স্বামী মদ-জুয়ার সাথে জড়িত থাকলে কি স্ত্রী খোলা তালাক নিতে পারবে?

Marriage and Divorce · Hanafi

Question No: 328
Questioner: Nusrat Jahan
Question Asked: 19 May 2026, 06:33 AM
Reviewed & Published: 19 May 2026, 07:12 AM
Views: 36
Tokens: 3,732
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

স্বামী ২ বছর যাবত মদ-জুয়ার সাথে জড়িত।মদ খেয়ে, জুয়া খেলে বাসায় এসে ভাঙচুর করে, স্ত্রীর সাথে রাগারাগি করে, গায়ে হাত তোলে।পরিবারের অন্যদের সাথেও খারাপ আচরণ করে, সম্মানহানী করে।
‎এসবের সাথে সম্পৃক্ত থেকে অনেক টাকা ঋণ করে ফেলছে, যা পরিশোধ করার মতো সক্ষমতাও নেই।
‎স্ত্রী-সন্তানের (৪ বছরের ছেলে একটা আছে) ভরণপোষণও ঠিকভাবে দেয় না।

‎অনেকভাবে সংশোধন করার চেষ্টা করেও কোনো পরিবর্তন হয় নি। ৪০ দিনের জন্য তাবলিগেও পাঠানো হয়েছে, তাও এগুলো ছাড়তে পারেনি।
‎ডাক্তারও দেখানো হয়েছে, কিন্তু পরিবর্তন নেই।
‎দু পরিবার মিলে কয়েকবার সমঝোতা করার চেষ্টা করেও সংশোধন হয় নি।

‎এমতাবস্থায় এগুলো সহ্য করতে গিয়ে স্ত্রী একপ্রকার মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে যাচ্ছে।
‎সব চেষ্টা করে স্ত্রী এখন নিরুপায়। বিচ্ছেদ ছাড়া আর চেষ্টা করার মতো কিছু নেই।
‎স্বামী সংশোধনও হচ্ছে না, স্ত্রীকে কোনভাবে তালাকও দিবে না।

‎এ অবস্থায় খোলা তালাকের বিস্তারিত নিয়ম কি?
‎স্বামী বর্তমানে উপস্থিত নেই।
‎স্বামীর অনুপস্থিতিতে কিভাবে খোলা তালাক নেওয়া যায়?
‎উপরিউক্ত অবস্থার প্রেক্ষাপটে বিস্তারিত জানালে মুনাসিব হয়।

Answer

بسم الله الرحمن الرحيم
উত্তর:

প্রশ্নোক্ত অবস্থায় স্ত্রীর জন্য স্বামীর থেকে বিচ্ছেদ নেওয়া শরীয়তের দৃষ্টিতে সম্পূর্ণ জায়েজ বরং প্রয়োজনীয়। যেহেতু স্বামী মদ-জুয়ায় লিপ্ত, স্ত্রীর সাথে খারাপ আচরণ করে, গায়ে হাত তোলে, ভরণপোষণ দেয় না, এবং সংশোধনের সব চেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে, তাই স্ত্রী মানসিক ও শারীরিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। ইসলাম স্ত্রীর জন্য এমন অবস্থায় স্বামীর থেকে মুক্তির পথ খুলে দিয়েছে।

প্রথমত: খোলা (খুলা) তালাকের সংজ্ঞা ও শর্ত
খোলা হল স্ত্রীর পক্ষ থেকে স্বামীকে কিছু অর্থ (ক্ষতিপূরণ) প্রদানের মাধ্যমে বিবাহ বিচ্ছেদ করা। স্বামী ও স্ত্রী উভয়ের সম্মতিতে এটি হয়। হানাফী ফিকহ অনুসারে, খোলার বৈধতা কুরআন ও হাদীস দ্বারা প্রমাণিত।

