কমিশনভিত্তিক রিসেলার সিস্টেমের শরয়ি বিধান।

Business and Job · Ahle Hadith / Salafi

Question No: 4115
Questioner: Mizanur Rahman
Question Asked: 18 Aug 2026, 08:55 AM
Reviewed & Published: 18 Aug 2026, 09:23 AM
Views: 28
Tokens: 8,930
This answer is according to the 'Ahle Hadith / Salafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

কমিশনভিত্তিক রিসেলার সিস্টেমের শরয়ি বিধান সম্পর্কে প্রশ্ন

আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ।

আমাদের একটি ইসলামিক অনলাইন বুকশপ রয়েছে। আমরা কমিশনভিত্তিক রিসেলার সিস্টেম চালু করতে চাই। প্রস্তাবিত এই ব্যবসায়িক পদ্ধতিটি ইসলামী শরিয়তের দৃষ্টিতে জায়েজ কি না—এ বিষয়ে আপনাদের কাছ থেকে শরয়ি দিকনির্দেশনা কামনা করছি।

আমাদের প্রস্তাবিত সিস্টেমটি হলো—

১. একজন রিসেলার আমাদের কাছ থেকে কোনো বই আগে থেকে কিনে নিজের কাছে স্টক করবে না এবং বইয়ের মালিকও হবে না।

২. রিসেলার নিজস্ব কাস্টমারদের কাছ থেকে বইয়ের অর্ডার সংগ্রহ করে আমাদের কাছে পাঠাবে।

৩. এরপর আমরা নিজেদের পক্ষ থেকে সংশ্লিষ্ট বই প্রস্তুত, প্যাকেজিং ও কুরিয়ারে পাঠানোর যাবতীয় কার্যক্রম সম্পন্ন করব।

৪. কাস্টমারের কাছ থেকে পণ্যের মূল্য কুরিয়ার/ডেলিভারি সিস্টেমের মাধ্যমে সরাসরি আমাদের প্রতিষ্ঠানের নির্ধারিত একাউন্টে জমা হবে।

৫. প্রতিটি সফল অর্ডারের বিপরীতে রিসেলারকে পূর্বনির্ধারিত হারে কমিশন প্রদান করা হবে।

৬. অর্থাৎ, রিসেলার মূলত আমাদের অনুমোদিত প্রতিনিধি/এজেন্ট হিসেবে কাস্টমারের কাছ থেকে অর্ডার সংগ্রহ করবে এবং আমরা পণ্য সরবরাহ ও ডেলিভারির দায়িত্ব পালন করব।

আমাদের মূল প্রশ্ন হলো:
উপরোক্ত পদ্ধতিতে রিসেলার সিস্টেম পরিচালনা করা কি ইসলামী শরিয়ত অনুযায়ী জায়েজ?

যদি জায়েজ হয়, তাহলে কী কী শর্ত ও নিয়ম মেনে এই সিস্টেম পরিচালনা করা আবশ্যক?

আর যদি এই পদ্ধতিতে শরিয়তসম্মত কোনো সমস্যা থাকে, তাহলে কীভাবে প্রয়োজনীয় সংশোধন করে এটিকে শরিয়তসম্মতভাবে পরিচালনা করা যেতে পারে?

বিশেষভাবে জানতে চাই, রিসেলার কোনো পণ্যের মালিকানা গ্রহণ না করেই শুধু অর্ডার সংগ্রহ করে কমিশন গ্রহণ করলে সেটি ওকালাহ/এজেন্সি বা অন্য কোনো বৈধ শরয়ি চুক্তির আওতায় জায়েজ হবে কি না।

বিষয়টি আমাদের ব্যবসায়িক কার্যক্রমের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত। তাই কুরআন-সুন্নাহ ও ফিকহের আলোকে বিস্তারিত দিকনির্দেশনা প্রদান করলে আমরা উপকৃত হব।

