প্রথম স্ত্রী ও সন্তান গোপন রেখে বিয়ে, স্বামীর প্রতি ভালোবাসা ও বিশ্বাস হারিয়ে ফেলা, বিচ্ছেদ চাওয়া এবং আমার শরয়ী করণীয়।
Marriage and Divorce · Hanafi
Question
আল্লাহ আপনাকে উত্তম প্রতিদান দান করুন। আমার একটি গুরুত্বপূর্ণ শরয়ী বিষয়ে দিকনির্দেশনা প্রয়োজন।
আমার বিয়ের আজ চার মাস দুই দিন। কিন্তু বিয়ের প্রায় দুই মাস চলাকালীন আমি জানতে পারি যে, আমার স্বামীর আগে থেকেই একজন স্ত্রী আছেন, তাঁদের একটি কন্যাসন্তান রয়েছে এবং তখন তাঁর প্রথম স্ত্রী প্রায় ৭–৮ মাসের গর্ভবতী। অথচ বিয়ের আগে আমাকে এসব বিষয়ে কিছুই জানানো হয়নি। আমাকে বলা হয়েছিল, তিনি ইয়াতিম, তাঁর মা-বাবা মারা গেছেন, তাঁর কেউ নেই এবং বিভিন্ন পারিবারিক সমস্যার কারণে তিনি বাড়িতে যান না এবং তাদের সাথে কোনো যোগাযোগ নেই।
আমি যদি আগে জানতাম যে তাঁর আগে থেকেই স্ত্রী ও সন্তান রয়েছে, তাহলে কখনোই এই বিয়েতে সম্মতি দিতাম না।
আমি স্বামীকে এর কারণ জিজ্ঞাসা করলে তিনি বলেন, তিনি নাকি ফিতনায় জড়িয়ে পড়ছিলেন এবং হারামে লিপ্ত হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা করছিলেন। তাই হারাম থেকে বাঁচার জন্য তিনি এই বিয়ে করতে বাধ্য হয়েছেন। পরে তিনি আমার কাছে এ বিষয়টি গোপন করার জন্য ক্ষমাও চেয়েছেন।
এরপর তাঁর প্রথম স্ত্রী বিষয়টি জানার পর খুবই মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন এবং নানান ধরনের পাগলামি করেন। তিনি আত্মহত্যার চেষ্টা করেন, না খেয়ে থাকার কারণে গর্ভের সন্তানের ওজনও কমে যায়। তিনি আমাকে বিভিন্নভাবে হুমকি দেন এবং আমার স্বামীকে চাপ দিয়ে আমাকে এক তালাক দিতে বাধ্য করেন। পরে শরয়ী মাসআলা জেনে আমার স্বামী আমাকে আবার ফিরিয়ে নেন কিন্তু উনার স্ত্রী জানে না, উনি আমাকে গোপন রাখতে চান। এরপরও তাঁর প্রথম স্ত্রী নিজের মাথা ফাটিয়ে ফেলেন এবং বারবার বলেন, তিনি তাঁর স্বামীর জীবনে অন্য কাউকে সহ্য করতে পারবেন না; আমাকে তালাক দিতেই হবে। কিন্তু আমার স্বামী আমাকে ছাড়তে চান না। প্রথম স্ত্রীও অসহায়; তাঁর বাবা নেই, মা-ও কথা বলতে, নানার বাড়িতে বড় হয়েছেন, নানাও তেমন দেখেন না।
এখন আমার অবস্থা হলো, আমি আর এই সংসারে থাকতে চাই না। আমি আমার স্বামীর সঙ্গে খুব একদমই কথা বলি না। সারাদিনে তাঁর খোঁজও নিই না—তিনি ঠিকমতো খেয়েছেন কি না জিগ্যেস ও করি না। কারণ আমি এই সম্পর্কে থাকতে চাই না, তাই নতুন করে মায়াও বাড়াতে চাই না।
আমি আর তাঁকে আগের মতো ভালোবাসতে পারছি না। তাঁর প্রতি আমার মায়া, অনুভূতি ও বিশ্বাস—সবই প্রায় শেষ হয়ে গেছে, আগের মতো আর কাজ করে না বা আসে না। এতে কি আমি গুনাহগার হচ্ছি? শায়েখ, মোহাব্বত তো আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকেই আসে তাই না!। তাই তা কমে বা চলে গেলে কি এজন্য আমার গুনাহ হবে?
