ইস্তিখারা করলে কি পাত্রী দেখা লাগবে না?

Marriage and Divorce · Hanafi

Question No: 4058
Questioner: Mnk
Question Asked: 17 Aug 2026, 11:18 AM
Reviewed & Published: 17 Aug 2026, 11:27 AM
Views: 38
Tokens: 3,730
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আসসালামু আলাইকুম।

বিয়ের আগে পাত্রী দেখার জন্য যে ইস্তিখারা করা হয়, সেটা কি উত্তম পাত্রী পাওয়ার জন্য যথেষ্ট নয়? অনেকেই তো বলে যে এলাকায় খোঁজ নেয়ার জন্য, মামা, চাচা তাদের থেকে খোঁজ নেয়ার জন্য।

মানে, ইস্তিখারার ফলাফল তো আল্লাহ পাকের পক্ষ হতে আসে, যদি তা পজিটিভ আসে, তাহলে এইসবের প্রয়োজনীয়তা কি?

Answer

উত্তর:

ইস্তিখারা একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত এবং আল্লাহর কাছে কল্যাণ প্রার্থনার একটি সুন্দর মাধ্যম। তবে, ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে, ইস্তিখারা করার অর্থ এই নয় যে, আমরা আমাদের প্রচেষ্টা (খোঁজখবর নেওয়া) ছেড়ে দেব। বরং, ইসলাম আমাদেরকে সর্বপ্রথম সাধারণ উপায় (আসবাব) অবলম্বন করার নির্দেশ দেয়, তারপর আল্লাহর উপর ভরসা (তাওয়াক্কুল) করতে বলে। ইস্তিখারা হলো সেই প্রচেষ্টার পরই আল্লাহর কাছে সিদ্ধান্তকে কল্যাণময় করার জন্য প্রার্থনা করা।

কুরআন ও হাদিসের আলোকে বিশ্লেষণ:

১. প্রচেষ্টা (খোঁজ নেওয়া) একটি শরয়ী নির্দেশ: ইসলাম বিয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে পাত্র-পাত্রী সম্পর্কে ভালোভাবে খোঁজখবর নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন: > "তোমাদের কেউ যখন কোনো নারীকে বিয়ে করার ইচ্ছা করে, তখন সে যদি তার দিকে তাকাতে পারে, তবে তা করা উচিত। কারণ, এতে তাদের মধ্যে প্রীতি ও সম্প্রীতি স্থাপিত হওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে।" (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ২০৮২; মিশকাতুল মাসাবিহ, হাদিস: ৩০৯০)

এই হাদিসটি প্রমাণ করে যে, পাত্রী দেখার এবং তার সম্পর্কে জানার চেষ্টা করা সুন্নাহ। এটি ইস্তিখারার বিকল্প নয়, বরং ইস্তিখারার পূর্বশর্ত।

২. ইস্তিখারার প্রকৃতি: ইস্তিখারা মানে হলো কোনো কাজের ভালো-মন্দ বুঝতে না পেরে আল্লাহর কাছে কল্যাণ প্রার্থনা করা। হাদিসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) সাহাবাদের সব কাজে ইস্তিখারা শেখাতেন, যেমন কুরআনের সূরা শেখাতেন। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ১১৬২)

ইস্তিখারার মাধ্যমে আল্লাহর কাছে এই দোয়া করা হয়:
> "হে আল্লাহ! আমি আপনার জ্ঞানের মাধ্যমে কল্যাণ প্রার্থনা করছি এবং আপনার ক্ষমতার মাধ্যমে শক্তি প্রার্থনা করছি... আপনি যদি জানেন যে, এই কাজটি আমার জন্য (দুনিয়া ও আখিরাতে) কল্যাণকর, তবে তা আমার জন্য নির্ধারিত করুন এবং সহজ করে দিন। আর যদি জানেন এটি আমার জন্য অকল্যাণকর, তবে তা আমার থেকে সরিয়ে নিন..." (সহিহ বুখারি, হাদিস: ১১৬২)

অর্থাৎ, ইস্তিখারা হলো সিদ্ধান্ত গ্রহণের পর আল্লাহর কাছে সেই সিদ্ধান্তকে কল্যাণময় করার প্রার্থনা, অথবা সিদ্ধান্তটি ভালো না হলে আল্লাহ তাকে অন্য পথ দেখানোর প্রার্থনা। এটি কোনো "ভবিষ্যদ্বাণী" বা "ফলাফল পাওয়ার" মাধ্যম নয়।

