বিবাহ ও জন্মনিয়ন্ত্রণ
Marriage and Divorce · Hanafi
Question
১। আমার বিবাহের পূর্বে আমি সব নিয়ম কানুন বলে দিছিলাম তারপরেও বিয়ের দিনে ঝামেলা হয়। অনেক পুরুষ মানুষ আমার রুমে এসেছিল সম্মতি নেওয়ার জন্য এবং আমার পিতা থাকার পরেও আমার নানাকে উকিল বানানো হয়েছিল। আমাকে কবুল বলানো হয়েছে জোর আওয়াজে। আমার কণ্ঠের পর্দাও নষ্ট হয়ে গেছে। আবার রেজিষ্ট্রেশন পেপার টা বিয়ে পড়ানোর আগেই লিখছে কাজি সাহেব। এখন আমার করণীয় কি? আমার বিয়ে কি শুদ্ধ হয়েছে?? আমি কি গুনাহগার হয়েছি তাহলে এখন কি করব?? কিছু বুঝতে পারছি না। দয়া করে সাহায্য করুন।
২। নতুন বিয়ের পরে এখনই আমি এবং আমার হাসবেন্ড কেউই বাচ্চা নিতে চাচ্ছি না। আমি আলিম কোর্সের রানিং স্টুডেন্ট সেই জন্য আমার হাসবেন্ড বলতিছে আগে কোর্স কমপ্লিট করো এখন বাচ্চা নিলে পড়াশোনা ঠিকভাবে করতে পারবা না। আর তাছাড়া নিজে আগে ইলম অর্জন না করলে সন্তানের তারবিয়াত কীভাবে করব। আমার প্রশ্ন হলো উক্ত কারণে জন্মনিয়ন্ত্রণ জায়েজ হবে কিনা??
Answer
উত্তর: وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
প্রশ্ন ১: বিবাহের শুদ্ধতা ও জবরদস্তি
আপনার বিবাহের যে বর্ণনা দিয়েছেন, তাতে কয়েকটি বিষয় বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন:
১. নারী কর্তৃক সম্মতি (ইজাব-ও-কবুল): হানাফি ফিকহ অনুযায়ী, নারীকে তার পক্ষ থেকে কোনো পুরুষকে উকিল (প্রতিনিধি) নিয়োগ করতে হবে অথবা তার সম্মতি নিতে হবে। যদি নারী নিজে বলতে না পারে, তাহলে তার পক্ষ থেকে উকিল হয়ে ইজাব-ও-কবুল করা যায়।
২. গুনাহগার হওয়া প্রসঙ্গে:
- আপনি জোর করে কবুল বলেছেন, এতে আপনার কোনো গুনাহ নেই, বরং যারা জোর করেছিল তাদের গুনাহ হয়েছে। আপনি নির্যাতিত হয়েছেন।
- তওবা করুন এবং আল্লাহর কাছে সাহায্য চান। আল্লাহ অত্যন্ত ক্ষমাশীল।
৩. কাজি সাহেবের পেপার আগে লেখা:
- রেজিস্ট্রেশন পেপার আগে লেখা একটি অনিয়ম, তবে এটি বিবাহের মূল শুদ্ধতাকে প্রভাবিত করে না। মূল বিষয় হলো ইজাব-ও-কবুলের বৈধতা।
প্রশ্ন ২: জন্মনিয়ন্ত্রণের বিধান
১. ইসলামি দৃষ্টিভঙ্গি:
- ইসলামে সন্তান জন্মদান একটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত এবং নবী (সা.) উম্মতকে বেশি সন্তান নেওয়ার উৎসাহ দিয়েছেন।
- তবে স্থায়ী জন্মনিয়ন্ত্রণ (নসবি বন্ধ্যাত্বকরণ) হারাম।
- অস্থায়ী জন্মনিয়ন্ত্রণ (যেমন: কনডম, পিল, কয়েল ইত্যাদি) জায়েজ আছে, তবে শর্ত হলো:
- স্বামী-স্ত্রী উভয়ের সম্মতি থাকতে হবে।
- কোনো ক্ষতিকর প্রভাব না থাকতে হবে।
- বৈধ কারণ থাকতে হবে।
২. আপনার ক্ষেত্রে বৈধ কারণ:
- ইলম অর্জন (আলিম কোর্স) একটি বৈধ কারণ। হাদিসে আছে: "ইলম অর্জন করা প্রত্যেক মুসলিম নর-নারীর উপর ফরজ।" (ইবনে মাজাহ: ২২৪)
- সন্তানের সঠিক তারবিয়াত (লালন-পালন) করার জন্য ইলম অর্জন করা একটি বৈধ কারণ।
- ইমাম গাজ্জালী (রহ.) বলেছেন: "সন্তানের তারবিয়াতের জন্য পিতামাতার ইলম থাকা জরুরি।"
৩. হানাফি ফিকহের বিধান:
- হানাফি ফিকহে, আযল (coitus interruptus) সাহাবাদের যুগে প্রচলিত ছিল এবং রাসূলুল্লাহ (সা.) তা নিষেধ করেননি। (সহিহ বুখারি: ৫২০৮)
- ইমাম আবু হানিফা (রহ.) এর মতে, স্ত্রীর অনুমতি ছাড়া আযল করা মাকরুহ, তবে স্ত্রীর সম্মতিতে জায়েজ।
- আধুনিক জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি (যেমন: পিল, কনডম) আযলের মতোই অস্থায়ী, তাই বৈধ।
৪. আপনার করণীয়:
- যেহেতু আপনার স্বামী সম্মত এবং আপনার ইলম অর্জনের বৈধ কারণ আছে, তাই অস্থায়ী জন্মনিয়ন্ত্রণ জায়েজ হবে।
- তবে স্থায়ী পদ্ধতি (যেমন: টিউবেকটমি, ভ্যাসেকটমি) গ্রহণ করা যাবে না।
- ডাক্তারের পরামর্শ নিন যেন কোনো ক্ষতিকর প্রভাব না থাকে।
সারসংক্ষেপ: ইলম অর্জনের বৈধ কারণে স্বামীর সম্মতিতে অস্থায়ী জন্মনিয়ন্ত্রণ জায়েজ।
আল্লাহ তাআলা আপনাকে উত্তম সমাধান দান করুন।
দলিলসমূহ:
- সহিহ বুখারি: ৬৯৮১ (নারীর সম্মতি)
- রদ্দুল মুহতার: ৩/৮৫ (জবরদস্তির বিধান)
- সহিহ বুখারি: ৫২০৮ (আযল)
- ইবনে মাজাহ: ২২৪ (ইলম অর্জনের ফরজিয়ত)
- ফাতাওয়া হিন্দিয়া: ১/৩৪২ (জন্মনিয়ন্ত্রণ)
- ফাতাওয়া উসমানি: ২/৩৪৫ (জন্মনিয়ন্ত্রণের শর্তাবলি)