জাদু গ্রস্থ অবস্থায় তালাক, এই পরিস্থিতিতে কি সিদ্ধান্ত নেয়া উত্তম?
Marriage and Divorce · Hanafi
Question
আসসালামু আলাইকুম
আমার বিয়ের বয়স ১.৫ বছর।আমি প্রেগন্যান্ট, ডেলিভারির সময় আছে ১৬ দিনের মতো।আমার জিনের আছর আছে। হাসবেন্ড এর পরীর আছর ছিল যদি ও এখন বলে তার কোনো সমস্যা ছিলনা।আর আমার মতে আমাদের জাদুর সমস্যা আছে। রুকইয়াহ করলে আমি ভালো ফিল করি।কিন্তু হাসবেন্ড বলে কোনো সমস্যা নেই। বেবি কনসিভের প্রথম ৩ মাসের দিকে কোনো রকম ঝগড়াঝাটি ছাড়া ডাক্তার দেখিয়ে আসার পর হঠাত আমার হাসবেন্ড আমাকে ১ তালাক বলছিল।পরে আমি সেটাকে সিরিয়াস মনে করলেও সে বলে তার মাথায় নাকি বলছিল আমাকে ছেড়ে দাও, ছেড়ে দাও, তাই তালাক বলছিল।
তারপর মাঝখানে সবকিছু ঠিক থাকে কোনোরকম সমস্যা হয়নি।আমার অসুস্থতা ছিল অনেক আর আমি আল্লাহ মাফ করুক কবিরাজ এর কাছে গেসলাম দেন আমার সুস্থতার জন্য কিছু দিন তাবিজ ব্যবহার করছিলাম কিন্তু পরে ভুল বুঝতে পেরে তওবা করি আর তাবিজ ফেলে দিই।বেশি খারাপ লাগলে পড়া অলিভ অয়েল আর সরিসার তেল দেই।এখন আবার আমার হাসবেন্ড বলতেছে ছাড়াছাড়ির কথা।বেবি নিয়ে আলাদা হওয়ার কথা।এরকম পরিস্থিতি আমার ও আমার পরিবার এর উপর অনেক চাপ ফেলে।এখন আমি পারমানেন্টলী একটা ডিসিশন নিতে চাচ্ছি।আমার প্রথম অবস্থায় বলা তালাক আর এখনের পরিস্থিতির উপর ভিত্তি করে শরীয়তের বিধান কি??সাথে বাচ্চা হওয়ার পর শরীয়ত কি বলে?আমার শাশুড়ীর সেভাবে চায়না আমাদের সংসার হোক সাথে আমার দেবর বিয়েতে রাজি ছিলনা। তারা কেউই চায়নি বিয়ে হোক কিন্তু আমার হাসবেন্ড এগুলো বিয়ের সময় আমাদের বলেনি।তাদের কারণে আমার পরিবার আমি সবসময় অশান্তিতে থাকি,কিছু না কিছু ঝামেলা লেগে থাকে। আমাকে উত্তম পরামর্শ দিয়ে সাহায্য করিয়েন।
Answer
বিস্তারিত ফতোয়া
প্রশ্ন: বিবাহিত জীবনে বিভিন্ন সমস্যা, জাদু-জিনের আছর, স্বামীর তালাক দেওয়ার কথা বলা, পারিবারিক অশান্তি ইত্যাদি কারণে স্থায়ী সিদ্ধান্ত নেওয়ার বিষয়ে শরীয়তের বিধান কী?
