স্ত্রীর কর্তব্য ও স্বামীর দায়িত্ব
Marriage and Divorce · Hanafi
Question
এক্ষেত্রে মুসলিম হিসেবে একজন নারীর কী করা উচিত? ইসলাম কী এমনটা করতে বলে যে স্বামী যেমনই হোক স্বামীর মতামতটাই গুরত্ব দিতে হবে। স্ত্রীর নিজের কোনো মতামত শেয়ার করতে পারবেনা।
Answer
বিবাহিত সম্পর্ক: স্ত্রীর কর্তব্য ও স্বামীর দায়িত্ব
প্রশ্নের সারসংক্ষেপ
প্রশ্নকারিণী জানতে চেয়েছেন—যদি স্বামী নেশায় আসক্ত, বেকার এবং স্ত্রীর মতামতকে গুরুত্ব না দিয়ে জোরজবরদস্তি করেন, তাহলে ইসলামী দৃষ্টিতে একজন নারীর কর্তব্য কী? ইসলাম কি সত্যিই বলে যে স্বামী যেমনই হোক, তার মতামতই চূড়ান্ত এবং স্ত্রীর নিজস্ব মতামত প্রকাশের কোনো অধিকার নেই?
ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গি: স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক
১. কুরআনের নির্দেশনা
আল্লাহ তাআলা কুরআনে ঘোষণা করেছেন:
وَعَاشِرُوهُنَّ بِالْمَعْرُوفِ "আর তোমরা স্ত্রীদের সাথে সদ্ব্যবহার করো।" (সূরা আন-নিসা: ১৯)
এই আয়াতে আল্লাহ তাআলা স্বামীদের প্রতি স্পষ্ট নির্দেশ দিয়েছেন যে, স্ত্রীদের সাথে উত্তম ও ন্যায়সঙ্গত আচরণ করতে হবে। এটি একটি অপরিহার্য নির্দেশ, শর্তহীন।
আরও বলা হয়েছে:
وَلَهُنَّ مِثْلُ الَّذِي عَلَيْهِنَّ بِالْمَعْرُوفِ "আর নারীদের জন্য তেমনি অধিকার রয়েছে, যেমনটি তাদের উপর দায়িত্ব রয়েছে—ন্যায়সঙ্গতভাবে।" (সূরা আল-বাকারা: ২২৮)
২. হাদীসের নির্দেশনা
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
خَيْرُكُمْ خَيْرُكُمْ لِأَهْلِهِ وَأَنَا خَيْرُكُمْ لِأَهْلِي "তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম সেই ব্যক্তি, যে তার পরিবারের কাছে সর্বোত্তম। আর আমি আমার পরিবারের কাছে তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম।" (তিরমিযী: ৩৮৯৫; ইবনে মাজাহ: ১৯৭৭)
আরেকটি হাদীসে এসেছে:
اسْتَوْصُوا بِالنِّسَاءِ خَيْرًا "তোমরা নারীদের সম্পর্কে কল্যাণের ওসিয়ত গ্রহণ করো।" (বুখারী: ৩৩৩১; মুসলিম: ১৪৬৮)
৩. স্বামীর দায়িত্ব
ইসলামে স্বামীর উপর স্ত্রীর অধিকার রয়েছে। ইমাম ইবনে আবিদীন (রহ.) তার বিখ্যাত গ্রন্থ রাদ্দুল মুহতার-এ উল্লেখ করেছেন:
"স্বামীর উপর স্ত্রীর অধিকার হলো—তার ভরণপোষণ (খোরপোষ) দেওয়া, তার সাথে সদ্ব্যবহার করা এবং তার সাথে ন্যায়সঙ্গত আচরণ করা।" (রাদ্দুল মুহতার, ৩/৫৯৯)
ফতোয়ায় আলমগীরী-তে বলা হয়েছে:
"স্বামীর জন্য স্ত্রীর সাথে সদ্ব্যবহার করা ওয়াজিব।" (ফতোয়ায় আলমগীরী, ২/১৬০)
৪. স্ত্রীর কর্তব্য
ইসলাম স্ত্রীর উপরও কিছু দায়িত্ব অর্পণ করেছে। সূরা আন-নিসা: ৩৪-এ আল্লাহ বলেন:
