ঝগড়ার সময় স্ত্রী বলল "তুমি আমাকে তালাক দাও" এবং স্বামী বলল "যাও তোমাকে তালাক দিলাম" — এতে কি ১ তালাক হবে নাকি ৩ তালাক?
Marriage and Divorce · Hanafi
Question
ঝগড়ার সময় স্ত্রী বলল
"তুমি আমাকে তালাক দাও
এবং উত্তরে স্বামী বলে" যাও তোমাকে তালাক দিলাম"
আমার প্রশ্ন হলো এতে কি ১ তালাক হবে নাকি পরিপূর্ণ তালাক বা ৩ তালাক হয়ে যাবে।
স্বামী স্ত্রী পরবর্তীতে ভুল বুঝে একসাথে একসাথে সংসার করছে এটা কি জায়েজ?
Answer
উত্তর
সংক্ষিপ্ত শরয়ী সিদ্ধান্ত:
১. স্ত্রীর "তুমি আমাকে তালাক দাও" কথার জবাবে স্বামীর "যাও তোমাকে তালাক দিলাম" বলায় ১টি তালাকে রাজ'ঈ (এক তালাকে রাজ'ঈ) পতিত হয়েছে। এতে ৩ তালাক বা সম্পূর্ণ তালাক (তালাকে মুগাল্লাযাহ) হয়নি।
২. পরবর্তীতে একসাথে সংসার করার শরয়ী বিধান:
- ইদ্দতের ভেতরে হলে: তালাক দেওয়ার পর স্ত্রী যদি ৩ মাসিক (ঋতুস্রাব) অতিবাহিত হওয়ার আগেই (ইদ্দতের ভেতরে) ভুল বুঝতে পেরে স্বামীর সাথে সংসার শুরু করে থাকে, তবে মৌখিক কথা (যেমন: "আমি তোমাকে ফিরিয়ে নিলাম") বা শারীরিক মিলনের মাধ্যমে স্বতঃস্ফূর্তভাবে 'রজু' (প্রত্যা his/প্র his ফিরে নেওয়া) হয়ে গেছে। ফলে তাদের বর্তমান সংসার সম্পূর্ণ জায়েয ও বৈধ।
- ইদ্দত শেষ হওয়ার পর হলে: কিন্তু ইদ্দত (৩ মাসিক) পার হয়ে যাওয়ার পর যদি কোনো প্রকার নতুন আকদে নিকাহ (পুনরায় বিবাহ) ছাড়া তারা একসাথে সংসার করে থাকে, তবে তা নাজায়েয ও গুনাহ হয়েছে । এ ক্ষেত্রে তাদের অবিলম্বে আল্লাহর কাছে তাওবা-ইস্তিগফার করতে হবে এবং দুইজন সাক্ষীর উপস্থিতিতে নতুন দেনমোহর ধার্য করে নতুন করে আকদে নিকাহ (পুনর্বিবাহ) করে নিতে হবে।
বিস্তারিত শরয়ী বিশ্লেষণ:
১. এটি ৩ তালাক না হয়ে ১ তালাকে রাজ'ঈ হওয়ার কারণ:
ইসলামি ফিকহে "তোমাকে তালাক দিলাম" শব্দটিকে 'তালাকে সরীহ' (স্পষ্ট তালাক) বলা হয় [২৩৩, ১]। স্বামী যেহেতু স্পষ্ট শব্দে একবার মাত্র তালাক উচ্চারণ করেছেন এবং ৩ সংখ্যা উল্লেখ করেননি, তাই শরীয়তের নিয়ম অনুযায়ী কেবল ১ তালাকে রাজ'ঈ পতিত হয়েছে। এটি কোনোক্রমেই ৩ তালাক বা চূড়ান্ত বিচ্ছিন্নতা নয়।
২. রজু (ফিরে পাওয়া) ও সংসারের ফিকহী নিয়ম:
- ইদ্দতের মেয়াদ (৩ মাসিক/তুহুর): তালাকে রাজ'ঈর পর স্ত্রীকে ফিরিয়ে নেওয়ার জন্য ইদ্দতের সময়সীমা পর্যন্ত স্বামীর অধিকার থাকে [২৩৩, ৫]।