এখনও আমাদের বিচ্ছেদ হয়নি। তিনি এখনও আমার স্বামী। আমি যে তাঁর সঙ্গে প্রয়োজন ছাড়া কথা বলি না, এতে কি আমি গুনাহ করছি?
আমি কি কোনোভাবে নিজের অজান্তে নফসের অনুসরণ করছি? আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের উদ্দেশ্য করে আমি কি উল্টো আমার রবের অবাধ্য হয়ে যাচ্ছি?
সবশেষে, আমার স্বামী আমাকে বিচ্ছেদ দিতে রাজি নন। কিন্তু আমি এই সম্পর্ককে নিজের দ্বীন, মানসিক শান্তি ও জীবনের জন্য ক্ষতিকর মনে করছি এবং এ সম্পর্ক থেকে বের হতে চাই।
এ অবস্থায় শরীয়তের দৃষ্টিতে আমার করণীয় কী? আমি কীভাবে এই সম্পর্ক থেকে শরয়ী পদ্ধতিতে বের হতে পারি?
বা আমার জন্য কোনটি সঠিক?
جزاكم الله خيرًا
Answer
বিয়ের পূর্বে স্ত্রী ও সন্তান গোপন রাখা এবং বিবাহ বিচ্ছেদের ইচ্ছা সম্পর্কে শরয়ী মাসআলা
উত্তর
আলহামদুলিল্লাহ, আপনার প্রশ্নটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং সংবেদনশীল। আমি আপনার সমস্যা মনোযোগ সহকারে পড়েছি এবং নিম্নে শরয়ী দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণ ও দিকনির্দেশনা প্রদান করছি।
১. বিয়ের পূর্বে স্ত্রী ও সন্তান গোপন রাখা
ইসলামী শরীয়তে বিবাহের সময় বর-কনের পক্ষ থেকে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় গোপন করা নৈতিকভাবে ভুল এবং প্রতারণার শামিল। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
"যে ব্যক্তি প্রতারণা করল, সে আমার উম্মতের অন্তর্ভুক্ত নয়।" (সহীহ মুসলিম: ১০১)
তবে শরয়ী দৃষ্টিকোণ থেকে, স্বামীর পূর্ববর্তী স্ত্রী ও সন্তান থাকা বিবাহের বৈধতার শর্ত নয়। অর্থাৎ, এই তথ্য গোপন করার কারণে বিবাহটি বাতিল হয় না। বিবাহের বৈধতার জন্য প্রয়োজন:
- ইজাব-কবুল (প্রস্তাব ও গ্রহণ)
- সাক্ষী
- মোহর
যেহেতু আপনার বিবাহ এসব শর্তে সম্পন্ন হয়েছে, তাই শরয়ী দৃষ্টিকোণ থেকে বিবাহটি সহীহ (বৈধ) হয়েছে। তবে স্বামী তথ্য গোপন করে প্রতারণা করেছেন, যা গুনাহের কাজ।
২. স্বামীর প্রতি ভালোবাসা ও বিশ্বাস হারানো
আপনি জিজ্ঞেস করেছেন, স্বামীর প্রতি ভালোবাসা কমে যাওয়া বা চলে যাওয়া কি গুনাহ?
