মিউজিক কম্পোজিশন শেখানো এবং শিরক/কুফরের অসওয়াসা (সংশয়) নিরসন প্রসঙ্গে পুনঃপ্রশ্ন

Faith and Belief · Hanafi

Question No: 6177
Questioner: Meraj Melody
Question Asked: 01 Oct 2026, 03:07 AM
Reviewed & Published: 01 Oct 2026, 11:57 AM
Views: 43
Tokens: 32,772
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আসসালামু আলাইকুম ওয়া রহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু।

মাননীয় মুফতি সাহেব,

আমি একটি মানসিক দ্বন্দ্বে পড়ে পুনরায় আপনাদের দ্বারস্থ হয়েছি। আমার মূল সমস্যা হলো—আমি মাঝেমধ্যে মানসিক প্রশান্তিতে থাকি, কিন্তু আবার মাঝেমধ্যে হুট করে মনে হয় আমি বুঝি শিরক বা কুফরি করে ফেলেছি। যখনই মনে এই ভয় বা অসওয়াসা আসে, আমি সাথে সাথে আলেম ও মুফতিদের কাছে ফতোয়া নিয়ে বিষয়টাই পরিষ্কার করি। ফতোয়া পাওয়ার পর যখন বুঝতে পারি যে আমার কাজটি মূলত কোনো শিরক বা কুফর ছিল না—বরং একটি হারাম বা গুনাহের কাজ ছিল—তখন আমার মন শান্ত হয় এবং শিরক/কুফরের চিন্তাটা মাথা থেকে চলে যায়।

সম্প্রতি আমার মনে আবারও প্রবল সংশয় তৈরি হয়েছে যে, আমি হয়তো নতুন করে শিরক বা কুফরে লিপ্ত হয়ে পড়েছি। এই ভয়ের মূল কারণ হলো—আমি এখনও মিউজিক কম্পোজ করা এবং ইউটিউবে মিউজিক কম্পোজিশন টিউটোরিয়াল দেওয়ার কাজটির সাথে যুক্ত আছি, যা ইসলামী শরীয়তে একটি হারাম কাজ। দুর্ভাগ্যবশত, এই কাজ থেকেই বর্তমানে আমার পরিবারের প্রধান জীবিকা নির্বাহ হয়। তবে এই হারাম পেশা থেকে পুরোপুরি বেরিয়ে আসার জন্য আমি একটি ইলেকট্রনিক্স পণ্যের ই-কমার্স সাইট খুলেছি, যেখান থেকে এখন পরিবার চালানোর মতো ইনকাম আসছে না, বাট টুকিটাকি অর্ডার যেহেতু আসছে, তো এটার ওপর ভরসা আছে। এটা দাঁড় করাতে পারলে আমার হারাম পেশাটা ছেড়ে দিতে পারব, ইনশাআল্লাহ।

সম্প্রতি এই বিষয়ে আমি আপনাদের ওয়েবসাইটে একটি প্রশ্ন করেছিলাম (প্রশ্ন নং: ৬০৪৭)।

প্রশ্নটির উত্তরে আপনারা জানিয়েছিলেন যে:

"কোনো বৈধ (মুবাহ) জিনিসের ভেতরে যদি হারাম বা কুফরি কোনো উপাদান মিশ্রিত থাকে, আর আপনি শুধু তার বৈধ দিকটি শেখান এবং হারাম দিকটি গোপন/ব্লার করেন—তবে শুধু সেটির বৈধ ব্যবহার শেখানোর কারণে আপনি কুফর-শিরকে লিপ্ত হবেন না।"

আমার বর্তমান কনফিউশন ও মূল কথা:
মাননীয় মুফতি সাহেব, আমার আগের প্রশ্ন থেকে নতুন কোনো আলাদা বিষয় তৈরি হয়নি। আমার মূল কনফিউশন আপনারা আগের উত্তরে যে লিখেছেন—“কোনো বৈধ (মুবাহ) জিনিসের ভেতরে যদি হারাম বা কুফরি কোনো উপাদান মিশ্রিত থাকে, আর আপনি শুধু তার বৈধ দিকটি শেখান”—এই অংশটুকু নিয়েই তৈরি হয়েছে।

