স্ত্রীর উপর স্বামীর আনুগত্যের সীমা, খোরপোষের দায়িত্ব, এবং ক্ষতিকর পরিবেশ থেকে নিরাপদ স্থানে যাওয়ার বিধান সম্পর্কে
Family Life · Hanafi
Question
"আসসালামু আলাইকুম, আমি একজন মেয়ে,একজন মা, আমি একটা মাসআলা জানতে চাই। আমার শশুড় বাড়িতে আমার সাথে আমার শাশুড়ির মনমালিন্য হওয়াতে, আমার শাশুড়ীর জুলুমের শিকার হয়ে, বিশেষ করে ফেতনা ফাসাদ থেকে দূরে থাকার জন্য আমি আমার হাসবেন্ডের সম্মতিতে একটা আবাসিক মাদ্রাসায় আসি জব করার জন্য। ওখানে আমি থেকে বাচ্চাদের পড়ায়। ওখানে বেশ কিছু দিন থাকার পর আমরা মা মেয়ে অসুস্থ হয়ে পড়ি। এবং আমাদের আরো বিভিন্ন সমস্যা দেখাদেয়। যার কারণে আমি একটা ভারা বাসায় যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিই। কিন্তু এতে আমার হাসবেন্ড রাজি হচ্ছে না। সে বলছে আমাকে আমার বাপের বাড়ি থাকতে। কিন্তু আমার বাপের বাড়ি ও আমাদের জন্য সুবিধাজনক না। তাই আমি একটা নিরাপদ স্থানে যেতে চাচ্ছি। কিন্তু আমার হাসবেন্ড এতে রাজি হচ্ছে না। এই অবস্থায় আমি কি তার কথার বিরুদ্ধে গিয়ে বাসায় থাকতে পারবো? এটা কি জায়েজ হবে? আমরা মা মেয়ে সুস্থ এবং ভালো থাকার জন্য।
আমার হাসবেন্ড বিয়ের পর থেকে আমাকে অনেক অবহেলা করেছে। আমরা মা মেয়ের হক আাদায় করেনি অনেক ক্ষেত্রে। অনেকটা ইচ্ছে করে করেছে। কিছুটা পরিস্থিতির শিকার হয়ে করেছে। এবং আমাকে ঠকিয়েছে অনেকবার। এমনকি এখনো সে ঠিকমতো আমাদের খরচ দেয়না,আমার বাবার বাড়ি থেকে এবং আমি নিজে আমাদের খরচ বহন করছি। এক্ষেত্রে আমি তার সব হুকুম মানতে বাধ্য কিনা?অর্থাত এমন হুকুম যেটাতে আমরা মা মেয়ের জীবনের ক্ষতি হচ্ছে। এবং তার কথার বিরুদ্ধে গিয়ে ভারা বাসায় যাওয়া যাবে কি না? অনুগ্রহ করে আমাকে এই প্রশনের উত্তর জানালে আমি উপকৃত হবো।"
Answer
উত্তরের সূচনা
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
প্রশ্নকারিণী বোনের প্রশ্নটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং সংবেদনশীল। ইসলামী আইন অনুযায়ী স্ত্রীর উপর স্বামীর অধিকার ও কর্তব্য সম্পর্কে কুরআন-হাদীস এবং হানাফী ফিকহের আলোকে বিস্তারিত উত্তর প্রদান করা হলো।
১. স্ত্রীর উপর স্বামীর আনুগত্যের সীমা
ইসলামে স্ত্রীর জন্য স্বামীর আনুগত্য করা ফরজ, তবে এর একটি স্পষ্ট সীমা রয়েছে। আল্লাহ তা'আলার নাফরমানি ও ক্ষতির নির্দেশে কারও আনুগত্য জায়েয নয়।
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
"لا طاعة لمخلوق في معصية الخالق" "সৃষ্টিকর্তার নাফরমানিতে সৃষ্টির আনুগত্য নেই।" (মুসনাদ আহমাদ, হাদীস: ১০৯৮; সুনানে আবু দাউদ, হাদীস: ২৬২৫)
