হোটেলে স্বামী-স্ত্রী হিসেবে পরিচয় দেওয়া ও ডকুমেন্টে সাইন করলে কি বিবাহ হয়ে যায়?
Marriage and Divorce · Hanafi
Question
ব্যাপার হলো মডার্ন ছেলে মেয়ে তো।বিয়ের আগেই এরা অবৈধ সম্পর্ক(যিনা) করার জন্য আবাসিক হোটেলে যায়।এখন এরপর তারা রিসিপশনে নিজেদের স্বামী-স্ত্রী(হাজবেন্ড-ওয়াইফ) হিসাবে পরিচয় দেয়।তখন রিসিপশনে দুইজন প্রাপ্তবয়স্ক লোক ছিল।ওনারা এদের কাছে কাবিন নামা চায়,কিন্তু এরা পরে আর তা দিতে পারে না।যাই হোক পরে কোন ভাবে সেই ব্যক্তিদের এটা বুঝায় যে ওরা ভবিষ্যতে বিয়ে করবে।আর কিছু টাকা দেবার মাধ্যমে ব্যাপারটার মিটায়।পরে হোটেল ডকুমেন্ট পূরণ করার সময় রিসিপশনে থাকা লোক দুটো আমার বন্ধুকে বলে আপনারা স্বামী স্ত্রী হিসাবে পরিচয় দেন।সেই হিসাবে আমার বন্ধু হোটেলের ডকুমেন্টে স্বামী-স্ত্রী এর নামের জায়গায় নিজেদের নাম লিখে।আর ছেলেটা নিজেই মেয়েটাকে সাইন করতে বলে।মেয়েটাও তেমন কোন কথা না বলে সাইন করে দেয়।হোটেল এর অন্যান্য ডকুমেন্টেও স্বামী-স্ত্রী হিসাবেই সব লেখালিখি করে।পরে সাইন করে।আর সেই সময় রিসিপশনে দুইজন প্রাপ্ত বয়স্ক লোকও(যারা থাকে সেখানে আরকি)ছিল।তাদের ফর্ম ফিলাপ করতে হেল্প করছিল।(মূলত বর্তমানে অনেক হোটেলে যে অনৈতিক কাজ হয়) এইটাইপের হোটেল ছিল।
এরপর তো এরা রুমে চলে গেছে আর পাপাচারে লিপ্ত হইল(আল্লাহ মাফ করুক)
যাই হোক কোন ভাবে আল্লাহর রহমতে কিভাবে জানি দুজনের মাঝের আল্লাহর ভয় আসতে শুরু করে কিছুদিন হলো,দুজনেই অনেক অনুতপ্ত।
এখন অই বন্ধু আমাকে সেদিন জিজ্ঞেস করতেছে,হোটেলে যাওয়া তো এমনেই তাদের উচিত হয় নাই,তার উপর আবার সেখানে স্বামী-স্ত্রী(হাজবেন্ড-ওয়াইফ)হিসাবে পরিচয় দেওয়া হইছে এবং সেখানে দুইজন প্রাপ্ত বয়স্ক লোকও ছিল।
১.
তাদের বিয়ে হয়ে গেছিল কিনা শরীয়াহ মতে???
২.
আর এর সাথে আরেকটা ব্যাপার নিয়ে সেই বন্ধু সন্দিহান যে দুজন প্রাপ্ত বয়স্কের সামনে নিজেদের স্বামী-স্ত্রী হিসাবে পরিচয় দেবার ফলে এবং কাগজে লেখালেখির কারণে এদের আবার ওখানেই বিবাহ শরীয়াহ অনুযায়ী হয়ে গেছে কিনা?
৩.
স্বামী স্ত্রী হিসাবে পরিচয় দেওয়া কি ইজাব কবুলের আওতায় পড়বে?সেটা লিখিত বা মৌখিক যাই হোক না কেন?
(বলা বাহুল্য ছেলে মেয়ের দুজনেই কেউ আবার কাউকে সেখানে মুখে বা মৌখিক ভাবে (স্বামী হিসাবে কবুল করলাম,স্ত্রী হিসাবে কবুল করলাম)এমন কথা বলে নাই বা কবুল বলে নাই।
ছেলেটা মেয়েটাকে দুইজন প্রাপ্ত বয়স্ক লোকের সামনে সাইন করতে বলেছিল।
৩.
ছেলেটা শুধু মেয়েটাকে সাইন করতে বলেছিল।-এটার মাধ্যমে ইজাব কবুল হবে কিনা?