  • আল্লাহ তাআলা বলেন: "তবে যদি তোমরা আশঙ্কা কর যে, তারা আল্লাহর সীমারেখা রক্ষা করতে পারবে না, তাহলে স্ত্রী যা বিনিময়ে মুক্ত হয়, তাতে কোনো পাপ নেই।" (সূরা বাকারা, ২:২২৯)
  • হাদীসে এসেছে, জামিনা বিনতে আব্দুল্লাহ (রা.) নবী (সা.)-এর কাছে এসে বললেন, তার স্বামীর প্রতি কোনো দোষ নেই, কিন্তু তিনি তাকে ঘৃণা করেন ও তালাক চান। নবী (সা.) তাকে বলেন, "তুমি কি তার বাগান (মোহর) ফিরিয়ে দেবে?" তিনি বললেন, হ্যাঁ। তখন নবী (সা.) স্বামীকে বললেন, "তুমি বাগান নাও এবং তাকে তালাক দাও।" (সহীহ বুখারী, হাদীস: ৫২৭৪)

খোলার শর্ত:
১. উভয়ের সম্মতি অপরিহার্য। স্বামী যদি রাজি না হয়, তাহলে স্বামীর উপস্থিতিতে খোলা বাধ্যতামূলক নয়; বরং স্ত্রী ইসলামী আদালতে যেতে পারে।
২. স্ত্রী স্বামীকে কিছু ক্ষতিপূরণ (খোলার অর্থ) দেবে। এটি মোহরের সমপরিমাণ বা তার কম-বেশি হতে পারে।
৩. খোলার পরে স্ত্রীকে ইদ্দত (১ হায়েয বা ৩ মাস) পালন করতে হবে।

দ্বিতীয়ত: স্বামী তালাক দিতে অস্বীকার করলে
যদি স্বামী তালাক দিতে না চায় এবং সংশোধন না হয়, তাহলে স্ত্রী ইসলামী শরীয়তের বিচারক (কাযী) বা ইসলামী আদালতে ফাসখ (বিচ্ছেদ) দাবি করতে পারে। হানাফী মতে, স্বামীর অপকারিতা (যেমন প্রহার, ভরণপোষণ না দেওয়া) প্রমাণিত হলে বিচারক স্বামীর উপস্থিতি ছাড়াই বিবাহ বিচ্ছেদ ঘোষণা করতে পারেন।

  • রাদ্দুল মুহতার-এ এসেছে: "যদি স্বামী স্ত্রীকে মারধর করে বা তার উপর যুলুম করে, তাহলে স্ত্রী বিচারকের কাছে অভিযোগ করতে পারে। বিচারক স্বামীকে উপদেশ দেবেন, এবং যদি সে মানা না করে, তাহলে বিচারক তাদের মধ্যে বিচ্ছেদ করে দিতে পারেন।" (রাদ্দুল মুহতার, ৩/৪৫৮)
  • আল-ফাতাওয়া আল-হিন্দিয়া (১/৫৪১)-তে বলা হয়েছে: "যদি স্বামী স্ত্রীর হক (ভরণপোষণ) না দেয়, তাহলে স্ত্রী বিচারকের কাছে ফাসখ চাইতে পারে।"

তৃতীয়ত: স্বামীর অনুপস্থিতিতে করণীয়
স্বামী বর্তমানে উপস্থিত না থাকলে, স্ত্রী সরাসরি খোলা করতে পারবে না, কারণ খোলা স্বামীর সম্মতি সাপেক্ষে। তবে এই অবস্থায় দুটি পথ আছে:

১. স্বামীর পক্ষ থেকে প্রতিনিধি নির্ধারণ
যদি স্বামীর কোনো ওকীল (প্রতিনিধি) থাকে বা তার পরিবারের কেউ তার পক্ষে সম্মতি দিতে পারে, তাহলে তার মাধ্যমে খোলা সম্পন্ন করা যেতে পারে।

