তিন শ্বাসে পানি পান করার শর্ত পূরণে সন্দেহ, অতিরিক্ত পান করলে তালাক পতিত হবে কি না?
Marriage and Divorce · Hanafi
Question
প্রিয় হুজুর
আমি বিগত দিনে শর্ত যুক্ত তালাক রেখেছি যে তিন শ্বাসে পানি পান না করলে আমার বউ তালাক হবে। তারপর থেকে আমি তিন শ্বাসে পানি পান করি কিন্তু পানি পান করতে করতে সন্দেহ হয় তিনবার খেয়েছি না দুবার খেয়েছি তাই হয়তো সন্দেহ থাকার কারণে হয়তো তিন শ্বাসে পানি পান করে থাকি তারপর আরো একবার পান করি সন্দেহ জন্য। এখন জানার বিষয়ে এই যে তখন আমি বলেছি যে শ্বাসে পানি পান করতে হবে কিন্তু সন্দেহের কারণে আর একবার যদি এক্সট্রা পান করি তাহলে কি আমার স্ত্রীর উপরে তালাক পতিত হবে। এই বিষয়ে সন্দেহ থাকে বলে শর্তটাকে যেদিন শর্ত রাখি তার হয়তো কিছু মাস পরে শর্তটাকে ঘুইরে বলি যে তিনবারের বেশি পান করা যাবে কিন্তু তিনবারে কম পান করা যাবে না তাহলে আমার স্ত্রী তালাক হবে এখন এই যে দ্বিতীয়বার বলেছি এটা কি সত্যের মধ্যে পড়বে নাকি এটাকে বাতিল হিসেবে গণ্য হবে তাহলে কি হবে যে আমি তিন শ্বাসে বেশি পানি পান করে থাকি। যদিও আমি তখন সত্যটা মুখে উচ্চারণ করে বলেছি তা আমি এখন নিশ্চিত হতে পারছি না। নাকি পানি তিন শ্বাসে পান করতে হয় আমি জানি সেটার জন্য শর্ত পড়ে গেছে কারণ তখন আমার তালাক নিয়ে অনেক জল্পনা কল্পনা হত আমার নিজের ইচ্ছার বিরুদ্ধে তালাকের সত্য হয়ে যেত তো এখন তাহলে আমি কি করব তিনবারে বেশি যদি পানি পান করে থাকি সেটা কি তালাক হবে কারণ আমি তখন হয়তো বলেছি যে তিন শ্বাসে পানি পান করতে হবে এটা হয়তো বলিনি যে তিনবারের অধিক পান করলে হবে। কিন্তু পরে সন্দেহের কারণে সেগুলোকে তিনবারের অধিক পানি পান করে থাকি এখন আমি তাহলে কি করব দয়া করে আমাকে একটু সাজেশন দেন। এতদিন আমি কিন্তু এটাকে তালাকের শর্ত মনে করে এসেছি
Answer
ওয়া আলাইকুমুস সালাম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু।
উত্তর দেওয়ার আগে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বলে নিচ্ছি—তালাকের বিষয়টি অত্যন্ত সংবেদনশীল এবং গুরুতর। এখানে প্রতিটি শব্দের উপর নির্ভর করে শরয়ী হুকুম পরিবর্তিত হয়। আপনার প্রশ্নটি দীর্ঘ এবং কিছুটা জটিল, তাই আমি ধাপে ধাপে বিশ্লেষণ করে উত্তর দিচ্ছি।
প্রথম অবস্থা (শর্ত স্থাপন): আপনি বলেছেন, "তিন শ্বাসে পানি পান না করলে আমার বউ তালাক হবে।"
- ইসলামি ফিকহের পরিভাষায় এটি একটি শর্তযুক্ত তালাক (তালাক মু'আল্লাক)।
- যেহেতু আপনি শর্তটি উচ্চারণ করেছেন এবং তা পূরণের ইচ্ছা ছিল, তাই এটি একটি বৈধ শর্ত হিসেবে গণ্য হবে। (রদ্দুল মুহতার, ৩:২৮০)
দ্বিতীয় অবস্থা (শর্ত পূরণে সন্দেহ): আপনি বলেন, পান করার সময় আপনার সন্দেহ হয়েছে যে তিনবার খেয়েছেন নাকি দুবার। সন্দেহ দূর করার জন্য আপনি আরও একবার (চতুর্থবার) পানি পান করেছেন।
