স্ত্রী তার কথা রক্ষা না করলে তালাক দিলে গুনাহ বা হক নষ্ট হবে কি
Marriage and Divorce · Hanafi
Question
Answer
উত্তর: স্ত্রীর হক ত্যাগ করা, পুনরায় দাবি করা এবং তালাক প্রদানের বিধান
সংক্ষিপ্ত উত্তর:
আপনার প্রথম স্ত্রী প্রাথমিকভাবে তার হক (সময় বণ্টন, ভরণপোষণ ইত্যাদি) ত্যাগ করলেও তা চিরস্থায়ী নয়। তিনি যেকোনো সময় সেই হক পুনরায় দাবি করতে পারেন। আপনি যদি তার দাবির পরও সমান অধিকার না দেন, তবে তা গুনাহ হবে। তবে আপনি যদি তালাক দেন, তাহলে তা জায়েজ, তবে শরিয়তের নিয়ম মেনে দিতে হবে। তিনি আল্লাহর কাছে বিচার চাইলে তার হক নষ্ট হবে না; বরং এটি তার বৈধ অধিকার।
বিস্তারিত উত্তর:
১. স্ত্রীর হক ত্যাগ করার বিধান (Hanafi Fiqh অনুযায়ী)
ইসলামী শরিয়তে স্ত্রীর ওপর স্বামীর বেশ কিছু অধিকার রয়েছে, যার মধ্যে অন্যতম হলো সমান সময় বণ্টন (কাসম) এবং ভরণপোষণ (নফকা)। স্ত্রী ইচ্ছা করলে তার এই হক স্বেচ্ছায় ত্যাগ করতে পারেন। তবে এই ত্যাগ চিরস্থায়ী নয়; তিনি যেকোনো সময় তা ফিরিয়ে নিতে পারেন।
-
রদ্দুল মুহতার (আল-হিদায়া ও ফাতাওয়া আলমগিরির আলোকে) বলা হয়েছে:
“যদি স্ত্রী তার রাতের অংশ (কাসম) স্বামীকে দান করে দেয়, তবে তা বৈধ। কিন্তু সে ইচ্ছা করলে যে কোনো সময় তা ফিরিয়ে নিতে পারে এবং স্বামীকে তার প্রাপ্য অংশ দিতে হবে।”
(রদ্দুল মুহতার, ৩/২১৩; বাবুল কাসম) -
ফাতাওয়া উসমানি (মুফতি তাকি উসমানি) তে উল্লেখ আছে:
“স্ত্রী নিজ ইচ্ছায় তার হক ত্যাগ করতে পারে, তবে যদি সে পরে তা দাবি করে, তবে স্বামীর জন্য তা পূরণ করা আবশ্যক। অন্যথায় স্বামী গুনাহগার হবে।”
(ফাতাওয়া উসমানি, ২/১৮০)
আপনার প্রথম স্ত্রী প্রাথমিকভাবে বলেছিলেন যে, তিনি আপনার বাড়িতে আসবেন না এবং তার হক ক্ষমা করে দিচ্ছেন। এখন তিনি সেই সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করে বাড়িতে এসেছেন এবং সমান অধিকার চাচ্ছেন। এটি তার বৈধ অধিকার। আপনি পূর্বে তার হক ত্যাগের কারণে যত দিন তিনি দাবি করেননি, তত দিন আপনার ওপর গুনাহ ছিল না। তবে এখন দাবি করার পর আপনি তাকে সমান অধিকার দিতে বাধ্য।
২. সমান অধিকার দেওয়া অসম্ভব হলে করণীয়
যদি আপনি দুই স্ত্রীর মধ্যে সম্পূর্ণ ন্যায়বিচার (বিশেষ করে রাত্রি যাপন ও ভরণপোষণে) করতে অক্ষম হন, তবে শরিয়ত আপনাকে তালাক দেওয়ার অনুমতি দেয়। কুরআনে বলা হয়েছে:
“আর যদি তোমরা নারীদের মধ্যে ন্যায়বিচার করতে না পারো, তবে একটিকেই বিবাহ করো।”
(সূরা নিসা: ৩)
এই আয়াতের ভিত্তিতে ফকিহগণ বলেন, যদি কেউ একাধিক স্ত্রীর মধ্যে সমান ন্যায়বিচার করতে সক্ষম না হয়, তবে তার জন্য এক স্ত্রী রাখাই উত্তম। তাই আপনি যদি মনে করেন যে, প্রথম স্ত্রীকে সমান অধিকার দেওয়া আপনার পক্ষে সম্ভব নয়, তাহলে তাকে তালাক দেওয়া জায়েজ, তবে তা গুনাহের কারণ নয় যদি আপনি শরিয়তের নিয়ম অনুযায়ী তালাক দেন।
৩. তিনি আল্লাহর কাছে বিচার চাইলে তার হক নষ্ট হবে কি?