فَالصَّالِحَاتُ قَانِتَاتٌ حَافِظَاتٌ لِّلْغَيْبِ بِمَا حَفِظَ اللَّهُ "সৎকর্মপরায়ণা স্ত্রীগণ অনুগতা এবং আল্লাহ যা হিফাযত করেছেন তার অভাবে (স্বামীর অনুপস্থিতিতে) তা হিফাযতকারিণী।"
তবে এখানে "অনুগতা" বলতে বুঝানো হয়েছে—আল্লাহর প্রতি অনুগত এবং স্বামীর বৈধ আদেশের প্রতি অনুগত। এটি শর্তহীন নয়, বরং বৈধ ও ন্যায়সঙ্গত বিষয়ে সীমাবদ্ধ।
স্বামীর মতামত মানার সীমা
১. বৈধ বিষয়ে আনুগত্য
ইসলামে স্ত্রীর জন্য স্বামীর বৈধ আদেশ মানা কর্তব্য। কিন্তু এটি শর্তহীন নয়। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
لَا طَاعَةَ لِمَخْلُوقٍ فِي مَعْصِيَةِ الْخَالِقِ "সৃষ্টিকর্তার নাফরমানীর ক্ষেত্রে কোনো সৃষ্টির আনুগত্য নেই।" (মুসনাদ আহমাদ: ১০৯৮; আল-মু'জামুল আওসাত: ৪৮৭৫)
২. অন্যায় ও ক্ষতিকর বিষয়ে আনুগত্য নেই
যদি স্বামী এমন কিছু আদেশ করেন যা ইসলামী বিধানবিরোধী বা স্ত্রীর জন্য ক্ষতিকর, তাহলে স্ত্রী তা মানতে বাধ্য নন। ইমাম আবু হানিফা (রহ.) এবং অন্যান্য ইমামগণ একমত যে, স্বামীর আনুগত্য কেবল বৈধ ও ন্যায়সঙ্গত বিষয়ে সীমাবদ্ধ।
৩. পরামর্শের অধিকার
ইসলাম স্ত্রীকে মতামত প্রকাশের অধিকার দিয়েছে। কুরআনে আল্লাহ তাআলা পারিবারিক বিষয়ে পারস্পরিক পরামর্শের কথা বলেছেন:
وَأَمْرُهُمْ شُورَى بَيْنَهُمْ "আর তাদের কাজকর্ম পারস্পরিক পরামর্শের মাধ্যমে হয়।" (সূরা আশ-শূরা: ৩৮)
মাআরিফুল কুরআন-এ মুফতি মুহাম্মদ শফি (রহ.) এই আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেন:
"পারিবারিক জীবনেও পারস্পরিক পরামর্শের নীতি অনুসরণ করা উচিত। স্বামী-স্ত্রী উভয়ের মতামতের গুরুত্ব রয়েছে।"
নেশাগ্রস্ত ও বেকার স্বামীর ক্ষেত্রে স্ত্রীর কর্তব্য
১. ধৈর্য ও সদুপদেশ
স্বামী নেশাগ্রস্ত হলে স্ত্রীর কর্তব্য হলো—ধৈর্যের সাথে তাকে সৎপথে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করা। আল্লাহ তাআলা বলেন:
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا قُوا أَنفُسَكُمْ وَأَهْلِيكُمْ نَارًا "হে ঈমানদারগণ! তোমরা নিজেদেরকে এবং তোমাদের পরিবার-পরিজনকে জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা করো।" (সূরা আত-তাহরিম: ৬)
২. পরিবারের অন্যান্য সদস্য ও বিজ্ঞজনকে জানানো
যদি স্বামী নেশাগ্রস্ত হয়ে পরিবারের ক্ষতি করেন, তাহলে স্ত্রী পরিবারের অন্যান্য সদস্য, আত্মীয়-স্বজন বা বিজ্ঞ আলেমের সাহায্য নিতে পারেন। এটি দোষণীয় নয়।
৩. তালাক বা বিচ্ছেদের বিধান
যদি স্বামী নেশাগ্রস্ত হয়ে স্ত্রীর অধিকার নষ্ট করে এবং সংসার চালানো অসম্ভব হয়ে পড়ে, তাহলে ইসলাম স্ত্রীকে খুলা (স্ত্রীর পক্ষ থেকে বিচ্ছেদ) বা তালাক চাওয়ার অনুমতি দিয়েছে।