কিন্তু হোটেল ফর্মে কি লেখা ছিল বা না ছিল জানে না।ও খালি এইটাই বলল যে,ওখানে ওরা নিজেদের স্বামী-স্ত্রী এমন হিসাবে লিখছে,পরিচয় দিছে।
৪.এখানে পুরো ঘটনার আলোকে কোন রকম বিয়ে শরিয়ত মোতাবেক হয়েছিল কিনা?আর এর পর ছেলে মেয়ের মধ্যে ঝগড়াঝাটির সময় নিয়তের সাথে কেনায়া বাক্য ছেলেটা বলে ফেললে বিচ্ছেদের কোন ঘটনা ঘটবে কিনা?
৫.
এখন ছেলেটার মনে যেটা ভয় হচ্ছে যে যদি আবাসিক হোটেলের অই ঘটনার কারণে বিবাহ হয়েও যেয়ে থাকে তাহলে পরে এই কিনায়া বাক্যের কারণে তো বিবাহে বিচ্ছেদের ব্যাপাত হতে পারে।কারণ কিনায়া বাক্য সে কত সংখ্যক নিয়তে বলছে এটা সঠিক বলতে পারে না।শুধু বলছে যে নিয়তের সাথেই বলছে।আর নিয়তটা বার বার আসতেছিল ওর মনে।আল্লাহ না করুক বিয়ের পর যিনায় লিপ্ত হয়ে যাইতে পারে।
এখন বন্ধুটা কোন সহীহ শরীয়াহ মোতাবেক সমাধান চাচ্ছে,সেই মেয়েটিকে(যার সাথে আবাসিক হোটেলে গিয়েছিল) কি সে শরীয়াহ অনুযায়ী বিবাহ করতে পারবে?এর কারণে পরবর্তীতে(আল্লাহ মাফ করুক) যিনায় লিপ্ত হবে কি?
Answer
বিবাহ সংক্রান্ত প্রশ্নের উত্তর
প্রশ্ন: আমার এক বন্ধু জেনারেল লাইনের স্টুডেন্ট। ওর গতবছর বিয়ে ঠিক হইছে, মেয়েও জেনারেল লাইনের স্টুডেন্ট। প্রেমের সম্পর্ক ছিল (আল্লাহ মাফ করুক)। পরবর্তীতে পরিবারিকভাবে কথা বার্তা শুরু হয়। বিয়ের আগেই এরা অবৈধ সম্পর্ক (যিনা) করার জন্য আবাসিক হোটেলে যায়। সেখানে নিজেদের স্বামী-স্ত্রী (হাজবেন্ড-ওয়াইফ) হিসাবে পরিচয় দেয়। রিসিপশনে দুইজন প্রাপ্তবয়স্ক লোক ছিল। ওনারা এদের কাছে কাবিন নামা চায়, কিন্তু এরা পরে আর তা দিতে পারে না। পরে কোনভাবে সেই ব্যক্তিদের এটা বুঝায় যে ওরা ভবিষ্যতে বিয়ে করবে। আর কিছু টাকা দেবার মাধ্যমে ব্যাপারটার মিটায়। পরে হোটেল ডকুমেন্ট পূরণ করার সময় রিসিপশনে থাকা লোক দুটো আমার বন্ধুকে বলে আপনারা স্বামী-স্ত্রী হিসাবে পরিচয় দেন। সেই হিসাবে আমার বন্ধু হোটেলের ডকুমেন্টে স্বামী-স্ত্রী এর নামের জায়গায় নিজেদের নাম লিখে। আর ছেলেটা নিজেই মেয়েটাকে সাইন করতে বলে। মেয়েটাও তেমন কোন কথা না বলে সাইন করে দেয়। হোটেল এর অন্যান্য ডকুমেন্টেও স্বামী-স্ত্রী হিসাবেই সব লেখালিখি করে। পরে সাইন করে। আর সেই সময় রিসিপশনে দুইজন প্রাপ্ত বয়স্ক লোকও ছিল। তাদের ফর্ম ফিলাপ করতে হেল্প করছিল। এরপর তো এরা রুমে চলে গেছে আর পাপাচারে লিপ্ত হইল (আল্লাহ মাফ করুক)। যাই হোক কোনভাবে আল্লাহর রহমতে কিভাবে জানি দুজনের মাঝের আল্লাহর ভয় আসতে শুরু করে কিছুদিন হলো, দুজনেই অনেক অনুতপ্ত।
এখন অই বন্ধু আমাকে সেদিন জিজ্ঞেস করতেছে, হোটেলে যাওয়া তো এমনেই তাদের উচিত হয় নাই, তার উপর আবার সেখানে স্বামী-স্ত্রী (হাজবেন্ড-ওয়াইফ) হিসাবে পরিচয় দেওয়া হইছে এবং সেখানে দুইজন প্রাপ্ত বয়স্ক লোকও ছিল।
১. তাদের বিয়ে হয়ে গেছিল কিনা শরীয়াহ মতে???