- এখানে মূল বিষয় হলো, আপনি যে শর্তটি রেখেছিলেন তা ছিল "তিন শ্বাসে পানি পান করা"।
- আপনি যদি তিন শ্বাসে পানি পান করে থাকেন, তাহলে শর্তটি পূরণ হয়ে গেছে এবং তালাক পতিত হবে না।
- আর যদি আপনি তিন শ্বাসের কম পান করেন, তাহলে শর্ত লঙ্ঘিত হওয়ার কারণে তালাক পতিত হবে।
- সন্দেহের কারণে অতিরিক্ত পান করা (চতুর্থবার) শর্তটিকে বাতিল করবে না, বরং এটি একটি অতিরিক্ত কাজ। যেহেতু আপনি মূল শর্ত (তিন শ্বাস) পূরণ করেছেন, তাই তালাক পতিত হবে না। (ফতোয়ায়ে উসমানি, ২:৩০৫)
তৃতীয় অবস্থা (শর্ত পরিবর্তন): আপনি বলেন, কিছু মাস পর আপনি শর্তটি পরিবর্তন করে বলেছেন, "তিনবারের বেশি পান করা যাবে, কিন্তু তিনবারের কম পান করা যাবে না।"
- শরয়ী বিধান: একবার শর্তযুক্ত তালাক উচ্চারণ করার পর তা পরিবর্তন বা বাতিল করার ক্ষমতা আপনার নেই। শর্তটি যেমন ছিল তেমনই বহাল থাকবে।
- আপনি দ্বিতীয়বার যে শর্তটি বলেছেন (তিনবারের বেশি পান করা যাবে), এটি একটি নতুন শর্ত হিসেবে গণ্য হবে, তবে এটি প্রথম শর্তটিকে বাতিল করবে না। প্রথম শর্তটি (তিন শ্বাসে পান করা) আগের মতোই কার্যকর থাকবে। (ফতোয়ায়ে আলমগীরী, ১:৩৭৩)
চতুর্থ অবস্থা (তালাক পতিত হওয়ার বিষয়ে সিদ্ধান্ত): এখন আপনার মূল প্রশ্ন হলো, "আমি তিনবারের বেশি পানি পান করেছি, তাহলে কি তালাক পতিত হবে?"
- আপনার প্রথম শর্ত ছিল "তিন শ্বাসে পানি পান করা"। আপনি যদি তিন শ্বাসে পানি পান করে থাকেন, তাহলে শর্ত পূরণ হয়েছে এবং তালাক পতিত হবে না।
- আপনি সন্দেহের কারণে অতিরিক্ত পান করেছেন, এটি শর্ত ভঙ্গের কারণ হবে না।
- তবে, যদি আপনি নিশ্চিত হন যে আপনি তিন শ্বাসের কম পান করেছেন, তাহলে শর্ত লঙ্ঘিত হওয়ার কারণে তালাক পতিত হবে। কিন্তু যেহেতু আপনি সন্দেহে আছেন, তাই সন্দেহের ভিত্তিতে তালাক পতিত হওয়ার বিধান নেই। ইসলামি ফিকহের মূলনীতি হলো, "اليقين لا يزول بالشك" অর্থাৎ সন্দেহের কারণে নিশ্চিত বিষয় বাতিল হয় না। (আল-আশবাহ ওয়ান-নাযাইর, ১:৬০)
আপনার জন্য করণীয়: ১. আপনি যদি তিন শ্বাসে পানি পান করে থাকেন, তাহলে আপনার স্ত্রীর উপর তালাক পতিত হয়নি। আপনি নিশ্চিন্ত থাকতে পারেন। ২. আপনি দ্বিতীয়বার যে শর্তটি বলেছেন (তিনবারের বেশি পান করা যাবে), এটি একটি নতুন শর্ত, তবে এটি প্রথম শর্তকে বাতিল করেনি। ৩. ভবিষ্যতে এই ধরনের শর্তযুক্ত তালাক থেকে বিরত থাকুন। তালাকের বিষয়ে ঠাট্টা-তামাশা বা পরীক্ষামূলক কোনো শর্ত রাখা মারাত্মক গুনাহের কাজ। ৪. আপনি যদি এখনো সন্দেহে থাকেন যে, শর্তটি পূরণ হয়েছে কি না, তাহলে আপনি একজন স্থানীয় মুফতি বা আলেমের সাথে সরাসরি যোগাযোগ করে বিস্তারিত পরিস্থিতি বর্ণনা করুন।