ইমাম আবু হানিফা (রহ.) এর মতে, যদি স্বামী স্ত্রীর ভরণপোষণ না দেয় এবং তা আদায়ে অক্ষম হয়, তাহলে স্ত্রী বিচ্ছেদ চাইতে পারেন। (বাদায়েউস সানায়ে, ৪/১৮৫)
ফতোয়ায় হিন্দিয়া-তে বলা হয়েছে:
"যদি স্বামী স্ত্রীর খোরপোষ দিতে অক্ষম হয় এবং স্ত্রী বিচ্ছেদ চায়, তাহলে বিচারক তাদের মধ্যে বিচ্ছেদ ঘটাতে পারেন।" (ফতোয়ায় হিন্দিয়া, ১/৫৪৫)
৪. নেশাগ্রস্ত স্বামীর আনুগত্য
নেশাগ্রস্ত অবস্থায় স্বামী যা বলেন বা করেন, তা মান্য করা স্ত্রীর জন্য জরুরি নয়। কারণ নেশাগ্রস্ত ব্যক্তির বিবেক-বুদ্ধি থাকে না এবং তার কথা-কাজের কোনো বৈধতা নেই।
স্ত্রীর মতামত প্রকাশের অধিকার
১. ইসলামী দৃষ্টিতে স্ত্রীর মতামত
ইসলাম স্ত্রীকে মতামত প্রকাশের পূর্ণ অধিকার দিয়েছে। রাসূলুল্লাহ ﷺ নিজেই স্ত্রীদের সাথে পরামর্শ করতেন। উম্মে সালামা (রা.) এর সাথে হুদায়বিয়ার সন্ধির সময় পরামর্শ করার ঘটনা প্রসিদ্ধ।
২. স্বামীর সাথে পারস্পরিক আলোচনা
ইমাম আল-তাহাবী (রহ.) তার শারহু মাআনিল আসার-এ উল্লেখ করেছেন যে, ইসলামী জীবনব্যবস্থায় স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে পারস্পরিক আলোচনা ও পরামর্শের গুরুত্ব অপরিসীম। স্ত্রী তার মতামত প্রকাশ করতে পারবেন এবং স্বামীর উচিত তা গুরুত্ব সহকারে শোনা।
৩. স্ত্রীর মতামত অগ্রাহ্য করার নিষেধাজ্ঞা
ইসলামে স্ত্রীর বৈধ মতামতকে অগ্রাহ্য করা এবং তাকে চাপে রাখা বৈধ নয়। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
أَلَا وَاسْتَوْصُوا بِالنِّسَاءِ خَيْرًا "সাবধান! তোমরা নারীদের সম্পর্কে কল্যাণের ওসিয়ত গ্রহণ করো।" (বুখারী: ৩৩৩১)
স্বামীর দায়িত্ব সম্পর্কে ইসলামী নির্দেশনা
১. ভরণপোষণের দায়িত্ব
স্বামীর উপর স্ত্রীর ভরণপোষণ (খোরপোষ) দেওয়া ফরজ। সূরা আত-তালাক: ৭-এ আল্লাহ বলেন:
لِيُنفِقْ ذُو سَعَةٍ مِّن سَعَتِهِ "সামর্থ্যবান ব্যক্তি নিজ সামর্থ্য অনুযায়ী খরচ করবে।"
যদি স্বামী বেকার হয় এবং খোরপোষ দিতে অক্ষম হয়, তাহলে এটি স্ত্রীর অধিকার ক্ষুণ্ন করে।
২. নেশা করা হারাম
নেশা করা ইসলামে সম্পূর্ণ হারাম। সূরা আল-মায়িদা: ৯০-এ আল্লাহ বলেন:
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِنَّمَا الْخَمْرُ وَالْمَيْسِرُ وَالْأَنصَابُ وَالْأَزْلَامُ رِجْسٌ مِّنْ عَمَلِ الشَّيْطَانِ فَاجْتَنِبُوهُ "হে ঈমানদারগণ! নিশ্চয়ই মদ, জুয়া, মূর্তিপূজার বেদি এবং ভাগ্য-নির্ধারক তীর—এসব শয়তানের কাজের নাপাক। সুতরাং তোমরা এসব থেকে বিরত থাকো।"
৩. স্বামীর অন্যায় আচরণ
