেশ্য ও মর্মের দিকে, শুধু বাহ্যিক আকৃতির দিকে নয়।" — (রাদ্দুল মুহতার, কিতাবুর রিবা, খণ্ড ৫, পৃ. ১৬৬)
ফাতাওয়া আলমগিরি-তে আছে:
"যদি কোনো ব্যক্তি অপরকে একশত টাকা ধার দেয় এই শর্তে যে, সে তার কাছ থেকে একশত দশ টাকার পণ্য ক্রয় করবে, তবে তা সুদ।" — (ফাতাওয়া আলমগিরি, কিতাবুল বাইয়ু, খণ্ড ৩, পৃ. ১৩৫)
হালাল বিকল্প পদ্ধতি
বিকল্প ১: মুদারাবা (লাভ-ক্ষতির অংশীদারিত্ব)
B যদি ব্যবসার সাময়িক অর্থসংকট মেটাতে চান, তবে তিনি মুদারাবা ভিত্তিতে অর্থ বিনিয়োগ করতে পারেন:
- B ব্যবসায় ১,২০,০০০ টাকা বিনিয়োগ করবেন।
- শর্ত থাকবে — লাভ হলে নির্দিষ্ট অনুপাতে (যেমন ৫০%-৫০%) ভাগ হবে।
- ক্ষতি হলে B ক্ষতির অংশ বহন করবেন (মূলধন থেকে)।
- এতে কোনো নির্দিষ্ট মুনাফা আগে থেকে নির্ধারণ করা যাবে না।
বিকল্প ২: প্রকৃত ক্রয়-বিক্রয় (সত্যিকারের মালিকানা সহ)
B যদি সত্যিকারভাবে ডলার ক্রয় করেন এবং ব্যবসার কাছে নয়, বরং বাজারে বিক্রি করেন — তবে তা জায়েয হবে। শর্ত:
- B নিজের নামে ডলার ক্রয় করবেন (ব্যবসার পক্ষ থেকে নয়)।
- ডলারের মালিকানা ও ঝুঁকি B-এর উপর থাকবে।
- B স্বাধীনভাবে বাজারে বিক্রি করবেন — ব্যবসার কাছে নির্দিষ্ট দামে নয়।
- ব্যবসার সাথে B-এর সম্পর্ক হবে কেবল ঋণদাতা-গ্রহীতা নয়, বরং স্বতন্ত্র ব্যবসায়ী হিসেবে।
বিকল্প ৩: ব্যবসার মূলধন বৃদ্ধি
B চাইলে ব্যবসার মূলধনে অতিরিক্ত বিনিয়োগ করতে পারেন (শরিকানা হিসেবে):
- B-এর অংশ বাড়বে।
- লাভ-ক্ষতি উভয়ই অংশ অনুপাতে ভাগ হবে।
- এতে কোনো নির্দিষ্ট মুনাফার নিশ্চয়তা থাকবে না — তাই সুদ হবে না।
বিকল্প ৪: কারযে হাসানা (নিঃস্বার্থ ঋণ)
B যদি ব্যবসাকে সহায়তা করতে চান, তবে কারযে হাসানা (নিঃস্বার্থ ঋণ) দিতে পারেন:
- ১,২০,০০০ টাকা ঋণ দেবেন।
- ফেরত নেবেন ঠিক ১,২০,০০০ টাকা — কোনো অতিরিক্ত নয়।
- এতে সওয়াব হবে এবং সুদ থেকে মুক্ত থাকবেন।
বিশেষ শরয়ি শর্তাবলি
যদি B প্রকৃত ক্রয়-বিক্রয়ের মাধ্যমে মুনাফা করতে চান, তবে নিম্নলিখিত শর্তাবলি অবশ্যই পালন করতে হবে:
- সতন্ত্র মালিকানা: ডলার ক্রয়ের সময় B-এর নিজস্ব মালিকানা ও ঝুঁকি প্রতিষ্ঠিত হতে হবে।
- কবজা (দখল): ডলার ক্রয়ের পর B-এর প্রকৃত দখলে আসতে হবে (হানাফি মতে, ফরেক্সে কবজা আবশ্যক)।
- স্বতন্ত্র বিক্রয়: বিক্রয়টি ব্যবসার কাছে নয়, বরং তৃতীয় পক্ষের কাছে হতে হবে — অথবা ব্যবসার কাছে হলে তা বাজারদরে প্রকৃত বিক্রয় হতে হবে, পূর্বশর্তযুক্ত নয়।
- পূর্বশর্ত না থাকা: "আমি তোমাকে ১,২০,০০০ টাকা দেব, তুমি আমাকে ১,২২,০০০ টাকা ফেরত দেবে" — এমন পূর্বশর্ত থাকা যাবে না।
- ঝুঁকি বহন: ডলারের মূল্য কমে গেলে B-কে ক্ষতি বহন করতে হবে — এতে কোনো গ্যারান্টি থাকবে না যে তিনি সবসময় লাভ করবেন।
ফ্রিল্যান্সারদের পেমেন্ট প্রসঙ্গে বিশেষ দৃষ্টিপাত
ফ্রিল্যান্সারদের বিদেশি ক্লায়েন্ট থেকে ডলারে পেমেন্ট গ্রহণ ও বাংলাদেশে টাকা পরিশোধ — এটি মূলত হাওয়ালা বা মানি ট্রান্সফার সেবা। এতে:
- ফ্রিল্যান্সারদের কাছ থেকে সার্ভিস চার্জ নেওয়া জায়েয (উজরাহ/কমিশন)।
- তবে ডলার ক্রয়-বিক্রয়ের নামে সুদি লেনদেন করা যাবে না।
- ফ্রিল্যান্সারদের পাওনা পরিশোধে বিলম্ব হলে তা তাদের সাথে সম্মত থাকলে সমস্যা নেই, তবে বিলম্বের জন্য অতিরিক্ত কিছু নেওয়া যাবে না।
-দেশীয় আইন বিরোধী কিছু করা যাবেনা।