৩. আসবাব (উপায়) অবলম্বন করা: ইসলামের মূলনীতি হলো, ফলাফল আল্লাহর হাতে, তবে উপায় অবলম্বন করা আমাদের দায়িত্ব। কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেন: > "আর মানুষের জন্য তা-ই রয়েছে যা সে চেষ্টা করে।" (সূরা আন-নাজম: ৩৯)

বিয়ের ক্ষেত্রে পাত্র-পাত্রী সম্পর্কে খোঁজখবর নেওয়া, পরিবারের বড়দের (মামা, চাচা) পরামর্শ নেওয়া, এলাকায় জিজ্ঞাসাবাদ করা—এগুলো সবই "আসবাব" বা উপায়। এই উপায়গুলো অবলম্বন করার পরই ইস্তিখারা করা উচিত। ইস্তিখারা করলেই যে খোঁজখবর নেওয়ার দরকার নেই, এমন ধারণা সঠিক নয়।

হানাফি ফিকহের আলোকে:

হানাফি ফিকহের প্রসিদ্ধ গ্রন্থ রদ্দুল মুহতার-এ উল্লেখ আছে যে, বিয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে পাত্র-পাত্রীর দ্বীনদারি, চরিত্র, আচরণ ইত্যাদি সম্পর্কে খোঁজখবর নেওয়া ওয়াজিবের কাছাকাছি (অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ)। কারণ, এর উপরই সংসার জীবনের সুখ-শান্তি নির্ভর করে। (রদ্দুল মুহতার, ৩/৬৬)

ফাতাওয়া উসমানি-তেও উল্লেখ আছে যে, ইস্তিখারা একটি দোয়া, যা আল্লাহর কাছে কল্যাণ প্রার্থনার জন্য। তবে এর অর্থ এই নয় যে, আমরা আমাদের জ্ঞান-বুদ্ধি ও পরামর্শ ব্যবহার করব না। বরং, পরামর্শ ও খোঁজখবর নেওয়ার পরই ইস্তিখারা করা উচিত। (ফাতাওয়া উসমানি, ২/৪৫০)

মুফতি মুহাম্মদ শফি (রহ.) তাঁর মা'আরিফুল কুরআন-এ বলেছেন যে, ইসলামের শিক্ষা হলো, প্রথমে উপায় অবলম্বন করো, তারপর আল্লাহর উপর ভরসা করো। ইস্তিখারা হলো সেই ভরসারই একটি অংশ। (মা'আরিফুল কুরআন, ৮/৪৫০)

সারসংক্ষেপ:

১. ইস্তিখারা যথেষ্ট নয়, বরং খোঁজখবর নেওয়াও জরুরি। ইস্তিখারা হলো আল্লাহর কাছে কল্যাণ প্রার্থনা, আর খোঁজখবর নেওয়া হলো মানুষের প্রচেষ্টা। এই দুটি একে অপরের পরিপূরক। ২. ইস্তিখারার ফলাফল "পজিটিভ" বা "নেগেটিভ" আসার বিষয়টি ভুল ধারণা। ইস্তিখারা করার পর ঘুমে বা মনে কোনো কিছু আসা জরুরি নয়। বরং, ইস্তিখারা করার পর যে সিদ্ধান্তে মন স্থির হয় এবং কাজটি সহজ হয়, সেটিই কল্যাণের লক্ষণ। (ফাতাওয়া উসমানি, ২/৪৫২) ৩. মামা-চাচা বা এলাকার লোকদের কাছ থেকে খোঁজ নেওয়া একটি বুদ্ধিমত্তার কাজ এবং শরিয়তসম্মত উপায়। এটি ইস্তিখারার বিপরীত নয়, বরং ইস্তিখারার পূর্বশর্ত।

আপনার করণীয়:

  • পাত্রী সম্পর্কে ভালোভাবে খোঁজখবর নিন (দ্বীনদারি, চরিত্র, স্বভাব, পারিবারিক পরিবেশ)।
  • পরিবারের বড়দের (মামা, চাচা) পরামর্শ নিন।
  • এরপর দুই রাকাত ইস্তিখারা পড়ুন এবং আল্লাহর কাছে কল্যাণ প্রার্থনা করুন।
  • এরপর যে সিদ্ধান্তে মন স্থির হয় এবং কাজটি সহজ হয়, সেটিই আপনার জন্য কল্যাণকর বলে ধরে নিন।

আল্লাহ তায়ালা আমাদের সবাইকে সঠিক বুঝ দান করুন এবং উত্তম পাত্রী পাওয়ার তাওফিক দিন। (আমিন)


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.