ভালোবাসা একটি স্বাভাবিক মানবিক অনুভূতি। এটি হৃদয়ের বিষয়, যা ইচ্ছা করলে নিয়ন্ত্রণ করা যায় না। আল্লাহ তাআলা বলেন:
"তোমাদের অন্তরে যা আছে তা আল্লাহ জানেন।" (সূরা আল-আহযাব: ৫১)
স্বামীর প্রতারণার কারণে আপনার মনে যে আঘাত লেগেছে এবং ভালোবাসা কমে গেছে, এটি স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া। এর জন্য আপনি গুনাহগার হবেন না, ইনশাআল্লাহ। তবে মনে রাখবেন, ভালোবাসা না থাকলেও স্ত্রী হিসেবে আপনার উপর স্বামীর সাথে সদ্ব্যবহার করার দায়িত্ব রয়েছে।
৩. স্বামীর সাথে কথা না বলা
আপনি বলেছেন, প্রয়োজন ছাড়া স্বামীর সাথে কথা বলেন না। শরীয়তের দৃষ্টিতে, স্ত্রীর উপর স্বামীর সাথে সদ্ব্যবহার করা এবং প্রয়োজনীয় কথাবার্তা বলা ওয়াজিব। তবে যদি আপনি মানসিকভাবে এতটাই বিপর্যস্ত হন যে, কথা বলতে পারছেন না, তাহলে এটি গুনাহ হবে না, ইনশাআল্লাহ। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে এটি সমস্যা তৈরি করতে পারে।
আল্লাহ তাআলা বলেন:
"আর তোমরা তাদের (স্ত্রীদের) সাথে সদ্ভাবে জীবনযাপন কর।" (সূরা আন-নিসা: ১৯)
৪. বিবাহ বিচ্ছেদের শরয়ী পদ্ধতি
আপনি জানতে চেয়েছেন, কীভাবে শরয়ী পদ্ধতিতে এই সম্পর্ক থেকে বের হতে পারেন। শরীয়তে বিবাহ বিচ্ছেদের কয়েকটি পদ্ধতি রয়েছে:
ক. খুলা (স্ত্রীর পক্ষ থেকে বিচ্ছেদ)
যদি স্ত্রী স্বামীর সাথে বসবাস করতে অপারগ হন এবং স্বামী তালাক দিতে রাজি না হন, তাহলে স্ত্রী খুলার মাধ্যমে বিচ্ছেদ নিতে পারেন। খুলা হলো—স্ত্রী স্বামীকে কিছু অর্থ (মোহর বা অন্য কিছু) ফেরত দিয়ে তালাক নেওয়া। আল্লাহ তাআলা বলেন:
"যদি তোমরা আশঙ্কা কর যে, তারা আল্লাহর নির্ধারিত সীমা বজায় রাখতে পারবে না, তাহলে স্ত্রী যা বিনিময়ে দেবে তাতে তাদের উভয়ের কোনো গুনাহ নেই।" (সূরা আল-বাকারা: ২৭৯)
খ. তালাক
স্বামী যদি রাজি হন, তাহলে তিনি তালাক দিতে পারেন। আপনি বলেছেন, স্বামী বিচ্ছেদে রাজি নন।
গ. আদালতের মাধ্যমে বিচ্ছেদ
যদি স্বামী তালাক দিতে রাজি না হন এবং স্ত্রীর উপর জুলুম করা হয়, তাহলে ইসলামী আদালতে (বা দেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী) গিয়ে বিচ্ছেদের আবেদন করা যেতে পারে। তবে শরয়ী দৃষ্টিকোণ থেকে, শুধুমাত্র স্বামীর পূর্ববর্তী স্ত্রী থাকার কারণে বিচ্ছেদ পাওয়া যায় না, যদি স্বামী ন্যায়সংগত আচরণ করেন।
৫. আপনার করণীয়
আমার পরামর্শ হলো:
প্রথমত: ধৈর্য ধারণ করুন
আপনি বর্তমানে মানসিকভাবে খুবই বিপর্যস্ত। এই অবস্থায় কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত নয়। আল্লাহ তাআলা বলেন:
"নিশ্চয়ই আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সাথে আছেন।" (সূরা আল-বাকারা: ১৫৩)
দ্বিতীয়ত: স্বামীর সাথে কথা বলুন
যদি সম্ভব হয়, স্বামীর সাথে শান্তভাবে বসে কথা বলুন। আপনার অনুভূতি ও সমস্যার কথা খুলে বলুন। তিনি যদি আন্তরিকভাবে অনুতপ্ত হন এবং ভবিষ্যতে ন্যায়সংগত আচরণের প্রতিশ্রুতি দেন, তাহলে সম্পর্ক রক্ষার চেষ্টা করা উত্তম।
তৃতীয়ত: পরিবারের সাথে পরামর্শ করুন
আপনার অভিভাবক বা পরিবারের সদস্যদের সাথে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করুন। তারা আপনাকে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করতে পারেন।
চতুর্থত: খুলার প্রস্তাব দিন
যদি আপনি সত্যিই এই সম্পর্ক থেকে বের হতে চান এবং স্বামী তালাক দিতে রাজি না হন, তাহলে খুলার প্রস্তাব দিন। মোহর বা অন্য কোনো অর্থ ফেরত দিয়ে বিচ্ছেদ নেওয়ার চেষ্টা করুন।
পঞ্চমত: ইসলাহ ও পরামর্শের আশ্রয় নিন
কোনো বিজ্ঞ আলেম বা ইসলামী সংস্থার মাধ্যমে উভয় পক্ষের মধ্যে মীমাংসার চেষ্টা করুন। আল্লাহ তাআলা বলেন:
"আর যদি তোমরা স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে সম্পর্কের অবনতির আশঙ্কা কর, তাহলে স্বামীর পরিবার থেকে একজন এবং স্ত্রীর পরিবার থেকে একজন বিচারক নিয়োগ কর। তারা উভয়ে যদি সংশোধন চায়, তবে আল্লাহ তাদের মধ্যে মীমাংসা করে দেবেন।" (সূরা আন-নিসা: ৩৫)
৬. গুনাহ সম্পর্কে আপনার উদ্বেগ
আপনি জিজ্ঞেস করেছেন, স্বামীর প্রতি ভালোবাসা না থাকা বা কথা না বলা কি গুনাহ?
