"তুমি ওকে নিয়ে থাকো, নইলে আমাকে নিয়ে"—এ ধরনের কথায় তালাক হয় কি না?

Family Life · Hanafi

Question No: 7169
Questioner: Khadija
Question Asked: 20 Oct 2026, 09:30 PM
Reviewed & Published: 20 Oct 2026, 09:51 PM
Views: 46
Tokens: 6,810
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আমার মনে সবসময় সন্দেহ হয়, স্বামী কোনো দ্বিতীয় বিয়ে করেছে কি না। করলেও আমি কোনোদিন তালাক চাই না, মানে স্বামীর কাছ থেকে আমার তালাক চাই না। আমি স্বামীকে সবসময় বলি, তুমি দ্বিতীয় বিয়ে করলে আমাকে বলো, আমি আমার মতো থাকব, তুমি তোমার স্ত্রীকে নিয়ে থাকো বা থাকিও—এসব বলতাম। আর এটাও চাইতাম মনে মনে, মানে এমন কিছু হলেও যেন দ্বিতীয় স্ত্রীকে ছেড়ে দেয়। এটাও মনে মনে আসত।

আজকে বলতেছিলাম, আবার তুমি দ্বিতীয় বিয়ে করলে ওকে নিয়ে থাকো। দুজনকে নিয়ে সুখে থাকতে পারবা না। হয় ওই মেয়েকে নিয়ে থাকো, নইলে আমাকে নিয়ে। এই কথা বলার সময় নিজেকে তালাক দেওয়ার কথা মনে আসেনি। আসছিল, ওই মহিলাকে যেন তালাক দেয়। তারপর বলি, আমি এমনভাবে থাকতে চাই, যেন তোমার কোনো অস্তিত্বই না থাকে আমার লাইফে। তারপর স্বামী আমাকে জড়িয়ে ধরে। আমি আবার বলি, আমি এমনভাবে বাঁচতে চাই, যেন তুমি আমার জন্য মারা গেছ।

আমাকে তালাকের ক্ষমতা দেওয়া আছে। এসব কথার কারণে কি কোনো সমস্যা হবে?

আমি একবার স্বামীকে বলেছিলাম, আগে দ্বিতীয় বিয়ে করলে আমি আল্লাহর কাছে চাইব, ওই মেয়ের সঙ্গে তোমার যেন ডিভোর্স হয়ে যায়। স্বামী বলে, অন্যের ক্ষতি চাইলে নিজের দিকে আসে। এটা বলায় কি কোনো সমস্যা হয়? মানে, কথার কথা, অন্যের ক্ষতি না চাওয়ার জন্য বলেছে।

Answer

প্রশ্নোক্ত কথাগুলোর কারণে তালাক পতিত হবে কি না?

সংক্ষিপ্ত উত্তর: না, প্রশ্নে উল্লেখিত কথাগুলোর কোনো একটির দ্বারাও আপনার ওপর তালাক পতিত হয়নি। তবে ভবিষ্যতে এ ধরনের স্পষ্ট শব্দ (যেমন—"আমাকে তালাক দাও", "আমি তালাক চাই") ব্যবহার থেকে বিরত থাকা কর্তব্য; কেননা তালাকের শব্দ মুখে উচ্চারণ করা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।


বিস্তারিত আলোচনা

১. তালাকের শর্ত ও শব্দের প্রকারভেদ

তালাক সংঘটিত হওয়ার জন্য দুটি বিষয় জরুরি:

  • (ক) স্বামী কর্তৃক তালাকের শব্দ উচ্চারণ (বা লিখন/স্পষ্ট ইশারা), এবং
  • (খ) শব্দটি তালাকের অর্থে প্রযোজ্য হওয়া।

হানাফি ফিকহে তালাকের শব্দ দুই প্রকার:

  1. সরীহ (স্পষ্ট) — যেমন: "তুমি তালাক", "তোমাকে তালাক দিলাম", "আমি তালাক দিলাম" ইত্যাদি। এতে নিয়তের প্রয়োজন নেই; শব্দ উচ্চারিত হলেই তালাক পতিত হয়।
  2. কিনায়া (অস্পষ্ট/ইঙ্গিতমূলক) — যেমন: "তুমি নিজের ঘরে চলে যাও", "আমি তোমাকে ছেড়ে দিলাম", "তোমার সাথে আমার কোনো সম্পর্ক নেই" ইত্যাদি। এতে তালাকের নিয়ত বা পরিস্থিতির قرينة (সূচক) থাকলে তালাক পতিত হয়, নইলে নয়।

দলিল: আল্লাহ তা'আলা বলেন—

"তালাক দুইবার।" (সূরা বাকারা: ২২৯)

রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন—

"নিশ্চয়ই আল্লাহ তা'আলা তালাককে হালাল করেছেন, কিন্তু আল্লাহর কাছে তালাকের চেয়ে বেশি অপছন্দনীয় কোনো হালাল বস্তু নেই।" — (সুনানে আবু দাউদ: ২১৭৮; সুনানে ইবনে মাজাহ: ২০১৮)

ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর উসূল অনুযায়ী, সরীহ শব্দে নিয়ত লাগে না, কিনায়া শব্দে নিয়ত বা قرينة লাগে। (আল-হিদায়া, কিতাবুত তালাক; রাদ্দুল মুহতার: ৩/২৩০-২৩৫)


২. আপনার কথাগুলোর বিশ্লেষণ

আপনি যে কথাগুলো বলেছেন, সেগুলো এক এক করে দেখা যাক:

(ক) "তুমি দ্বিতীয় বিয়ে করলে আমাকে বলো, আমি আমার মতো থাকব, তুমি তোমার স্ত্রীকে নিয়ে থাকো"

  • এখানে তালাকের কোনো শব্দ নেই; বরং ভবিষ্যতের একটি শর্তসাপেক্ষ বর্ণনা। এটি তালাকের সরীহ শব্দ নয়, কিনায়াও নয়। তালাক পতিত হয়নি।

(খ) "হয় ওই মেয়েকে নিয়ে থাকো, নইলে আমাকে নিয়ে"

  • এটি একটি শর্ত/বিকল্পের কথা। এতে তালাকের কোনো স্পষ্ট শব্দ নেই। আপনি নিজেও বলেছেন—"এই কথা বলার সময় নিজেকে তালাক দেওয়ার কথা মনে আসেনি; আসছিল, ওই মহিলাকে যেন তালাক দেয়।"
  • যেহেতু শব্দটি তালাকের সরীহ শব্দ নয় এবং আপনার নিয়তও নিজের তালাকের ছিল না, বরং দ্বিতীয় স্ত্রীর তালাকের ছিল—সুতরাং আপনার ওপর তালাক পতিত হয়নি।

(গ) "আমি এমনভাবে থাকতে চাই, যেন তোমার কোনো অস্তিত্বই না থাকে আমার লাইফে" / "আমি এমনভাবে বাঁচতে চাই, যেন তুমি আমার জন্য মারা গেছ"

  • এগুলো তালাকের শব্দ নয়; বরং মানসিক অসন্তোষ ও অভিমানের প্রকাশ। এতে তালাকের কোনো সরীহ বা কিনায়া শব্দ নেই। তালাক পতিত হয়নি।

(ঘ) "আগে দ্বিতীয় বিয়ে করলে আমি আল্লাহর কাছে চাইব, ওই মেয়ের সঙ্গে তোমার যেন ডিভোর্স হয়ে যায়"

  • এটি দ্বিতীয় স্ত্রীর তালাকের জন্য দু'আ/কামনার কথা। এতে আপনার নিজের তালাকের কোনো শব্দ নেই। আপনার ওপর তালাক পতিত হয়নি।
  • স্বামীর জবাব—"অন্যের ক্ষতি চাইলে নিজের দিকে আসে"—এটি একটি উপদেশমূলক কথা, তালাকের শব্দ নয়। এতেও তালাক হয়নি।

৩. গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা

যদিও প্রশ্নোক্ত কথাগুলোতে তালাক পতিত হয়নি, তবুও কয়েকটি বিষয় মনে রাখা জরুরি:

  1. তালাকের শব্দ মুখে উচ্চারণ করা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। অনেক সময় রাগ বা অভিমানে বলা কথায় তালাক পতিত হয়ে যায়, যা পরে অনুতাপের কারণ হয়। তাই "তালাক", "ছেড়ে দিলাম", "আমার সাথে থাকার দরকার নেই" ইত্যাদি শব্দ সচেতনভাবে এড়িয়ে চলুন।

  2. স্বামীকে দ্বিতীয় বিয়ের অনুমতি দেওয়ার মতো কথা বলা: শরীয়তে স্বামীর দ্বিতীয় বিয়ে করা বৈধ (শর্তসাপেক্ষে), তবে স্ত্রীর জন্য তা কষ্টদায়ক হলে সে অনুভব প্রকাশ করতে পারে, দু'আ করতে পারে। কিন্তু "তুমি বিয়ে করলে আমি তালাক চাইব না, তুমি তোমার স্ত্রীকে নিয়ে থাকো"—এ ধরনের কথা বারবার বলা ঠিক নয়; এতে পারিবারিক সম্পর্কে টানাপোড়েন বাড়ে।

  3. "আমাকে তালাকের ক্ষমতা দেওয়া আছে" — আপনি বলেছেন আপনার কাছে তালাকের ক্ষমতা (তালাক-ই-তাফবীয) আছে। এমতাবস্থায়ও আপনার নিজের মুখ থেকে তালাকের শব্দ উচ্চারিত না হলে তালাক পতিত হয় না। তবে তাফবীযের শর্ত ও শব্দগুলো স্পষ্টভাবে জানা থাকা উচিত। প্রয়োজনে আপনার বিবাহের সময়ের শর্তগুলো (যা লিখিত বা মৌখিকভাবে দেওয়া হয়েছে) একজন মুফতি সাহেবকে দেখিয়ে নিশ্চিত হয়ে নিন।


৪. উপসংহার

  • প্রশ্নে উল্লেখিত কোনো কথার দ্বারা আপনার ওপর তালাক পতিত হয়নি।
  • আপনার বিবাহ এখনো বহাল আছে; স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক পূর্বের মতোই বৈধ।
  • ভবিষ্যতে তালাকের শব্দ বা তালাকের অর্থবহ কোনো কথা বলা থেকে বিরত থাকুন।
  • পারিবারিক বিষয়ে মতানৈক্য হলে ধৈর্য ধারণ করুন, দু'আ করুন এবং সম্ভব হলে কোনো বিশ্বস্ত আলেম/মুফতির পরামর্শ নিন।

আল্লাহ তা'আলা আপনার সংসারকে বরকতময় করুন এবং শয়তানের কুমন্ত্রণা থেকে হেফাজত করুন। আমিন।


আরবি সারসংক্ষেপ (খুলাসা)

السؤال: هل يقع الطلاق بقول الزوجة لزوجها: "إن تزوجت ثانية فخُذها أو خُذني"، وقولها: "أريد أن أعيش كأنك ميت"، وقولها: "أدعو الله أن يطلق امرأتك الثانية"؟

الجواب: لا يقع الطلاق بشيء من هذه الأقوال؛ لأنها ليست من ألفاظ الطلاق الصريحة ولا الكنائية المقترنة بالنية أو القرينة. والطلاق لا يقع إلا باللفظ الصريح أو الكنائي مع النية أو دلالة الحال. قال الله تعالى: «الطَّلَاقُ مَرَّتَانِ» (البقرة: ২২৯). وفي الحديث: «أبغض الحلال إلى الله الطلاق» (أبو داود: ২১৭৮). وعليه فالنكاح باقٍ على حاله، وينبغي للزوجة أن تجتنب ألفاظ الطلاق، وأن تصبر وتدعو الله، وتراجع أهل العلم عند الحاجة. (الهداية، كتاب الطلاق؛ رد المحتار: ৩/২৩০ وما بعدها؛ الفتاوى الهندية: ১/৩৭৫)


আল্লাহ সর্বজ্ঞ।


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.