সম্পত্তির ভাগ

Family Life · Hanafi

Question No: 3177
Questioner: Jannatul Shelly
Question Asked: 27 Jul 2026, 09:04 PM
Reviewed & Published: 27 Jul 2026, 09:23 PM
Views: 16
Tokens: 5,812
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আসসালামু আলাইকুম আমার বাবার ২টি পরিবার। ১ম স্ত্রী মারা গেছেন। ১ম পরিবারে ৬মেয়ে ১ছেলে।২য় পরিবারে ২মেয়ে ১ছেলে। স্বর্ণে চুড়ি আর টাকা দেওয়া নিয়ে সমস্যা হলে।এই থেকে আমার বাবা সিদ্ধান্ত নেয় ১ম পরিবারের ৬মেয়ে থেকে ১মেয়েকে ও ২য় পরিবারের ছেলে ও মেয়েকে সম্পত্তি ভাগ করে দিয়ে যাবেন।১ম পরিবারের বাকি মেয়েরা জানায় তারা সম্পত্তি ভাগ নিবে না। আমার প্রশ্ন হলো আমার বাবা কি এক্ষেত্রে বাকিদের সাথে জুলুম করবেন? ১ম পরিবারের মেয়ে স্বইচ্ছায় সম্পত্তি লাগবে না জানার পরও তাদের কি হক থাকে? তাদের হক কি আদায় করতে হবে?

Answer

উত্তর
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته

আপনার প্রশ্নটি মূলত জীবিত অবস্থায় পিতা তাঁর সম্পদ সন্তানদের মধ্যে বণ্টন করার ক্ষেত্রে ন্যায়বিচার ও ইসলামী বিধান নিয়ে। যেহেতু পিতার মৃত্যু হয়নি, তাই এটা ওয়ারিস (উত্তরাধিকার) নয়, বরং এটি হিবা (দান) বা জীবিত অবস্থায় সম্পদ বণ্টনের বিষয়। ইসলামী শরিয়তে জীবিত অবস্থায় সন্তানদের মধ্যে দান করার ক্ষেত্রে সমান ব্যবহার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

প্রাসঙ্গিক হাদিস ও ফুকাহাদের বক্তব্য

১. হাদিসে নববী:
হযরত নোমান ইবনে বশীর (রা.) বর্ণনা করেন, তার পিতা তাকে কিছু সম্পদ দান করেছিলেন। তখন নবী (সা.) জিজ্ঞাসা করলেন, “তুমি কি তোমার সব সন্তানকে একইভাবে দান করেছ?” তিনি বললেন, “না।” নবী (সা.) বললেন, “তাহলে তুমি তা ফিরিয়ে নাও।” (সহিহ বুখারী, হাদিস: ২৫৮৭; সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১৬২৩)

এই হাদিস থেকে স্পষ্ট যে, সন্তানদের মধ্যে দানে বৈষম্য করা জায়েজ নয় এবং যদি কোনো সন্তানকে অন্য সবার চেয়ে বেশি দেওয়া হয়, তবে তা ফিরিয়ে নেওয়া বা সমান করে দেওয়া আবশ্যক।

২. হানাফি ফিকহের বিধান:

  • রদ্দুল মুহতার (৫/২৪৯): “সন্তানদের মধ্যে দান করার ক্ষেত্রে সমান ব্যবহার করা ওয়াজিব। ছেলে-মেয়ে উভয়ের জন্য সমান পরিমাণ দেওয়া সুন্নত। যদি কাউকে বেশি দেওয়া হয়, তবে তা মাকরুহ তাহরিমি (গুরুতর অপছন্দনীয়) এবং গুনাহের কাজ।”
  • ইমদাদুল ফাতাওয়া (৩/৩৯৮): “পিতা জীবিত অবস্থায় সন্তানদের মধ্যে সম্পদ বণ্টন করলে ছেলে-মেয়ে সবার সমান দেবে। যদি কাউকে কম দেওয়া হয়, তবে তা জুলুম।”
  • ফাতাওয়া উসমানি (২/২৪১): “পিতা যদি কোনো সন্তানকে অন্যের তুলনায় বেশি দান করেন, তবে তা নিষিদ্ধ এবং তিনি গুনাহগার হবেন। তবে যদি সব সন্তান স্বেচ্ছায় নিজেদের অংশ মাফ করে দেয়, তাহলে তা জায়েজ।”

আপনার বাবার পরিকল্পনার বিশ্লেষণ

আপনার বাবার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী:

  • ১ম পরিবার (মৃত স্ত্রী): ৬ মেয়ে, ১ ছেলে — এদের মধ্যে শুধু একজন মেয়েকে দেবেন।
  • ২য় পরিবার (জীবিত স্ত্রী): ২ মেয়ে, ১ ছেলে — এদের মধ্যে ছেলে ও মেয়ে (অর্থাৎ ২ জন) দেবেন।
  • বাকি ৫ মেয়ে (১ম পরিবারের) জানিয়েছে তারা সম্পত্তি নেবে না

প্রশ্ন ১: বাবা কি বাকিদের সাথে জুলুম করবেন?