স্বামী যদি স্ত্রীর সাথে অন্যায় আচরণ করেন এবং তাকে দাবায়ে রাখেন, তাহলে এটি ইসলামসম্মত নয়। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
لَا يُلْدَغُ الْمُؤْمِنُ مِنْ جُحْرٍ مَرَّتَيْنِ "মুমিন একই গর্ত থেকে দুবার দংশিত হয় না।" (বুখারী: ৬১৩৩)
ব্যবহারিক সমাধান
১. ধৈর্য ও সদুপদেশ
প্রথমত, স্ত্রী ধৈর্য ধরে স্বামীকে সৎপথে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করবেন। নেশা ছাড়তে উৎসাহিত করবেন এবং দ্বীনের কথা বলবেন।
২. পরিবার ও বিজ্ঞজনকে সম্পৃক্ত করা
স্বামীকে বোঝানোর জন্য পরিবারের সিনিয়র সদস্য, আত্মীয়-স্বজন বা স্থানীয় আলেমের সাহায্য নেওয়া যেতে পারে।
৩. পরামর্শ ও আলোচনা
স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে পারস্পরিক আলোচনার মাধ্যমে সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করা উচিত। স্ত্রী তার মতামত প্রকাশ করবেন এবং স্বামী তা শুনবেন।
৪. বিচ্ছেদের কথা বিবেচনা
যদি স্বামী নেশাগ্রস্ত অবস্থায় থাকে, খোরপোষ না দেয় এবং স্ত্রীর সাথে অন্যায় আচরণ করে, তাহলে স্ত্রী খুলা বা তালাক চাইতে পারেন। তবে এটি সর্বশেষ সমাধান হিসেবে বিবেচনা করা উচিত।
৫. ধৈর্যের সাথে দোয়া করা
স্ত্রীর জন্য দোয়া করা এবং আল্লাহর কাছে সাহায্য প্রার্থনা করা গুরুত্বপূর্ণ। আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَل لَّهُ مَخْرَجًا "যে আল্লাহকে ভয় করে, আল্লাহ তার জন্য উত্তরণের পথ তৈরি করে দেন।" (সূরা আত-তালাক: ২)
সংক্ষিপ্ত উত্তর
ইসলাম কখনোই বলে না যে স্বামী যেমনই হোক, তার মতামতই চূড়ান্ত এবং স্ত্রীর নিজস্ব মতামত প্রকাশের কোনো অধিকার নেই। ইসলাম স্বামী-স্ত্রী উভয়ের অধিকার ও দায়িত্ব নির্ধারণ করে দিয়েছে। স্বামীর আনুগত্য কেবল বৈধ ও ন্যায়সঙ্গত বিষয়ে সীমাবদ্ধ। নেশাগ্রস্ত, অন্যায়কারী এবং খোরপোষ দিতে অক্ষম স্বামীর ক্ষেত্রে স্ত্রী তার মতামত প্রকাশ করতে পারবেন এবং প্রয়োজনে বিচ্ছেদও চাইতে পারেন।
দলিলসমূহ
১. সূরা আন-নিসা: ১৯, ৩৪ ২. সূরা আল-বাকারা: ২২৮ ৩. সূরা আত-তাহরিম: ৬ ৪. সূরা আত-তালাক: ৭ ৫. সূরা আল-মায়িদা: ৯০ ৬. সূরা আশ-শূরা: ৩৮ ৭. বুখারী: ৩৩৩১ ৮. মুসলিম: ১৪৬৮ ৯. তিরমিযী: ৩৮৯৫ ১০. মুসনাদ আহমাদ: ১০৯৮ ১১. রাদ্দুল মুহতার: ৩/৫৯৯ ১২. ফতোয়ায় আলমগীরী: ২/১৬০, ১/৫৪৫ ১৩. বাদায়েউস সানায়ে: ৪/১৮৫ ১৪. মাআরিফুল কুরআন (মুফতি মুহাম্মদ শফি রহ.)
স্ত্রীর জন্য উত্তম পথ হলো—ধৈর্য ধরা, সদুপদেশ দেওয়া, পরিবার ও বিজ্ঞজনকে সম্পৃক্ত করা এবং প্রয়োজনে ইসলামী আইন অনুযায়ী বিচ্ছেদের ব্যবস্থা নেওয়া। আল্লাহ তাআলা সবাইকে সঠিক পথে চলার তাওফিক দান করুন। আমীন।