ব্যবসায়ে পার্টনারশিপ পরিবর্তন করলে কি হয় আমানতের খিয়ানত কখন হয়?

Business and Job · Hanafi

Question No: 6198
Questioner: mbshsh
Question Asked: 01 Oct 2026, 12:57 PM
Reviewed & Published: 01 Oct 2026, 01:43 PM
Views: 43
Tokens: 8,973
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আমার স্বামী একজন পার্টনার নিয়ে একটি দোকানে ব্যাবসা শুরু করেন। দোকানটি তারা দোকান মালিকের কাছেথেকে সারাবছরের ভাড়া একেবারে দিয়ে তারপর নেন, একইসাথে সেই লোককে মাসে মাসে কিছু টাকা দিবেন এ হিসেবে চুক্তিবদ্ধ হয়ে নেন।কিছুদিন পর পারস্পরিক সমাঝোতায় আমার স্বামী তার পার্টনারের অধীনস্থ হিসেবে বেতনভুক্ত হয়ে কাজ করা শুরু করেন।তাদের এই দোকানের জন্য এক বছর পর্যন্ত চুক্তি ছিলো।ছয়মাস যাওয়ার পর তিনি আমার স্বামীকে জানিয়ে দেন " আমি আর কন্টিনিউ করবো না।আপনি দোকানের অর্ধেকে আপনার জিনিষ ( দোকানের না, আমার স্বামীর নিজস্ব) বিক্রি করেন । "৷ আর বাকি অর্ধেকে দোকান মালিককে দোকানের সব জিনিস দিয়ে বলেন সেসব বিক্রি করে তার পাওয়া টাকা তুলে নিতে।এখানে উল্লেখ্য যে, তিনি আর আমার স্বামীকে মাসিক বেতন দিবেন না।আবার, তিনি কিছুদিন পর আবার ও ব্যাবসা করবেন কিনা তা-ও জানান নি,শুধু জানিয়েছেন তিনি আর কন্টিনিউ করবেন না। এর কিছুদিনপর আমার স্বামী একটি পুরনো মালের সন্ধান পান, তিনি তার একসময়ের পার্টনার থাকা লোক কে জানান স্টোরে থাকা পুরনো কিছু জিনিস পেয়েছেন,সেই লোক আগ্রহ প্রকাশ করেন " গিয়ে দেখা যায়"।পরে সেই লোককে তিনি আর পার্টনারশিপে নেন না, কারণ তার কাছে ওই মুহুর্তে টাকা ছিলো না।আরেকজন নতুন পার্টনার নিয়ে সেই স্টোরের জিনিস দিয়ে ব্যাবসা শুরু করেন।অন্য দোকান নেয়ার আগ পর্যন্ত আমার স্বামী এই দোকানে কিছু জিনিস রেখে বিক্রি করা শুরু করেন, তাকে দেয়া নির্দিষ্ট জায়গায়। এখন তার আগের পার্টনার বলছেন এই জিনিসপত্র সব এই দোকানের, আপনি আমানতের খিয়ানত করেছেন।আমার প্রশ্ন, তিনি কি আমানতের খিয়ানত করেছেন? তার কি অনুমতি আছে অন্য কাউকে নিয়ে আলাদা করে ব্যাবসা করার? আমার স্বামী বর্তমানে যে পার্টনার নিয়ে ব্যাবসা করছেন সেই পার্টনার ও কি আমানতের খিয়ানত করেছেন?

Answer

ব্যবসায়ে পার্টনারশিপ পরিবর্তন: আমানতের খিয়ানতের বিধান

প্রশ্নের সারসংক্ষেপ

আপনার স্বামী ও তাঁর একসময়ের পার্টনার মিলে একটি দোকান ভাড়া নিয়ে ব্যবসা শুরু করেন। ভাড়া পুরো বছর এককালীন পরিশোধ করা হয় এবং দোকান মালিককে মাসিক কিছু টাকা দেওয়ার চুক্তিও হয়। পরবর্তীতে পারস্পরিক সমঝোতায় আপনার স্বামী বেতনভুক্ত কর্মচারী হিসেবে কাজ শুরু করেন। ছয় মাস পর পার্টনার ব্যবসা ছেড়ে দেন এবং আপনার স্বামীকে দোকানের অর্ধেকে নিজস্ব মাল বিক্রি করতে ও বাকি অর্ধেকে দোকান মালিককে সব মাল বুঝিয়ে দিতে বলেন। এরপর আপনার স্বামী পুরনো মালের সন্ধান পেয়ে সাবেক পার্টনারকে জানান, কিন্তু টাকা না থাকায় তাঁকে পার্টনার না নিয়ে নতুন পার্টনার নিয়ে ব্যবসা শুরু করেন। এখন সাবেক পার্টনার অভিযোগ করছেন যে জিনিসপত্র সব দোকানের, আপনার স্বামী আমানতের খিয়ানত করেছেন।


শরীয়তের মূলনীতি: পার্টনারশিপ (শিরকাত) ও আমানত

১. পার্টনারশিপের প্রকৃতি

ইসলামী ফিকহে ব্যবসায়িক পার্টনারশিপকে শিরকাত বলা হয়। এর মূল ভিত্তি হলো পারস্পরিক সম্মতি ও চুক্তি। আল্লাহ তাআলা বলেন:

"হে ঈমানদারগণ! তোমরা পরস্পরের সম্পদ অন্যায়ভাবে খেয়ো না, তবে ব্যবসার মাধ্যমে পারস্পরিক সম্মতিতে (খেয়ো)..." — (সূরা আন-নিসা: ২৯)

২. আমানতের বিধান

আল্লাহ তাআলা আরও বলেন:

"নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের আদেশ দেন আমানতসমূহ তার হকদারদের কাছে প্রত্যর্পণ করতে..." — (সূরা আন-নিসা: ৫৮)

রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:

"যার আমানতদারিতা নেই, তার ঈমান নেই।" — (মুসনাদে আহমাদ, হাদিস: ১২৩৮৩)


প্রশ্নোত্তর পর্ব

প্রশ্ন ১: আপনার স্বামী কি আমানতের খিয়ানত করেছেন?

উত্তর: না, ইনশাআল্লাহ তিনি আমানতের খিয়ানত করেননি। কারণ:

১. পার্টনারশিপ ইতিমধ্যে বিলুপ্ত হয়েছে:

সাবেক পার্টনার নিজেই স্পষ্টভাবে বলেছেন: "আমি আর কন্টিনিউ করবো না।" — এ ঘোষণার মাধ্যমে পার্টনারশিপ চুক্তি বাতিল হয়ে যায়। ইমাম ইবন আবিদীন (রহ.) «রাদ্দুল মুহতার»-এ উল্লেখ করেন:

"শিরকাত (পার্টনারশিপ) পারস্পরিক সম্মতিতে অথবা এক পক্ষের অব্যাহত রাখার ইচ্ছা প্রকাশ না করলে বিলুপ্ত হয়ে যায়।" — (রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ৪, পৃ. ৩০০-৩০১)

২. পার্টনার নিজেই দায়িত্ব বণ্টন করে দিয়েছেন:

তিনি বলেছেন — অর্ধেকে আপনার স্বামীর নিজস্ব মাল বিক্রি করবেন, বাকি অর্ধেকে দোকান মালিককে সব মাল বুঝিয়ে দেবেন। এ নির্দেশনা প্রমাণ করে যে, তিনি নিজেই পার্টনারশিপ থেকে বেরিয়ে গেছেন এবং সম্পদের বণ্টন করে দিয়েছেন।

৩. পার্টনারশিপ বিলুপ্তির পর নতুন ব্যবসা করা:

পার্টনারশিপ বিলুপ্ত হওয়ার পর আপনার স্বামী স্বাধীন। তিনি যেকোনো নতুন পার্টনার নিয়ে ব্যবসা করতে পারেন। এতে সাবেক পার্টনারের কোনো অধিকার নেই।

৪. পুরনো মালের বিষয়:

যদি পুরনো মাল পার্টনারশিপের অবশিষ্ট সম্পদ হয়, তবে তা বণ্টনযোগ্য। কিন্তু সাবেক পার্টনার নিজেই বলেছেন তিনি আর কন্টিনিউ করবেন না এবং সম্পদ বণ্টনের নির্দেশ দিয়েছেন। সুতরাং আপনার স্বামী যদি সেই বণ্টন অনুযায়ী নিজের অংশ নিয়ে থাকেন, তবে তা বৈধ।

তবে সতর্কতা: যদি পুরনো মাল স্পষ্টভাবে পার্টনারশিপের অবিভক্ত সম্পদ হয় এবং সাবেক পার্টনার তা থেকে অংশ দাবি করেন, তবে শরীয়ত অনুযায়ী তার অংশ তাকে দেওয়া উচিত। এ বিষয়ে সৎভাবে হিসাব করে মীমাংসা করা কর্তব্য।


প্রশ্ন ২: আপনার স্বামীর কি অনুমতি আছে অন্য কাউকে নিয়ে আলাদা ব্যবসা করার?

উত্তর: হ্যাঁ, অবশ্যই অনুমতি আছে। কারণ:

১. পার্টনারশিপ বিলুপ্ত:

সাবেক পার্টনার স্পষ্টভাবে ব্যবসা ছেড়ে দিয়েছেন। পার্টনারশিপ বিলুপ্ত হওয়ার পর আপনার স্বামী সম্পূর্ণ স্বাধীন।

২. শরীয়তের মূলনীতি:

ইমাম সারাখসী (রহ.) «আল-মাবসূত»-এ উল্লেখ করেন:

"শিরকাত বিলুপ্ত হলে প্রত্যেক শরিক স্বাধীনভাবে ব্যবসা করতে পারে।" — (আল-মাবসূত, খণ্ড ১১, পৃ. ১৫২)

৩. ফতোয়ায়ে আলমগিরিতে আছে:

"যদি শরিকগণ পার্টনারশিপ বিলুপ্ত করার সিদ্ধান্ত নেয়, তবে প্রত্যেকে নিজ নিজ সম্পদ নিয়ে স্বাধীন।" — (ফতোয়ায়ে আলমগিরি, খণ্ড ২, পৃ. ৩০৫)

৪. সাবেক পার্টনারের আপত্তির ভিত্তি নেই:

সাবেক পার্টনার নিজেই ব্যবসা ছেড়ে দিয়েছেন। এখন তিনি আপত্তি করলে তা শরীয়তসম্মত নয়। তিনি যদি পার্টনারশিপ চালিয়ে যেতে চাইতেন, তবে আগেই জানাতেন।


প্রশ্ন ৩: আপনার স্বামীর বর্তমান পার্টনার কি আমানতের খিয়ানত করেছেন?

