সহীহ বুখারির ফিতনা অধ্যায়ের ৭০৮১ নং হাদীস- উপবিষ্ট ব্যক্তি উত্তম, আশ্রয়ের স্থান, ফিতনা থেকে বাঁচার উপায়, ইত্যাদির ব্যাখ্যা কি হতে পারে?
Sunnah and Bid'ah · Hanafi
Question
উপবিষ্ট, হেঁটে চলা, ধাবমান ব্যাক্তি দ্বারা কী বোঝানো হয়েছে? আশ্রয়ের/নিরাপদ জায়গা কোথায়? ইত্যাদি।
মোট কথা, পুরো হাদিসের ব্যাখ্যা কী হবে?
Answer
সহীহ বুখারির ৭০৮১ নং হাদিসের ব্যাখ্যা
প্রশ্নের বিবরণ
প্রশ্নকারী সহীহ বুখারির ৭০৮১ নং হাদিস সম্পর্কে জানতে চেয়েছেন, যেখানে "উপবিষ্ট ব্যক্তি হেঁটে চলা ব্যক্তি হতে উত্তম হবে" এবং "আশ্রয়ের জায়গা পায়... আশ্রয় গ্রহণ করে" সম্পর্কে আলোচনা রয়েছে।
হাদিসটি কী?
সহীহ বুখারির ৭০৮১ নং হাদিসটি ফিতনা (বিশৃঙ্খলা) সম্পর্কিত অধ্যায়ের অন্তর্ভুক্ত। হাদিসটি নিম্নরূপ:
"উপবিষ্ট ব্যক্তি হেঁটে চলা ব্যক্তি হতে উত্তম হবে" — এটি বুখারির ফিতনা অধ্যায়ের একটি হাদিস:
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ، أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: "سَيَكُونُ فِتَنٌ، الْقَاعِدُ فِيهَا خَيْرٌ مِنَ الْقَائِمِ، وَالْقَائِمُ فِيهَا خَيْرٌ مِنَ الْمَاشِي، وَالْمَاشِي فِيهَا خَيْرٌ مِنَ السَّاعِي، مَنْ تَشَرَّفَ لَهَا تَسْتَشْرِفْهُ، فَمَنْ وَجَدَ مَلْجَأً أَوْ مَعَاذًا فَلْيَعُذْ بِهِ"
অনুবাদ: অচিরেই এমন ফিতনা (বিশৃঙ্খলা) আসবে, তখন উপবিষ্ট ব্যক্তি দণ্ডায়মান ব্যক্তি হতে উত্তম হবে, দণ্ডায়মান ব্যক্তি পদব্রজে চলা ব্যক্তি হতে উত্তম হবে, পদব্রজে চলা ব্যক্তি দৌড়ানো ব্যক্তি হতে উত্তম হবে। যে ব্যক্তি ফিতনার প্রতি আকৃষ্ট হবে, ফিতনা তাকে গ্রাস করবে। সুতরাং যে ব্যক্তি আশ্রয়স্থল বা নিরাপদ স্থান পায়, সে যেন সেখানে আশ্রয় গ্রহণ করে।
হাদিসের ব্যাখ্যা
১. "উপবিষ্ট, হেঁটে চলা, ধাবমান ব্যক্তি" দ্বারা কী বোঝানো হয়েছে?
ইমাম ইবনে হাজার আসকালানি (রহ.) ফাতহুল বারীতে এই হাদিসের ব্যাখ্যায় বলেন:
এই শব্দগুলো ফিতনায় অংশগ্রহণের মাত্রা নির্দেশ করে। অর্থাৎ:
- উপবিষ্ট (القاعد): যে ব্যক্তি ফিতনায় জড়িত হয় না, ঘরে বসে থাকে, ফিতনা থেকে দূরে থাকে।
- দণ্ডায়মান (القائم): যে ব্যক্তি ফিতনার সময় দাঁড়িয়ে পড়ে, অর্থাৎ ফিতনার প্রতি মনোযোগী হয়।
- হেঁটে চলা (الماشي): যে ব্যক্তি ফিতনার দিকে অগ্রসর হয়।
- ধাবমান/দৌড়ানো (الساعي): যে ব্যক্তি ফিতনায় সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করে, ফিতনা ছড়াতে দৌড়ায়।
মূল কথা: ফিতনার সময় যত বেশি কেউ ফিতনা থেকে দূরে থাকবে, সে তত বেশি নিরাপদ থাকবে। ফিতনায় যত বেশি জড়াবে, ক্ষতির সম্মুখীন হওয়ার আশঙ্কা তত বেশি।
২. "আশ্রয়ের জায়গা" কোথায়?
