লাশের পাশে বা মৃত ব্যক্তির জন্য কোরআন তিলাওয়াত করা এবং এর সওয়াব মৃত ব্যক্তির কাছে পৌঁছানোর নিয়ত করার বিধান।
Sunnah and Bid'ah · Hanafi
Question
কেউ মারা গেলে তার বাসার মানুষ লাশ থাকা অবস্থাতে কোরআন পড়ে,পুরুষ এর লাশ নেওয়ার আগে সব মহিলারা একত্র হয়ে মোনাজাত নেয়,লাশ নিয়ে যাওয়ার পরে বাসার মহিলারা একটা নিয়মে গোসল করে,মৃত ব্যক্তির স্ত্রীকে সাদা কাপড় পড়ায়,৪দিন রান্না করতে নিষেদ করে এগুলো কি সুন্নাহসম্মত?
মৃত পুরুষ ব্যক্তির জন্য ও লাশ নেওয়ার পরে তার পরিবারের মানুষ এর জন্য সুন্নাত কি কি?
Answer
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
আপনার প্রশ্নের জন্য ধন্যবাদ। আপনি মৃত্যু সংক্রান্ত বেশ কিছু প্রচলিত রীতিনীতি সম্পর্কে জানতে চেয়েছেন। নিচে প্রতিটি বিষয়ের বিস্তারিত আলোচনা ও শরয়ী বিধান পেশ করা হলো:
১. লাশ থাকা অবস্থায় কোরআন তিলাওয়াত করা
উত্তর: লাশের পাশে বা মৃত ব্যক্তির জন্য কোরআন তিলাওয়াত করা এবং এর সওয়াব মৃত ব্যক্তির কাছে পৌঁছানোর নিয়ত করা জায়েয ও মুস্তাহাব। তবে এটি সুন্নাহ নয়, বরং এটি একটি উত্তম কাজ। হাদিসে এসেছে, মৃত ব্যক্তির জন্য সূরা ইয়াসিন পাঠ করা উৎসাহিত করা হয়েছে। (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ৩১২১; মুসনাদে আহমাদ: ৫/২৬)
তবে মনে রাখতে হবে, লাশের পাশে উচ্চস্বরে বা সমবেতভাবে কোরআন পড়ার কোনো প্রমাণ নেই। নীরবে বা আস্তে আস্তে পড়া উত্তম।
তবে কেহ কেহ এ পদ্ধতিকে বিদ'আত বলেছেন। এমতাবস্থায় তাদের মতানুসারীগন সেই মত অনুসারে আমল করতে পারেন।
২. পুরুষের লাশ নেওয়ার আগে মহিলাদের একত্র হয়ে মোনাজাত করা
উত্তর: এটি বিদআত। কারণ, মৃত ব্যক্তির জন্য দোয়া করা অবশ্যই উত্তম, কিন্তু নির্দিষ্ট সময়ে (লাশ নেওয়ার আগে) এবং নির্দিষ্ট পদ্ধতিতে (সব মহিলা একত্র হয়ে) মোনাজাত করার কোনো প্রমাণ শরিয়তে নেই। দোয়া করা যেকোনো সময়ই করা যায়, তবে একে আবশ্যকীয় বা নির্দিষ্ট রীতি বানিয়ে নেওয়া বিদআতের অন্তর্ভুক্ত।
৩. লাশ নেওয়ার পর মহিলাদের নির্দিষ্ট নিয়মে গোসল করা
উত্তর: লাশ বহন করার পর বা জানাযায় অংশ নেওয়ার পর গোসল করা জায়েয আছে, তবে এটি ওয়াজিব বা আবশ্যক নয়। যদি কারো মনে হয় লাশ স্পর্শ করার কারণে বা জানাযায় অংশ নেওয়ার কারণে তার উপর কোনো অপবিত্রতা এসেছে, তাহলে সে গোসল করতে পারে। কিন্তু একে বাধ্যতামূলক বা নির্দিষ্ট রীতি বানিয়ে নেওয়া ঠিক নয়। (ফাতাওয়া হিন্দিয়া, ১/১৩)
৪. মৃত ব্যক্তির স্ত্রীকে সাদা কাপড় পড়ানো