উত্তর: না, তিনি আমানতের খিয়ানত করেননি। কারণ:

১. তিনি নতুন পার্টনারশিপে শরিক:

বর্তমান পার্টনার আপনার স্বামীর সাথে নতুন চুক্তিতে ব্যবসা করছেন। সাবেক পার্টনারের সাথে তাঁর কোনো সম্পর্ক নেই।

২. সাবেক পার্টনার নিজেই ব্যবসা ছেড়েছেন:

সাবেক পার্টনার ব্যবসা ছেড়ে দেওয়ার পর নতুন পার্টনার নিয়োগ সম্পূর্ণ বৈধ।

৩. আমানতের খিয়ানতের শর্ত:

আমানতের খিয়ানত তখনই হয় যখন কারও কাছে রাখা সম্পদ অবৈধভাবে আত্মসাৎ করা হয়। এখানে সাবেক পার্টনার নিজেই সম্পদ বণ্টন করে দিয়েছেন, তাই খিয়ানতের প্রশ্ন ওঠে না।


তবে কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় খেয়াল রাখা জরুরি

১. পার্টনারশিপের হিসাব নিষ্পত্তি

পার্টনারশিপ বিলুপ্তির সময় সমস্ত সম্পদ ও দায়ের সঠিক হিসাব হওয়া উচিত। ইমাম ইবন আবিদীন (রহ.) বলেন:

"শিরকাত বিলুপ্তির সময় প্রত্যেক শরিকের অংশ সঠিকভাবে নির্ধারণ করা ওয়াজিব।" — (রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ৪, পৃ. ৩০২)

যদি সাবেক পার্টনারের কোনো পাওনা থেকে যায়, তবে তা পরিশোধ করা কর্তব্য।

২. দোকান মালিকের সাথে চুক্তি

দোকান মালিকের সাথে চুক্তি অনুযায়ী যদি দোকানের সব মাল তাঁর কাছে হস্তান্তর করার শর্ত থাকে, তবে তা পালন করা উচিত। মুফতি তাকি উসমানি (দা.বা.) «ফতোয়ায়ে উসমানি»-তে উল্লেখ করেন:

"চুক্তির শর্তাবলি পালন করা মুসলিমের কর্তব্য, যতক্ষণ না তা হারাম কাজের আদেশ দেয়।" — (ফতোয়ায়ে উসমানি, খণ্ড ৩, পৃ. ৪২)

৩. সাবেক পার্টনারের সাথে সদাচরণ

যদিও শরীয়তগতভাবে আপনার স্বামী সঠিক, তবুও সাবেক পার্টনারের সাথে সদাচরণ ও স্পষ্ট হিসাব করে দেওয়া উত্তম। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:

"তোমরা পরস্পরে হিংসা করো না, ঘৃণা করো না, মুখ ফিরিয়ে নিও না; বরং আল্লাহর বান্দা হিসেবে ভাই ভাই হয়ে যাও।" — (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৫৬৪)


সারসংক্ষেপ ও চূড়ান্ত ফতোয়া

| প্রশ্ন | উত্তর | |--------|--------| | আপনার স্বামী কি আমানতের খিয়ানত করেছেন? | না — পার্টনারশিপ বিলুপ্ত হয়েছে, তিনি নিজের অংশ নিয়েছেন | | অন্য কাউকে নিয়ে ব্যবসা করার অনুমতি আছে? | হ্যাঁ — পার্টনারশিপ বিলুপ্তির পর তিনি স্বাধীন | | বর্তমান পার্টনার কি খিয়ানত করেছেন? | না — তিনি নতুন চুক্তিতে শরিক | | সাবেক পার্টনারের দাবি কি বৈধ? | না — তিনি নিজেই ব্যবসা ছেড়েছেন |

তবে করণীয়:

  1. সাবেক পার্টনারের সাথে স্পষ্ট হিসাব করে মীমাংসা করুন
  2. যদি তাঁর কোনো বৈধ পাওনা থাকে, তা পরিশোধ করুন
  3. দোকান মালিকের সাথে চুক্তি অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করুন
  4. ভবিষ্যতে লিখিত চুক্তি করে ব্যবসা করুন

দুআ

আল্লাহ তাআলা আপনার স্বামীকে হালাল উপার্জন ও সৎ ব্যবসার তাওফিক দান করুন। পারস্পরিক সমঝোতা ও সদাচরণের মাধ্যমে বিষয়টি মীমাংসা করার তাওফিক দিন। আমিন।


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.