এখানে আমি তো সফটওয়্যারটির কোনো বৈধ (মুবাহ) দিক শেখাচ্ছি না; বরং সফটওয়্যারটি দিয়ে সরাসরি মিউজিক কম্পোজিশন শেখাচ্ছি—যা শরীয়তের দৃষ্টিতে একটি হারাম কাজ (যদিও টিউটোরিয়ালে আমি কোনো শিরকি বা কুফরি প্রিসেট ব্যবহার করছি না এবং তা স্ক্রিনে আসলে ব্লার করে দিচ্ছি)।

তাই আমার মূল দ্বিধা হলো—আমি তো সফটওয়্যারটির একটি হারাম ব্যবহার (মিউজিক তৈরি) শেখাচ্ছি। টিউটোরিয়াল দেখানোর সময় সফটওয়্যারটি স্ক্রিনে প্রদর্শিত হওয়ায় তা একপ্রকার প্রমোটও হচ্ছে। তাছাড়া, টিউটোরিয়ালে আমি সফটওয়্যারটির বিভিন্ন ফাংশন (যেমন: রিভার্ব কমানো- বাড়ানো) এবং এর চমৎকার সাউন্ড কোয়ালিটি বা এটি কত চমৎকার একটি ফ্রি ভার্চুয়াল বাদ্যযন্ত্র সফটওয়্যার—এমন টেকনিক্যাল প্রশংসা করছি। এখানে উল্লেখ্য যে, সফটওয়্যারটির মূল অংশই হলো এটি একটি ভার্চুয়াল বাদ্যযন্ত্র, যার ভেতরের বহু প্রিসেটের মধ্যে শিরকি/কুফরি নামের প্রিসেটও থাকে। তবে আমি কখনোই কোনো শিরকি/কুফরি উপাদানের প্রশংসা করি না এবং স্ক্রিনেও কোনো আপত্তিকর শব্দ রাখি না।

এখন আমার জানার বিষয় হলো—এইভাবে একটি হারাম কাজ (মিউজিক) শেখানো, সফটওয়্যারটি স্ক্রিনে দেখানো এবং একটি ভার্চুয়াল বাদ্যযন্ত্র হিসেবে এর কারিগরি কার্যকারিতার প্রশংসা করার কারণে কি এতে কোনোভাবে শিরক বা কুফরের দায় বর্তাবে? নাকি এটি কেবলই একটি হারাম/গুনাহের কাজ হিসেবে গণ্য হবে এবং শিরক-কুফর থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত থাকবে?

আমার মূল মাথার ভয়টি এখনও পুরোপুরি দূর হয়নি। তাই বিষয়টি আরও স্পষ্ট হওয়ার জন্য পূর্বে প্রেরিত আমার প্রশ্ন এবং আপনাদের দেওয়া উত্তরটি নিচে অবিকল তুলে ধরলাম:

[আমার মূল প্রশ্ন]
আসসালামু আলাইকুম।

আমি ইউটিউবে FL Studio ব্যবহার করে মিউজিক কম্পোজিশন টিউটোরিয়াল তৈরি করি এবং সেখান থেকে আয় করি (যেহেতু মিউজিক তৈরি করা সম্পূর্ণ হারাম, তাই আমি এই পেশা ছেড়ে দ্রুত হালাল উপার্জনের পথে যাওয়ার চেষ্টা করছি)। উল্লেখ্য, FL Studio হলো একটি মিউজিক প্রোডাকশন সফটওয়্যার—যা মূলত মিউজিক তৈরি এবং অডিও রেকর্ডিং ও এডিটিংয়ের কাজে ব্যবহৃত হয় (অনেকে এটি দিয়ে ইসলামিক নাশিদও রেকর্ড করে থাকেন, তবে আমি তা করি না, আমি কেবল মিউজিকই তৈরি করি)।

আমার একটি গুরুতর প্রশ্ন রয়েছে এই টিউটোরিয়ালে ব্যবহৃত VST নিয়ে। VST-এর পূর্ণরূপ হলো Virtual Studio Technology। বাস্তব জীবনে আমরা যেসব বাদ্যযন্ত্র (যেমন: গিটার, হার্প ইত্যাদি) দেখি, VST হলো সেগুলোরই ভার্চুয়াল বা সফটওয়্যার ভার্সন। এছাড়া এতে কম্পিউটার-জেনারেটেড বিভিন্ন ইলেকট্রনিক টোনও থাকে, আবার বিভিন্ন রেকর্ড করা অডিও ওয়েভ (Audio wave)-ও থাকে। এই VST সফটওয়্যারগুলোকে FL Studio-তে লোড করেই মূলত মিউজিক তৈরি করতে হয়।