না, তার হক নষ্ট হবে না। বরং এটি তার বৈধ অধিকার। তিনি আল্লাহর কাছে বিচার চাইতে পারেন এবং আপনি যদি তার প্রাপ্য হক আদায় না করেন, তবে আল্লাহর দরবারে আপনি জবাবদিহি হবেন। ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর মতে, স্ত্রী তার স্বামীর বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলতে পারেন এবং শরিয়তের আদালতে বিচার চাইতে পারেন। সুতরাং, তিনি বিচার চাইলে তার হক নষ্ট হওয়ার কোনো প্রশ্ন নেই; বরং আপনি যদি তার হক আদায় না করেন, তবে তা আপনার জন্য গুনাহ হবে।
৪. তালাক দেওয়ার পদ্ধতি ও সতর্কতা
আপনি যদি প্রথম স্ত্রীকে তালাক দিতে চান, তবে নিম্নলিখিত নিয়ম মেনে চলুন:
- এক তালাক দিন: একসঙ্গে তিন তালাক না দিয়ে শুধু একটি তালাক (রাজ‘ঈ) দিন। যাতে তিনি ইদ্দতের মধ্যে ফিরিয়ে নেওয়ার সুযোগ থাকে।
- ইদ্দতের সময় ভরণপোষণ দিন: তালাকের পর ইদ্দতকাল (তিন মাসিক বা তিন মাস) পর্যন্ত তার থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে।
- মোহরানা আদায় করুন: যদি কোনো মোহর বাকি থাকে, তবে তা পরিশোধ করুন।
- ইদ্দতের মধ্যে তাকে বাড়ি থেকে বের করবেন না (তবে যদি উভয়েই সম্মত হন, তবে ভিন্ন)।
৫. গুরুত্বপূর্ণ হানাফি কিতাবের রেফারেন্স:
- রদ্দুল মুহতার (৩/২১৩): স্ত্রীর হক ত্যাগ ও পুনরায় দাবির বিধান।
- ফাতাওয়া আলমগিরি (১/৩৪২): একাধিক স্ত্রীর মধ্যে ন্যায়বিচার ও তালাকের বিধান।
- ইমদাদুল ফাতাওয়া (২/২৪৫): স্ত্রীর হক ত্যাগের পর পুনরায় দাবি করলে করণীয়।
- বেহেশতি জেওর (বিবাহ অধ্যায়): স্ত্রীর অধিকার ও তালাকের নিয়ম।
উপসংহার:
- আপনার প্রথম স্ত্রী তার হক ত্যাগ করেছিলেন, কিন্তু এখন তা ফিরিয়ে নিয়েছেন। এটি বৈধ।
- আপনি এখন তাকে সমান অধিকার দিতে বাধ্য। যদি দেওয়া সম্ভব না হয়, তবে তালাক দেওয়া জায়েজ।
- তিনি আল্লাহর কাছে বিচার চাইলে তার হক নষ্ট হবে না; বরং এটি তার অধিকার।
- তালাক দিলে তা গুনাহ নয়, তবে শরিয়তের নিয়ম মেনে দিতে হবে।
আল্লাহ তায়ালা আপনাকে সঠিক পথ দেখান এবং উভয় স্ত্রীর মধ্যে ন্যায়বিচার করার তওফিক দান করুন। আমিন।
জাযাকাল্লাহ খাইর।