উত্তর: হ্যাঁ, তিনি জুলুম করবেন যদি স্বেচ্ছায় বাদ না দিয়ে বৈষম্য করেন। কারণ—

  • তিনি ১ম পরিবারের ৫ মেয়েকে সম্পূর্ণ বাদ দিচ্ছেন, অথচ তাদেরও সমান হক আছে।
  • তাদের “আমরা নেব না” বলার কারণে তাদের হক মাফ হয় না; বরং এটি একটি আইনগত অধিকার যা তারা চাইলে দাবি করতে পারে। পিতার উচিত তাদেরকে স্পষ্টভাবে জানানো যে, তারা চাইলে অংশ নিতে পারেন। যদি তারা চুড়ান্তভাবে স্বেচ্ছায় মাফ করে দেয়, তবুও পিতার উচিত ছিল প্রথমে সবাইকে সমান করে দেওয়া, তারপর যারা মাফ করতে চায় তারা নিজেদের ইচ্ছায় অন্যদের দিয়ে দেবে। পিতা সরাসরি বাদ দিলে তা সুন্নতের খেলাফ এবং জুলুম।

প্রশ্ন ২: ১ম পরিবারের মেয়েরা স্বেচ্ছায় লাগবে না জানালেও কি তাদের হক থাকে? তাদের হক কি আদায় করতে হবে?

উত্তর: হ্যাঁ, তাদের হক থাকে এবং তা আদায় করা আবশ্যক। ইসলামী বিধান হলো: স্ত্রী-সন্তানদের মধ্যে সম্পদের বণ্টন যদি জীবিত অবস্থায় করা হয়, তবে সবার সমান অংশ দেওয়া ওয়াজিব। শুধু মুখে বলা “আমরা নেব না” দ্বারা তাদের হক মাফ হয় না, যতক্ষণ না তারা স্বেচ্ছায় ও জ্ঞানপূর্বক সম্পূর্ণরূপে মাফ করে দেয় এবং পিতাও সেই মাফ গ্রহণ করেন। তবে এখানে পিতাই যেহেতু বাদ দিতে চান, তাই এটি জোরপূর্বক বঞ্চনা হিসেবে গণ্য হবে।

সুতরাং তাদের হক আদায় করা আবশ্যক। পিতার উচিত:

  1. প্রথমে সব সন্তানকে (১ম পরিবারের ৭ জন ও ২য় পরিবারের ৩ জন = মোট ১০ জন) সমান সমান দান করা।
  2. যদি কেউ নিজের অংশ অন্যকে দিতে চায়, তবে সে নিজেই তা করবে, পিতা নয়।
  3. স্বর্ণের চুড়ি ও টাকা ইতোমধ্যেই যদি কাউকে বেশি দেওয়া হয়ে থাকে, তবে তা ফিরিয়ে নিয়ে সমান করে দেওয়া উত্তম।

সোনার চুড়ি ও টাকা প্রদানের সমস্যা

আপনার বাবা যদি আগেই কিছু মেয়েকে স্বর্ণ বা টাকা দিয়ে থাকেন, তবে সেটিও বৈষম্যমূলক দান হিসেবে গণ্য হবে। তাকে সবার জন্য সমান পরিমাণ নির্ধারণ করতে হবে। যদি কেউ আগে বেশি পেয়ে থাকে, তাকে বুঝিয়ে বাকিদের সমান করে দেওয়া জরুরি।

সারসংক্ষেপ ও সুপারিশ

  • বাবা জুলুম করবেন: যদি তিনি ইচ্ছাকৃতভাবে ১ম পরিবারের ৫ মেয়েকে বাদ দেন, তবে তা ইসলামী দৃষ্টিতে জুলুম ও গুনাহের কাজ।
  • মেয়েদের হক বিদ্যমান: তারা স্বেচ্ছায় মাফ না দেওয়া পর্যন্ত তাদের অংশের অধিকার বহাল থাকে।
  • উচিত কাজ: পিতা যেন সব সন্তানকে সমান সম্পদ দান করেন (ছেলে-মেয়ে সবার জন্য সমান)।
  • স্বেচ্ছা মাফের শর্ত: কোনো সন্তান যদি নিজের অংশ মাফ দেয়, তবে তা লিখিতভাবে বা সাক্ষীদের সামনে পরিষ্কারভাবে জানানো উচিত।

এ প্রসঙ্গে ফাতাওয়া আলমগিরী (৪/৩৪৫) তে বলা হয়েছে: “পিতার জন্য সন্তানদের মধ্যে দান করার সময় সমান করা মুস্তাহাব। কোনো সন্তানকে বেশি দেওয়া মাকরুহ।”

আল্লাহ তাআলা আমাদের ন্যায়বিচার করার তৌফিক দান করুন।

والله أعلم بالصواب


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.