সন্তান জন্মের পর পরই মা বাবার করণীয় কী? কী কী করা সুন্নাহ?
Sunnah and Bid'ah · Hanafi
Question
সন্তান জন্মের পর পরই মা বাবার করণীয় কী? কী কী করা সুন্নাহ?
Answer
وعلیکم السلام ورحمة الله وبركاته
সন্তান জন্মের পর মা-বাবার করণীয় ও সুন্নতসমূহ
আলহামদুলিল্লাহ, সন্তান আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে একটি শ্রেষ্ঠ নেয়ামত। সন্তান জন্মের পর ইসলামী শরিয়ত ও সুন্নাহ অনুযায়ী কিছু গুরুত্বপূর্ণ কাজ রয়েছে যা মা-বাবার করা উচিত। নিম্নে বিস্তারিত তুলে ধরা হলো:
১. সন্তান জন্মের পর প্রথম কাজ: শুকরিয়া আদায় করা
সন্তান জন্মের পর সবার প্রথমে আল্লাহ তাআলার শুকরিয়া আদায় করা এবং সন্তান সুস্থভাবে জন্মেছে বলে আনন্দ প্রকাশ করা। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন:
"وَقَالَ رَبِّ أَوْزِعْنِي أَنْ أَشْكُرَ نِعْمَتَكَ الَّتِي أَنْعَمْتَ عَلَيَّ وَعَلَىٰ وَالِدَيَّ" "আর তিনি বললেন, হে আমার রব! আপনি আমার প্রতি ও আমার পিতামাতার প্রতি যে নেয়ামত দান করেছেন, তার শুকরিয়া আদায় করার তাওফিক দিন।" (সূরা আহকাফ: ১৫)
২. সুসংবাদ প্রদান ও দোয়া করা
সন্তান জন্মের পর পরিবারের সদস্যদেরকে সুসংবাদ দেওয়া এবং সন্তানের জন্য দোয়া করা। কুরআনে হযরত যাকারিয়া (আঃ) এর দোয়ার উল্লেখ রয়েছে:
"رَبِّ هَبْ لِي مِن لَّدُنكَ ذُرِّيَّةً طَيِّبَةً ۖ إِنَّكَ سَمِيعُ الدُّعَاءِ" "হে আমার রব! আপনার পক্ষ থেকে আমাকে পবিত্র সন্তান দান করুন। নিশ্চয়ই আপনি দোয়া শ্রবণকারী।" (সূরা আলে ইমরান: ৩৮)
৩. ডান কানে আজান ও বাম কানে ইকামত দেওয়া (সুন্নাহ)
সন্তান জন্মের পর ডান কানে আজান এবং বাম কানে ইকামত দেওয়া সুন্নাহ। হাদীসে বর্ণিত হয়েছে:
عَنْ أَبِي رَافِعٍ قَالَ: رَأَيْتُ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَذَّنَ فِي أُذُنِ الْحَسَنِ بْنِ عَلِيٍّ حِينَ وَلَدَتْهُ فَاطِمَةُ بِالصَّلَاةِ "আবু রাফি (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-কে দেখেছি, ফাতিমা (রাঃ) যখন হাসান (রাঃ)-কে জন্ম দেন, তখন তিনি তার ডান কানে আজান দেন।" (আবু দাউদ: ৫১০৫, তিরমিযী: ১৫১৪)
হানাফি ফিকহের বিধান: ইমাম আবু হানিফা (রহঃ) সহ হানাফি ফুকাহায়ে কেরামগণ এই আমলকে সুন্নাহ বলেছেন। তবে কোনো কোনো বর্ণনায় বাম কানে ইকামতের কথা এসেছে, যা মুস্তাহাব। (রদ্দুল মুহতার, ৬/৩৮৭)
৪. তাহনীক করা (সুন্নাহ)
নবজাতকের মুখে খেজুর বা মিষ্টি জিনিস চিবিয়ে দেওয়াকে তাহনীক বলে। এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ সুন্নাহ। হাদীসে বর্ণিত:
عَنْ أَسْمَاءَ بِنْتِ أَبِي بَكْرٍ أَنَّهَا حَمَلَتْ بِعَبْدِ اللَّهِ بْنِ الزُّبَيْرِ فَخَرَجَتْ وَهِيَ مُتَمِّمٌ فَأَتَتْ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَوَضَعَهُ فِي حَجْرِهِ ثُمَّ دَعَا بِتَمْرٍ فَمَضَغَهُ ثُمَّ تَفَلَ فِي فِيهِ فَكَانَ أَوَّلَ شَيْءٍ دَخَلَ جَوْفَهُ رِيقُ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ "আসমা বিনতে আবু বকর (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি আব্দুল্লাহ ইবনে যুবায়ের (রাঃ)-কে গর্ভে ধারণ করেন। তিনি রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর কাছে আসেন এবং তিনি তাকে নিজের কোলে রাখেন। তারপর খেজুর আনার আদেশ দেন, তা চিবিয়ে তার মুখে দেন। সুতরাং তার পেটে সর্বপ্রথম যা প্রবেশ করে তা ছিল রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর মুখের লালা।" (বুখারী: ৫৪৬৯)
বিধান: বর্তমানে রাসূল (সাঃ)-এর লালা পাওয়া সম্ভব নয়, তবে কোনো আলেম বা পious ব্যক্তি খেজুর চিবিয়ে শিশুর মুখে দিতে পারেন। এটি মুস্তাহাব।
৫. আকীকা করা (সুন্নাহ)
সন্তান জন্মের ৭ম দিনে আকীকা করা সুন্নাহ। হাদীসে বর্ণিত:
عَنْ سَلْمَانَ بْنِ عَامِرٍ الضَّبِّيِّ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: مَعَ الْغُلَامِ عَقِيقَةٌ فَأَهْرِيقُوا عَنْهُ دَمًا وَأَمِيطُوا عَنْهُ الْأَذَى "সালমান ইবনে আমির (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন: ছেলের সাথে আকীকা রয়েছে। সুতরাং তার পক্ষ থেকে রক্ত প্রবাহিত কর (পশু যবেহ কর) এবং তার থেকে কষ্ট দূর কর (মাথা মুণ্ডন কর)।" (বুখারী: ৫৪৭২)
হানাফি ফিকহের বিধান:
- ছেলে সন্তানের জন্য: ২টি ছাগল বা ভেড়া
- মেয়ে সন্তানের জন্য: ১টি ছাগল বা ভেড়া
عَنْ أُمِّ كُرْزٍ قَالَتْ: سَمِعْتُ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَقُولُ: عَنْ الْغُلَامِ شَاتَانِ مُكَافِئَتَانِ وَعَنْ الْجَارِيَةِ شَاةٌ "উম্মে কুরয (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-কে বলতে শুনেছেন: ছেলের পক্ষ থেকে সমান বয়সের দুটি ছাগল এবং মেয়ের পক্ষ থেকে একটি ছাগল।" (তিরমিযী: ১৫১৬, নাসাঈ: ৪২১৩)
আকিকার মাংস: নিজে খাওয়া, আত্মীয়-স্বজন ও গরিব-মিসকিনকে দান করা। রান্না করে বিতরণ করা উত্তম। (ফাতাওয়া হিন্দিয়া, ৫/৩৫৯)
৬. মাথা মুণ্ডন করা ও চুলের ওজনের রূপা দান করা (সুন্নাহ)
৭ম দিনে সন্তানের মাথা মুণ্ডন করা এবং চুলের ওজনের সমপরিমাণ রূপা বা তার মূল্য সদকা করা সুন্নাহ। হাদীসে বর্ণিত:
عَنْ عَلِيٍّ قَالَ: عَقَّ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ عَنْ الْحَسَنِ بِشَاةٍ وَقَالَ: يَا فَاطِمَةُ احْلِقِي رَأْسَهُ وَتَصَدَّقِي بِزِنَةِ شَعْرِهِ فِضَّةً "আলী (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) হাসান (রাঃ)-এর পক্ষ থেকে একটি ছাগল আকীকা করেন এবং বলেন: হে ফাতিমা! তার মাথা মুণ্ডন কর এবং তার চুলের ওজনের সমপরিমাণ রূপা সদকা কর।" (তিরমিযী: ১৫১৯)
হানাফি ফিকহের বিধান: চুল মুণ্ডন করা এবং চুলের ওজনের সমপরিমাণ রূপা বা তার মূল্য সদকা করা মুস্তাহাব। (রদ্দুল মুহতার, ৬/৩৮৮)
৭. সুন্দর নাম রাখা (সুন্নাহ)
সন্তানের সুন্দর ও অর্থপূর্ণ নাম রাখা পিতার দায়িত্ব। হাদীসে বর্ণিত:
عَنْ أَبِي الدَّرْدَاءِ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: إِنَّكُمْ تُدْعَوْنَ يَوْمَ الْقِيَامَةِ بِأَسْمَائِكُمْ وَأَسْمَاءِ آبَائِكُمْ فَأَحْسِنُوا أَسْمَاءَكُمْ "আবু দারদা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন: কিয়ামতের দিন তোমাদেরকে তোমাদের নাম এবং তোমাদের পিতাদের নামে ডাকা হবে। সুতরাং তোমরা সুন্দর নাম রাখো।" (আবু দাউদ: ৪৯৪৮)
নাম রাখার নিয়ম:
- আব্দুল্লাহ, আব্দুর রহমান (সবচেয়ে প্রিয় নাম)
- নবীদের নাম
- সাহাবীদের নাম
- অর্থপূর্ণ সুন্দর নাম
নাম রাখার সময়: জন্মের ৭ম দিনে নাম রাখা উত্তম, তবে জন্মের প্রথম দিনেও রাখা জায়েয। (ফাতাওয়া হিন্দিয়া, ৫/৩৫৯)
৮. সন্তানের জন্য দোয়া করা
সন্তানের জন্য নিম্নোক্ত দোয়া করা উচিত:
"بَارَكَ اللَّهُ لَكَ فِي الْمَوْهُوبِ وَشَكَرْتَ الْوَاهِبَ وَبَلَغَ أَشُدَّهُ وَرُزِقْتَ بِرَّهُ" "আল্লাহ তাআলা তোমাকে দানকৃত সন্তানের মধ্যে বরকত দান করুন, তুমি দাতার শুকরিয়া আদায় করো এবং সন্তান পরিপূর্ণ বয়সে পৌঁছুক এবং তুমি তার সদাচরণ লাভ করো।" (আবু দাউদ: ২৮৪৭)
৯. গোশত বা মাংস বিতরণ
আকিকার গোশত তিন ভাগে ভাগ করা উত্তম:
- ১ ভাগ নিজে খাওয়া
- ১ ভাগ আত্মীয়-স্বজনকে দান করা
- ১ ভাগ গরিব-মিসকিনকে দান করা
(ফাতাওয়া হিন্দিয়া, ৫/৩৫৯)
১০. সন্তানকে স্তন্যপান করানো
মায়ের দুধ পান করানো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কুরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন:
"وَالْوَالِدَاتُ يُرْضِعْنَ أَوْلَادَهُنَّ حَوْلَيْنِ كَامِلَيْنِ لِمَنْ أَرَادَ أَن يُتِمَّ الرَّضَاعَةَ" "আর মায়েরা তাদের সন্তানদেরকে পূর্ণ দুই বছর দুধ পান করাবে, যদি কেউ দুধ পান করানোর সময় পূর্ণ করতে চায়।" (সূরা বাকারা: ২৩৩)
১১. বর্জনীয় বিষয় (বিদ'আত)
নিম্নোক্ত কাজগুলো বিদ'আত ও পরিত্যাজ্য:
- জন্মের পর মসজিদে নিয়ে গিয়ে আযান দেওয়া (ডান কানে আযান সুন্নাহ, মসজিদে নিয়ে যাওয়া নয়)
- ৪০ দিন পর্যন্ত বিশেষ আচার-অনুষ্ঠান করা
- মৃতের নামে মানত করা
- জন্মের পর অশুভ লক্ষণ দেখা
- মোবারকবাদ দেওয়ার নামে গান-বাজনা বা অশ্লীল আচরণ করা
সারসংক্ষেপ: জন্মের পর করণীয় কাজসমূহ
| ক্রম | কাজ | বিধান | |------|-----|-------| | ১ | আল্লাহর শুকরিয়া | ওয়াজিব | | ২ | ডান কানে আযান, বাম কানে ইকামত | সুন্নাহ | | ৩ | তাহনীক (খেজুর চিবিয়ে মুখে দেওয়া) | মুস্তাহাব | | ৪ | ৭ম দিনে আকীকা | সুন্নাহ | | ৫ | ৭ম দিনে মাথা মুণ্ডন ও রূপা সদকা | মুস্তাহাব | | ৬ | সুন্দর নাম রাখা | সুন্নাহ | | ৭ | সন্তানের জন্য দোয়া | মুস্তাহাব | | ৮ | মায়ের দুধ পান করানো | গুরুত্বপূর্ণ |
দলিলভিত্তিক রেফারেন্স:
- রদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদীন), ৬/৩৮৭-৩৮৮
- ফাতাওয়া হিন্দিয়া, ৫/৩৫৯
- ফাতাওয়া উসমানী, ২/১৮৫
- বাহিশ्तি জেওর (আশরাফ আলী থানভী), ২/৩০-৩২
- ইমদাদুল ফাতাওয়া, ৪/২৩০
আল্লাহ তাআলা আমাদের সকলকে সুন্নাহ মোতাবেক আমল করার তাওফিক দান করুন। আমীন।