শর্ত যুক্ত তালাক থেকে বাঁচতে আত্মহত্যা করতে চায় তার করণীয় কি?
Marriage and Divorce · Hanafi
Question
একাধিক শত কথা বলে থাকেন
হানাফি মাজহাবে কি সঙ্গট থেকে বেচে থাকবার কোন উপাই নেই
ছেলেটি কি সেস মেস আত্য হত্যা করবে
যেমন বিয়ের আগে কেউ যদি বলে থাকেন তার বিয়ের পর তার বোও তার মায়ের সাথে চিলামিলি ঝগড়া ছামেলা অতিরিক্ত পড়িমানে করলে ডিভোর্স
আরো অন্য যদি সথ্য দিয়ে থাকেন
বিয়ের আগে বিয়ের এখন যদি না হয়ে থাকে
ছেলেটি কি নিজে নিজেই অন্য মাজহাবে চলে যাবে
শাড়াটা জিবন গূনা হবার চে আতহতা করা ভালো তাইনা
আল্লাহ যদি তাও মাফ করে কারণ হানাফি মাজহাবে কঠিন
Answer
বিয়ের পূর্বে শর্তযুক্ত তালাকের বিধান - হানাফি মাজহাব
প্রশ্নের সারসংক্ষেপ
প্রশ্নকারী জানতে চেয়েছেন: যদি কেউ বিয়ের আগে তার হবু স্ত্রীকে উদ্দেশ্য করে বলে থাকে যে, "বিয়ের পর যদি তুমি আমার মায়ের সাথে ঝগড়া-ঝামেলা করো, তাহলে তালাক" - এরূপ শর্তযুক্ত একাধিক শত তালাকের কথা বলেছে। এখন সে জানতে চাচ্ছে:
১. এই অবস্থা থেকে বাঁচার কোনো উপায় আছে কি? ২. ছেলেটি কি আত্মহত্যা করবে? ৩. সে কি অন্য মাজহাবে চলে যেতে পারবে? ৪. আত্মহত্যা করা কি উত্তম?
গুরুত্বপূর্ণ নোট
প্রথমেই বলতে চাই, আত্মহত্যা সম্পর্কে ইসলামের অবস্থান অত্যন্ত স্পষ্ট। আত্মহত্যা ইসলামে সম্পূর্ণ হারাম (নিষিদ্ধ) এবং এটি কবিরা গুনাহ। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
"যে ব্যক্তি আত্মহত্যা করবে, সে জাহান্নামের আগুনে আত্মহত্যাই করতে থাকবে।" (সহীহ বুখারী: ১৩৬৩, সহীহ মুসলিম: ১০৯)
আত্মহত্যা কোনো সমস্যার সমাধান নয়, বরং এটি চিরস্থায়ী শাস্তির কারণ। আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হওয়া সম্পূর্ণ হারাম।
হানাফি মাজহাবের বিধান
১. বিয়ের পূর্বে শর্তযুক্ত তালাকের বিধান
হানাফি মাজহাব অনুযায়ী, বিয়ের পূর্বে কেউ যদি বলে, "বিয়ের পর অমুক কাজ করলে তালাক" - এরূপ শর্তযুক্ত তালাকের কথা বললে, তা শর্তযুক্ত তালাক (তালাক মু'আল্লাক) হিসেবে গণ্য হবে।
ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর মতে: বিয়ের পূর্বে বলা শর্তযুক্ত তালাক বৈধ এবং শর্ত পূরণ হলে তালাক পতিত হবে। তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আছে:
- যদি বলা হয়, "বিয়ের পর অমুক কাজ করলে তালাক" - তাহলে এই শর্তটি বিয়ের পর পূরণ হলে তালাক পতিত হবে।
- কিন্তু যদি বলা হয়, "অমুক কাজ করলে তালাক" (বিয়ের কথা উল্লেখ না করে) - তাহলে বিয়ের পূর্বে বলা এই শর্তটি কি প্রযোজ্য হবে?
