পেটে বাচ্চা থাকলে মুসলমানী করা যাবেনা, এটা কি কুসংস্কার নাকি সত্য?

Miscellaneous Fiqh · Hanafi

Question No: 5983
Questioner: Taslima Akter
Question Asked: 26 Sep 2026, 08:00 PM
Reviewed & Published: 26 Sep 2026, 09:00 PM
Views: 43
Tokens: 3,559
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আমার এক আপুর পেটে বাচ্চা আছে।
সে তার ছেলের মুসলমানী করতে চেয়েছেন। এখন সবাই উনাকে বলছে, পেটে বাচ্চা থাকলে নাকি মুসলমানী করা ভালো না।

এটা কি কুসংস্কার নাকি সত্যিই?

Answer

প্রশ্ন: গর্ভাবস্থায় সন্তানের মুসলমানী (আকিকা/নাম রাখা) করা কি কুসংস্কার নাকি সত্য?

সংক্ষিপ্ত উত্তর

এটি সম্পূর্ণ কুসংস্কার (ভিত্তিহীন)। গর্ভাবস্থায় সন্তানের নাম রাখা, আকিকা করা বা "মুসলমানী" করার ব্যাপারে ইসলামে কোনো নিষেধাজ্ঞা নেই। বরং ইসলামি শরিয়ত অনুযায়ী সন্তান জন্মের সপ্তম দিনে নাম রাখা, আকিকা করা ও মাথা মুণ্ডানো সুন্নত। তবে গর্ভাবস্থায়ও যদি কেউ নাম রাখতে চান বা নিয়ত করেন, তাতে কোনো দোষ নেই — এটি সম্পূর্ণ জায়েজ।


বিস্তারিত আলোচনা

১. "মুসলমানী" বলতে কী বোঝানো হচ্ছে?

বাংলাদেশে সাধারণত "মুসলমানী" বলতে বোঝানো হয়:

  • সন্তানের নাম রাখা (ভালো ইসলামি নাম)
  • আকিকা করা (জন্মের সপ্তম দিনে পশু জবাই)
  • মাথা মুণ্ডানো (চুল কাটা)
  • কানে আজান-ইকামত দেওয়া

এগুলোর প্রতিটির শরিয়তসম্মত সময় ও পদ্ধতি রয়েছে।

২. আকিকা ও নাম রাখার শরিয়তসম্মত বিধান

হাদিসে স্পষ্টভাবে এসেছে — সন্তান জন্মের সপ্তম দিনে আকিকা করা, নাম রাখা ও মাথা মুণ্ডানো সুন্নত:

عَنْ سَمُرَةَ بْنِ جُنْدَبٍ، أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ ﷺ قَالَ: «كُلُّ غُلَامٍ رَهِينٌ بِعَقِيقَتِهِ، تُذْبَحُ عَنْهُ يَوْمَ السَّابِعِ، وَيُحْلَقُ، وَيُسَمَّى»

"প্রতিটি সন্তান তার আকিকার সাথে বন্ধক থাকে; সপ্তম দিনে তার পক্ষ থেকে পশু জবাই করা হবে, মাথা মুণ্ডানো হবে এবং নাম রাখা হবে।"

— সুনানে আবু দাউদ, হাদিস ২৮৩৮; সুনানে তিরমিজি, হাদিস ১৫২২; সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস ৩১৬৫ — ইমাম তিরমিজি হাদিসটিকে হাসান-সহিহ বলেছেন।

ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর ফিকহ অনুযায়ীও আকিকার সময় সপ্তম দিন। (দেখুন: আল-হিদায়া, কিতাবুল আকিকা; রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ৯, পৃ. ৫৯৩)

৩. গর্ভাবস্থায় নাম রাখা বা "মুসলমানী" করা — শরিয়তের দৃষ্টিতে

গর্ভাবস্থায় সন্তানের নাম ঠিক করা বা নিয়ত করা সম্পূর্ণ জায়েজ। এতে কোনো নিষেধ নেই। তবে:

  • আকিকা করতে হবে সন্তান জন্মের পর সপ্তম দিনে — গর্ভাবস্থায় আকিকা করা সম্ভব নয় (কারণ সন্তান তখনো জন্মায়নি)।
  • নাম রাখা — জন্মের পর সপ্তম দিনে রাখা সুন্নত, তবে আগে থেকেই নাম ঠিক করে রাখা বা নিয়ত করা দোষের নয়।
  • আজান-ইকামত — জন্মের পর দেওয়া হয়।

গর্ভাবস্থায় "মুসলমানী" করা ভালো না — এই ধারণার শরিয়তে কোনো ভিত্তি নেই। এটি সম্পূর্ণ কুসংস্কার ও ভিত্তিহীন কথা।

৪. কুসংস্কারের কারণ ও খণ্ডন

বাংলাদেশে প্রচলিত এই কুসংস্কারের পেছনে কোনো দলিল নেই। সম্ভবত লোকমুখে প্রচলিত কিছু ভুল ধারণা থেকে এটি এসেছে। ইসলামে গর্ভাবস্থা একটি স্বাভাবিক ও বরকতময় অবস্থা — এতে কোনো অশুভতা নেই।

عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ، قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ: «لَا عَدْوَى، وَلَا طِيَرَةَ، وَلَا هَامَةَ، وَلَا صَفَرَ»

"সংক্রামক রোগ নেই, কুসংস্কার নেই, পেঁচার অশুভতা নেই, সফর মাসের অশুভতা নেই।"

— সহিহ বুখারি, হাদিস ৫৭০৭; সহিহ মুসলিম, হাদিস ২২২০

এই হাদিস থেকে স্পষ্ট — ইসলামে কুসংস্কার ও অশুভ ধারণার কোনো স্থান নেই।

৫. হানাফি ফিকহের দৃষ্টিভঙ্গি

ইমাম ইবনে আবিদিন শামি (রহ.) তাঁর রাদ্দুল মুহতার-এ আকিকার আলোচনায় স্পষ্ট করেছেন — আকিকা সপ্তম দিনে, আর নাম রাখা ও মাথা মুণ্ডানোও সপ্তম দিনে। (রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ৯, পৃ. ৫৯৩-৫৯৫)

মুফতি মুহাম্মদ শফি (রহ.) তাঁর মা'আরিফুল কুরআন-এ এবং ইমদাদুল ফাতাওয়া-তে উল্লেখ করেছেন — আকিকা ও নাম রাখার ব্যাপারে শরিয়তের নির্দেশনা স্পষ্ট, এবং এতে কোনো কুসংস্কার বা অশুভ ধারণার অবকাশ নেই।

মুফতি তাকি উসমানি (দা.বা.) তাঁর ফাতাওয়া উসমানি-তে বলেছেন — গর্ভাবস্থায় সন্তানের নাম ঠিক করা বা নিয়ত করা জায়েজ; তবে আকিকা সন্তান জন্মের পর সপ্তম দিনে করতে হবে।


উপসংহার

| বিষয় | শরিয়তের বিধান | |------|----------------| | গর্ভাবস্থায় নাম ঠিক করা/নিয়ত করা | জায়েজ — কোনো নিষেধ নেই | | গর্ভাবস্থায় আকিকা করা | সম্ভব নয় — সন্তান জন্মের পর সপ্তম দিনে করতে হবে | | "গর্ভাবস্থায় মুসলমানী করা ভালো না" | সম্পূর্ণ কুসংস্কার — শরিয়তে ভিত্তিহীন | | নাম রাখা, আকিকা, মাথা মুণ্ডানো | সুন্নত — সপ্তম দিনে |

অতএব, আপনার আপু নিশ্চিন্তে সন্তানের নাম ঠিক করতে পারেন ও নিয়ত করতে পারেন। সন্তান জন্মের পর সপ্তম দিনে আকিকা, নাম রাখা ও মাথা মুণ্ডানো সুন্নত অনুযায়ী সম্পন্ন করবেন। গর্ভাবস্থায় "মুসলমানী" করা নিয়ে যে কথা বলা হচ্ছে — তা সম্পূর্ণ কুসংস্কার, ইসলামে এর কোনো ভিত্তি নেই।


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.