ইমাম আবু হানীফা (রহঃ) সহ সকল ফকীহ এই নীতিতে একমত যে, স্বামীর নির্দেশ যদি স্ত্রীর জন্য ক্ষতিকর হয় এবং শরীয়তসম্মত কোনো কারণ ছাড়া হয়, তবে তা মানা বাধ্যতামূলক নয়।
২. স্বামীর দায়িত্ব ও কর্তব্য
স্বামীর উপর স্ত্রীর ভরণপোষণ (খোরপোষ) প্রদান করা ফরজ। আল্লাহ তা'আলা বলেন:
"الرِّجَالُ قَوَّامُونَ عَلَى النِّسَاءِ بِمَا فَضَّلَ اللَّهُ بَعْضَهُمْ عَلَىٰ بَعْضٍ وَبِمَا أَنفَقُوا مِنْ أَمْوَالِهِمْ" "পুরুষরা নারীদের উপর কর্তৃত্বশীল, কারণ আল্লাহ একে অপরের উপর শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছেন এবং কারণ তারা নিজেদের মাল থেকে খরচ করে।" (সূরা আন-নিসা: ৩৪)
ইমাম ইবনে আবিদীন (রহঃ)在其著名的《রদ্দুল মুহতার》一书中明确指出:
"نفقة الزوجة واجبة على الزوج بالكتاب والسنة والإجماع" "স্ত্রীর ভরণপোষণ স্বামীর উপর কিতাব, সুন্নাহ এবং ইজমা দ্বারা ওয়াজিব।" (রদ্দুল মুহতার, ৩/৫৭৮)
যদি স্বামী স্ত্রীর খোরপোষ প্রদান না করে, তবে স্ত্রীর জন্য স্বামীর আনুগত্য না করার অবকাশ রয়েছে। ফাতাওয়া আলমগীরীতে বলা হয়েছে:
"إذا امتنع الزوج عن نفقة زوجته مع قدرته عليها، فللزوجة أن ترفع أمرها إلى القاضي، ويفرق بينهما إن شاءت" "যদি স্বামী সক্ষম হওয়া সত্ত্বেও স্ত্রীর খোরপোষ দিতে অস্বীকার করে, তবে স্ত্রী বিচারকের নিকট অভিযোগ দায়ের করতে পারে এবং চাইলে বিচারক তাদের মধ্যে বিচ্ছেদ ঘটাতে পারেন।" (ফাতাওয়া আলমগীরী, ১/৫৪৬)
৩. স্বামীর অবাধ্যতা ও ক্ষতির নির্দেশ
আপনার বিবরণ অনুযায়ী:
- স্বামী ঠিকমতো খরচ দিচ্ছেন না
- স্ত্রী ও তার মা অসুস্থ হয়ে পড়েছেন
- বর্তমান অবস্থান (মাদ্রাসা) স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর
- শাশুড়ির জুলুম ও ফেতনার পরিবেশ
এই অবস্থায় স্বামী যদি স্ত্রীকে এমন স্থানে থাকতে বলেন যা তার জন্য ক্ষতিকর এবং নিরাপদ নয়, তবে স্ত্রী তার কথা না মানতে পারেন।
ইমাম আল-হিদায়াহ গ্রন্থে উল্লেখ আছে:
"وللزوجة أن تمنع زوجها من الدخول عليها إذا كان في مسكنها ما يضر بها" "স্ত্রী তার স্বামীকে তার ঘরে প্রবেশ করতে বাধা দিতে পারে যদি সেখানে তার ক্ষতির কারণ থাকে।" (আল-হিদায়াহ, ২/৩৪৫)
৪. স্ত্রীর জন্য পৃথক বাসস্থানের অধিকার
ইসলামী আইনে স্ত্রীর জন্য নিরাপদ ও উপযুক্ত বাসস্থানের অধিকার রয়েছে। স্বামী স্ত্রীকে এমন স্থানে রাখতে বাধ্য করতে পারে না যা তার জন্য ক্ষতিকর বা নিরাপদ নয়।
ফাতাওয়া উসমানী তে বলা হয়েছে:
"স্ত্রীর জন্য পৃথক ও নিরাপদ বাসস্থান স্বামীর দায়িত্ব। যদি স্বামী স্ত্রীকে এমন স্থানে রাখে যা তার জন্য ক্ষতিকর বা নিরাপদ নয়, তবে স্ত্রী সেখানে থাকতে বাধ্য নয়।"
৫. আপনার প্রশ্নের সরাসরি উত্তর
প্রশ্ন: স্বামীর কথার বিরুদ্ধে গিয়ে ভাড়া বাসায় যাওয়া যাবে কি?