উত্তর: না, তাদের বিয়ে শরীয়াহ মতে হয়নি। কারণ বিয়ে শুদ্ধ হওয়ার জন্য ইজাব (প্রস্তাব) এবং কবুল (গ্রহণ) অপরিহার্য। এখানে ছেলে-মেয়ে কেউই মৌখিকভাবে বা লিখিতভাবে ইজাব-কবুল করেনি। হোটেলের ডকুমেন্টে স্বামী-স্ত্রী হিসেবে পরিচয় দেওয়া বা লেখালেখি করাকে শরীয়তের দৃষ্টিতে ইজাব-কবুল হিসেবে গণ্য করা হবে না।
২. আর এর সাথে আরেকটা ব্যাপার নিয়ে সেই বন্ধু সন্দিহান যে দুজন প্রাপ্ত বয়স্কের সামনে নিজেদের স্বামী-স্ত্রী হিসাবে পরিচয় দেবার ফলে এবং কাগজে লেখালেখির কারণে এদের আবার ওখানেই বিবাহ শরীয়াহ অনুযায়ী হয়ে গেছে কিনা?
উত্তর: না, এতে বিবাহ শরীয়াহ অনুযায়ী হয়নি। কারণ বিবাহের জন্য নিম্নলিখিত শর্তগুলো পূরণ হওয়া আবশ্যক:
১. ইজাব (প্রস্তাব): ছেলের পক্ষ থেকে বা তার পক্ষ থেকে কেউ বিয়ের প্রস্তাব দেওয়া। ২. কবুল (গ্রহণ): মেয়ের পক্ষ থেকে বা তার পক্ষ থেকে কেউ সেই প্রস্তাব গ্রহণ করা। ৩. সাক্ষী: দুইজন পুরুষ সাক্ষী বা একজন পুরুষ ও দুইজন মহিলা সাক্ষী উপস্থিত থাকা। ৪. মহর: স্ত্রীকে মহর নির্ধারণ করা।
এখানে ইজাব-কবুলের কোনো শারঈ পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়নি। হোটেলের ডকুমেন্টে স্বামী-স্ত্রী হিসেবে লেখালেখি করা বা পরিচয় দেওয়া ইজাব-কবুল নয়। তাই বিবাহ হয়নি।
৩. স্বামী-স্ত্রী হিসাবে পরিচয় দেওয়া কি ইজাব কবুলের আওতায় পড়বে? সেটা লিখিত বা মৌখিক যাই হোক না কেন?
উত্তর: না, স্বামী-স্ত্রী হিসেবে পরিচয় দেওয়া ইজাব-কবুলের আওতায় পড়বে না। ইজাব-কবুল হলো বিবাহের নির্দিষ্ট শব্দে (যেমন: "আমি আপনাকে বিবাহ করলাম" - "আমি গ্রহণ করলাম") প্রস্তাব ও গ্রহণ। হোটেলের ডকুমেন্টে স্বামী-স্ত্রী হিসেবে লেখালেখি করা বা পরিচয় দেওয়া বিবাহের ইজাব-কবুল নয়। এটি কেবল একটি মিথ্যা পরিচয় দেওয়া, যা গুনাহের কাজ, কিন্তু এর দ্বারা বিবাহ সংঘটিত হয় না।
৪. ছেলেটা শুধু মেয়েটাকে সাইন করতে বলেছিল। - এটার মাধ্যমে ইজাব কবুল হবে কিনা?
উত্তর: না, ছেলেটা মেয়েটাকে সাইন করতে বলেছে - এটি দ্বারা ইজাব-কবুল হবে না। কারণ সাইন করা মানে বিবাহের ইজাব-কবুল নয়। এটি কেবল হোটেলের ডকুমেন্টে স্বাক্ষর করা। বিবাহের জন্য নির্দিষ্ট শব্দে ইজাব-কবুল করা আবশ্যক।
৫. এখানে পুরো ঘটনার আলোকে কোন রকম বিয়ে শরিয়ত মোতাবেক হয়েছিল কিনা?
উত্তর: না, পুরো ঘটনার আলোকে কোনো রকম বিয়ে শরিয়ত মোতাবেক হয়নি। কারণ:
১. ইজাব-কবুল হয়নি। ২. দুইজন সাক্ষীর সামনে বিবাহের প্রস্তাব ও গ্রহণ হয়নি। ৩. মহর নির্ধারণ করা হয়নি। ৪. বিবাহের নিয়তে কোনো শারঈ পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়নি।
তাই তাদের মধ্যে বিবাহ সংঘটিত হয়নি। তারা যে কাজ করেছে তা সম্পূর্ণ হারাম ও গুনাহের কাজ।
৬. আর এর পর ছেলে মেয়ের মধ্যে ঝগড়াঝাটির সময় নিয়তের সাথে কেনায়া বাক্য ছেলেটা বলে ফেললে বিচ্ছেদের কোন ঘটনা ঘটবে কিনা?
