একজনের ডিউটি অন্য জন করে দিতে পারবে নাকি?
Miscellaneous Fiqh · Hanafi
Question
এর মধ্যে আমাদের সকলের কাজ হলো রুগীর ফলো আপ দেওয়া ও সেটা নোট করা ,তারপর ফাইলের কাজ করা।
স্যার দের সাথে রাউন্ড দেওয়া বাধ্যতামূলক না।
এই অবস্থায় আমি যদি কয়েকদিন এর ছুটি না নেই এবং কাজেও না যাই এবং আমার কাজ গুলো আমার বান্ধবী করে দেয়।তাহলে কি বেতন হালাল হবে?
আমার মনে এটা নিয়ে সন্দেহ হয় যে,যেহেতু ডিউটি তে সকালে প্রত্যেকের থাকার নিয়ম,সেই জন্য কাজ আমার বান্ধবী করে দিলেও আমার অনুপস্থিতির জন্য বেতন হারাম হবে নাকি??
আমি মেইন স্যার এর কাছে ছুটি না নিলেও আমি যার under এর ইন্টার্ন তাকে জানিয়ে যাইতে চাচ্ছি যে আমার কাজ গুলো আমার বান্ধবী করে দিবে।
এভাবে নিতে চাচ্ছি কারণ ছুটি নিলে পরে আবার ডিউটি করে দিতে হয়।যদি আমার বান্ধবী আমার কাজ করে দেয় তাহলে আর আমি যে অনুপস্থিত ছিলাম সেটা কেউ বুঝবে না। আর পরে করেও দিতে হবে না।
এটা আসলে আমার মন থেকে বলছে ঠিক হবে না।তাও আপনাদের মতামত আশা করছি।
Answer
ইন্টার্ন ডাক্তারের ডিউটিতে অনুপস্থিত থাকা ও বেতনের হুকুম
প্রশ্নের সারসংক্ষেপ
আপনি একজন ইন্টার্ন ডাক্তার। আপনার নির্ধারিত ডিউটি সকাল ৮টা থেকে দুপুর ২টা ৩০ পর্যন্ত। বিকালে রোস্টার অনুযায়ী ডিউটি থাকে। আপনি কয়েকদিন ছুটি না নিয়ে কাজে না গিয়ে আপনার বান্ধবীকে দিয়ে কাজ করিয়ে দিতে চান, যাতে পরে ডিউটি করতে না হয় এবং অনুপস্থিতি ধরা না পড়ে। জানতে চান—এভাবে বেতন হালাল হবে কি না?
ফিকহি বিশ্লেষণ
১. চাকরির শর্ত ও আমানতদারিতা
ইসলামে চাকরি একটি ইজারাহ (ভাড়া/চুক্তি) এর অন্তর্ভুক্ত। ইজারাহর মূল ভিত্তি হলো—নির্ধারিত কাজের বিনিময়ে নির্ধারিত পারিশ্রমিক। মুসলিমের জন্য ওয়াজিব হলো সে তার চাকরির শর্তাবলি পূর্ণভাবে পালন করবে। আল্লাহ তাআলা বলেন:
إِنَّ اللَّهَ يَأْمُرُكُمْ أَن تُؤَدُّوا الْأَمَانَاتِ إِلَىٰ أَهْلِهَا "নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদেরকে আদেশ দেন আমানতসমূহ তার প্রাপ্য অধিকারীর কাছে প্রত্যর্পণ করতে।" (সূরা আন-নিসা: ৫৮)
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
كُلُّكُمْ رَاعٍ وَكُلُّكُمْ مَسْئُولٌ عَنْ رَعِيَّتِهِ "তোমরা প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল এবং প্রত্যেকেই নিজ দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে।" (সহিহ বুখারি: ৭১৩৮, সহিহ মুসলিম: ১৮২৯)
২. হানাফি ফিকহে ইজারাহর মূলনীতি
আল-হিদায়াহ ও রাদ্দুল মুহতার-এ উল্লেখ আছে, ইজারাহতে পারিশ্রমিক প্রাপ্তির শর্ত হলো নির্ধারিত খিদমত আদায় করা। যদি কর্মচারী নির্ধারিত সময়ে উপস্থিত না থাকে এবং কাজ না করে, তবে সে সময়ের পারিশ্রমিক তার জন্য হালাল নয়।
ইমাম আবু হানিফা (রহ.) ও ইমাম মুহাম্মাদ (রহ.)-এর মত হলো—ইজারাহতে সময় ও কাজ উভয়ই নির্ধারিত থাকলে কর্মচারীকে সেই সময়ে উপস্থিত থাকতে হবে। অনুপস্থিত থাকলে সে সময়ের বেতন প্রাপ্য নয়।
ফাতাওয়া আলমগিরি-তে আছে:
"যদি কর্মচারী নির্ধারিত সময়ে কাজ না করে, তবে সে সময়ের পারিশ্রমিক তার জন্য রহিত হয়ে যায়।"
৩. আপনার প্রশ্নের মূল দিকগুলো
ক) বান্ধবী কাজ করে দিলে কি আপনার অনুপস্থিতি পূরণ হবে?