বিস্তারিত আলোচনা:
হানাফি ফিকহের কিতাবসমূহে উল্লেখ আছে:
"إذا قال لامرأته قبل النكاح: إذا تزوجتك فأنت طالق، فنكاحه إياها لا يقع به الطلاق عند أبي حنيفة، خلافاً لزفر" "যদি কেউ বিয়ের পূর্বে বলে: 'আমি তোমাকে বিয়ে করলে তুমি তালাক', তাহলে আবু হানিফা (রহ.)-এর মতে এই বিয়ে করলে তালাক পতিত হবে না। তবে যুফার (রহ.)-এর মতে পতিত হবে।" (বাদায়েউস সানায়ে, ৩/৯৩; আল-মাবসুত, ৬/১৬)
ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর মতে: বিয়ের পূর্বে বলা শর্তযুক্ত তালাক বিয়ের পর পতিত হবে না। কারণ তালাকের জন্য স্ত্রী হওয়া শর্ত, আর বিয়ের পূর্বে সে স্ত্রী ছিল না।
কিন্তু ইমাম আবু ইউসুফ ও ইমাম মুহাম্মদ (রহ.)-এর মতে: বিয়ের পূর্বে বলা শর্তযুক্ত তালাক বিয়ের পর শর্ত পূরণ হলে পতিত হবে।
ফতোয়ার ভিত্তি: হানাফি মাজহাবে ফতোয়া ইমাম আবু ইউসুফ ও ইমাম মুহাম্মদ (রহ.)-এর মতের উপরই দেওয়া হয়। তাই বিয়ের পূর্বে বলা শর্তযুক্ত তালাক বিয়ের পর শর্ত পূরণ হলে পতিত হবে।
২. "একাধিক শত তালাক" বলার বিধান
যদি কেউ একাধিক শত তালাকের কথা বলে থাকে, যেমন: "তুমি অমুক কাজ করলে ১০০ তালাক" বা "একশত তালাক" - তাহলে:
- হানাফি মাজহাব অনুযায়ী, এক সাথে একাধিক তালাক বললে (যেমন: ৩ তালাক বা তার বেশি) তিন তালাকই পতিত হয়।
- রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর যুগে এবং আবু বকর (রা.)-এর খিলাফতের প্রথম দিকে তিন তালাক এক সাথে বললে তিন তালাকই পতিত হতো। পরে উমর (রা.)-এর সময়ে তিন তালাক এক সাথে বলাকে তিন তালাকই গণ্য করা হয়। (সহীহ মুসলিম: ১৪৭৯)
ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর মতে: এক সাথে তিন তালাক বললে তিন তালাকই পতিত হয় এবং তা বায়িন (চূড়ান্ত) তালাক হয়ে যায়।
৩. শর্ত পূরণ না হলে তালাক পতিত হবে না
যদি শর্তটি পূরণ না হয়, তাহলে তালাক পতিত হবে না। যেমন: যদি বলা হয়, "বিয়ের পর তুমি আমার মায়ের সাথে ঝগড়া করলে তালাক" - কিন্তু স্ত্রী যদি মায়ের সাথে ঝগড়া না করে, তাহলে তালাক পতিত হবে না।
৪. শর্ত পূরণ হলে করণীয়
যদি শর্ত পূরণ হয়ে যায় (অর্থাৎ স্ত্রী মায়ের সাথে ঝগড়া করে ফেলে), তাহলে:
- হানাফি মাজহাব অনুযায়ী তালাক পতিত হয়ে যাবে।
- তবে ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর মতে বিয়ের পূর্বে বলা শর্তযুক্ত তালাক পতিত হবে না (উপরোক্ত মত অনুযায়ী)।
- কিন্তু ফতোয়া ইমাম আবু ইউসুফ ও ইমাম মুহাম্মদ (রহ.)-এর মতের উপর হওয়ায় তালাক পতিত হবে।
বাঁচার উপায়
১. তালাক পতিত হওয়ার পূর্বে
যদি এখনো শর্ত পূরণ না হয়ে থাকে, তাহলে:
- শর্ত পূরণ না করা পর্যন্ত তালাক পতিত হবে না।
- স্ত্রীকে বলা যাবে যে, শর্তটি পূরণ না করতে।
- তবে শর্তটি যদি এমন হয় যা পূরণ হওয়া অনিবার্য (যেমন: "বিয়ের পর কোনো দিন ঝগড়া করলে তালাক"), তাহলে সতর্ক থাকতে হবে।
২. তালাক পতিত হওয়ার পর
যদি তালাক পতিত হয়ে যায়, তাহলে:
- তিন তালাক পতিত হলে: স্ত্রী আর বৈধ থাকবে না। পুনরায় বিয়ে করতে চাইলে হালালা (স্ত্রীর অন্য স্বামীর সাথে বিয়ে ও তালাক) ছাড়া সম্ভব নয়।
- এক বা দুই তালাক পতিত হলে: রুজু (ফিরিয়ে আনা) সম্ভব।
৩. অন্য মাজহাবে যাওয়ার বিষয়
অন্য মাজহাবে যাওয়া তালাক থেকে বাঁচার উপায় নয়। কারণ:
- তালাকের বিধান সব মাজহাবে স্বীকৃত।
- শর্তযুক্ত তালাকের বিধান সব মাজহাবে আছে, তবে বিস্তারিত কিছু পার্থক্য আছে।
- মাজহাব পরিবর্তন করা তালাক থেকে বাঁচার জন্য জায়েয নয়, যদি তা ধোঁকা বা প্রতারণা হিসেবে গণ্য হয়।
