পাবলিক বাসে চলাচল, পর্দার ক্ষতি, পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া, পারিবারিক চাপ ও ইস্তেখারা সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নিতে বিস্তারিত পরামর্শ চাই
Miscellaneous Fiqh · Hanafi
Question
আমি যেই ভার্সিটিতে পড়ি সেখানে সহশিক্ষা নেই তবে ভার্সিটি আসা যাওয়ার জন্য পাবলিক বাস ব্যবহার করতে হয়। আমরা তেমন সামর্থবান না পাবলিক বাসের বিকল্প কোন ট্রান্সপোর্ট ব্যবহার করা অসম্ভব। আমার বড় বোন দ্বীনে ফেরার পর সহশিক্ষা ছেড়ে দেয় এতে আব্বু আমার বোনকে অনেক অপমান করেন বাসা থেকেও বের করে দিয়েছিলেন (সে বিবাহিত)। এখন আমি সেই সব ঝামেলার জন্য ছাড়তেও পারছিনা এছাড়াও এখন ছাড়তে হলে ১বছরের সমস্ত ফি দিয়ে কাগজ পত্র উঠাতে হবে তারপর ছাড়তে পারবো কিন্ত আমাদের এখন সেই সামর্থ্য নেই একসাথে এত গুলো টাকা দেওয়ার আর পড়ালেখা ছাড়ার জন্য এই টাকা আব্বু দিবেও না। আমার আব্বু অনেক বদমেজাজী অনেক অহংকার তার,, কিছু থেকে কিছু হলে অনেক দুর্ব্যবহার করেন,, বাসায় প্রতিদিন প্রতি বেলা ছোট খাট বিষয় নিয়ে চিল্লাচিল্লি,গালিগালাজ করেন।আমার আব্বুর অধিনস্থ (যেমন তার সন্তান,স্ত্রী)যারা সবার সাথেই অনেক বাজে ব্যবহার করেন।বুঝ হয়েছে ধরে বাসায় এসব দেখে আসছি মানসিক অবস্থাও ভাল না সব সময় আতংকে থাকতে হয়।এমন পরিস্থিতে আমার বাসায় থাকতেও ইচ্ছে করেনা ভার্সিটি গেলে অনেকটা টাইম বাসায় থাকা হয়না তাই মানসিক চাপও কিছুটা কমে।কিন্তু ভার্সিটি আসা যাওয়া করতে পাবলিক বাস ব্যবহার করতে হয় এতে তো পর্দার ক্ষতি হচ্ছে। জার্নি করতে হয় ১২-১৩ কি.মি পথ এতে নামাজ মিস হয় না তবে পড়তে অনেক কষ্ট হয়ে যায়। যেদিন ক্লাস থাকে সেদিন ইবাদত করাও কম হয়ে যায়।
আমি এই অবস্থায় কি করবো? পড়াশুনা ছাড়তেও পারছিনা এসব কারণে।
আর আমি যেই কোন সিদ্ধান্ত নিতেই অনেক দিদ্বাদন্দে ভুগি ইস্তেখারা করেও কোন সিদ্ধান্ত নিতে পারিনা।এটা কিভাবে ঠিক করবো?