জাযাকুমুল্লাহু খাইরান।

Answer

কমিশনভিত্তিক রিসেলার সিস্টেমের শরয়ি বিধান

উত্তর:

ওয়া আলাইকুম আসসালাম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ।

আপনার প্রশ্নের জন্য ধন্যবাদ। আপনার প্রস্তাবিত কমিশনভিত্তিক রিসেলার সিস্টেমটি ইসলামী শরিয়তের দৃষ্টিতে জায়েজ হওয়ার জন্য এর কাঠামোটি ওকালাহ (এজেন্সি) চুক্তির আওতায় পড়ে, যা ইসলামী ফিকহে বৈধ। তবে কিছু গুরুত্বপূর্ণ শর্ত ও নিয়ম মেনে চলা আবশ্যক।


১. ওকালাহ (এজেন্সি) চুক্তির বৈধতা

কুরআন ও সুন্নাহতে ওকালাহ বা প্রতিনিধিত্বের বৈধতার প্রমাণ রয়েছে:

কুরআন থেকে দলিল:

فَابْعَثُوا أَحَدَكُمْ بِوَرِقِكُمْ هَذِهِ إِلَى الْمَدِينَةِ "তোমরা তোমাদের একজনকে এই রৌপ্যমুদ্রা দিয়ে শহরে পাঠাও..." (সূরা আল-কাহফ: ১৯)

হাদিস থেকে দলিল:

عَنْ عُرْوَةَ الْبَارِقِيِّ أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَعْطَاهُ دِينَارًا يَشْتَرِي بِهِ أُضْحِيَّةً أَوْ شَاةً "উরওয়াহ আল-বারিকী (রাঃ) থেকে বর্ণিত, নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাকে একটি দীনার দিয়েছিলেন যেন তিনি তা দিয়ে একটি কুরবানীর পশু কিনে আনেন।" (সহীহ বুখারী: ২৩০৬)

ইজমা: ইসলামী ফিকহের ইমামগণ ওকালাহ বা এজেন্সি চুক্তির বৈধতার উপর ইজমা (ঐকমত্য) করেছেন।


২. আপনার প্রস্তাবিত সিস্টেমের শরয়ি বিশ্লেষণ

আপনার বর্ণিত সিস্টেমটি নিম্নরূপ বিশ্লেষণ করা যায়:

ক. রিসেলারের ভূমিকা:

রিসেলার এখানে মূলত ওকিল (প্রতিনিধি/এজেন্ট) হিসেবে কাজ করছেন। তিনি:

  • পণ্য ক্রয় করেন না
  • পণ্যের মালিক হন না
  • শুধু অর্ডার সংগ্রহ করেন এবং কাস্টমারকে পণ্য পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করেন

খ. আপনার প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা:

আপনারা এখানে মুওয়াক্কিল (মালিক/নিয়োগকর্তা) হিসেবে কাজ করছেন। আপনারা:

  • পণ্যের মালিক
  • পণ্য সরবরাহের দায়িত্বে
  • ডেলিভারির দায়িত্বে

গ. কমিশন:

রিসেলারকে প্রদত্ত কমিশন হলো তার ওকালাতুল উজরাহ (পারিশ্রমিক) যা তার সেবার বিনিময়।


৩. জায়েজ হওয়ার শর্তাবলী

এই সিস্টেমটি শরিয়তসম্মত হওয়ার জন্য নিম্নলিখিত শর্তগুলো মেনে চলা আবশ্যক:

শর্ত ১: স্পষ্ট চুক্তি

রিসেলারের সাথে একটি স্পষ্ট লিখিত চুক্তি করতে হবে যেখানে কমিশনের হার, দায়িত্ব, শর্তাবলী স্পষ্টভাবে উল্লেখ থাকবে।

শর্ত ২: কমিশনের হার পূর্বনির্ধারিত

কমিশনের হার অবশ্যই পূর্বনির্ধারিত হতে হবে এবং এটি নির্দিষ্ট পরিমাণে বা নির্দিষ্ট শতাংশে হতে হবে। কমিশন নির্ধারণে অনিশ্চয়তা (ঘারার) থাকা যাবে না।