না। কারণ—
- চাকরির চুক্তি আপনার সাথে হয়েছে, আপনার বান্ধবীর সাথে নয়।
- আপনার ব্যক্তিগত উপস্থিতি ও খিদমতই চুক্তির বিষয়বস্তু।
- অন্য কেউ আপনার কাজ করে দিলে তা আপনার পক্ষ থেকে আদায় হিসেবে গণ্য হয় না, বরং তা অন্যের কাজ।
- হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ যদি আপনার বান্ধবীকে অনুমোদন না দেয়, তবে তার কাজ করাটা অনুমতিহীন হস্তক্ষেপ।
খ) ছুটি না নিয়ে অনুপস্থিত থাকা
ছুটি না নিয়ে অনুপস্থিত থাকা মানে হলো—
- আপনি চুক্তি অনুযায়ী উপস্থিত ছিলেন না।
- আপনি কাজও করেননি।
- আপনি ছুটি নেননি (তাই ছুটি হিসেবে গণ্য নয়)।
- ফলে আপনি অনুপস্থিত হিসেবে গণ্য হবেন।
এমতাবস্থায় আপনি যে বেতন নিচ্ছেন, তা আপনার প্রাপ্য নয়। কারণ আপনি সেই সময়ে কোনো খিদমত আদায় করেননি।
গ) প্রতারণা ও মিথ্যার বিষয়
আপনি বলেছেন—"যদি আমার বান্ধবী আমার কাজ করে দেয় তাহলে আর আমি যে অনুপস্থিত ছিলাম সেটা কেউ বুঝবে না।" এটি প্রতারণা। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
مَنْ غَشَّنَا فَلَيْسَ مِنَّا "যে ব্যক্তি প্রতারণা করে, সে আমাদের দলভুক্ত নয়।" (সহিহ মুসলিম: ১০১)
ঘ) বেতন হালাল হবে কি?
না, হালাল হবে না। কারণ—
- আপনি নির্ধারিত সময়ে উপস্থিত ছিলেন না।
- আপনি নিজে খিদমত আদায় করেননি।
- আপনার বান্ধবীর কাজ আপনার কাজ হিসেবে গণ্য নয়।
- আপনি ছুটি না নিয়ে অনুপস্থিত থেকে বেতন নিচ্ছেন—এটি আমানতের খিয়ানত।
- এটি আকদ (চুক্তি) ভঙ্গ।
৪. হানাফি ফিকহের স্পষ্ট বক্তব্য
রাদ্দুল মুহতার (৬/৪২)-এ ইবনে আবিদিন (রহ.) বলেন:
"ইজারাহতে পারিশ্রমিক প্রাপ্তির জন্য শর্ত হলো—নির্ধারিত খিদমত আদায় করা। খিদমত আদায় না হলে পারিশ্রমিক প্রাপ্য নয়।"
ফাতাওয়া উসমানি (২/৪২৩)-এ মুফতি তাকি উসমানি (দা.বা.) বলেন:
"কর্মচারী যদি নির্ধারিত সময়ে কাজ না করে, তবে সে সময়ের বেতন তার জন্য হালাল নয়।"
ইমদাদুল ফাতাওয়া (৩/৫৬)-এ মাওলানা আশরাফ আলী থানভি (রহ.) বলেন:
"চাকরিতে আমানতদারিতা ওয়াজিব। অনুপস্থিত থেকে বেতন নেওয়া খিয়ানত।"
৫. আপনার করণীয়
-
ছুটি নিন—যদি কাজে যেতে না পারেন, তবে মেইন স্যারের কাছে ছুটি নিন। ছুটি নিলে পরে ডিউটি করতে হবে—এটি আপনার দায়িত্ব, এড়িয়ে যাওয়ার উপায় নয়।
-
বান্ধবীকে দিয়ে কাজ করাবেন না—কারণ এটি আপনার চুক্তি ভঙ্গ ও প্রতারণা।
-
অনুপস্থিত থাকলে বেতন নেবেন না—সেই সময়ের বেতন ফেরত দিন বা ছুটি হিসেবে সমন্বয় করুন।
-
তওবা করুন—যদি পূর্বে এমনটি করে থাকেন, তবে তওবা করুন এবং প্রাপ্য ফেরত দিন।
-
সন্দেহ দূর করুন—আপনার মন যা বলছে (ঠিক হবে না), সেটাই সঠিক। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
دَعْ مَا يَرِيبُكَ إِلَىٰ مَا لَا يَرِيبُكَ "সন্দেহজনক বিষয় ছেড়ে দাও, নিঃসন্দেহ বিষয়ের দিকে আসো।" (তিরমিজি: ২৫১৮)
উপসংহার
ছুটি না নিয়ে অনুপস্থিত থেকে, বান্ধবীকে দিয়ে কাজ করিয়ে, বেতন নেওয়া হালাল নয়। এটি আমানতের খিয়ানত, চুক্তি ভঙ্গ ও প্রতারণা। আপনার উচিত—ছুটি নেওয়া, অথবা উপস্থিত থেকে কাজ করা। অনুপস্থিত থাকলে সেই সময়ের বেতন নেওয়া থেকে বিরত থাকা।