- ভালোবাসা কমে যাওয়া: এটি স্বাভাবিক মানসিক প্রতিক্রিয়া। এর জন্য আপনি গুনাহগার হবেন না।
- কথা না বলা: এটি আদর্শ আচরণ নয়, তবে মানসিক বিপর্যয়ের কারণে যদি আপনি কথা বলতে না পারেন, তাহলে এটি ক্ষমার যোগ্য। তবে চেষ্টা করুন, অন্তত প্রয়োজনীয় কথাবার্তা বলতে।
৭. নফসের অনুসরণ সম্পর্কে
আপনি জিজ্ঞেস করেছেন, আপনি নফসের অনুসরণ করছেন কিনা। নফসের অনুসরণ তখনই হয়, যখন কোনো কাজ আল্লাহর নাফরমানির জন্য করা হয়। আপনি যদি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্যই এই সম্পর্ক থেকে বের হতে চান এবং শরয়ী পদ্ধতি অনুসরণ করেন, তাহলে এটি নফসের অনুসরণ নয়। তবে সতর্ক থাকুন, যেন রাগ বা ক্ষোভের বশবর্তী হয়ে কোনো সিদ্ধান্ত না নেন।
৮. চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত
আপনার জন্য কোনটি সঠিক—এটি নির্ভর করে আপনার পরিস্থিতি ও স্বামীর আচরণের উপর। তবে শরয়ী দৃষ্টিকোণ থেকে:
১. যদি স্বামী ন্যায়সংগত আচরণ করেন এবং আপনি ধৈর্য ধারণ করতে পারেন, তাহলে সম্পর্ক রক্ষা করা উত্তম। বিশেষ করে, আপনার সন্তান (যদি থাকে) এবং পারিবারিক স্থিতিশীলতার জন্য।
২. যদি স্বামী ন্যায়সংগত আচরণ না করেন বা আপনার উপর জুলুম করেন, তাহলে খুলার মাধ্যমে বিচ্ছেদ নেওয়া জায়েয।
৩. যদি আপনি মানসিকভাবে এতটাই বিপর্যস্ত হন যে, এই সম্পর্কে থাকা আপনার দ্বীন ও দুনিয়ার জন্য ক্ষতিকর, তাহলে খুলার মাধ্যমে বিচ্ছেদ নেওয়া যেতে পারে।
উপসংহার
প্রিয় বোন, আপনার পরিস্থিতি সত্যিই কঠিন। আমি আপনার জন্য দোয়া করি, আল্লাহ আপনাকে ধৈর্য ও সাহায্য দান করুন। মনে রাখবেন:
"নিশ্চয়ই কষ্টের সাথে স্বস্তি রয়েছে।" (সূরা আশ-শারহ: ৫)
আপনার উচিত:
- আল্লাহর কাছে বেশি বেশি দোয়া করা
- ধৈর্য ধারণ করা
- স্বামীর সাথে শান্তিপূর্ণ আলোচনা করা
- প্রয়োজনে খুলার মাধ্যমে বিচ্ছেদ নেওয়া
আল্লাহ তাআলা আপনার জন্য উত্তম সিদ্ধান্ত নেওয়ার তাওফিক দান করুন। আমিন।