হালাল- হারাম
Halal and Haram · Hanafi
Question
একজন মহিলার ২ টা বেবি আছে অলরেডি ,তো second বেবি হওয়ার পর ডাক্তার না করে দিয়েছিল আর কোনো বেবি না নিতে । কারণ এতে তার লাইফে রিস্ক হবে কারণ তার পেটে টিউমার আছে ,এখন সে এক মাসের কন্সিভ তো এক্ষেত্রে লাইফের রিস্ক এড়ানোর জন্য সে কি তা নষ্ট করতে পারবে?
Answer
উত্তর: وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
আপনার প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার আগে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় পরিষ্কার করা প্রয়োজন। ইসলামী শরীয়তের দৃষ্টিতে গর্ভপাত (Abortion) একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল ও গুরুতর বিষয়। গর্ভে সন্তান ধারণের পর তা নষ্ট করা সাধারণত হারাম (নিষিদ্ধ)।
আপনার প্রশ্নে উল্লেখিত মহিলার ক্ষেত্রে, তার এক মাসের গর্ভ রয়েছে এবং ডাক্তার জানিয়েছেন যে, গর্ভধারণ করলে তার (মায়ের) জীবনের ঝুঁকি রয়েছে। এই অবস্থায় শরীয়তের বিধান জানার জন্য নিম্নলিখিত দিকগুলো বিবেচনা করা জরুরি:
১. গর্ভাবস্থার সময়কাল ও রুহ (আত্মা) প্রবেশের বিষয়
ইসলামী ফিকহের (বিশেষত হানাফি মাযহাবের) নিয়ম অনুযায়ী, গর্ভে সন্তানের মধ্যে রুহ (আত্মা) প্রবেশ করে গর্ভধারণের ১২০ দিন (৪ মাস) পর।
- ১২০ দিনের আগে: অর্থাৎ, গর্ভধারণের প্রথম ৪০ দিন বা ১২০ দিনের মধ্যে গর্ভপাত করানো সম্পর্কে ফিকহবিদদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। তবে হানাফি মাযহাবের বিশুদ্ধ মত অনুযায়ী, ৪০ দিনের আগে গর্ভপাত করানো মাকরূহে তাহরিমি (নিষিদ্ধের কাছাকাছি) বা হারাম, যদি কোনো বৈধ শরয়ী কারণ (যেমন: মায়ের জীবন রক্ষা) না থাকে। কিন্তু ৪০ দিনের পর থেকে ১২০ দিনের মধ্যে গর্ভপাত করানো সম্পূর্ণ হারাম, কারণ তখন সন্তানের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ গঠন শুরু হয়ে যায়।
- ১২০ দিনের পর: রুহ প্রবেশের পর গর্ভপাত করানো সম্পূর্ণ হারাম এবং এটি একটি জীবন্ত মানুষের হত্যার সমতুল্য। কোনো অবস্থাতেই তা জায়েয নয়, শুধুমাত্র মায়ের জীবন বাঁচানোর জন্য যদি ডাক্তারি পরামর্শে নিশ্চিত হয় যে, গর্ভধারণ চালিয়ে গেলে মায়ের মৃত্যু অনিবার্য, তাহলে সেক্ষেত্রে কিছু বিশেষজ্ঞ আলেম মায়ের জীবনকে অগ্রাধিকার দিয়ে গর্ভপাতের অনুমতি দিয়েছেন, তবে তা অত্যন্ত সতর্কতার সাথে এবং শুধুমাত্র জরুরি অবস্থায়।
২. মায়ের জীবনের ঝুঁকি (Life Risk) এর ক্ষেত্রে বিধান
আপনার প্রশ্নে উল্লেখ করা হয়েছে যে, মহিলার পেটে টিউমার আছে এবং ডাক্তার জানিয়েছেন, আরেকটি সন্তান নিলে তার জীবনের ঝুঁকি রয়েছে।
- যদি ডাক্তার নিশ্চিত হন যে, গর্ভধারণ চালিয়ে গেলে মায়ের জীবন বিপন্ন হবে এবং এটি একটি জরুরি অবস্থা (যেমন: মায়ের মৃত্যুর আশঙ্কা), তাহলে ইসলামী ফিকহের নীতিমালা অনুযায়ী, মায়ের জীবনকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। কারণ, মা হলেন জীবিত ও প্রতিষ্ঠিত ব্যক্তি, আর গর্ভস্থ সন্তান এখনও সম্পূর্ণরূপে জীবিত নয় (বিশেষত ১২০ দিনের আগে)।