Answer
উত্তর: وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
প্রশ্নটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং সংবেদনশীল। আপনি যে জটিল পরিস্থিতির মধ্যে দিয়ে যাচ্ছেন, তা সত্যিই কঠিন। আপনার প্রশ্নের উত্তরটি কয়েকটি ভাগে বিভক্ত করে দিচ্ছি, যাতে আপনি সহজে বুঝতে পারেন এবং শরীয়তসম্মত সিদ্ধান্ত নিতে পারেন।
১. পাবলিক বাসে চলাচল ও পর্দার বিধান:
আপনি বলেছেন, ভার্সিটিতে যাওয়ার জন্য পাবলিক বাস ব্যবহার করতে হয় এবং এতে পর্দার ক্ষতি হচ্ছে। শরীয়তের দৃষ্টিতে, পর্দা ফরজ। তবে, প্রয়োজনের তাগিদে (যেমন: শিক্ষা অর্জন বা জীবিকা নির্বাহের জন্য) যদি পাবলিক ট্রান্সপোর্ট ব্যবহার করা ছাড়া উপায় না থাকে, তাহলে সেটি মা'যুর হিসেবে গণ্য হবে। অর্থাৎ, আপনি যদি চেষ্টা করেন পর্দা রক্ষা করার (যেমন: পূর্ণ আবরণ, চেহারা ঢেকে রাখা, সম্ভব হলে মহিলাদের জন্য নির্ধারিত সিটে বসা, কারো সাথে অপ্রয়োজনীয় কথা না বলা), তাহলে পর্দার ক্ষতি হলেও আপনি গুনাহগার হবেন না, ইনশাআল্লাহ।
কুরআন ও হাদিসের নির্দেশনা:
- আল্লাহ তাআলা বলেন: "আর তোমরা নিজেদের হাত দিয়ে নিজেদেরকে ধ্বংসের মধ্যে নিক্ষেপ করো না।" (সূরা আল-বাকারা: ১৯৫) — অর্থাৎ, শিক্ষা অর্জনের মতো প্রয়োজনীয় কাজ বন্ধ করে নিজেকে চরম ক্ষতির মধ্যে ফেলা উচিত নয়।
- রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: "প্রয়োজনীয়তার কারণে নিষিদ্ধ বস্তু বৈধ হয়ে যায়।" (আল-আশবাহ ওয়ান-নাযাইর, ইবনে নুজাইম) — এটি একটি মূলনীতি। আপনার ক্ষেত্রে, পাবলিক বাস ব্যবহার করা যদি একান্তই প্রয়োজন হয় (অন্য কোনো উপায় না থাকে), তাহলে পর্দার ক্ষতি সত্ত্বেও তা ব্যবহার করা জায়েয হবে, তবে পর্দার সর্বোচ্চ চেষ্টা করতে হবে।
হানাফি ফিকহের দলিল:
- রদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদীন): এতে বলা হয়েছে, "যদি কোনো নারীকে বের হতে হয় এবং সে পর্দা রক্ষা করে, তাহলে তার জন্য বের হওয়া জায়েয, বিশেষ করে প্রয়োজনের সময়।" (রদ্দুল মুহতার, ২/৩৮৩)
- ফাতাওয়া হিন্দিয়া (আলমগিরি): এতে বলা হয়েছে, "যদি কোনো নারী নিরুপায় হয়ে বের হয় এবং সে নিজেকে আবৃত রাখে, তাহলে তার জন্য কোনো গুনাহ নেই।" (ফাতাওয়া হিন্দিয়া, ৫/৩২৮)
আপনার করণীয়:
- বাসে ওঠার সময় এবং নামার সময় পর্দার দিকে বিশেষ খেয়াল রাখুন।
- সম্ভব হলে বোরকা বা এমন পোশাক পরুন যা সম্পূর্ণ শরীর ঢেকে রাখে এবং আকর্ষণীয় না হয়।
- বাসে মহিলাদের জন্য নির্ধারিত সিটে বসার চেষ্টা করুন।
- কারো সাথে অপ্রয়োজনীয় কথা বলা থেকে বিরত থাকুন।
২. নামাজ ও ইবাদতের ক্ষতি:
আপনি বলেছেন, ১২-১৩ কিলোমিটার পথ যাতায়াতের কারণে নামাজ পড়তে কষ্ট হয় এবং ক্লাসের দিনে ইবাদত কমে যায়। এটি একটি বাস্তব সমস্যা।
সমাধান:
- নামাজ: সফরের (ভ্রমণের) ক্ষেত্রে শরীয়তে কিছু শিথিলতা আছে। তবে, ১২-১৩ কিলোমিটার পথকে শরীয়তের পরিভাষায় "সফর" বলা হয় না (সফর হলো ৪৮ মাইল বা প্রায় ৭৭ কিলোমিটার)। তাই আপনি নামাজ কসর (সংক্ষিপ্ত) করতে পারবেন না। তবে, আপনি যদি বাসে থাকাকালীন নামাজের সময় হয়ে যায়, তাহলে বাস থামলে বা গন্তব্যে পৌঁছে নামাজ আদায় করবেন। নামাজ কখনো ছেড়ে দেবেন না, কারণ নামাজ ছেড়ে দেওয়া কবিরা গুনাহ।
- ইবাদত: ক্লাসের দিনে ইবাদত কমে যাওয়া স্বাভাবিক। তবে, চেষ্টা করবেন ফরজ নামাজগুলো যথাসময়ে আদায় করার। নফল ইবাদত (যেমন: তিলাওয়াত, জিকির) কম হলেও, ফরজ নামাজগুলো কখনো ছাড়বেন না। বাসে যাওয়ার সময় বা আসার সময় জিকির, দরুদ বা কুরআন তিলাওয়াত (মোবাইলে দেখে) করতে পারেন।
৩. পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া নাকি ছেড়ে দেওয়া:
আপনার পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, পড়াশোনা ছেড়ে দেওয়া আপনার জন্য বুদ্ধিমানের কাজ হবে না, কারণ:
- আপনার আব্বু পড়াশোনার খরচ দিতে রাজি নন, এবং ছাড়তে গেলে ১ বছরের ফি দিতে হবে, যা আপনার সামর্থ্যের বাইরে।
- পড়াশোনা ছেড়ে দিলে আপনি বাসায় থাকতে বাধ্য হবেন, যেখানে আপনার মানসিক চাপ আরও বেড়ে যাবে।
- শিক্ষা অর্জন করা ইসলামে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, বিশেষ করে মেয়েদের জন্য।
সিদ্ধান্ত:
- পড়াশোনা চালিয়ে যান। তবে, পর্দার সর্বোচ্চ চেষ্টা করুন এবং বাসে চলাচলের সময় পর্দা রক্ষার নিয়ম মেনে চলুন।
- আব্বুর সাথে সম্পর্ক: আপনার আব্বুর আচরণ কঠোর হলেও, আপনি তার সাথে সম্মানজনক আচরণ করবেন। তার সাথে তর্ক বা বিতর্কে যাবেন না। সম্ভব হলে, তার সাথে শান্তভাবে কথা বলার চেষ্টা করুন, তবে যদি তিনি রাগান্বিত হন, তাহলে চুপ থাকাই উত্তম।
- মানসিক চাপ: আপনি মানসিক চাপে আছেন, এটি স্বাভাবিক। এই চাপ কমানোর জন্য আপনি নিয়মিত ইস্তেগফার (ক্ষমা প্রার্থনা) করুন এবং আল্লাহর উপর ভরসা রাখুন। মনে রাখবেন, আল্লাহ বলেন: "নিশ্চয়ই কষ্টের সাথে স্বস্তি রয়েছে।" (সূরা আল-ইনশিরাহ: ৬)
৪. ইস্তেখারা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ:
আপনি বলেছেন, ইস্তেখারা করেও সিদ্ধান্ত নিতে পারছেন না। এটি একটি সাধারণ সমস্যা। ইস্তেখারা মানে এই নয় যে, স্বপ্নে বা মনে কোনো ইঙ্গিত আসবেই। ইস্তেখারা হলো, আল্লাহর কাছে কল্যাণ প্রার্থনা করা। এরপর আপনি যে সিদ্ধান্তই নেন, মনে করবেন সেটিই আপনার জন্য কল্যাণকর।
ইস্তেখারার সঠিক পদ্ধতি:
- দুই রাকাত নফল নামাজ পড়ুন।
