স্বামীর নিষেধ অমান্য করে বাইরের টেইলরের কাছে কাপড় সেলাই করানোর বিধান কী?

Family Life · Hanafi

Question No: 6197
Questioner: Rukaiya Ahmed
Question Asked: 01 Oct 2026, 12:45 PM
Reviewed & Published: 01 Oct 2026, 12:53 PM
Views: 50
Tokens: 6,254
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

যথাসম্ভব চেষ্টা করি আমার স্বামীর আনুগত্য করার। বাইরে টেইলার এর কাছ থেকে কাপড় সেলাই করতে তিনি নিষেধ করেছেন। ঈদের সময় আমার ননদ আমাকে একটা জামা গিফট দেন এবং সেলাই করতে টেইলর এর কাসে নিয়ে যেতে চান। আমি অনেকবার নিষেধ করি। কিন্তু অনেক অনুরোধের কারণে আমি টেইলর এর কাছে যেতে বাধ্য হই। যাওয়ার আগ মুহূর্তেও আমার মনে হল বাইরে থেকে জামা সেলাই করব না। আমি বুঝতে পারিনি কি মনে করে যেনো আমি ব্লাউজের কাপর সাথে সেলাই করতে দিয়ে ফেলি।

ভয় পেয়েছিলাম যে আমার স্বামী জানতে পারলে আমার উপর অনেক মন খারাপ করবে, কথাটা তাকে বলিনি কারণ এই ঘটনার সাথে আমার ননদ জড়িত ছিলেন। পরবর্তীতে নানা ঘটনার পরে আমার ননদ এ কথাটা তার ভাইকে বলে দেন এবং তিনি আমার উপরে চরম রাগ করেন। এখন তার কথা হলো আমি তার সাথে প্রতারণা করেছি। এবং অনেক রাগ করে আছেন। আমি অনেক ক্ষমা চেয়েছি এবং আগেই ঘটনার পরে মনে মনে নিয়ত করেছিলাম আর কখনোই কাউকে খুশি করানোর জন্য হলেও কাজ করব না। কিন্তু এখন পরিস্থিতি ভালো না মনটাও খুব খারাপ লাগছে। ঘটনা এবং আমার ভুলগুলো বলবেন।

Answer

স্বামীর আনুগত্য ও গোপনীয়তার সীমা: একটি ফিকহি বিশ্লেষণ

উত্তর:

بسم الله الرحمن الرحيم الحمد لله رب العالمين، والصلاة والسلام على أشرف الأنبياء والمرسلين، أما بعد

সংক্ষিপ্ত উত্তর

আপনার প্রশ্নে দু'টি পৃথক বিষয় জড়িত রয়েছে:

১. স্বামীর নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে বাইরের টেইলরের কাছে গিয়ে কাপড় সেলাই করানো — এটি স্বামীর আনুগত্যের পরিপন্থী এবং শরীয়তসম্মত কারণ ছাড়া স্বামীর নিষেধ অমান্য করা জায়েয নয়।

২. ঘটনাটি স্বামীকে না জানানো (গোপন রাখা) — এতে আপনি সরাসরি মিথ্যা বলেননি, তবে ইঙ্গিতে বা পরোক্ষভাবে স্বামীকে বিভ্রান্ত করেছেন। ইসলামে স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কের ভিত্তি হলো সততা ও বিশ্বস্ততা। এ ধরনের গোপনীয়তা সম্পর্কে সন্দেহ সৃষ্টি করে।

আপনার করণীয়: আন্তরিক তাওবা, স্বামীর কাছে স্পষ্টভাবে ক্ষমা প্রার্থনা, এবং ভবিষ্যতে স্বামীর শরীয়তসম্মত নির্দেশ মেনে চলার দৃঢ় সংকল্প।


বিস্তারিত আলোচনা

১. স্বামীর আনুগত্যের বিধান

আল্লাহ তা'আলা বলেন:

الرِّجَالُ قَوَّامُونَ عَلَى النِّسَاءِ بِمَا فَضَّلَ اللَّهُ بَعْضَهُمْ عَلَىٰ بَعْضٍ وَبِمَا أَنفَقُوا مِنْ أَمْوَالِهِمْ

"পুরুষরা নারীদের উপর দায়িত্বশীল, কারণ আল্লাহ তাদের এককে অপরের উপর শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছেন এবং因为他们 তাদের সম্পদ থেকে ব্যয় করে।" — (সূরা আন-নিসা: ৩৪)

রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন:

لَوْ كُنْتُ آمِرًا أَحَدًا أَنْ يَسْجُدَ لِأَحَدٍ لَأَمَرْتُ الْمَرْأَةَ أَنْ تَسْجُدَ لِزَوْجِهَا

"যদি আমি কাউকে অন্য কারো জন্য সিজদা করার আদেশ দিতাম, তবে নারীকে তার স্বামীর জন্য সিজদা করার আদেশ দিতাম।" — (সুনানে তিরমিযী: ১১৫৯; মুসনাদে আহমাদ)

ইমাম ইবনে আবিদীন (রহ.) «রাদ্দুল মুহতার»-এ উল্লেখ করেন:

"নারীর উপর তার স্বামীর আনুগত্য ওয়াজিব, যতক্ষণ না তা আল্লাহর অবাধ্যতার আদেশ হয়।" — (রাদ্দুল মুহতার: ৩/৫৭২)

মুফতি তাকি উসমানি (দা.বা.) «ফাতাওয়া উসমানি»-তে বলেন:

"স্বামীর শরীয়তসম্মত নির্দেশ মানা স্ত্রীর উপর ওয়াজিব। শরীয়তবিরোধী নির্দেশে আনুগত্য নেই।" — (ফাতাওয়া উসমানি: ২/৩৩০)