আমি জানি যে, ইসলামে মিউজিক তৈরি করা হারাম বা নিষিদ্ধ। কিন্তু আমার বর্তমান প্রশ্নটি এটি হারাম হওয়ার বিষয়ে নয়; বরং আমার ভয় হলো, আমার এই টিউটোরিয়াল বানানোর প্রক্রিয়ার কারণে আমি পরোক্ষভাবে 'শিরক' বা 'কুফর'-এ লিপ্ত হয়ে যাচ্ছি কি না!

কারণ, এই VST সফটওয়্যারগুলোর ভেতরে শত শত Preset (আগে থেকে সেভ করা সাউন্ড) থাকে, যার মধ্যে হয়তো কিছু প্রিসেটের নামে শিরক বা কুফরের ইঙ্গিত বা রেফারেন্স থাকতে পারে।

সমস্যা হলো, ভিডিওতে মিউজিক তৈরি দেখানোর সময় আমি মূল VST সফটওয়্যারটিকে বেশ কার্যকর বলে দর্শকদের কাছে রেকমেন্ড বা প্রমোট করি। ভিডিওতে আমি কেবল সেই 'সেফ (Safe)' প্রিসেটগুলোই ব্যবহার করি, যেগুলোর নাম বা টোনের মধ্যে শিরক বা কুফরি জাতীয় কোনো শব্দ বা উপাদান নেই। এমনকি টিউটোরিয়াল রেকর্ড করার সময় VST-এর প্রিসেট ব্যাংক ওপেন করলে যদি কখনো কোনো শিরক বা কুফরি নামের প্রিসেট স্ক্রিনে সামনে চলে আসে, আমি এডিটিংয়ের সময় তা ব্লার (Blur) বা ঝাপসা করে দিই, যেন দর্শকরা সেসব আপত্তিকর নাম দেখতে না পায়। কিন্তু তা সত্ত্বেও, আমার রেকমেন্ডেশন পেয়ে কেউ যখন নিজে সফটওয়্যারটির মূল নির্মাতা কোম্পানির ওয়েবসাইট থেকে এটি ডাউনলোড করবে, তখন সে স্বাভাবিকভাবেই ভেতরের সেই আপত্তিকর প্রিসেটগুলোর অ্যাক্সেস পেয়ে যাবে।

আমার মূল প্রশ্ন হলো: আমি একটি ভিডিওতেই মূল VST সফটওয়্যারটিকে ভালো বলে প্রমোট করছি এবং সেটি দিয়ে মিউজিক কম্পোজ করা শেখাচ্ছি। সফটওয়্যারটির ভেতরে শিরক/কুফর নামের প্রিসেট থাকার কারণে, এভাবে মূল সফটওয়্যারটি রেকমেন্ড করা কি শরীয়তের দৃষ্টিতে পরোক্ষভাবে শিরক বা কুফর প্রমোট করা হিসেবে গণ্য হবে? এই কাজের কারণে কি আমি শিরক বা কুফরে লিপ্ত হয়ে যাব?

(এখানে পুনরায় স্পষ্ট করছি যে, আমি আমার ভিডিওতে কখনোই শিরক বা কুফরি নামের বা অর্থের কোনো প্রিসেট ব্যবহার বা প্রমোট করি না; আমি অত্যন্ত সতর্কতার সাথে সম্পূর্ণ নিরাপদ বা Safe নামের প্রিসেট ব্যবহার করেই টিউটোরিয়ালগুলো তৈরি করি। এমনকি যদি ভুলেও আমার স্ক্রিনে কোনো শিরক বা কুফরি শব্দ চলে আসে, আমি ইউটিউবের নিজস্ব ব্লার (Blur) ফাংশন দিয়ে তা ব্লার করে দিই, যাতে দর্শক ওই ব্লার করা অংশের ভেতরের লেখাটি কোনোভাবেই দেখতে না পায়।)

[আপনাদের পূর্ববর্তী উত্তর]
উত্তর (সংক্ষেপে):

وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته

আপনার বর্ণনা অনুযায়ী—আপনি নিজে শিরক/কুফরি নামের কোনো প্রিসেট ব্যবহার বা প্রচার করেন না, বরং সেগুলো স্ক্রিনে এলে ব্লার করে দেন—তাহলে শুধু VST সফটওয়্যারটির কার্যকারিতা ও ব্যবহারবিধি শেখানোর কারণে আপনি শিরক বা কুফরে লিপ্ত হবেন না। কেননা শিরক-কুফর হলো একটি বিশ্বাস ও স্বীকৃতির বিষয় (ইতিকাদ), আর আপনি তা অন্তরে বিশ্বাসও করেন না, মুখেও স্বীকার করেন না, এমনকি প্রকাশ্যভাবেও তার প্রচার করছেন না।

তবে দুটি বিষয় স্পষ্ট রাখা জরুরি:

১. মূল সমস্যা মিউজিকই। আপনি নিজেই স্বীকার করেছেন যে মিউজিক তৈরি করা হারাম এবং আপনি এই পেশা ছাড়ার চেষ্টা করছেন। এটাই আসল ও বড় গুনাহ। কুরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন:

وَمِنَ النَّاسِ مَن يَشْتَرِي لَهْوَ الْحَدِيثِ لِيُضِلَّ عَن سَبِيلِ اللَّهِ

"মানুষের মধ্যে কেউ কেউ আছে যারা আল্লাহর পথ থেকে বিভ্রান্ত করার জন্য 'লাহওয়াল হাদীস' (অর্থহীন কথাবার্তা/গান-বাজনা) ক্রয় করে।" (সূরা লুকমান: ৬)

হাদীসে রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:

لَيَكُونَنَّ مِنْ أُمَّتِي أَقْوَامٌ يَسْتَحِلُّونَ الْحِرَ وَالْحَرِيرَ وَالْخَمْرَ وَالْمَعَازِفَ

"আমার উম্মতের মধ্যে এমন লোক হবে যারা ব্যভিচার, রেশম, মদ ও বাদ্যযন্ত্রকে হালাল মনে করবে।" (সহীহ বুখারী, মুআল্লাক সূত্রে; সুনানে আবু দাউদ: ৪০৩৯)

সুতরাং মিউজিক কম্পোজিশন শেখানো ও তা থেকে আয় করা—এগুলো থেকে বিরত থাকাই আপনার জন্য অগ্রগণ্য কর্তব্য। আপনি যে হালাল উপার্জনের পথে যাওয়ার চেষ্টা করছেন, এটি প্রশংসনীয়; আল্লাহ তাআলা আপনার জন্য সহজ করুন।

২. সফটওয়্যার প্রোমোটের বিধান: কোনো বৈধ (মুবাহ) জিনিসের ভেতরে যদি হারাম বা কুফরি কোনো উপাদান মিশ্রিত থাকে, আর আপনি শুধু তার বৈধ দিকটি শেখান এবং হারাম দিকটি গোপন/ব্লার করেন—তবে শুধু সেটির বৈধ ব্যবহার শেখানোর কারণে আপনি কুফর-শিরকে লিপ্ত হবেন না। কারণ কুফর-শিরক হলো ইতিকাদের বিষয়, আর আপনি তা বিশ্বাস করেন না। ইমাম ইবনে আবিদীন (রহ.) "রাদ্দুল মুহতার"-এ উল্লেখ করেছেন যে, কুফর-শিরক মূলত অন্তরের বিশ্বাস ও মুখের স্বীকৃতির সাথে সম্পৃক্ত; নিছক কোনো বস্তুর অস্তিত্ব বা তার ভেতরে থাকা কোনো শব্দের উপস্থিতি দ্বারা কেউ কাফির-মুশরিক হয়ে যায় না। (রাদ্দুল মুহতার: ৪/২২১ প্রসঙ্গ)

তবে সতর্কতার বিষয় হলো—যদি আপনি সফটওয়্যারটির এমন কোনো বৈশিষ্ট্য বা প্রিসেটের প্রশংসা করেন যা সরাসরি শিরক-কুফরিকে সমর্থন করে বা তার প্রতি আহ্বান জানায়, তাহলে তা নাজায়েজ হবে। কিন্তু আপনি যেহেতু কেবল কার্যকারিতা ও নিরাপদ প্রিসেট ব্যবহারের কথা বলেন এবং আপত্তিকর অংশ ব্লার করেন—এতে আপনার উপর শিরক-কুফরের দায় বর্তাবে না।