- এরপর ইস্তেখারার দোয়া পড়ুন (যা হাদিসে বর্ণিত)।
- এরপর আপনার মনে যা ভালো মনে হয়, বা যে সিদ্ধান্ত নিতে মন চায়, সেটিই গ্রহণ করুন। মনে করবেন, আল্লাহ আপনার জন্য সেটিই ভালো করেছেন।
আপনার জন্য পরামর্শ:
- আপনি ইতিমধ্যে পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার পক্ষে যুক্তি দিয়েছেন (যেমন: খরচ, বাসার চাপ)। এটি আপনার জন্য সঠিক সিদ্ধান্ত বলে মনে হচ্ছে। তাই ইস্তেখারা করে পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিন এবং আল্লাহর উপর ভরসা রাখুন।
- মনে রাখবেন, ইস্তেখারার পর যদি কোনো সিদ্ধান্ত নিতে মন না চায়, তাহলে বারবার ইস্তেখারা না করে, সব দিক বিবেচনা করে যে সিদ্ধান্তটি যুক্তিসঙ্গত মনে হয়, সেটিই নেওয়া উচিত।
৫. পারিবারিক সমস্যা ও ধৈর্য:
আপনার আব্বুর আচরণের কারণে আপনি মানসিকভাবে বিপর্যস্ত। এটি সত্যিই কঠিন। তবে, ইসলামে পিতামাতার সাথে সদ্ব্যবহারের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, এমনকি তারা অন্যায় করলেও।
কুরআনের নির্দেশনা:
- আল্লাহ তাআলা বলেন: "আর আমি মানুষকে তার পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহার করার নির্দেশ দিয়েছি।" (সূরা আল-আহকাফ: ১৫)
- তবে, এর অর্থ এই নয় যে, আপনি তাদের অন্যায় আচরণ মেনে নেবেন। আপনি চুপচাপ থাকবেন, কিন্তু মনে মনে তাদের জন্য দোয়া করবেন।
পরামর্শ:
- আপনার আব্বুর সাথে সরাসরি সংঘর্ষে যাবেন না।
- সম্ভব হলে, আপনার বোনের মতো আপনিও দ্বীনের পথে থাকুন, তবে আব্বুকে না জানিয়ে বা তার সাথে বিতর্কে না গিয়ে।
- আপনার জন্য সবচেয়ে ভালো হবে, পড়াশোনা শেষ করে স্বাবলম্বী হওয়া, যাতে আপনি একটি স্বাধীন ও ইসলামিক পরিবেশে জীবনযাপন করতে পারেন।
৬. চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত:
আপনার জন্য চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হলো:
- পড়াশোনা চালিয়ে যান। এটি আপনার জন্য জরুরি, কারণ এটি আপনার ভবিষ্যতের জন্য প্রয়োজনীয়।
- পর্দার সর্বোচ্চ চেষ্টা করুন। পাবলিক বাসে চলাচল করলেও পর্দার নিয়ম মেনে চলুন। মনে রাখবেন, প্রয়োজনের তাগিদে পর্দার ক্ষতি হলে আপনি গুনাহগার হবেন না, ইনশাআল্লাহ।
- নামাজ কখনো ছাড়বেন না। কষ্ট হলেও নামাজ আদায় করুন।
- আব্বুর সাথে ধৈর্য ধরুন। তার সাথে সম্মানজনক আচরণ করুন এবং তার জন্য দোয়া করুন।
- ইস্তেখারা করে সিদ্ধান্ত নিন। ইস্তেখারা করার পর যে সিদ্ধান্ত যুক্তিসঙ্গত মনে হয়, সেটিই গ্রহণ করুন এবং আল্লাহর উপর ভরসা রাখুন।
আল্লাহ তাআলা আপনার জন্য সহজ পথ বের করে দেবেন, ইনশাআল্লাহ। আপনি ধৈর্য ধারণ করুন এবং আল্লাহর কাছে সাহায্য প্রার্থনা করুন।
আল্লাহই সর্বজ্ঞ।