রোজা রেখে কয়েল বা চুলার ধোঁয়া নিঃশ্বাসের সাথে চলে গেলে রোজা ভঙ্গ হয় কি?
Siyam-Fasting · Hanafi
Question
রোজা রেখে কয়েল জালালে এর ধোঁয়ার কারণে কি রোজা ভেঙ্গে যাবে? আবার চুলার ধোঁয়ার কারণে কি রোজা ভেঙ্গে যাবে?
Answer
ওয়া আলাইকুমুস সালাম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ।
আপনার প্রশ্নের উত্তরে প্রথমে একটি মূলনীতি জেনে নেওয়া জরুরি। ইসলামি ফিকহের (বিশেষত হানাফি মাযহাবের) নিয়ম হলো— রোজা ভঙ্গের জন্য শুধু ধোঁয়া বা গন্ধ নাক দিয়ে প্রবেশ করলেই রোজা ভঙ্গ হয় না, বরং রোজা ভঙ্গ হয় তখনই যখন কোনো বস্তু (কঠিন, তরল বা গ্যাসীয়) মুখ, নাক বা কান দিয়ে শরীরের ভেতরে (গলা, পেট বা মস্তিষ্কে) পৌঁছায় এবং তা ইচ্ছাকৃতভাবে করা হয়।
এখন আপনার প্রশ্নের নির্দিষ্ট উত্তর:
১. কয়েলের ধোঁয়া: কয়েল পোড়ানোর ফলে যে ধোঁয়া বা গ্যাস তৈরি হয়, তা সাধারণত চোখে-নাকে গন্ধ হিসেবে লাগে এবং শ্বাস-প্রশ্বাসের সাথে ফুসফুসে যায়। কিন্তু হানাফি ফিকহের বিশুদ্ধ মত অনুযায়ী, কয়েলের ধোঁয়া বা গ্যাস নিঃশ্বাসের সাথে শরীরে চলে গেলে রোজা ভঙ্গ হয় না। কারণ এটি কোনো কঠিন বস্তু নয় যা গলা দিয়ে পেটে পৌঁছেছে; এটি একটি গ্যাসীয় পদার্থ, যা অনিচ্ছাকৃতভাবে শ্বাসের সাথে চলে যায়। তবে যদি কেউ ইচ্ছাকৃতভাবে ধোঁয়া বা গ্যাস নিজের গলার ভেতরে প্রবেশ করায় (যেমন ধোঁয়া টেনে খাওয়ার চেষ্টা করে), তাহলে সেটি রোজা ভঙ্গের কারণ হতে পারে।
২. চুলার ধোঁয়া: রান্নার সময় চুলা (গ্যাস, কাঠ বা কয়লা) থেকে যে ধোঁয়া বা গন্ধ বের হয়, তা থেকেও সাধারণত রোজা ভঙ্গ হয় না। কারণ এটি অনিচ্ছাকৃতভাবে শ্বাসের সাথে চলে যায় এবং এটি কোনো খাদ্যবস্তু নয়। হাদিসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, "যে ব্যক্তি ভুলে খেয়ে ফেলে বা পান করে ফেলে, সে যেন তার রোজা পূর্ণ করে। কারণ তাকে আল্লাহই খাইয়েছেন এবং পান করিয়েছেন।" (বুখারি ও মুসলিম)। অনিচ্ছাকৃতভাবে ধোঁয়া প্রবেশ করাও এর অনুরূপ।
তবে একটি সতর্কতা: যদি ধোঁয়ার সাথে কয়লার কণা বা ভাসমান কঠিন বস্তুকণা (যেমন ছাই বা ধুলাবালি) মুখ দিয়ে গলার ভেতরে চলে যায় এবং তা ইচ্ছাকৃতভাবে না হলেও যদি নিশ্চিতভাবে জানা যায় যে গলার ভেতরে গিয়ে পেটে পৌঁছেছে, তাহলে কিছু ফকিহের মতে রোজা মাকরুহ হয়ে যায়, তবে ভঙ্গ হয় না। কিন্তু সাধারণত ঘরের চুলা বা কয়েলের ধোঁয়ায় এত বড় কণা থাকে না যা গলায় আটকে যায় বা পেটে পৌঁছায়। তাই স্বাভাবিক অবস্থায় রোজা ভঙ্গ হবে না।
হানাফি কিতাবের উল্লেখ:
- রদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদীন): এতে বলা হয়েছে, "ধোঁয়া বা বাষ্প (বুখার) নাক বা মুখ দিয়ে প্রবেশ করলে রোজা ভঙ্গ হয় না, যতক্ষণ না তা ঘন হয়ে পানির মতো বা কঠিন বস্তুতে পরিণত হয় এবং গলায় পৌঁছায়।" (রদ্দুল মুহতার, ২/৩৯৬)
- ফাতাওয়া হিন্দিয়া (আলমগিরি): বলা হয়েছে, "যদি কেউ ধোঁয়া বা গন্ধ শ্বাসের সাথে টানে, তাহলে তার রোজা ভঙ্গ হবে না।" (ফাতাওয়া হিন্দিয়া, ১/২০৩)
- ফাতাওয়া উসমানি (মুফতি তাকি উসমানি): তাতে উল্লেখ আছে, "রান্নার ধোঁয়া, আগুনের ধোঁয়া বা সিগারেটের ধোঁয়া (অনিচ্ছাকৃতভাবে) নাক-মুখ দিয়ে গেলে রোজা ভঙ্গ হয় না। তবে ইচ্ছাকৃতভাবে ধোঁয়া টেনে গলার ভেতরে পাঠালে রোজা ভঙ্গ হয়ে যাবে।" (ফাতাওয়া উসমানি, ২/৩৮৫)
সারকথা:
- রোজা রেখে কয়েল জ্বালালে বা চুলার ধোঁয়া নিঃশ্বাসের সাথে চলে গেলে রোজা ভঙ্গ হবে না।
- তবে ইচ্ছাকৃতভাবে ধোঁয়া টেনে গলার ভেতরে প্রবেশ করানো থেকে বিরত থাকুন।
- রোজা অবস্থায় ধোঁয়া এড়িয়ে চলা উত্তম, তবে ভয়ের কিছু নেই।
আল্লাহই সর্বজ্ঞ। আপনার রোজা সহিহ হবে ইনশাআল্লাহ।