উত্তর: আপনার বর্ণনা অনুযায়ী:
- আপনি অসুস্থ হয়ে পড়েছেন
- আপনার মাও অসুস্থ
- স্বামী খরচ দিচ্ছেন না
- বর্তমান স্থানটি আপনার জন্য নিরাপদ নয়
- শাশুড়ির জুলুম ও ফেতনার পরিবেশ
এই অবস্থায় আপনার জন্য স্বামীর কথার বিরুদ্ধে গিয়ে নিরাপদ স্থানে (ভাড়া বাসায়) যাওয়া জায়েয হবে, যদি:
- আপনি সত্যিই অসুস্থ হন এবং চিকিৎসার প্রয়োজন হয়
- বর্তমান স্থানটি আপনার স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর হয়
- আপনার মা-মেয়ের নিরাপত্তা ঝুঁকিতে থাকে
তবে কিছু শর্ত:
- সর্বোচ্চ চেষ্টা করুন স্বামীকে বোঝানোর জন্য
- মধ্যস্থতা করুন পরিবারের সিনিয়র সদস্যদের মাধ্যমে
- নিরাপদ স্থান নির্বাচন করুন যা শরীয়তসম্মত
- ইদ্দতের নিয়ম মাথায় রাখুন
৬. গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা
ক. স্বামীর সাথে সম্পর্কের ক্ষেত্রে:
- স্বামীর সাথে সম্পর্ক ছিন্ন না করে, বরং পরিস্থিতি বুঝিয়ে বলুন
- সম্ভব হলে স্থানীয় আলেম বা মসজিদের ইমামের মাধ্যমে মধ্যস্থতা করুন
- স্বামীর ভালো দিকগুলো বিবেচনা করুন
খ. নিরাপত্তার ক্ষেত্রে:
- ভাড়া বাসা নির্বাচনে নিরাপত্তা নিশ্চিত করুন
- একা না থেকে কোনো বিশ্বস্ত পরিবারের পাশে থাকুন
- প্রয়োজনে স্থানীয় থানায় জানিয়ে রাখুন
গ. আর্থিক ক্ষেত্রে:
- স্বামী খরচ না দিলে আপনি নিজে কাজ করে খরচ চালাতে পারেন
- প্রয়োজনে আইনি সহায়তা নিতে পারেন (মুসলিম পারিবারিক আইন অনুযায়ী)
৭. কুরআন-হাদীসের আলোকে স্ত্রীর অধিকার
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
"ألا واستوصوا بالنساء خيرا" "সাবধান! নারীদের সাথে সদ্ব্যবহারের وصية করছি।" (সহীহ বুখারী, হাদীস: ৩৩৩১; সহীহ মুসলিম, হাদীস: ১৪৬৮)
আল্লাহ তা'আলা বলেন:
"وَعَاشِرُوهُنَّ بِالْمَعْرُوفِ" "তোমরা স্ত্রীদের সাথে সৎভাবে জীবনযাপন করো।" (সূরা আন-নিসা: ১৯)
৮. চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত
আপনার পরিস্থিতিতে স্বামীর কথার বিরুদ্ধে গিয়ে নিরাপদ স্থানে যাওয়া জায়েয হবে, তবে নিম্নোক্ত শর্তে:
- নিয়ত হবে নিরাপত্তা ও সুস্থতা লাভের জন্য, স্বামীর অবাধ্যতার জন্য নয়
- স্থান হবে নিরাপদ ও শরীয়তসম্মত
- সম্ভব হলে স্বামীকে জানিয়ে যাওয়া
- মধ্যস্থতা করার চেষ্টা করা
ইমাম ইবনে আবিদীন (রহঃ) বলেন:
"إذا كان مسكن الزوجية فيه ضرر على الزوجة، فللزوجة أن تنتقل إلى مسكن آخر آمن" "যদি বৈবাহিক বাসস্থান স্ত্রীর জন্য ক্ষতিকর হয়, তবে স্ত্রী অন্য নিরাপদ স্থানে স্থানান্তরিত হতে পারবে।" (রদ্দুল মুহতার, ৩/৫৬৫)
৯. উপসংহার ও দোয়া
আল্লাহ তা'আলা আপনার অসুবিধা দূর করুন এবং আপনার জন্য সহজ পথ নির্ধারণ করুন। আপনি যদি সত্যিই অসুস্থ হন এবং বর্তমান স্থানটি আপনার জন্য ক্ষতিকর হয়, তবে নিরাপদ স্থানে যাওয়া আপনার জন্য জায়েয। তবে সর্বদা চেষ্টা করুন স্বামীর সাথে সম্পর্ক ভালো রাখার এবং সম্ভব হলে তার সম্মতিতে সিদ্ধান্ত নেওয়ার।
"رَبَّنَا هَبْ لَنَا مِنْ أَزْوَاجِنَا وَذُرِّيَّاتِنَا قُرَّةَ أَعْيُنٍ وَاجْعَلْنَا لِلْمُتَّقِينَ إِمَامًا" "হে আমাদের রব! আমাদের স্ত্রী ও সন্তানদের মাধ্যমে আমাদের চোখ শীতল করুন এবং আমাদের মুত্তাকীদের ইমাম বানান।" (সূরা আল-ফুরকান: ৭৪)
সংক্ষিপ্ত উত্তর
হ্যাঁ, আপনার বর্ণিত পরিস্থিতিতে (অসুস্থতা, নিরাপত্তাহীনতা, খরচ না দেওয়া) স্বামীর কথার বিরুদ্ধে গিয়ে নিরাপদ স্থানে যাওয়া জায়েয হবে। তবে সর্বোচ্চ চেষ্টা করুন স্বামীকে বোঝানোর এবং মধ্যস্থতার মাধ্যমে সমাধান করার। স্বামীর খোরপোষ না দেওয়া তার জন্য গুনাহ এবং আপনি নিজের খরচ বহন করতে পারেন।