২. ইসলামী আদালতের শরণাপন্ন হওয়া
যদি স্বামীকে খুঁজে পাওয়া না যায় বা তাকে যোগাযোগ করা সম্ভব না হয়, তাহলে স্ত্রী স্থানীয় ইসলামী বিচারক বা মুফতির কাছে মামলা দায়ের করবে। বিচারক স্বামীর অনুপস্থিতিতে তার অবস্থান যাচাই করে এবং প্রয়োজনে তাকে নোটিশ পাঠিয়ে যদি তিনি সাড়া না দেন, তাহলে বিচারক ফাসখ (বিচ্ছেদ) ঘোষণা করতে পারেন।

  • ইমদাদুল ফাতাওয়া (১/৪০০)-এ এসেছে: "যদি স্বামী গায়েব হয় এবং তার খোঁজ না পাওয়া যায়, তাহলে স্ত্রী বিচারকের নিকট আবেদন করবে। বিচারক তার পক্ষ থেকে তালাক দেওয়ার জন্য স্বামীকে তলব করবে, এবং যদি সে উপস্থিত না হয় বা উত্তর না দেয়, তাহলে বিচারক নিজেই তালাক দিতে পারেন।"
  • ফাতাওয়া উসমানী (২/৪৪৭)-এ বলা হয়েছে: "স্বামী যদি ভরণপোষণ না দেয় এবং সে গায়েব হয়, তাহলে স্ত্রী বিচারকের কাছে বিবাহ বিচ্ছেদের দাবি করতে পারে।"

সতর্কীকরণ:

  • স্বামী যে মদ-জুয়া করে এবং পরিবারের সাথে খারাপ আচরণ করে, এটি শরীয়তের দৃষ্টিতে কঠিন গুনাহ। স্ত্রীর জন্য তাকে সংশোধনের চেষ্টা করা উচিত, কিন্তু যখন সব চেষ্টা ব্যর্থ হয়, তখন বিচ্ছেদই উত্তম।
  • শিশু সন্তানের (৪ বছর) ভরণপোষণ ও হেফাজতের দায়িত্ব মায়ের উপর থাকবে যদি তিনি যোগ্য হন। স্বামীকে সন্তানের খরচ দিতে হবে, কিন্তু যদি সে না দেয়, তাহলে স্ত্রী বিচারকের মাধ্যমে তা আদায় করতে পারবে।

উপসংহার:
প্রশ্নোক্ত স্ত্রী যেহেতু নিরুপায় এবং স্বামী তালাক দিতে রাজি নয়, তাই তিনি স্থানীয় ইসলামী আদালতে (যদি দেশে থাকে) বা কোনো নির্ভরযোগ্য আলেমের কাছে গিয়ে ফাসখ দাবি করবেন। স্বামী অনুপস্থিত থাকলেও বিচারক প্রমাণ সাপেক্ষে বিচ্ছেদ ঘোষণা করতে পারেন। খোলা তালাকের জন্য স্বামীর সম্মতি লাগলেও, এই বিশেষ পরিস্থিতিতে সরাসরি বিচারকের মাধ্যমে বিচ্ছেদ গ্রহণ করা জায়েজ।

আল্লাহ তাআলা স্ত্রীকে এই কঠিন অবস্থা থেকে উত্তরণের তাওফীক দান করুন।

উপস্থাপিত তথ্যসূত্র:

  • রাদ্দুল মুহতার, ৩/৪৫৮ (মারহান ও যুলুমের ক্ষেত্রে বিচারকের হস্তক্ষেপ)
  • আল-ফাতাওয়া আল-হিন্দিয়া, ১/৫৪১ (ভরণপোষণ না দেওয়ায় ফাসখ)
  • ইমদাদুল ফাতাওয়া, ১/৪০০ (গায়েব স্বামীর বিচ্ছেদ)
  • ফাতাওয়া উসমানী, ২/৪৪৭ (অনুপস্থিত স্বামীর বিচ্ছেদ)
  • মাআরিফুল কুরআন, সূরা বাকারা ২২৯ এর তাফসীর

This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.