উত্তর
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
প্রিয় বোন, আপনার দীর্ঘ প্রশ্নটি মনোযোগ দিয়ে পড়েছি। আপনার সমস্যাগুলো অত্যন্ত জটিল এবং সংবেদনশীল। আল্লাহ তাআলা আপনার ধৈর্য ও সাহায্য করুন। আমি ধাপে ধাপে শরীয়তের বিধান তুলে ধরছি:
১. প্রথম তালাকের বিধান
আপনি বলেছেন, ডাক্তার দেখিয়ে আসার পর আপনার স্বামী বলেছিলেন "১ তালাক"। পরে তিনি বলেছেন যে, তার মাথায় বলছিল "ছেড়ে দাও, ছেড়ে দাও" তাই তিনি তালাক বলেছেন।
শরীয়তের বিধান: হানাফী মাযহাব অনুযায়ী, যদি কোনো ব্যক্তি তালাক শব্দ উচ্চারণ করে, তবে তা কার্যকর হয়ে যায়। তবে যদি তিনি প্রমাণ করতে পারেন যে, তিনি সম্পূর্ণ অজ্ঞান অবস্থায় বা জোরপূর্বক (ইকরাহ) প্রান নাশের হুমকিতে তিনি এমন বলেছেন, তাহলে ভিন্ন বিধান। কিন্তু "মাথায় বলছিল" বা "মনে হচ্ছিল" - এটি ইকরাহ বা জবরদস্তির পর্যায়ে পড়ে না। এটি কেবল অভ্যন্তরীণ প্ররোচনা, যা তালাক কার্যকর হওয়া থেকে বিরত রাখে না।
সুতরাং প্রশ্নে উল্লেখিত ছুরতে এক তালাকে রজয়ী পতিত হয়েছে।
এক্ষেত্রে তিনি যদি আপনাকে ফিরিয়ে নেন,তাহলে পুনরায় ঘর সংসার করা বৈধ হবে।
এক্ষেত্রে তিনি যদি আপনাকে ফিরিয়ে না নেন বা ইদ্দতকাল অতিবাহিত হওয়ার পর পুনরায় বিবাহ না করেন, তাহলে তো আপনাদের ঘর-সংসার করার কোন বৈধতা নেই।
আপনাদের এখনই পৃথক হয়ে যেতে হবে।
আর যদি তিনি আপনাকে ফিরিয়ে নেন তাহলে পরামর্শ থাকবে,পরবর্তী তালাকের ব্যপারে সন্তান জন্মের পর সিদ্ধান্ত নিন:
গর্ভাবস্থায় ও প্রসবকালীন সময়ে মানসিক চাপ মা ও শিশুর জন্য ক্ষতিকর। সন্তান জন্মের পর শান্ত মাথায় সিদ্ধান্ত নেওয়া উত্তম।
পারিবারিক সালিশ: উভয় পরিবারের সম্মানিত ব্যক্তিদের নিয়ে একটি সালিশি বৈঠক করুন। আল্লাহ তাআলা বলেন:
"যদি তোমরা স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে সম্পর্কের অবনতির আশঙ্কা কর, তবে স্বামীর পরিবার থেকে একজন এবং স্ত্রীর পরিবার থেকে একজন সালিস নিয়োগ কর। তারা উভয়ে যদি সংশোধন করতে চায়, তবে আল্লাহ তাদের মধ্যে মিলিয়ে দেবেন।" (সূরা নিসা: ৩৫)
রুকইয়াহ চালিয়ে যান: যেহেতু রুকইয়াহ করলে আপনি ভালো অনুভব করেন, তাই কুরআন ও সহীহ দুআ দ্বারা রুকইয়াহ করুন। জাদু-জিনের সমস্যা থাকলে তা দূর করার বৈধ উপায় হলো রুকইয়াহ।
সন্তান জন্মের পর:
- সন্তান উভয়েরই দায়িত্বে থাকবে
- যদি আপনাকে ফিরিয়ে না নেন,বা আবারো তালাক দেয়, তবে সন্তানের হেফাজতের অধিকার মায়ের থাকে নির্দিষ্ট বয়স পর্যন্ত (হানাফী মাযহাবে ছেলের জন্য ৭ বছর এবং মেয়ের জন্য ৯ বছর পর্যন্ত)
- স্বামীকে সন্তানের ভরণপোষণ দিতে হবে
ইমাম আবু হানীফা (রহ.) এর মতে, সন্তানের হেফাজতের অধিকার মায়ের। (আল-হিদায়া, ২/৩৮)
৫. পারিবারিক অশান্তি
আপনার শাশুড়ি ও দেবর বিয়ে চাননি এবং তারা অশান্তি তৈরি করছে। এটি অত্যন্ত দুঃখজনক। তবে মনে রাখবেন, ইসলামে স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
"তোমাদের মধ্যে সেই উত্তম যে তার স্ত্রীর কাছে উত্তম।" (তিরমিজি: ৩৮৯৫)
আপনার স্বামীকে উচিত তার পরিবারের চাপ থেকে আপনাকে রক্ষা করা। যদি তিনি তা না করেন, তবে এটি তার দায়িত্বে ঘাটতি।
والله أعلم بالصواب