উত্তর: যেহেতু তাদের মধ্যে বিবাহই সংঘটিত হয়নি, তাই তালাক বা বিচ্ছেদের কোনো প্রশ্নই আসে না। তালাক শুধুমাত্র বিবাহিত দম্পতির ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। যেহেতু তাদের বিবাহ হয়নি, তাই কেনায়া বাক্য বললেও তালাক সংঘটিত হবে না।
তবে যদি ভবিষ্যতে তারা সঠিকভাবে বিবাহ করে, তাহলে সেই বিবাহের পর কেনায়া বাক্য বললে তালাক সংঘটিত হওয়ার বিষয়টি প্রযোজ্য হবে। কেনায়া বাক্যে তালাক সংঘটিত হওয়ার জন্য নিয়ত শর্ত। যদি কেউ কেনায়া বাক্য বলে এবং নিয়ত করে তালাকের, তাহলে তালাক সংঘটিত হবে।
৭. এখন বন্ধুটা কোন সহীহ শরীয়াহ মোতাবেক সমাধান চাচ্ছে, সেই মেয়েটিকে (যার সাথে আবাসিক হোটেলে গিয়েছিল) কি সে শরীয়াহ অনুযায়ী বিবাহ করতে পারবে? এর কারণে পরবর্তীতে (আল্লাহ মাফ করুক) যিনায় লিপ্ত হবে কি?
উত্তর: হ্যাঁ, সে মেয়েটিকে শরীয়াহ অনুযায়ী বিবাহ করতে পারবে। তবে শর্ত হলো:
১. তওবা: প্রথমে উভয়কে আল্লাহর কাছে আন্তরিকভাবে তওবা করতে হবে। যিনার গুনাহ থেকে ফিরে আসতে হবে। আল্লাহ তাআলা বলেন: "বলুন, হে আমার বান্দাগণ! যারা নিজেদের উপর জুলুম করেছ, তোমরা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না। নিশ্চয় আল্লাহ সমস্ত গুনাহ মাফ করে দেন। নিশ্চয় তিনি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।" (সূরা আয-যুমার: ৫৩)
২. বিবাহ: এরপর তারা যদি সত্যিই একে অপরকে ভালোবাসে এবং বিবাহ করতে চায়, তাহলে শরীয়াহ মোতাবেক সঠিকভাবে বিবাহ করতে পারবে। বিবাহের জন্য প্রয়োজন:
- ইজাব-কবুল
- দুইজন সাক্ষী
- মহর নির্ধারণ
- অভিভাবকের সম্মতি (মেয়ের ক্ষেত্রে)
৩. যিনার পরিণতি: যিনা করার পর যদি তারা তওবা করে এবং সঠিকভাবে বিবাহ করে, তাহলে আল্লাহ তাদের ক্ষমা করবেন ইনশাআল্লাহ। তবে বিবাহের পরও যদি তারা যিনায় লিপ্ত হয়, তাহলে সেটি আরও বড় গুনাহ হবে। তাই বিবাহের পর স্বামী-স্ত্রী হিসেবে বৈধ সম্পর্ক বজায় রাখতে হবে।
মহत्वपूर्ण নোট: যারা যিনা করেছে তাদের জন্য বিবাহ করা জায়েয, তবে উত্তম হলো যিনার পর তওবা করে পবিত্র জীবন শুরু করা। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: "যে ব্যক্তি যিনা করে তওবা করে, আল্লাহ তার তওবা কবুল করেন।" (তিরমিযী)
উপসংহার: ১. তাদের বিবাহ শরীয়াহ মোতাবেক হয়নি। ২. হোটেলের ডকুমেন্টে স্বামী-স্ত্রী হিসেবে লেখালেখি করা বা পরিচয় দেওয়া বিবাহ নয়। ৩. সাইন করা ইজাব-কবুল নয়। ৪. যেহেতু বিবাহ হয়নি, তাই তালাকের প্রশ্নই আসে না। ৫. তারা চাইলে তওবা করে সঠিকভাবে শরীয়াহ মোতাবেক বিবাহ করতে পারবে। ৬. বিবাহের পর যিনা থেকে বিরত থাকা আবশ্যক।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে সঠিক পথে চলার তাওফিক দান করুন। আমিন।