- কিন্তু শর্ত হলো: এটি শুধুমাত্র তখনই জায়েয হবে, যখন বিশ্বস্ত মুসলিম ডাক্তারদের একটি প্যানেল (কমপক্ষে ২-৩ জন বিশেষজ্ঞ ডাক্তার) নিশ্চিত করবেন যে, গর্ভধারণ চালিয়ে গেলে মায়ের মৃত্যুর আশঙ্কা রয়েছে। শুধুমাত্র "ঝুঁকি আছে" বা "রিস্ক হবে" বললেই হবে না; বরং তা হতে হবে প্রাণঘাতী ঝুঁকি।
- যদি ঝুঁকি মারাত্মক না হয় (যেমন: শুধু শারীরিক কষ্ট, অসুস্থতা বা জটিলতা হবে, কিন্তু মৃত্যুর আশঙ্কা নেই), তাহলে গর্ভপাত করা হারাম। কারণ, সন্তানের জীবন নষ্ট করা যাবে না।
৩. আপনার প্রশ্নের সরাসরি উত্তর
যেহেতু প্রশ্নে বলা হয়েছে, মহিলার এক মাসের গর্ভ (অর্থাৎ ৪০ দিনের কম) এবং তার জীবনের ঝুঁকি রয়েছে, তাই:
- যদি ডাক্তার নিশ্চিতভাবে বলেন যে, এই গর্ভধারণ চালিয়ে গেলে মহিলার মৃত্যুর আশঙ্কা রয়েছে (এবং এটি টিউমারের কারণে জটিলতা সৃষ্টি করবে), তাহলে হানাফি মাযহাবের কিছু বড় আলেমের মতে, ৪০ দিনের আগে মায়ের জীবন বাঁচানোর জন্য গর্ভপাত করানো জায়েয হতে পারে। তবে এটি অত্যন্ত সতর্কতার সাথে এবং শুধুমাত্র জরুরি প্রয়োজনে।
- কিন্তু যদি ডাক্তার শুধু বলেন "রিস্ক আছে" বা "জটিলতা হবে" কিন্তু মৃত্যুর আশঙ্কা নেই, তাহলে গর্ভপাত করা জায়েয হবে না। কারণ, সন্তান নষ্ট করা হারাম।
৪. গুরুত্বপূর্ণ নসিহত (উপদেশ)
- ডাক্তারের পরামর্শ নিন: প্রথমে একজন ভালো ও অভিজ্ঞ ডাক্তারের কাছে গিয়ে সম্পূর্ণ পরীক্ষা করান। টিউমারটি কতটা বড়, এটি গর্ভের উপর কী প্রভাব ফেলছে এবং সত্যিই মায়ের জীবন হুমকির মুখে আছে কিনা, তা নিশ্চিত করুন।
- বিকল্প চিকিৎসা: টিউমার থাকা সত্ত্বেও গর্ভধারণ চালিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা আছে কিনা, ডাক্তারের সাথে আলোচনা করুন। অনেক সময় টিউমার থাকলেও সতর্কতার সাথে গর্ভধারণ চালিয়ে যাওয়া যায়।
- ইস্তেখারা করুন: আল্লাহর কাছে ইস্তেখারা করুন এবং দ্বীনি আলেমদের সাথে পরামর্শ করুন। মনে রাখবেন, সন্তান আল্লাহর পক্ষ থেকে একটি আমানত (গচ্ছিত সম্পদ)। এটি নষ্ট করা একটি বড় গুনাহ।
৫. চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত
আপনার প্রশ্নের সরাসরি উত্তর হলো:
- যদি ডাক্তার নিশ্চিত হন যে, গর্ভধারণ চালিয়ে গেলে মায়ের মৃত্যু অনিবার্য, তাহলে ৪০ দিনের আগে (এক মাসের গর্ভ) মায়ের জীবন বাঁচানোর জন্য গর্ভপাত করানো জায়েয হতে পারে।
- কিন্তু যদি মৃত্যুর আশঙ্কা না থাকে, শুধু ঝুঁকি বা জটিলতা থাকে, তাহলে তা নষ্ট করা হারাম এবং সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে সঠিক বুঝ দান করুন এবং এই মহিলাকে সুস্থতা দান করুন। আমিন।
দলিল/রেফারেন্স:
- ফাতাওয়া হিন্দিয়া (আলমগীরি): ৫ম খণ্ড, ৪১৩ পৃষ্ঠা - "গর্ভপাত সম্পর্কে বলা হয়েছে, যদি ১২০ দিনের আগে গর্ভপাত করা হয়, তবে তা মাকরূহ; কিন্তু যদি মায়ের জীবনের আশঙ্কা থাকে, তবে জায়েয।"
- রদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদীন): ৬ষ্ঠ খণ্ড - "গর্ভস্থ সন্তানের মধ্যে রুহ প্রবেশের আগে (১২০ দিনের আগে) গর্ভপাত করানো মাকরূহে তাহরিমি; তবে মায়ের জীবন রক্ষার জন্য জরুরি অবস্থায় জায়েয।"
- ফাতাওয়া উসমানী: ২য় খণ্ড - "মায়ের জীবনের ঝুঁকি থাকলে এবং ডাক্তার নিশ্চিত হলে, ৪০ দিনের আগে গর্ভপাতের অনুমতি দেওয়া হয়েছে।"