- ইদ্দতের মধ্যে ফিরিয়ে নিলে: ইদ্দত চলাকালীন স্বামী যদি মুখে বলে "আমি তোমাকে ফিরিয়ে নিলাম" অথবা স্বামী-স্ত্রী হিসেবে মেলামেশা করে, তবে নতুন করে বিয়ের প্রয়োজন হয় না; পূর্বের বিয়ের ওপরই সংসার বহাল হয়ে যায়।
- ইদ্দত পার হয়ে গেলে (তালাকে বায়েন): ইদ্দত পার হয়ে গেলে ওই ১ তালাকে রাজ'ঈ পরিবর্তিত হয়ে 'তালাকে বায়েন' হয়ে যায়। তখন নতুন নিকাহ ছাড়া একসাথে থাকা হারাম। তবে ইদ্দত পার হয়ে গেলেও উভয়ের সম্মতিতে নতুন মেহের ও দুজন পুরুষ সাক্ষীর উপস্থিতিতে নতুন করে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে পুনরায় সংসার করার পূর্ণ অধিকার শরীয়ত তাদের দিয়েছে।
৩. বর্তমানে অবশিষ্ট তালাকের সংখ্যা:
উক্ত ঘটনার দ্বারা স্বামীর হাত থেকে ১টি তালাক চলে গেছে। এখন তার নিকট কেবল ২টি তালাকের মালিকানা বাকি রয়েছে। ভবিষ্যতে কখনো পুনরায় অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে ২টি তালাক দিলে তখন ৩ তালাক পূর্ণ হয়ে স্থায়ী বিচ্ছেদ ঘটে যাবে। তাই ভবিষ্যতে তালাক শব্দ ব্যবহারে অত্যন্ত সতর্ক থাকা অপরিহার্য।
সংযুক্ত কিতাব, ভলিউম ও পৃষ্ঠা নম্বর:
১. ফাতাওয়ায়ে আলমগীরী (১ম খণ্ড):
- পৃষ্ঠা: ৩১৫: (অধ্যায়: কিতাবুত তালাক, ৩য় অনুচ্ছেদ — স্ত্রী তালাক চাইলে জবাবে 'তোমাকে তালাক দিলাম' বলায় এক তালাকে রাজ'ঈ পতিত হওয়ার বিবরণ)।
- পৃষ্ঠা: ৩৫৪: (অধ্যায়: কিতাবুত তালাক, ৫ম পরিচ্ছেদ — তালাকে রাজ'ঈর বিবরণ এবং ইদ্দতের ভেতরে রজু করার মাসআলা)।
২. ফাতাওয়া মাহমুদিয়া (১২শ খণ্ড):
- পৃষ্ঠা: ১৭৬: (অধ্যায়: বাব وقوع الطلاق — সরীহ শব্দে এক তালাক হওয়ার ফতোয়া)।
- পৃষ্ঠা: ১৮২: (অধ্যায়: বাব وقوع الطلاق — তালাকে রাজ'ঈর পর রজু এবং তালাকের সংখ্যা অবশিষ্ট থাকার বিবরণ)।
৩. ফাতাওয়া মাহমুদিয়া (১৩শ খণ্ড):
- পৃষ্ঠা: ৫১–৫২: (অধ্যায়: কিতাবুত তালাক — তালাকে রাজ'ঈর পর ইদ্দত অতিক্রান্ত হলে নতুন নিকাহর বাধ্যবাধকতা)।
৪. দরসুল ফিকহ (১ম খণ্ড):
- পৃষ্ঠা: ২৬৭–২৬৮: (অধ্যায়: তালাক ও ডিভোর্সের শর'য়ী বিধান — তালাকে রাজ'ঈ, রজুর নিয়ম এবং ইদ্দত পরবর্তী নতুন আকদে নিকাহর ফায়সালা)।
মূল রেফারেন্স:
- রাদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদীন শামী) — কিতাবুত তালাক
- আল-হিদায়া (বুরহানুদ্দীন মারগীনানী) — কিতাবুত তালাক
- ফাতাওয়া আলমগিরি — কিতাবুত তালাক
- ফাতাওয়া উসমানী (মুফতি তাকী উসমানী) — ২/৩০০-৩১০
- ইমদাদুল ফাতাওয়া (আশরাফ আলী থানভী) — ২/২৫০
- বেহেশতী জেওর (আশরাফ আলী থানভী) — তালাক অধ্যায়
والله أعلم بالصواب