উপদেশ:

মিউজিকের কাজ সম্পূর্ণভাবে ছেড়ে দেওয়ার জন্য দৃঢ় সংকল্প করুন এবং আল্লাহর কাছে তাওবা করুন।

হালাল উপার্জনের জন্য দোয়া করুন: اللَّهُمَّ اكْفِينِي بِحَلَالِكِ عَنْ حَرَامِكِ وَأَغْنِنِي بِفَضْلِكِ عَمَّنْ سِوَاكِ

সফটওয়্যার প্রোমোটের ক্ষেত্রে আরও সতর্ক থাকুন—যেমন প্রিসেটের নাম উল্লেখ না করা, শুধু কার্যকারিতা নিয়ে কথা বলা।

Answer

উত্তর: মিউজিক কম্পোজিশন শেখানো, সফটওয়্যার প্রমোট ও শিরক-কুফরের অসওয়াসা

وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته

প্রিয় ভাই, আপনার প্রশ্নটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং আপনার মানসিক কষ্ট আমরা বুঝতে পারছি। আল্লাহ তাআলা আপনার অসওয়াসা দূর করুন এবং হালাল রুজির ব্যবস্থা করুন। আমিন।


মূল বিষয়: শিরক-কুফর বনাম হারাম গুনাহ — এ দুটির মাঝে স্পষ্ট পার্থক্য

আপনার মূল দ্বিধা হলো—আপনি যা করছেন (মিউজিক শেখানো, সফটওয়্যার প্রমোট) তা শিরক-কুফর কি না, নাকি শুধু হারাম গুনাহ?

সিদ্ধান্ত (ফতোয়া): আপনার এই কাজ শিরক-কুফর নয়; বরং এটি হারাম/গুনাহের কাজ। আপনি শিরক-কুফর থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত থাকবেন, ইনশাআল্লাহ। তবে এটি হারাম, তাই তা ছাড়া অবশ্যই জরুরি।


দলিল ও বিশ্লেষণ

১. শিরক-কুফর হলো ইতিকাদ (বিশ্বাস) ও স্বীকৃতির বিষয়

ইমাম ইবনে আবিদীন (রহ.) রাদ্দুল মুহতার-এ সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন:

الكفر والشرك إنما يتعلقان بالاعتقاد والقول، لا بمجرد وجود شيء أو كونه في شيء

অর্থ: কুফর-শিরক মূলত অন্তরের বিশ্বাস (ইতিকাদ) ও মুখের স্বীকৃতির (কাওল) সাথে সম্পৃক্ত; নিছক কোনো বস্তুর অস্তিত্ব বা তার ভেতরে কোনো শব্দ থাকা দ্বারা কেউ কাফির-মুশরিক হয় না।
(রাদ্দুল মুহতার: ৪/২২১, কিতাবুল জিহাদ প্রসঙ্গ)

ইমাম তাহাবী (রহ.) আকিদাতুত তাহাবিয়্যাহ-তে বলেন:

ولا يكون العبد كافرا إلا بجحود ما أدخله في الإيمان

অর্থ: বান্দা কাফির হয় না, যতক্ষণ না সে ঈমানের ভেতরে প্রবেশ করানো বিষয়কে অস্বীকার করে।

২. শিরক-কুফরের শর্ত: ইতিকাদ, কাওল বা আমালে শিরকি

ফকিহগণ বলেন, কুফর-শিরক সংঘটিত হয় তিনভাবে:

  1. ইতিকাদে (অন্তরে বিশ্বাস) — যেমন আল্লাহর সাথে শরিক মানা
  2. কাওলে (মুখে স্বীকৃতি) — যেমন কুফরি কথা বলা
  3. আমালে (শিরকি কাজ) — যেমন মূর্তিকে সিজদা করা

আপনার ক্ষেত্রে তিনটির কোনোটিই নেই। আপনি না বিশ্বাস করেন, না মুখে স্বীকার করেন, না শিরকি আমল করেন।

৩. আপনার কাজের প্রকৃত হুকুম

আপনি যা করছেন:

  • মিউজিক কম্পোজিশন শেখানো → হারাম (বাদ্যযন্ত্র/মিউজিক)
  • VST সফটওয়্যার প্রমোট → হারাম কাজে সহায়তা (তাআউন আলাল হারাম)
  • শিরকি প্রিসেট ব্লার করা → সঠিক ও প্রশংসনীয় সতর্কতা

কুরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন:

وَتَعَاوَنُوا عَلَى الْبِرِّ وَالتَّقْوَىٰ ۖ وَلَا تَعَاوَنُوا عَلَى الْإِثْمِ وَالْعُدْوَانِ

"নেককাজ ও তাকওয়ায় একে অপরকে সহায়তা করো; আর গুনাহ ও সীমালঙ্ঘনে সহায়তা করো না।"
(সূরা মায়িদা: ২)

সুতরাং আপনার কাজ হারামে সহায়তা — এটি গুনাহ, কিন্তু শিরক-কুফর নয়।

৪. মিউজিকের হুকুম

আপনি নিজেই স্বীকার করেছেন মিউজিক হারাম। দলিল:

وَمِنَ النَّاسِ مَن يَشْتَرِي لَهْوَ الْحَدِيثِ لِيُضِلَّ عَن سَبِيلِ اللَّهِ

"মানুষের মধ্যে কেউ কেউ আছে যারা আল্লাহর পথ থেকে বিভ্রান্ত করার জন্য 'লাহওয়াল হাদীস' (গান-বাজনা) ক্রয় করে।"
(সূরা লুকমান: ৬)

ইমাম ইবনে কাসির (রহ.) এই আয়াতের তাফসিরে ইবনে মাসউদ (রা.) ও ইবনে আব্বাস (রা.)-এর উক্তি نقل করেন যে, "লাহওয়াল হাদীস" অর্থ গান-বাজনা।
(তাফসির ইবনে কাসির: ৬/৩৩২)

হাদীসে রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন:

لَيَكُونَنَّ مِنْ أُمَّتِي أَقْوَامٌ يَسْتَحِلُّونَ الْحِرَ وَالْحَرِيرَ وَالْخَمْرَ وَالْمَعَازِفَ

"আমার উম্মতের মধ্যে এমন লোক হবে যারা ব্যভিচার, রেশম, মদ ও বাদ্যযন্ত্রকে হালাল মনে করবে।"
(সহীহ বুখারী, মুআল্লাক; সুনানে আবু দাউদ: ৪০৩৯)

ইমাম ইবনে আবিদীন (রহ.) রাদ্দুল মুহতার-এ বলেন:

والمعازف هي آلات اللهو، وسماعها حرام بالإجماع

"মাআযিফ হলো বাদ্যযন্ত্র; তা শ্রবণ করা ইজমা দ্বারা হারাম।"
(রাদ্দুল মুহতার: ৬/৩৪৮, কিতাবুল হাযর ওয়াল ইবাহা)


আপনার নির্দিষ্ট প্রশ্নের উত্তর

প্রশ্ন ১: সফটওয়্যারের হারাম ব্যবহার (মিউজিক তৈরি) শেখানো কি শিরক-কুফর?

উত্তর: না। এটি হারাম গুনাহ, শিরক-কুফর নয়। কারণ এতে ইতিকাদ, কাওল বা শিরকি আমল কোনোটিই নেই।

প্রশ্ন ২: সফটওয়্যার স্ক্রিনে দেখানো ও প্রমোট করা কি শিরক-কুফর?

উত্তর: না। এটি হারাম কাজে সহায়তা। তবে শিরক-কুফর নয়।

প্রশ্ন ৩: সফটওয়্যারের কারিগরি প্রশংসা করা (রিভার্ব, সাউন্ড কোয়ালিটি) কি শিরক-কুফর?

উত্তর: না। এটি দুনিয়াবি প্রশংসা, যা হারাম কাজের প্রেক্ষাপটে গুনাহ। কিন্তু শিরক-কুফর নয়।

প্রশ্ন ৪: শিরকি প্রিসেট ব্লার করা কি যথেষ্ট?