হাদিসে বলা হয়েছে: "যে ব্যক্তি আশ্রয়স্থল বা নিরাপদ স্থান পায়, সে যেন সেখানে আশ্রয় গ্রহণ করে।"
আশ্রয়ের স্থান বলতে কী বোঝানো হয়েছে তা নিয়ে আলেমদের মতামত:
ক. শারীরিক আশ্রয়: পাহাড়, মরুভূমি, নির্জন স্থান — যেখানে গিয়ে ফিতনা থেকে দূরে থাকা যায়। যেমনটি অন্য হাদিসে এসেছে — "সর্বোত্তম সম্পদ হবে ছাগল, যা নিয়ে পাহাড়ের চূড়ায় চলে যাবে।"
খ. দ্বীনি আশ্রয়: মসজিদ, দ্বীনি পরিবেশ, আলেমদের সাহচর্য — যেখানে গিয়ে দ্বীনকে হেফাজত করা যায়।
গ. আধ্যাত্মিক আশ্রয়: আল্লাহর কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করা। যেমন হাদিসে এসেছে, ফিতনা থেকে বাঁচার দোয়া শেখানো হয়েছে:
اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ مِنْ فِتْنَةِ النَّارِ وَعَذَابِ النَّارِ، وَفِتْنَةِ الْقَبْرِ وَعَذَابِ الْقَبْرِ، وَمِنْ فِتْنَةِ الْغِنَى، وَمِنْ فِتْنَةِ الْفَقْرِ، وَأَعُوذُ بِكَ مِنْ فِتْنَةِ الْمَسِيحِ الدَّجَّالِ
অর্থ: "হে আল্লাহ! আমি আপনার কাছে আশ্রয় চাই জাহান্নামের ফিতনা থেকে এবং জাহান্নামের আযাব থেকে, কবরের ফিতনা থেকে এবং কবরের আযাব থেকে, সম্পদের ফিতনা থেকে এবং দারিদ্র্যের ফিতনা থেকে, এবং আমি আপনার কাছে আশ্রয় চাই মাসীহ দাজ্জালের ফিতনা থেকে।"
৩. ফিতনা থেকে বাঁচার উপায়
ইমাম নববী (রহ.) বলেন: ফিতনার সময় মুমিনের কর্তব্য হলো ফিতনা থেকে দূরে থাকা, ফিতনায় অংশ না নেওয়া, এবং সম্ভব হলে ফিতনার স্থান ত্যাগ করা।
মুফতি মুহাম্মদ শফি (রহ.) মা'আরিফুল কুরআনে বলেন: ফিতনার সময় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো দ্বীনকে হেফাজত করা। দুনিয়ার স্বার্থে দ্বীনকে বিসর্জন দেওয়া যাবে না।
মুফতি তাকি উসমানি (দামাত বারাকাতুহুম) বলেন: ফিতনার যুগে মুমিনের কর্তব্য হলো:
- ফিতনায় অংশ না নেওয়া
- ফিতনা সৃষ্টিকারীদের থেকে দূরে থাকা
- নিজের দ্বীন ও ইবাদতকে সুরক্ষিত রাখা
- পরিবার-পরিজনকে ফিতনা থেকে রক্ষা করা
৪. "যে ব্যক্তি ফিতনার প্রতি আকৃষ্ট হবে, ফিতনা তাকে গ্রাস করবে"
এর অর্থ হলো — যে ব্যক্তি ফিতনার প্রতি আগ্রহ দেখাবে, ফিতনায় জড়ানোর ইচ্ছা পোষণ করবে, ফিতনা তাকে ধ্বংস করে দেবে। যেমনটি আমরা ইতিহাসে দেখি — যারা ফিতনায় জড়িয়েছে, তারা শেষ পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
ফিতনা সম্পর্কে অন্যান্য হাদিসের আলোকে ব্যাখ্যা
সহীহ মুসলিমের হাদিসে এসেছে:
عَنْ حُذَيْفَةَ بْنِ الْيَمَانِ قَالَ: كَانَ النَّاسُ يَسْأَلُونَ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ عَنِ الْخَيْرِ، وَكُنْتُ أَسْأَلُهُ عَنِ الشَّرِّ مَخَافَةَ أَنْ يُدْرِكَنِي، فَقُلْتُ: يَا رَسُولَ اللَّهِ، إِنَّا كُنَّا فِي جَاهِلِيَّةٍ وَشَرٍّ، فَجَاءَنَا اللَّهُ بِهَذَا الْخَيْرِ، فَهَلْ بَعْدَ هَذَا الْخَيْرِ مِنْ شَرٍّ؟ قَالَ: "نَعَمْ" قُلْتُ: وَهَلْ بَعْدَ ذَلِكَ الشَّرِّ مِنْ خَيْرٍ؟ قَالَ: "نَعَمْ، وَفِيهِ دَخَنٌ" قُلْتُ: وَمَا دَخَنُهُ؟ قَالَ: "قَوْمٌ يَهْدُونَ بِغَيْرِ هَدْيِي، يَعْرِفُ مِنْهُمْ وَيُنْكِرُ" قُلْتُ: فَهَلْ بَعْدَ ذَلِكَ الْخَيْرِ مِنْ شَرٍّ؟ قَالَ: "نَعَمْ، دُعَاةٌ عَلَى أَبْوَابِ جَهَنَّمَ، مَنْ أَجَابَهُمْ إِلَيْهَا قَذَفُوهُ فِيهَا"