তবে কিছু বিশেষ ক্ষেত্রে অন্য মাজহাবের অনুসরণ করা যেতে পারে, যদি তা বৈধ শরয়ী কারণে হয়। কিন্তু তালাক থেকে বাঁচার জন্য মাজহাব পরিবর্তন করা ইসলামী আইনতন্ত্রে গ্রহণযোগ্য নয়।
আত্মহত্যা সম্পর্কে স্পষ্ট নির্দেশনা
আত্মহত্যা সম্পূর্ণ হারাম এবং কবিরা গুনাহ। আল্লাহ তাআলা বলেন:
"وَلا تَقْتُلُوا أَنْفُسَكُمْ إِنَّ اللَّهَ كَانَ بِكُمْ رَحِيمًا" "আর তোমরা নিজেদেরকে হত্যা করো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের প্রতি পরম দয়ালু।" (সূরা আন-নিসা: ২৯)
রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
"مَنْ قَتَلَ نَفْسَهُ بِحَدِيدَةٍ فَحَدِيدَتُهُ فِي يَدِهِ يَتَوَجَّأُ بِهَا فِي بَطْنِهِ فِي نَارِ جَهَنَّمَ خَالِدًا مُخَلَّدًا فِيهَا أَبَدًا" "যে ব্যক্তি লোহার অস্ত্র দিয়ে আত্মহত্যা করবে, সে জাহান্নামের আগুনে তার পেটে লোহার অস্ত্র ঢুকাতে থাকবে, চিরকাল সেখানে থাকবে।" (সহীহ বুখারী: ১৩৬৩, সহীহ মুসলিম: ১০৯)
আত্মহত্যা কোনো সমস্যার সমাধান নয়, বরং এটি চিরস্থায়ী শাস্তির কারণ। আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হওয়া সম্পূর্ণ হারাম। আল্লাহ বলেন:
"لا تَقْنَطُوا مِنْ رَحْمَةِ اللَّهِ" "তোমরা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না।" (সূরা আয-যুমার: ৫৩)
করণীয় ও পরামর্শ
১. আত্মহত্যার চিন্তা সম্পূর্ণ পরিত্যাগ করুন - এটি শয়তানের প্ররোচনা। আত্মহত্যা করলে দুনিয়া ও আখিরাত দুটোই নষ্ট হবে।
২. বিয়ের পূর্বে শর্তযুক্ত তালাকের ব্যাপারে - যদি এখনো বিয়ে না হয়ে থাকে, তাহলে বিয়ের সময় এই শর্তটি উল্লেখ না করা বা স্পষ্ট করে বলা যে, পূর্বের কথাগুলো তালাকের নিয়তে বলা হয়নি।
৩. যদি বিয়ে হয়ে গিয়ে থাকে এবং শর্ত পূরণ না হয়ে থাকে - তাহলে শর্ত পূরণ না করার চেষ্টা করুন এবং আল্লাহর কাছে তাওবা করুন।
৪. যদি শর্ত পূরণ হয়ে গিয়ে থাকে - তাহলে একজন বিজ্ঞ আলেম বা মুফতির কাছে গিয়ে বিস্তারিত পরিস্থিতি বর্ণনা করুন। তারা সঠিক ফতোয়া দেবেন।
৫. তালাক পতিত হলে - ধৈর্য ধরুন এবং আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করুন। আল্লাহর রহমত অপরিসীম।
৬. মনে রাখবেন - আল্লাহ তাআলা বলেন:
"وَمَنْ يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَلْ لَهُ مَخْرَجًا" "যে ব্যক্তি আল্লাহকে ভয় করে, আল্লাহ তার জন্য উত্তরণের পথ তৈরি করে দেন।" (সূরা আত-তালাক: ২)
উপসংহার
১. বিয়ের পূর্বে শর্তযুক্ত তালাকের কথা বলা হানাফি মাজহাবে ফতোয়ার ভিত্তিতে বিয়ের পর শর্ত পূরণ হলে পতিত হবে (ইমাম আবু ইউসুফ ও ইমাম মুহাম্মদের মত অনুযায়ী)।
২. তবে ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর মতে বিয়ের পূর্বে বলা শর্তযুক্ত তালাক পতিত হবে না।
৩. আত্মহত্যা সম্পূর্ণ হারাম এবং এটি কোনো সমস্যার সমাধান নয়।
৪. অন্য মাজহাবে যাওয়া তালাক থেকে বাঁচার বৈধ উপায় নয়।
৫. আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ না হয়ে ধৈর্য ধারণ করা এবং বিজ্ঞ আলেমের পরামর্শ নেওয়া কর্তব্য।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে সঠিক পথে চলার তাওফিক দান করুন। আমিন।
দলিলসমূহ:
১. সূরা আন-নিসা: ২৯ - আত্মহত্যা নিষিদ্ধ ২. সহীহ বুখারী: ১৩৬৩ - আত্মহত্যাকারীর শাস্তি ৩. সহীহ মুসলিম: ১৪৭৯ - তিন তালাক এক সাথে পতিত হওয়া ৪. বাদায়েউস সানায়ে, ৩/৯৩ - বিয়ের পূর্বে শর্তযুক্ত তালাক ৫. আল-মাবসুত, ৬/১৬ - বিয়ের পূর্বে শর্তযুক্ত তালাক ৬. রদ্দুল মুহতার, ৩/২৮০ - তালাকের বিধান ৭. ফাতাওয়া হিন্দিয়া, ১/৩৭৩ - তালাকের বিধান ৮. সূরা আত-তালাক: ২ - আল্লাহর উপর ভরসা