শর্ত ৩: পণ্যের মূল্য নির্ধারিত

পণ্যের মূল্য অবশ্যই নির্ধারিত হতে হবে। রিসেলার যেন পণ্যের মূল্য নিজে নির্ধারণ করতে না পারে, বরং মূল্য আপনার প্রতিষ্ঠান নির্ধারণ করবে।

শর্ত ৪: রিসেলার পণ্যের মালিক হবে না

রিসেলার পণ্য ক্রয় করে নিজের মালিকানায় রাখবে না। এটি আপনার সিস্টেমে ইতিমধ্যে নিশ্চিত করা হয়েছে।

শর্ত ৫: পণ্য সরবরাহের দায়িত্ব প্রতিষ্ঠানের

পণ্য সরবরাহ, প্যাকেজিং, ডেলিভারি—সব দায়িত্ব আপনার প্রতিষ্ঠানের উপর থাকবে। রিসেলার শুধু অর্ডার সংগ্রহ করবে।

শর্ত ৬: কমিশন শুধু সফল অর্ডারের উপর

কমিশন শুধুমাত্র সফল অর্ডারের (যে অর্ডারটি সম্পন্ন হয়েছে এবং পণ্য কাস্টমারের কাছে পৌঁছেছে) উপর দেওয়া হবে। অসম্পূর্ণ বা বাতিল অর্ডারের উপর কমিশন দেওয়া যাবে না।

শর্ত ৭: প্রতারণা ও ধোঁকাবাজি থেকে বিরত থাকা

রিসেলারকে অবশ্যই সৎ হতে হবে। তিনি কোনো প্রকার প্রতারণা, মিথ্যা বিজ্ঞাপন বা ধোঁকাবাজি করতে পারবেন না।


৪. জায়েজ হওয়ার দলিল

শায়খুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়্যাহ (রহঃ) বলেন:

الْوَكَالَةُ جَائِزَةٌ بِالْكِتَابِ وَالسُّنَّةِ وَالْإِجْمَاعِ "ওকালাহ (এজেন্সি) কুরআন, সুন্নাহ এবং ইজমা দ্বারা বৈধ।" (মাজমুউল ফাতাওয়া: ২০/৫)

শায়খ ইবনে উসাইমীন (রহঃ) বলেন:

الْوَكِيلُ إِذَا وَكَّلَهُ الْإِنْسَانُ لِيَبِيعَ لَهُ أَوْ يَشْتَرِيَ لَهُ بِأَجْرٍ مُعَيَّنٍ فَهَذَا جَائِزٌ "যদি কেউ কোনো ব্যক্তিকে নির্দিষ্ট পারিশ্রমিকের বিনিময়ে তার পক্ষ থেকে বিক্রি বা ক্রয়ের জন্য ওকিল নিয়োগ করে, তবে তা জায়েজ।" (আশ-শারহুল মুমতি': ৯/৩৩)

শায়খ সালিহ আল-ফাওযান (হাফিযাহুল্লাহ) বলেন:

الْوَسَاطَةُ التِّجَارِيَّةُ بِأَخْذِ عُمْولَةٍ عَلَى ذَلِكَ جَائِزَةٌ إِذَا كَانَتْ بِعَقْدٍ وَاضِحٍ وَبِدُونِ غِشٍّ وَخِدَاعٍ "বাণিজ্যিক মধ্যস্থতা এবং এর বিনিময়ে কমিশন গ্রহণ করা জায়েজ, যদি তা স্পষ্ট চুক্তির ভিত্তিতে হয় এবং প্রতারণা ও ধোঁকাবাজি না থাকে।" (আল-মুনতাকা: ৫/২৭৮)


৫. সম্ভাব্য সমস্যা ও সমাধান

সমস্যা ১: ঘারার (অনিশ্চয়তা)