অনুবাদ: হুযাইফা (রা.) বলেন, লোকেরা রাসূলুল্লাহ (সা.)-কে কল্যাণ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করত, আর আমি অকল্যাণ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করতাম — এই ভয়ে যে, তা আমাকে পেয়ে বসতে পারে। আমি বললাম: হে আল্লাহর রাসূল! আমরা জাহিলিয়াত ও অকল্যাণের মধ্যে ছিলাম, আল্লাহ আমাদের এ কল্যাণ দান করেছেন। এ কল্যাণের পর কি কোনো অকল্যাণ আসবে? তিনি বললেন: হ্যাঁ। আমি বললাম: সে অকল্যাণের পর কি কোনো কল্যাণ আসবে? তিনি বললেন: হ্যাঁ, তবে তাতে ধোঁয়াশা থাকবে। আমি বললাম: তার ধোঁয়াশা কী? তিনি বললেন: এমন এক সম্প্রদায় যারা আমার পথ অনুসরণ করবে না, তাদের কিছু কাজ চেনা যাবে (সঠিক) এবং কিছু কাজ অস্বীকার করতে হবে (ভুল)। আমি বললাম: সে কল্যাণের পর কি কোনো অকল্যাণ আছে? তিনি বললেন: হ্যাঁ, জাহান্নামের দরজায় আহ্বানকারী, যারা তাদের ডাকে সাড়া দেবে, তারা তাদেরকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করবে।
ফিতনার যুগে করণীয় সম্পর্কে ফুকাহাদের মতামত
ইমাম আবু হানিফা (রহ.) এর নীতি ছিল — ফিতনা থেকে দূরে থাকা। তিনি ফিতনার সময় কোনো পক্ষে অংশ না নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন।
ইমাম আবু ইউসুফ (রহ.) বলেন: ফিতনার সময় মুমিনের কর্তব্য হলো নীরব থাকা এবং ফিতনা থেকে দূরে থাকা।
ইমাম মুহাম্মদ (রহ.) বলেন: ফিতনার সময় নিজের ঘরে বসে থাকা, পরিবারের দেখাশোনা করা এবং ইবাদতে সময় কাটানো উত্তম।
আল্লামা ইবনে আবিদিন (রহ.) রদ্দুল মুহতারে বলেন: ফিতনার সময় মুমিনের জন্য উত্তম হলো ফিতনা থেকে দূরে থাকা এবং নিজের দ্বীনকে হেফাজত করা।
আমাদের করণীয়
১. ফিতনা থেকে দূরে থাকা: ফিতনার সময় কোনো পক্ষে অংশ না নেওয়া। ২. দ্বীনি জ্ঞান অর্জন: ফিতনা চেনার জন্য দ্বীনি জ্ঞান অর্জন করা। ৩. আল্লাহর কাছে আশ্রয় প্রার্থনা: ফিতনা থেকে বাঁচার জন্য দোয়া করা। ৪. সৎ সঙ্গী নির্বাচন: ভালো মানুষের সাহচর্য গ্রহণ করা। ৫. পরিবারকে সুরক্ষিত রাখা: নিজের পরিবার-পরিজনকে ফিতনা থেকে রক্ষা করা।
উপসংহার
এই হাদিসের মূল শিক্ষা হলো — ফিতনার যুগে মুমিনের কর্তব্য হলো ফিতনা থেকে দূরে থাকা এবং নিজের দ্বীনকে হেফাজত করা। ফিতনায় যত বেশি জড়াবে, ক্ষতির আশঙ্কা তত বেশি। ফিতনার সময় সবচেয়ে উত্তম কাজ হলো আল্লাহর কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করা এবং ফিতনা থেকে দূরে থাকার চেষ্টা করা।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে ফিতনা থেকে হেফাজত করুন। আমিন।