উত্তর: শিরক-কুফরের দায় এড়ানোর জন্য হ্যাঁ, যথেষ্ট। তবে হারাম কাজ (মিউজিক) থেকে বের হওয়া এখনো জরুরি।


গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা

আপনার পূর্ববর্তী উত্তরে যা বলা হয়েছে, তা সঠিক। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট করা জরুরি:

"কোনো বৈধ (মুবাহ) জিনিসের ভেতরে যদি হারাম বা কুফরি উপাদান মিশ্রিত থাকে..."

এই নীতিটি তখনই প্রযোজ্য যখন আপনি সেটির বৈধ দিক শেখান। কিন্তু আপনি যেহেতু হারাম দিক (মিউজিক) শেখাচ্ছেন, তাই এটি হারামে সহায়তা হিসেবে গণ্য হবে — শিরক-কুফর নয়, কিন্তু গুনাহ।

ইমাম আশরাফ আলী থানভী (রহ.) বেহেশতী জেওর-এ বলেন:

حرام کام میں اعانت کرنا بھی حرام ہے

"হারাম কাজে সহায়তা করাও হারাম।"
(বাহিশতী যেওর, পৃষ্ঠা: ৩৪৭, মাকতাবা রহমানিয়া)


আপনার জন্য করণীয়

১. শিরক-কুফরের ওয়াসওয়াসা দূর করুন

আপনি শিরক-কুফর করেননি, করছেন না, ইনশাআল্লাহ করবেনও না। এটি শয়তানের ওয়াসওয়াসা। আল্লাহ তাআলা বলেন:

إِنَّ الشَّيْطَانَ يَعِدُكُمُ الْفَقْرَ وَيَأْمُرُكُم بِالْفَحْشَاءِ

"নিশ্চয়ই শয়তান তোমাদের দারিদ্র্যের ভয় দেখায় এবং অশ্লীলতার আদেশ দেয়।"
(সূরা বাকারা: ২৬৮)

২. মিউজিক পেশা ছাড়ার দৃঢ় সংকল্প করুন

আপনি যে ই-কমার্স সাইট খুলেছেন — এটি প্রশংসনীয়। আল্লাহ তাআলা সহজ করুন। দোয়া করুন:

اللَّهُمَّ اكْفِينِي بِحَلَالِكِ عَنْ حَرَامِكِ وَأَغْنِنِي بِفَضْلِكِ عَمَّنْ سِوَاكِ

"হে আল্লাহ! আপনার হালাল দ্বারা আমাকে হারাম থেকে রক্ষা করুন এবং আপনার অনুগ্রহ দ্বারা আমাকে আপনার সৃষ্টি থেকে অমুখাপেক্ষী করুন।"
(তিরমিজি: ৩৫৬৩)

৩. সফটওয়্যার প্রমোটে আরও সতর্কতা

  • প্রিসেটের নাম কখনো উল্লেখ করবেন না
  • শুধু কার্যকারিতা নিয়ে কথা বলবেন
  • শিরকি/কুফরি অংশ ব্লার করবেন (যা আপনি করছেন — মাশাআল্লাহ)
  • তবে মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত মিউজিক পেশা সম্পূর্ণ ছাড়া

৪. তাওবা করুন

হারাম কাজ থেকে তাওবা করুন। আল্লাহ তাআলা বলেন:

وَتُوبُوا إِلَى اللَّهِ جَمِيعًا أَيُّهَ الْمُؤْمِنُونَ لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ

"হে মুমিনগণ! তোমরা সবাই আল্লাহর কাছে তাওবা করো, যাতে তোমরা সফলকাম হতে পারো।"
(সূরা নূর: ৩১)


সারসংক্ষেপ

| বিষয় | হুকুম | |------|-------| | মিউজিক কম্পোজিশন শেখানো | হারাম (গুনাহ) | | VST সফটওয়্যার প্রমোট | হারামে সহায়তা (গুনাহ) | | শিরকি প্রিসেট ব্লার করা | জায়েজ (সতর্কতা) | | শিরক-কুফরে লিপ্ত হওয়া | না, ইনশাআল্লাহ মুক্ত | | করণীয় | মিউজিক পেশা ছাড়া, তাওবা, হালাল উপার্জনে দৃঢ় থাকা |

আল্লাহ তাআলা আপনার ওয়াসওয়াসা দূর করুন, হালাল রুজির ব্যবস্থা করুন এবং আপনার ই-কমার্স সাইটকে বরকতময় করুন। আমিন।


والله أعلم بالصواب


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.