উত্তর: ইসলামি শরিয়তে ইদ্দত পালনকারী মহিলার জন্য নির্দিষ্ট রঙের কাপড় পড়া ইসলামের কোনো নীতি নয়।
এটি অনেকটা হিন্দুয়ানী সংস্কৃতি, যাহা পরিত্যাজ্য।
তবে উচিত হলো, ইদ্দতের সময় সাধারণ ও অলংকারহীন কাপড় পড়া। ইসলামে ইদ্দতের মূল উদ্দেশ্য হলো সাজসজ্জা ও অলংকার পরিহার করা, নির্দিষ্ট রঙের কাপড় নয়। (সূরা বাকারা: ২৩৪; ফাতাওয়া উসমানি, ২/৪৫৬)
৫. ৪ দিন রান্না করতে নিষেধ করা
উত্তর: মৃত্যুর পর ৪ দিন বা নির্দিষ্ট সময় রান্না বন্ধ রাখা সম্পূর্ণ বিদআত ও ভুল প্রথা। ইসলামে এমন কোনো বিধান নেই। বরং মৃতের পরিবারের জন্য খাবার পাঠানো এবং তাদের সান্ত্বনা দেওয়া মুস্তাহাব। হাদিসে এসেছে, নবীজি (সা.) জাফর (রা.)-এর পরিবারের জন্য খাবার পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছিলেন। (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ৩১৩২; তিরমিজি, হাদিস: ৯৯৮)
৬. মৃত ব্যক্তি ও তার পরিবারের জন্য সুন্নাহসম্মত কাজসমূহ
মৃত ব্যক্তির জন্য এবং তার পরিবারের জন্য নিম্নলিখিত কাজগুলো সুন্নাহসম্মত:
১. মৃত ব্যক্তির চোখ বন্ধ করে দেওয়া এবং তার জন্য দোয়া করা। ২. মৃত ব্যক্তির শরীর ঢেকে দেওয়া। ৩. মৃত ব্যক্তিকে গোসল দেওয়া এবং কাফন পরানো। ৪. মৃত ব্যক্তির জন্য জানাযার নামাজ পড়া এবং দাফন করা। ৫. দাফনের পর মৃত ব্যক্তির জন্য দোয়া ও ইস্তিগফার করা। ৬. মৃতের পরিবারকে সান্ত্বনা দেওয়া এবং তাদের জন্য খাবার পাঠানো। ৭. মৃত ব্যক্তির জন্য দোয়া করা এবং তার ঋণ পরিশোধ করা। ৮. মৃত ব্যক্তির পক্ষ থেকে সদকা করা (যদি সম্ভব হয়)। ৯. মৃতের পরিবারের জন্য терпение (সবর) করার উপদেশ দেওয়া।
মৃত ব্যক্তির জন্য দোয়া: اللَّهُمَّ اغْفِرْ لَهُ وَارْحَمْهُ وَعَافِهِ وَاعْفُ عَنْهُ (উচ্চারণ: আল্লাহুম্মাগফির লাহু ওয়ারহামহু ওয়া আফিহি ওয়া'ফু আনহু) (অর্থ: হে আল্লাহ! তাকে ক্ষমা করুন, তার উপর রহম করুন, তাকে নিরাপদ রাখুন এবং তাকে মাফ করে দিন।) (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ৯৬৩)
মৃতের পরিবারকে সান্ত্বনা দেওয়ার দোয়া: إِنَّ لِلَّهِ مَا أَخَذَ وَلَهُ مَا أَعْطَى وَكُلُّ شَيْءٍ عِنْدَهُ بِأَجَلٍ مُسَمًّى (উচ্চারণ: ইন্না লিল্লাহি মা আখাযা, ওয়া লাহু মা আ'তা, ওয়া কুল্লু শাইয়িন ইনদাহু বিআজালিন মুসাম্মা) (অর্থ: নিশ্চয়ই আল্লাহ যা নিয়েছেন তা তারই, আর যা দিয়েছেন তাও তারই, এবং প্রতিটি জিনিসের জন্য তার কাছে নির্ধারিত সময় রয়েছে।) (সহিহ বুখারি, হাদিস: ১২৮৪)
আল্লাহ তায়ালা আমাদের সবাইকে সুন্নাহ মোতাবেক আমল করার তাওফিক দান করুন। (আমিন)