হিংসা হলে করণীয় আমল সম্পর্কে
Faith and Belief · Hanafi
Question
Answer
ওয়া আলাইকুমুস সালাম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ।
প্রশ্ন করার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ। আপনার প্রশ্নটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং আত্মশুদ্ধির সাথে সম্পর্কিত।
হিংসা (Hasad) কী এবং এর বিধান
আপনি যে বিষয়ে জিজ্ঞেস করেছেন, ইসলামি পরিভাষায় একে ‘হাসাদ’ (حسد) বা হিংসা বলা হয়। এর অর্থ হলো, অন্যের কাছে কোনো নেয়ামত (ভালো গুণ, সম্পদ, জ্ঞান, দ্বীনদারিতা) দেখে তা না পাওয়ার আফসোস করা এবং তার ধ্বংস কামনা করা।
হিংসা করা হারাম (নিষিদ্ধ) এবং কবিরা গুনাহ। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন:
"তোমরা হিংসা থেকে বেঁচে থাকো। নিশ্চয়ই হিংসা আগুন যেমন কাঠকে খেয়ে ফেলে, তেমনি নেক আমলগুলোকে খেয়ে ফেলে (নষ্ট করে দেয়)।" (সুনানে আবু দাউদ: ৪৯০৩)
এই হাদিস থেকে স্পষ্ট বোঝা যায়, হিংসা শুধু গুনাহই নয়, বরং এটি একজন মুমিনের পূর্ববর্তী নেক আমলসমূহকেও নষ্ট করে দিতে পারে। তাই হিংসা করলে আল্লাহ নারাজ হবেন—এতে কোনো সন্দেহ নেই।
কারো দ্বীনদারিতা দেখে হিংসা হলে করণীয়
কারো দ্বীনদারিতা, ইবাদত, জ্ঞান বা ভালো চরিত্র দেখে মনে যদি হিংসার উদ্রেক হয়, তাহলে তা দমন করা এবং তার বিপরীত কাজ করা জরুরি। ইসলাম আমাদেরকে নিম্নোক্ত বিষয়গুলো শিক্ষা দেয়:
১. হিংসাকে ‘গিবতা’ (Ghibtah)-তে রূপান্তর করুন: ইসলামে অন্যের ভালো গুণ দেখে হিংসা করা নিষিদ্ধ, তবে তার মতো ভালো হওয়ার ইচ্ছা পোষণ করাকে ‘গিবতা’ বা ‘মুনাফাসা’ বলা হয়, যা প্রশংসনীয়। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন:
"দুইটি বিষয় ব্যতীত (অন্যের কাছে থাকা) হিংসা (ঈর্ষা) করা জায়েয নেই। (১) সেই ব্যক্তি, যাকে আল্লাহ কুরআন (শিক্ষা ও তিলাওয়াতের) জ্ঞান দান করেছেন এবং সে তা রাত-দিন (আমল ও তিলাওয়াতের মাধ্যমে) কায়েম রাখে। (২) সেই ব্যক্তি, যাকে আল্লাহ সম্পদ দান করেছেন এবং সে তা রাত-দিন (আল্লাহর পথে) ব্যয় করে।" (সহিহ বুখারি: ৭৫২৯)
অর্থাৎ, আপনি যখন দেখবেন কেউ দ্বীনদার, তখন মনে করবেন—"আল্লাহ তাকে এই নেয়ামত দিয়েছেন, আমি চাই আমারও এই গুণ হোক।" এই চেষ্টা করাটাই হলো গিবতা, যা আপনাকে হিংসা থেকে রক্ষা করবে এবং আপনাকে ভালো কাজে উদ্বুদ্ধ করবে।
২. হিংসার কারণ চিহ্নিত করুন এবং দূর করুন: হিংসার মূল কারণ সাধারণত অহংকার (অহংকার) বা দুনিয়ার প্রতি অতিরিক্ত ভালোবাসা। নিজের মধ্যে এই রোগগুলো খুঁজে বের করে তা দূর করার চেষ্টা করুন।
৩. হিংসার শিকার ব্যক্তির জন্য দোয়া করুন: হিংসা দূর করার সবচেয়ে কার্যকরী উপায় হলো, যার প্রতি হিংসা হচ্ছে তার জন্য কল্যাণের দোয়া করা। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন:
"মুসলিমের জন্য তার ভাইয়ের গায়েবানা (অনুপস্থিতিতে) দোয়া করা কবুল হয়।" (সহিহ মুসলিম: ২৭৩৩)
আপনি যখন তার জন্য দোয়া করবেন, তখন আপনার অন্তর থেকে হিংসার বিষ দূর হয়ে যাবে এবং ভালোবাসা জন্ম নেবে।
৪. নিজের দুর্বলতা স্বীকার করুন: মনে রাখবেন, দ্বীনদারিতা আল্লাহর পক্ষ থেকে একটি বিশেষ নেয়ামত। আল্লাহ যাকে চান এই তাওফিক দেন। তাই কারো দ্বীনদারিতা দেখে হিংসা করার অর্থ আল্লাহর বণ্টন নিয়ে আপত্তি করা। বরং নিজের কসুর খুঁজে বের করুন এবং আল্লাহর কাছে দ্বীনদার হওয়ার জন্য দোয়া করুন।
৫. হিংসার কুফল সম্পর্কে চিন্তা করুন: হিংসা অন্তরের রোগ। এটি দুনিয়ায় মানসিক অশান্তি সৃষ্টি করে এবং আখিরাতে শাস্তির কারণ। ইমাম গাযযালী (রহ.) তাঁর ‘ইহইয়া উলুমিদ্দীন’ গ্রন্থে হিংসাকে অন্তরের সবচেয়ে ধ্বংসাত্মক রোগ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তাই এই রোগ থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য সর্বদা সচেষ্ট থাকুন।
সংক্ষিপ্ত উত্তর
- হিংসা করা হারাম এবং কবিরা গুনাহ। এতে আল্লাহ নারাজ হবেন এবং এটি নেক আমল নষ্ট করে দেয়।
- করণীয়: হিংসা না করে তার দ্বীনদারিতা দেখে অনুপ্রাণিত হওয়া, তার জন্য দোয়া করা, নিজের মধ্যে সেই গুণ অর্জনের চেষ্টা করা এবং আল্লাহর কাছে তাওফিক কামনা করা।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সকলকে হিংসার মতো মারাত্মক রোগ থেকে হিফাজত করুন এবং দ্বীনদার মুমিনদের প্রতি ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা পোষণের তাওফিক দান করুন। আমিন।