যদি কমিশনের হার নির্ধারিত না থাকে বা পণ্যের মূল্য অনিশ্চিত থাকে, তাহলে ঘারার সৃষ্টি হবে।

সমাধান: কমিশনের হার এবং পণ্যের মূল্য স্পষ্টভাবে নির্ধারণ করুন।

সমস্যা ২: রিসেলার যদি পণ্যের মালিকানা দাবি করে

কিছু ক্ষেত্রে রিসেলার নিজেকে পণ্যের মালিক হিসেবে উপস্থাপন করতে পারে, যা সমস্যা সৃষ্টি করবে।

সমাধান: চুক্তিতে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করুন যে রিসেলার শুধু এজেন্ট, পণ্যের মালিক নন।

সমস্যা ৩: কমিশন নির্ধারণে অনৈক্য

যদি কোনো অর্ডার ফেরত আসে বা বাতিল হয়, তাহলে কমিশন নিয়ে সমস্যা হতে পারে।

সমাধান: চুক্তিতে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করুন যে কমিশন শুধুমাত্র সফল অর্ডারের উপর দেওয়া হবে।


৬. গুরুত্বপূর্ণ নোট

আপনার বর্ণিত সিস্টেমে একটি বিষয় লক্ষণীয়: রিসেলার অর্ডার সংগ্রহ করে আপনার কাছে পাঠাবে এবং আপনি পণ্য সরবরাহ করবেন। এটি সম্পূর্ণভাবে ওকালাহ বিল-বাই (বিক্রয়ের জন্য এজেন্সি) চুক্তির আওতায় পড়ে, যা ইসলামী ফিকহে বৈধ।

তবে, সামসারাহ (দালালি/ব্রোকারেজ) চুক্তির সাথেও এর সাদৃশ্য রয়েছে, যেখানে একজন দালাল ক্রেতা ও বিক্রেতার মধ্যে মধ্যস্থতা করে এবং এর বিনিময়ে কমিশন গ্রহণ করে। ইসলামী ফিকহে সামসারাহও বৈধ।

শায়খ আল-আলবানী (রহঃ) বলেন:

السِّمْسَارَةُ جَائِزَةٌ إِذَا كَانَتْ بِأُجْرَةٍ مَعْلُومَةٍ "দালালি জায়েজ, যদি তা নির্ধারিত পারিশ্রমিকের ভিত্তিতে হয়।" (সিলসিলাতুল হুদা ওয়ান-নূর)


৭. চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত

আপনার প্রস্তাবিত কমিশনভিত্তিক রিসেলার সিস্টেমটি জায়েজ এবং শরিয়তসম্মত, যদি নিম্নলিখিত শর্তগুলো পূরণ করা হয়:

  1. রিসেলারের সাথে স্পষ্ট লিখিত চুক্তি করা
  2. কমিশনের হার পূর্বনির্ধারিত এবং নির্দিষ্ট
  3. পণ্যের মূল্য নির্ধারিত
  4. রিসেলার পণ্যের মালিক হবে না
  5. পণ্য সরবরাহ ও ডেলিভারির দায়িত্ব প্রতিষ্ঠানের উপর
  6. কমিশন শুধুমাত্র সফল অর্ডারের উপর
  7. কোনো প্রকার প্রতারণা ও ধোঁকাবাজি থেকে বিরত থাকা

আল্লাহই সর্বজ্ঞ। আপনার ব্যবসায়িক কার্যক্রমে আল্লাহ বারাকাহ দান করুন।

وَمَنْ يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَلْ لَهُ مَخْرَجًا * وَيَرْزُقْهُ مِنْ حَيْثُ لَا يَحْتَسِبُ "যে ব্যক্তি আল্লাহকে ভয় করে, আল্লাহ তার জন্য উত্তরণের পথ তৈরি করে দেন এবং তাকে এমন উৎস থেকে রিযিক দেন যা সে কল্পনাও করতে পারে না।" (সূরা আত-তালাক: ২-৩)


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.