২. আপনার নির্দিষ্ট ঘটনার বিশ্লেষণ

আপনার স্বামী বাইরের টেইলরের কাছে কাপড় সেলাই করতে নিষেধ করেছেন। এই নিষেধাজ্ঞা শরীয়তসম্মত কারণেই ছিল — কারণ বাইরের অ-মাহরাম পুরুষের সাথে অপ্রয়োজনীয় যোগাযোগ এড়ানো ইসলামে কাম্য। আল্লাহ বলেন:

وَلَا تَبَرَّجْنَ تَبَرُّجَ الْجَاهِلِيَّةِ الْأُولَىٰ

"আর তোমরা পূর্বকালের জাহেলিয়াতের মতো নিজেদের প্রদর্শন করো না।" — (সূরা আল-আহযাব: ৩৩)

আপনি ননদের অনুরোধে বাধ্য হয়ে গিয়েছেন — এখানে আপনার দুর্বলতা ছিল। ননদের খুশি করার জন্য স্বামীর নিষেধ অমান্য করা শরীয়তে জায়েয নয়। রাসূল ﷺ বলেন:

لَا طَاعَةَ لِمَخْلُوقٍ فِي مَعْصِيَةِ الْخَالِقِ

"সৃষ্টির আনুগত্যে স্রষ্টার অবাধ্যতা করা যাবে না।" — (সুনানে আবু দাউদ: ২৬২৫; মুসনাদে আহমাদ)

আপনি যাওয়ার আগ মুহূর্তে মনে মনে নিষেধ করেছিলেন — এটি আপনার বিবেকের জাগরণ ছিল। কিন্তু আপনি তা বাস্তবায়ন করতে পারেননি। এতে বোঝা যায়, আপনি জানতেন এটি ভুল, কিন্তু সামাজিক চাপে পড়ে গেছেন।

আপনি স্বামীকে জানাননি — এখানে আপনার ভুল হলো: আপনি সরাসরি মিথ্যা না বললেও, ঘটনাটি গোপন রেখে স্বামীকে বিভ্রান্ত করেছেন। রাসূল ﷺ বলেন:

مَنْ غَشَّنَا فَلَيْسَ مِنَّا

"যে আমাদের সাথে প্রতারণা করে, সে আমাদের দলভুক্ত নয়।" — (সহীহ মুসলিম: ১০১)

ইমাম গাযালি (রহ.) «ইহইয়াউ উলুমিদ্দীন»-এ বলেন:

"স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কের মূল ভিত্তি হলো পারস্পরিক বিশ্বস্ততা ও সততা। একে অপরকে গোপন রাখা বা বিভ্রান্ত করা সম্পর্কের ক্ষতি করে।" — (ইহইয়াউ উলুমিদ্দীন: ২/৩৫)

৩. আপনার স্বামীর রাগের বিধান

আপনার স্বামীর রাগ করা স্বাভাবিক, কারণ:

  • আপনি তার স্পষ্ট নিষেধ অমান্য করেছেন
  • ঘটনাটি গোপন রেখেছেন
  • তাকে বিভ্রান্ত করেছেন

তবে তার উচিত শরীয়তের সীমার মধ্যে থাকা — গালি দেওয়া, মারধর করা বা অতিরিক্ত শাস্তি দেওয়া ইসলামে নিষিদ্ধ। আল্লাহ বলেন:

وَعَاشِرُوهُنَّ بِالْمَعْرُوفِ

"আর তাদের সাথে সদ্ভাবে জীবনযাপন করো।" — (সূরা আন-নিসা: ১৯)

৪. আপনার করণীয়

১. আন্তরিক তাওবা করুন:

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا تُوبُوا إِلَى اللَّهِ تَوْبَةً نَّصُوحًا

"হে ঈমানদারগণ! আল্লাহর কাছে খাঁটি তাওবা করো।" — (সূরা আত-তাহরীম: ৮)

২. স্বামীর কাছে স্পষ্টভাবে ক্ষমা চান — শুধু "ক্ষমা চেয়েছি" নয়, বরং ঘটনার সম্পূর্ণ সত্যতা স্বীকার করে, তার নিষেধ অমান্যের জন্য অনুতপ্ত হয়ে ক্ষমা প্রার্থনা করুন।

৩. ভবিষ্যতে দৃঢ় সংকল্প করুন — কোনো মানুষের খুশি করার জন্য স্বামীর শরীয়তসম্মত নিষেধ অমান্য করবেন না।

৪. ননদের সাথে সম্পর্ক — তাকে ভদ্রভাবে বুঝিয়ে দিন যে, স্বামীর নিষেধের বিষয়ে তাকে আর চাপ দিতে না। তবে সম্পর্ক ছিন্ন করবেন না।

৫. স্বামীর রাগ কমার জন্য দু'আ করুন — আল্লাহর কাছে সাহায্য চান।


সারসংক্ষেপ

| বিষয় | বিধান | |------|-------| | স্বামীর শরীয়তসম্মত নিষেধ মানা | ওয়াজিব | | ননদের খুশির জন্য স্বামীর নিষেধ অমান্য | জায়েয নয় | | ঘটনা গোপন রাখা | ভুল, সম্পর্কের ক্ষতি করে | | আন্তরিক তাওবা | কর্তব্য | | স্বামীর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা | কর্তব্য | | ভবিষ্যতে সংকল্প | আবশ্যক |

আল্লাহ তা'আলা আপনার স্বামীর হৃদয় নরম করুন এবং আপনার সংসারে শান্তি ফিরিয়ে দিন। আমীন।

والله أعلم بالصواب


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.