কর্তৃপক্ষ যদি ঘুষ গ্রহণ করে সেক্ষেত্রে যারা মধ্যস্থতা করছে তাদের আয় কি জায়েয?
Business and Job · Hanafi
Question
Answer
মধ্যস্থতার বিনিময়ে টাকা নেওয়ার বিধান
প্রশ্নের সারসংক্ষেপ
সরকারি বাজেট থেকে বরাদ্দকৃত কোনো কাজ কর্তৃপক্ষ ঘুষ গ্রহণ করে দিচ্ছে। সেই কাজ পাওয়ার জন্য কোম্পানি ও কর্তৃপক্ষের মধ্যে মধ্যস্থতা করা হচ্ছে। এই মধ্যস্থতার বিনিময়ে টাকা নেওয়া জায়েজ হবে কি?
উত্তর
মূল নীতি: ইসলামে ঘুষ (রিশওয়াত) স্পষ্টভাবে হারাম। ঘুষ দেওয়া-নেওয়া উভয়ই কবিরা গুনাহ। পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হয়েছে:
"তোমরা একে অপরের সম্পদ অন্যায়ভাবে ভোগ করো না এবং জনগণের সম্পদের কিছু অংশ জেনেশুনে পাপের পথে খেয়ে ফেলার উদ্দেশ্যে শাসকদেরকে দিও না।" (সূরা আল-বাকারা: ১৮৮)
এছাড়া রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
"ঘুষদাতা ও ঘুষগ্রহীতার উপর লানত।" (মিশকাতুল মাসাবিহ: ৩৭৭৮)
মধ্যস্থতার বিনিময়ে টাকা নেওয়ার বিধান
উপরোক্ত প্রশ্নের প্রেক্ষাপটে, এখানে কয়েকটি বিষয় বিবেচনা করতে হবে:
১. মধ্যস্থতার প্রকৃতি
যদি মধ্যস্থতাকারী কর্তৃপক্ষের কাছে কোম্পানির পক্ষ হয়ে কাজটি পাওয়ার জন্য সুপারিশ করে এবং এর বিনিময়ে টাকা নেয়, তাহলে এটি নিম্নলিখিত কারণে জায়েজ হবে না:
-
ঘুষের সহায়তা করা: কর্তৃপক্ষ যখন ঘুষের বিনিময়ে কাজ দিচ্ছে, তখন মধ্যস্থতাকারী পরোক্ষভাবে এই হারাম লেনদেনে সহায়তা করছে। ইসলামে হারাম কাজে সহায়তা করাও হারাম। ইরশাদ হয়েছে:
"তোমরা নেকী ও তাকওয়ায় একে অপরের সহযোগিতা করো, পাপ ও সীমালঙ্ঘনে সহযোগিতা করো না।" (সূরা আল-মায়েদা: ৫:২)
-
ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর মতানুযায়ী: কোনো হারাম কাজের মাধ্যম যদি কেউ উপার্জন করে, তবে তা হারাম। ইবনে আবিদীন (রহ.) 'রাদ্দুল মুহতার' গ্রন্থে বলেছেন:
"ঘুষের মাধ্যমে কোনো কাজ করিয়ে দেওয়ার বিনিময়ে পারিশ্রমিক নেওয়া জায়েজ নয়, কারণ এটি হারাম কাজের সহায়তা।" (রাদ্দুল মুহতার, ৫:৪২)
২. কর্তৃপক্ষ যদি ঘুষ গ্রহণ করে তবুও কাজটি পাওয়ার মাধ্যম
যদি কর্তৃপক্ষ ঘুষ গ্রহণ করে এবং কোম্পানি জানে যে কাজটি পেতে ঘুষ দিতে হবে, তাহলে সেখানে মধ্যস্থতা করা দ্বিগুণভাবে হারাম। ইমাম মুহাম্মাদ (রহ.) বলেছেন:
"যে ব্যক্তি কোনো হারাম কাজের জন্য মধ্যস্থতা করে এবং এর বিনিময়ে অর্থ গ্রহণ করে, তা তার জন্য হালাল নয়।" (আল-আসল, ৪:৪৮)
৩. ব্যতিক্রম পরিস্থিতি
শুধুমাত্র সেসব ক্ষেত্রে মধ্যস্থতা জায়েজ হতে পারে যেখানে:
- কাজটি পাওয়ার জন্য ঘুষের প্রয়োজন নেই, বরং ঘুষ একটি পৃথক বিষয়।
- মধ্যস্থতাকারী শুধুমাত্র বৈধ পদ্ধতিতে (যেমন: সঠিক তথ্য প্রদান, যোগ্যতা প্রমাণ ইত্যাদি) সহায়তা করে।
- মধ্যস্থতার বিনিময় প্রকৃত সেবার জন্য হয়, ঘুষের লেনদেনের জন্য নয়।
কিন্তু প্রশ্নে উল্লেখিত অবস্থায় যেখানে কর্তৃপক্ষ ঘুষ গ্রহণ করে কাজ দিচ্ছে, সেখানে সাধারণত মধ্যস্থতা করা এবং তার বিনিময়ে টাকা নেওয়া জায়েজ হবে না।
ফাতাওয়া উসমানী তে উল্লেখ আছে
মুফতি মুহাম্মাদ তাকী উসমানী (দামাত বারাকাতুহুম) বলেন:
"সরকারি কাজ পাইয়ে দেওয়ার নামে কোনো ব্যক্তি যদি কমিশন বা পারিশ্রমিক গ্রহণ করে, কিন্তু সেই কাজ পাওয়ার জন্য ঘুষ বা অন্য কোনো হারাম উপায় অবলম্বন করতে হয়, তাহলে এই কমিশন গ্রহণ করা জায়েজ নয়। বরং এটি সুদ ও ঘুষের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ।" (ফাতাওয়া উসমানী, ২:৪৫২)
উপসংহার
প্রশ্নে বর্ণিত অবস্থায় কর্তৃপক্ষ যখন ঘুষ গ্রহণ করে কাজ প্রদান করছে, তখন সেই কাজ পাওয়ার জন্য মধ্যস্থতা করা এবং তার বিনিময়ে টাকা নেওয়া জায়েজ নয়। কারণ এটি হারাম কাজে সহায়তা করার নামান্তর। মুসলিম ব্যক্তির জন্য উচিত হবে এই ধরনের লেনদেন থেকে সম্পূর্ণরূপে বিরত থাকা।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে হালাল রিজিক অন্বেষণ করার এবং হারাম থেকে দূরে থাকার তাওফিক দান করুন। আমীন।
আল্লাহই সর্বাধিক জ্ঞানী।